মনিরা দারিদ্র্যকে হার মানিয়ে স্বাবলম্বী

নিউজ ডেস্ক: মনিরা আকতার রিমারও সাধ ছিল অন্যান্য সহপাঠীদের মতো লেখাপড়া চালিয়ে যাওয়ার। ভালোভাবে জীবন গড়ে দেশও মানুষের সেবা করার। কিন্তু বিধিরবাম, অকালেই ভেঙে গেল তার সেই স্বপ্ন। হঠাৎ বাবা অসুস্থ হয়ে দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে ফেলেন, সংসারে নেমে আসে অভাবের খড়গ। পুত্রসন্তান না থাকায় বড় মেয়ে হিসেবে ৫ জনের সংসারের দায়িত্ব পরে তার কাঁধে।

বাবার উপার্জন বন্ধ হওয়ায় অভাব অনটনের সংসারে দুবেলা দু’মুঠো ভাতও জোটে না তাদের। সেই অবস্থায় সততা, ইচ্ছাশক্তি, বিশ্বাস আর শ্রম দিয়ে স্বাবলম্বী হওয়ার স্বপ্ন দেখেন মনিরা। সমাজে একজন পুরুষ যেমন পরিশ্রম দিয়ে নিজের জীবনেরচিত্র বদলাতে পারে, তেমনি পারে একজন নারীও। এমন প্রতিজ্ঞায় দারিদ্রতার কাছে হার মানেননি মনিরা। সংসারে স্বচ্ছলতা ফেরাতে তিনি কৃষিকাজ থেকে শুরু করে সবকিছুতেই পারদর্শী হয়ে ওঠেন। এরইমধ্যে মনিরা বাংলাদেশ কেমিস্ট অ্যান্ড ড্রাগিস্ট সমিতি (বিসিডিএস) জয়পুরহাট থেকে ৬ মাসের ফার্মাসি কোর্স শেষ করে গড়ে তোলেন ওষুধের দোকান। সেখানে ওষুধ বিক্রির পাশাপাশি অসহায় মানুষের প্রাথমিক চিকিৎসাও দিতেন বিনামূল্যে।

মনিরা আকতার রিমার ওষুধের দোকান জয়পুরহাটের পাঁচবিবি উপজেলার রামচন্দ্রপুর বাজারে। তিনি ওই এলাকার দৃষ্টি প্রতিবন্ধী সাইফুল ইসলামের মেয়ে।

মনিরার পরিবার জানায়, বাড়ির একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি অন্ধ হয়ে যাওয়ায় বড় মেয়ে হিসেবে সংসারের সকল কাজের দায়িত্ব পড়ে মনিরার কাঁধে। ওই অবস্থায় ২০০৬ সালে মনিরা এসএসসি পাশ করার পর জয়পুরহাট বিসিডিএস থেকে ফার্মাসি কোর্সে ৬ মাসের প্রশিক্ষণ নিয়ে নিজেই সংসারের হাল ধরেন। এরপর তাদের সংসার থেকে অভাব দূর হয়েছে।

মনিরা বলেন, যখন আমার বয়স ১২ বছর, তখন বাবা অসুস্থ হয়ে দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে ফেলেন। বাবার সংসারে মা আর আমরা তিন বোন। সংসারে উপার্জনের কোন পুরুষ মানুষ ছিল না। সেসময় ঠিকমত দু’বেলা খাওয়া-দাওয়াও মেলেনি আমাদের।

তিনি বলেন, যখন এসএসসি পাশ করি তখন বয়স ১৬ বছর। ইচ্ছা ছিল পড়াশুনা করার। কিন্তু অভাবের কারণে সেখানেই থেমে গেলাম। বাড়িতেই শুরু করলাম সেলাই মেশিনের কাজ। পাশাপাশি মাঠে কৃষিকাজও করতাম। এরই ফাঁকে জয়পুরহাট বিসিডিএস থেকে ফার্মাসি কোর্সে ৬ মাসের প্রশিক্ষণ নেই। পরে জমানো কিছু অর্থ আর স্থানীয় এনজিও থেকে সাপ্তাহিক কিস্তিতে ঋণ স্থানীয় বাজারে ওষুধের দোকান দেয়। কিছুদিন পর প্রতিদিনের লাভের টাকা থেকে জমানো অর্থ দিয়ে ১১ হাজার টাকায় কিনেন একটি মোটরসাইকেল। তা চালিয়ে মনিরা প্রতিদিন বাজারে গিয়ে ফার্মেসি চালানোর পাশাপাশি গ্রামে গ্রামে ঘুরে অসহায় মানুষদের বিনামূল্যে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া অব্যাহত রেখেছেন।

স্থানীয়রা জানায়, ত্রিশ বছর বয়সেও মনিরা নিজে বিয়ে না করে বিয়ে দিয়েছেন মেঝ বোনকে। আবার ছোট বোনকে ভাল কলেজে লেখাপড়াও করাচ্ছেন।

মনিরার বাবা সাইফুল ইসলাম বলেন, আমার তিন মেয়ে। দৃষ্টিশক্তি হাড়িয়ে ফেলেছি অনেক আগে। সেই থেকে লেখাপড়া বাদ দিয়ে সংসারের হাল ধরেছে মনিরা। মেয়ে হয়ে ব্যবসা করা এবং মোটরসাইকেল চালিয়ে মানুষের চিকিৎসা দেওয়া প্রথমদিকে অনেকেই নানা কথা বলেছে। আমারও অনেক খারাপ লাগতো। বর্তমানে মনিরার এমন সাফল্য অবহেলিত নারীদের মাঝে অনুপ্রেরণা যোগাচ্ছে। ৩০ বছর বয়স পার হয়ে গেছে তবুও মেয়েটি বিয়ে করেনি। এটাই আমাকে সবসময় কাঁদায়।’

প্রতিবেশী জান্নাতুন খাতুন বলেন, অনেক কষ্ট করেছে ওরা। একজন নারী হয়ে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করা এবং পুরো পরিববারের দায়িত্ব নেওয়া খুব কঠিন কাজ। মনিরাকে দেখে সত্যিই আমাদের গর্ব হয়। যে কাজগুলো ছেলেরা করে সেই কাজ মনিরা করছে। নিজের ইচ্ছাকে বিলিন করে মনিরা প্রমাণ করেছে মেয়েরাও সব কাজ করতে পারে।

আরেক প্রতিবেশী ঝরনা আক্তার বলেন, নারীরা সমাজে কারও বোঝা হয়ে থাকতে চায় না। সমাজে অসহায় নারীরা হাল না ছেড়ে নিজের চেষ্টায় স্বাবলম্বী হয়ে মনিরার মতো দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে এমনটাই প্রত্যাশা।

জেড,আই/ঢাকানিউজ২৪ডটকম।