ঘুমন্ত নৈতিকতায় নীতিমালা অসাড়

প্রফেসর ড. মো: ফখরুল ইসলাম: প্রতিদিন কোথাও না কোথাও কোন না কোন ব্যক্তি, দল বা প্রতিষ্ঠানের জন্য নীতমালা তৈরী করা হয়। এসব নীতি দিয়ে সংশ্লিষ্ট সবার আচরণ পরিশীলিত করে একটি কল্যাণকর ভুমিকা রাখার প্রচেষ্টা চালানোর কথা বলা হয়ে থাকে। লিখিত বা অলিখিত যে কোন প্রকারে নীতি প্রচারিত হয়ে থাকে। মানুষ সেভাবে নিজেকে উপযোজন করে নেয়, মেনে নেয়। এভাবে একটি সুশৃংখল ব্যবস্থা তৈরী হয়ে সমাজ বা দেশ ইতিবাচকভাবে একটি গণতান্ত্রিক ধারা খুঁজে পায়। তৈরী ব্যবস্থাগুলো সচল থাকলে শান্তি ও প্রগতির বিকাশ ঘটতে থাকে।

সেজন্য যে কোন কাজের শুরুতেই নীতিমালা তৈরী করার প্রস্তাব আসে। মতামতের সাযুয্যতার ভিত্তিতে প্রতিদিনের দিনলিপিতে অজস্র নীতিমালা তৈরী করা হয়েছে এই পৃথিবীতে। ফাইলে বন্দী করে, টেবিলে সাজিয়ে রেখে সেগুলোর পরিধি, ভয় ও বাধ্যবাধকতা দেখিয়ে কাজের বাস্তবায়ন করা হচ্ছে প্রতিনিয়ত।কিন্তু কিছু ব্যক্তিগত ও দলীয় হীন স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতে গিয়ে এসব নীতিমালা বহুলাংশেই কাগুজে বাঘ হয়ে আবির্ভূত হচ্ছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে আসল নীতিমালা ফাইলে বন্দী জীবন কাটায় আর ব্যক্তি মনের ইচ্ছা-অনিচ্ছা বাস্তবায়ন করাটা প্রধান নীতি হিসেবে স্থান করে নেয়।

এভাবে চাপিয়ে দেয়া নীতির জোরে পথহারা পরিকল্পনা হঠাৎ এ উড়ে এসে জুড়ে বসে। এ প্রক্রিয়ায় স্বভাবতই: মনগড়া ও গতিহারা উন্নয়ন ক্ষেত্র তৈরী হয়ে যায়। এ পন্থা সহজে রূপলাভ করার অন্যতম কারণ চাটুকারী আমলাতন্ত্র ও তাদের প্রভাব বলয়।দিন দিন এই প্রভাব বলয়ে যুক্ত হয়েছে দুর্বল ও অসাড় নেতৃত্ব। পৃথিবীর সকল দরিদ্র দেশে একই অবস্থা। বিদেশী সাহায্যনির্ভর, অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল করা দুর্বল অর্থনীতির দেশগুলোতে আমলাতান্ত্রিক প্রভাব বলয় প্রায় একই রকম ভূমিকা পালন করে থাকে। অবৈধ অর্থ ও পেশীশক্তির জোরে রাজনৈতিক ক্ষমতা অর্জন করে নৈতিকভাবে দুর্বল নেতৃত্ব। দুর্বল নেতৃত্ব ও চাটুকার আমলা মিলে দেশজ অর্থনীতির ভাগবাটোয়ারা অধ্যায়ের প্রকল্প তৈরী করা হয়। এভাবে অপ্রয়োজনীয়, অলাভজনক ও জনক্ষতিকর নীতিকে এগিয়ে নিতে তৎপর থাকে তারা।

তাইতো এসব দেশের রাস্তায় চলাচল করা যায় না। উন্নয়নের নামে সারা বছর রাস্তা খোড়াখুঁড়ি চলে। সংস্কার কাজের নামে জনদুর্ভোগের মাত্রা অসহ্য রূপ নেয়। একটু বৃষ্টি হলে রাজপথে বন্যা নামে। সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্তা ধেকে ঝাড়–দার পর্যন্ত ঘুষ-দুর্নীতি বাণিজ্যে জড়িয়ে পড়ে। কিছুদিন আগে রাজউকের এবং সম্প্রতি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এক কর্মচারীর তিনটি করে সাততলা ও একটি দশতলা বাড়ি, বিলাসবহুল গাড়ি ইত্যাদির খবর জানা গেছে। সরকারী অফিসের এক মহাপরিচালকের ড্রাইভারের তিনটি ব্যক্তিগত বিলাসবহুল গাড়ি এবং সেগুলোর ব্যক্তিগত ড্রাইভারের বেতন সেই সরকারী ড্রাইভারের বেতনের তিনগুণ সমপরিমাণ দিয়ে পোষার খবর জাতিকে কিসের ইঙ্গিত দেয় তা বলাই বাহুল্য।

সিরিয়াল ধর্ষক মজনুর কান্না সেদিন কোর্ট প্রাঙ্গনকে উদ্বেলিত করে তুলেছিল। সামনের দুটি দাঁতভাঙ্গা মজনু নিজেই শারিরীকভাকে ভীষণ দুর্বল। সেদিন সে এজলাসে বলেছে আমি কোন দোষ করিনি। সে যে একজন সিরিয়াল ধর্ষক সেটার যথেষ্ট প্রমাণ কী হাতে এসেছে? সিরিয়াল ধর্ষকের বৈশিষ্ট্য কি তার অতীত জীবন ইতিহাস ও চরিত্রের মধ্যে খুঁজে পাওয়া গেছে? এরকম নানা প্রশ্ন শোনা গেছে বিভিন্ন প্রতিবেদনে। কারো চাপিয়ে দেয়া কোন কিছু যেন একজন পথমানুষের জীবনকে অন্ধকারে ঠেলে না দেয় সেদিকটাও ভাবতে হবে। ভারত থেকে ভাঙ্গা রাস্তায় পেঁয়াজের ট্রাক লাফিয়ে লাফিয়ে চালিয়ে আসায় হাজার হাজার মণ পেঁয়াজ থেতলিয়ে বস্তার মধ্যে পঁচে গলে গেছে বলে একজন ড্রাইভার সেদিন সীমান্তে দাড়িয়ে আক্ষেপ করে সাক্ষাৎকার দিচ্ছিলেন। তাহলে সে দেশেও কি রাস্তার বেহাল অবস্থা! আর আমাদের দেশের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় গতবছর পেঁয়াজের ঝাঁজে নাস্তানাবুদ হয়েও কেন এবছর আগাম প্রস্তুতি নেয়নি, তা মোটেও বোধগম্য নয়।

উপমহাদেশের প্রায় সব দেশেই হীন রাজনীতি ও দুর্বল প্রশাসনিক নীতির চাপে পিষ্ট হন সাধারণ মানুষ। তারা নিজেদের স্বর্থে যে কোন সময় ভাল নীতিবান মানুষদেরকে জিম্মি করে হঠকারী সিদ্ধান্ত নিয়ে বিপদের মুখে ঠেলে দিতে পারেন-সেটা পেঁয়াজ নিয়ে পচা রাজনীতির মাধ্যমে সাধারণ মানুষের বুঝতে দেরী হয়নি। তাই যে কোন মৌলিক মানবিক প্রয়োজন মেটানোর তাগিতে তাদের উপর ভরসা করাটা বোকামী। কিছুদিন পূর্বে রাজপথের দেয়ালে লেখা দেখা যেত- ‘সুবোধ নির্বাসনে’। এখন সেটাও চোখে পড়ে না। এখন সুবোধ নামক ছেলেটা হয়তো নির্বাসিত হয়ে রোগে শোকে অচল হয়ে ঘুমিয়ে দিন কাটাচ্ছে। দেশের এমন কোন গ্রাম নেই যেখানে মাদক পাওয়া যায় না বলে সংবাদ বেরিয়েছে। গভীর সমুদ্রপথেও মাদক আসছে। হয়তো সেই মাদক গিলে সুবোধেরা দলে দলে নিজ ঘরে নির্বাসিত জীবন-যাপন করছে। অথবা তাদেরকে মাদক দিয়ে ঘুম পাড়িয়ে দেয়া হয়েছে।

যে দু’চারজন এগুলো লিখতেন তারাও বার্ধক্যের কারণে অথবা অভিমান করে আর লিখতে চাচ্ছেন না। ঘুমন্ত সুবোধদের মত নাকে তেল দিয়ে ঘুমুচ্ছেন। আর যে ক’জন আছেন তারা সমস্যাকে আড়াল করে নিজের স্বার্থের কথা চিন্তা করে ভিন্নভাবে বক্তব্য তুলে ধরছেন। এরাইতো ভুলুন্ঠিত মানুষের নৈতিকতা জাগিয়ে দেবেন। কিন্তু তাঁরা নিজেরা আড়ষ্ঠ হয়ে মহাঘুম দিয়ে ঘুমন্ত নীতির বর্তমান প্রকৃতিকে আরো করুণভাবে প্রকাশ পেতে সহায়তা করছেন।

নীতিকে সোজা পথে চালানোর জন্য যাদের ভূমিকা থাকা দরকার ছিল তারা আজ চোখ বুঁজে ঘুমের ভান করে আছেন। সেজন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় অনৈতিকতাময় অবস্থা সূচিত হয়েছে। হঠাৎ মনগড়া দুর্বল নীতি সেখানে সবল হয়ে উঠছে। অনেক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন নীতিবানদের জায়গা বেদখল হয়ে যাওয়ায় তাঁরা লজ্জায় সবকিছু মুখবুঁজে সহ্য করে যাচ্ছেন।

অন্যায়ের প্রতিবাদ করার জন্য শুধু লাঠি হাতে নিলে হয় না। আইন দিয়ে সাময়িক ভয় তৈরী করা যায়। শাস্তি দিয়ে শান্তি আসে না। এজন্য মোটিভেশনাল কর্মসূচির মাধ্যমে মানুষের ভেতরের পশুটাকে সরাতে হবে। পথশিশুটা যেন অভাবের তাড়নায় গ্যাংয়ের আহবানে কুপথে চলে না যায়, মজনুর মত পথমানুষরা যেন ক্ষুধার তাড়নায় পকেটমার না হয়, জিকে, শাহেদের মত বাটপাররা যেন আরো বেশী লোভী হয়ে নকল করোনা রিপোর্ট না দেয়, চৌধুরী, খান, দাস, প্রদীপরা যেন মাদক ঢুকতে দিয়ে বিত্তশালী না হতে পারে সেজন্য মনের পশুটাকে জবাই করে মনুষ্যত্ববোধ জাগাতে হবে। আর হ্যাঁ, এই নৈতিকতাবোধ জিনিষটা মানুষ একে অপরেরটা দেখে বেশী বেশী শিখে। তাই এজন্য মডেল মানুষ দরকার। নৈতিকতাসম্পন্ন ভাল মানুষেরা ঘুম দিয়ে কাল কাটালে কোনমতেই সেটা বাস্তবায়িত হবে না। কাকে দেখে নৈতিকতা শিখবে আমাদের শিশু, কিশোর, যুবকরা? সেই নৈতিকতাবোধ সম্পন্ন মানুষ তৈরীতে কাজ শুরু করতে হবে আমাদের রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ মাথা থেকে নগর, শহর, গ্রাম, বস্তির সবার ঘরে ঘরে।

*লেখক রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডীন, সমাজকর্ম বিভাগের প্রফেসর ও সাবেক চেয়ারম্যান।E-mail: fakrul@ru.ac.bd

জেড,আই/ঢাকানিউজ২৪ডটকম।