সব দলের তৃণমূলে অনুপ্রবেশকারী

নিউজ ডেস্ক:  প্রায় সব দলের তৃণমূলেই কমবেশি ঢুকে পড়েছে অনুপ্রবেশকারী। রাজাকার-পোষ্য, মাদক ব্যবসায়ী, টেন্ডারবাজ, চাঁদাবাজসহ বিতর্কিতরা অর্থ দিয়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের উপজেলা, ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ পদ বাগিয়েছেন। আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টি (জাপা)সহ অনেক দলের তৃণমূলের চিত্র অভিন্ন।

সূত্র জানায়, আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মূল দল ও এর সহযোগী-ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনগুলোর তৃণমূল শাখাগুলো থেকে বিতর্কিতদের বাদ দেওয়ার নির্দেশ দিয়ে বলেছেন, সারা দেশে আওয়ামী লীগের জেলা-উপজেলা-পৌরসভা-ইউনিয়ন-ওয়ার্ড শাখাগুলোর মধ্যে যেগুলোর মেয়াদ শেষ হয়েছে, সেগুলোতে সম্মেলনের মাধ্যমে নতুন নেতৃত্ব নিয়ে আসতে হবে। এক্ষেত্রে ত্যাগীদের মূল্যায়ন করতে হবে।

একই সঙ্গে করোনাকালীন সময়ে যারা সাধারণ মানুষের পাশে থেকে ভূমিকা রেখেছেন তাদেরও মূল্যায়ন করার নির্দেশ দিয়ে তিনি বলেন, কোনোভাবেই যেন বিতর্কিতরা কমিটিতে স্থান না পায়। গতকাল বিকালে গণভবনে দলের স্থানীয় সরকার নির্বাচন মনোনয়ন বোর্ডের সভায় সভাপতিত্বকালে তিনি এসব কথা বলেন। সারা দেশে দলকে সুসংগঠিত করতে কেন্দ্রীয় নেতাদের নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী।

নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নিরঙ্কুশ জয়ের পর থেকেই দলের বিভিন্ন স্তরে শুরু হয় ব্যক্তিকেন্দ্রিক দলভারী করার প্রবণতা। কেন্দ্রীয় নেতা-মন্ত্রী-এমপিরা নিজ বলয় ভারী করতে ‘ফুলের তোড়ায়’ বরণ করে নেন বিএনপি ও জামায়াত-শিবিরসহ রাজাকার-পোষ্যদের। যাদের অনেকের বিরুদ্ধে ছিল আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী হত্যাসহ নাশকতা ও অবৈধ অস্ত্রের একাধিক মামলা। দল বদল করে আওয়ামী লীগে এসে রাতারাতি পুনর্বাসিত হয়েছেন তারা। শুধু তাই নয়, বঙ্গবন্ধুর আদর্শবিরোধী ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধীরা এখন জেলা-উপজেলা-ইউনিয়ন-ওয়ার্ড পর্যায়ে চালকের আসনেও বসেছেন।

‘অন্য দল থেকে আওয়ামী লীগে নয়’ দলের হাইকমান্ডের এমন নির্দেশনা থাকলেও তোয়াক্কা করেননি একশ্রেণির মন্ত্রী-এমপি ও নেতারা। গত সাড়ে ১১ বছরে কমপক্ষে অর্ধলক্ষাধিক অনুপ্রবেশ ঘটেছে আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী-ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনগুলোতে। বিশেষ করে পদপদবি বিক্রি চলছে ছাত্রলীগ, কৃষক লীগ, শ্রমিক লীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ, যুবলীগসহ বিভিন্ন সংগঠনে। এসব বিতর্কিত অনুপ্রবেশকারীদের অনেকে এখন ইয়াবাসহ বিভিন্ন মাদক ব্যবসায় জড়িত।

আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জাপার তৃণমূলে পদ কেনাবেচা এখন ওপেন সিক্রেট। অনেক স্থানে নির্ধারিত পদের জন্য টাকার অঙ্কও নির্ধারণ করা আছে। সারা দেশে একশ্রেণির নেতা মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে দলীয় পদপদবি পেয়ে টাকা উসুল করতে নানা অপরাধ ও অপকর্মে জড়িয়ে পড়েছেন। এবারও তারা পদ ধরে রাখতে অর্থের বিনিময়ে তৃণমূলের পাশাপাশি রাজনৈতিক দলগুলোর কেন্দ্রীয় একশ্রেণির নেতাকেও ম্যানেজ করেন।

প্রায় ৫০০ নেতার নাম এসেছে যারা বিএনপি, জামায়াত-শিবির এবং ফ্রিডম পার্টি থেকে আওয়ামী লীগে যোগ দিয়েই তৃণমূল শাখাগুলোতে সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক, সহসভাপতি, যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক, সাংগঠনিক সম্পাদকসহ গুরুত্বপূর্ণ পদপদবি পেয়েছেন। কেউ কেউ উপজেলা চেয়ারম্যান, ইউনিয়ন চেয়ারম্যান ও পৌর মেয়রও হয়েছেন ‘নৌকা’ প্রতীক নিয়ে। তারাই এখন ছড়ি ঘোরাচ্ছেন জেলা-উপজেলা-ইউনিয়নে। পরিস্থিতি এমন যে, কোথাও কোথাও অনুপ্রবেশকারী আওয়ামী লীগারদের হাতে আওয়ামী লীগ বা তার সহযোগী সংগঠনের সত্যিকারের ত্যাগী নেতাকর্মীরা মার খাচ্ছেন, অপমান-অপদস্ত হচ্ছেন। তাদের পক্ষে এখন আওয়ামী লীগ করাই দুরূহ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফ্রিডম পার্টির ক্যাডার ও বঙ্গবন্ধুর খুনি বজলুল হুদার দেহরক্ষী এখন মেহেরপুর জেলা শ্রমিক লীগের সভাপতি। ঐ নেতা এক সময় ফ্রিডম পার্টির খুলনা বিভাগের দায়িত্বে ছিলেন।

তিনি ১৯৮৮ সালে সাতক্ষীরা-৩ (আশাশুনি) আসন থেকে ফ্রিডম পার্টির হয়ে নির্বাচন করেন। কুমিল্লার নাঙ্গলকোর্ট পৌর জামায়াতের আমির প্রথমে বিএনপিতে যোগ দিয়ে কোষাধ্যক্ষ পদ পান। এরপর আওয়ামী লীগে যোগ দিয়েই হয়ে যান পৌর আওয়ামী লীগের সভাপতি। বাগমারা উপজেলা ও পশ্চিম জেলা শিবির সভাপতি বাংলাভাইয়ের সহযোগী এখন উপজেলা আওয়ামী লীগের শিক্ষাবিষয়ক সম্পাদক। পুঁটিয়া উপজেলা জামায়াতের সদস্য এখন উপজেলা কৃষক লীগের সাধারণ সম্পাদক। ঝালকাঠির রাজাপুর উপজেলা শিবিরের সভাপতি এখন উপজেলা আওয়ামী লীগের ত্রাণবিষয়ক সম্পাদক।

রাজশাহীর বাগমারার দয়ারামপুর ইউনিয়ন জামায়াতের সভাপতি বর্তমানে ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সদস্য। শিবিরের সাথি বর্তমানে নাটোর জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সমাজকল্যাণ সম্পাদক। শেরপুর সরকারি কলেজের শিবির মনোনীত জিএস এখন জেলা ওলামা লীগের সভাপতি। জেলা শিবিরের সেক্রেটারি এখন ওলামা লীগের সাধারণ সম্পাদক হয়েছেন। রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলা বিএনপির সভাপতি এখন কাকনহাট পৌর আওয়ামী লীগের সভাপতির পদে। একই উপজেলার যুবদলের সভাপতি এখন পৌর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক। শেরপুর শহর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক এখন আওয়ামী লীগে যোগ দিয়ে উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক পদ পেয়েছেন। সিলেটের বিশ্বনাথ উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আওয়ামী লীগে ভিড়েই পেয়েছেন উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতির পদ। উপজেলা বিএনপির সহসভাপতি এখন আওয়ামী লীগের সদস্য।

আওয়ামী লীগের একজন প্রেসিডিয়াম সদস্য বলেন, অর্থের বিনিময়ে গুরুত্বপূর্ণ পদ পাওয়া বিরোধী মতাদর্শী অনুপ্রবেশকারীরা দলের জন্য অশনিসংকেত। তারা ভেতরে ভেতরে নতুন করে সংঘবদ্ধ হয়েছেন। আওয়ামী লীগে আশ্রয় নেওয়া বিরোধী মতাদর্শীর এই নেতাকর্মীদের মধ্যে অনেকেই হত্যা-সন্ত্রাস-নাশকতা মামলার আসামি—এমন তথ্য সাংগঠনিক ও গোয়েন্দা রিপোর্টে উঠে এসেছে। স্থানীয় পুলিশের তালিকাভুক্ত মাদক ব্যবসায়ীদের অনেকেও এসব অনুপ্রবেশকারীদের মধ্যে রয়েছেন। দলের পদে থাকায় তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারে না প্রশাসন। ২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার কিছুদিন পর থেকেই বিরোধী মতাদর্শী নেতাকর্মীদের দলে ভেড়ার যে প্রবণতার শুরু, ২০১৪ সালে দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পর সেই প্রবণতা বেড়েছে হাজার গুণ।

টানা সাড়ে ১১ বছরেরও বেশি সময় ধরে ক্ষমতায় থাকায় সুযোগ-সুবিধার হিসাব কষে তুলনামূলকভাবে বেশি অনুপ্রবেশকারী ঢুকেছে আওয়ামী লীগে। তবে প্রায় ১৪ বছর ক্ষমতার বাইরে থাকলেও পদবাণিজ্য রয়েছে বিএনপিতেও। ছাত্রদল, যুবদল ও স্বেচ্ছাসেবক দলসহ বিএনপির বিভিন্ন অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত সুযোগসন্ধানী অনুপ্রবেশকারীতে ভরা। টাকার বিনিময়ে অনেকেই বড় পদ বাগিয়েছেন বলে খোদ এসব সংগঠনেই কথা উঠেছে। একই চিত্র এইচ এম এরশাদের প্রতিষ্ঠিত জাপায়ও। কখনো জাপার কিংবা রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত না থাকলেও ক্ষমতাসীন দলে ঠাঁই না পেয়ে এহাত-ওহাত ধরে ঢুকেছেন জাপায়। যাদের কেউ জামায়াত-শিবিরের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ভূমিদস্যু ও ইয়াবা ব্যবসায়ী কেউ কেউ খোদ দলটির কেন্দ্রীয় গুরুত্বপূর্ণ পদে রয়েছেন বলেও জাপার নেতাকর্মীদের মুখে মুখে শোনা যাচ্ছে।

বিতর্কিতদের কোনো কমিটিতে না রাখার নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর

সূত্র জানায়, প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা সারা দেশের তৃণমূলের নবগঠিত কোনো কমিটিতে বিতর্কিতদের না রাখার নির্দেশ দিয়ে বলেছেন, সারা দেশে ওয়ার্ড, ইউনিয়ন, উপজেলা, জেলা ও মহানগর শাখার যেগুলোতে মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও এখনো সম্মেলন হয়নি, দ্রুততার সঙ্গে সেসব শাখায় সম্মেলনের মাধ্যমে দলকে সারা দেশে শক্তিশালী করে গড়ে তুলতে হবে। একই সঙ্গে সবাইকে সতর্ক করে দিয়ে তিনি বলেন, কোনো কমিটিতেই যেন উলটাপালটা কিংবা প্রশ্নবিদ্ধ সুযোগসন্ধানী ও বিতর্কিতরা প্রবেশ করতে না পারে। আর কমিটি পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে দলের ত্যাগী, পরীক্ষিত এবং করোনা মহামারির সময় সাহসের সঙ্গে ভূমিকা পালনকারী নেতাকর্মীদের যেন মূল্যায়ন করা হয়, সেদিকে নজর রাখতে হবে। যেসব উপজেলা শাখায় ভারপ্রাপ্ত দিয়ে কমিটি চলছে সেগুলোতে দ্রুত সম্মেলনের আয়োজন করার নির্দেশনা দেন প্রধানমন্ত্রী।