সেবা সংস্থাগুলো কবে ডিজিটাল হবে, বড় বাধা পুরোনো পদ্ধতির সুবিধাভোগীরা

নিউজ ডেস্ক:  দেশে এখন ডিজিটাল অবকাঠামো তৈরি হয়েছে। এটা যথেষ্ট উপযোগীও। সে তুলনায় বিভিন্ন ক্ষেত্রে ডিজিটাইজেশন বা অটোমেশন হয়নি। তবে ডিজিটাইজেশনের সুযোগ আছে এবং সংশ্নিষ্ট কর্তৃপক্ষগুলো যথাযথ পদক্ষেপ নিলে এটা সহজেই সম্ভব। বিশেষ করে সরকারি সেবা খাত, যেমন- বিদ্যুৎ, পানি, গ্যাস সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর নেটওয়ার্কগুলোতে অটোমেশন এবং ডিজিটাল মনিটরিং ব্যবস্থা চালু হলে অনেক ক্ষেত্রেই দুর্ঘটনা এড়ানো এবং অনিয়ম দুটিই বন্ধ করা সম্ভব।’

সমকালের সঙ্গে আলাপকালে কথাগুলো বলছিলেন খ্যাতিমান তথ্যপ্রযুক্তিবিদ এবং ডাক ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার। তিনি আরও বলেন, জরুরি সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলো চাইলে তারা একটি সার্ভিস নেটওয়ার্কের ডিজিটাল ম্যাপ তৈরি করতে পারে। বর্তমানে যে ডিজিটাল অবকাঠামো আছে, সেখানে এটা খুব বেশি কঠিন কিছু নয়। বিশেষ করে পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) মডেলে এ কাজগুলো করা হলে তা অনেক বেশি ফলপ্রসূ এবং সরকারের জন্যও লাভজনক হয়। যেমন ডাক বিভাগের ডিজিটাল আর্থিক সেবা ‘নগদ’ এর একটি ভালো উদাহরণ। ডাক বিভাগের ব্র্যান্ড নাম ব্যবহার করে এখানে বেসরকারি অংশীদার প্রতিষ্ঠান পুরো প্রযুক্তিগত অবকাঠামো গড়ে তুলেছে। ডাক বিভাগকে কোনো বিনিয়োগই করতে হয়নি, উল্টো প্রথম বছরেই প্রায় দেড় কোটি টাকা লাভ পেয়েছে। এ উদাহরণটা অন্যান্য ক্ষেত্রেও কাজে লাগানো যেতে পারে।

অনুসন্ধানে দেখা যায়, জরুরি সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর কোনোটিই এখন পর্যন্ত স্বয়ংক্রিয় কিংবা ডিজিটাল ‘ফল্ট ডিটেকশন অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট’ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারেনি। এমনকি ডিজিটাল প্রযুক্তিতে পরিপূর্ণ বিল পরিশোধ ব্যবস্থাও গড়ে তুলতে পারেনি বেশিরভাগ সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রকৃতপক্ষে পুরোনো পদ্ধতির সুবিধাভোগীরাই সরকারের বিভিন্ন সংস্থায় আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থা গড়ে তোলার বিষয়টি দীর্ঘসূত্রতায় ফেলে দিচ্ছেন। এর ফলে সরকারের ডিজিটাল বাংলাদেশ গঠনের রূপরেখা বাস্তবায়নও পিছিয়ে যাচ্ছে।

ডিজিটাইজেশন যেখানে নেই : কিছুদিন আগে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় ত্রুটিপূর্ণ গ্যাসলাইন থেকে বিস্ম্ফোরণের কারণে একটি মসজিদে নামাজ আদায়ের সময় অনেক মুসল্লি হতাহত হন। এখানে ত্রুটিপূর্ণ গ্যাসলাইন থেকে গ্যাস নির্গত হওয়ার ঘটনাটি আরও কয়েক সপ্তাহ ধরেই চলছিল। গ্যাস বিতরণ সংস্থা তিতাসের স্থানীয় কর্তৃপক্ষের কাছে মসজিদ কমিটির পক্ষ থেকে মৌখিকভাবে গ্যাসের ত্রুটিপূর্ণ লাইনের কথাও বলা হয়েছিল। বিষয়টি যথাযথ গুরুত্ব দিয়ে দেখেনি সংশ্নিষ্টরা। মর্মান্তিক বিস্ম্ফোরণের পর এ বিষয়টি সবার সামনে আসে। কখন, কীভাবে, কাকে অভিযোগ জানানো হয়েছিল তা উদ্ঘাটনও সঠিকভাবে করা যায়নি। তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষের বিতরণ নেটওয়ার্কে স্বয়ংক্রিয় কিংবা ডিজিটাল ‘ফল্ট ডিটেকশন অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট’ ব্যবস্থা থাকলে যে মুহূর্তে গ্যাসলাইনে ত্রুটি শুরু হয়েছে তখনই তা কর্তৃপক্ষের নজরে আসত এবং এ জন্য কারও অভিযোগ জানানোরও প্রয়োজন হতো না। এমনকি সিস্টেম থেকেই জানা যেত ত্রুটি সারাতে কী ধরনের ব্যবস্থা নিতে হবে এবং তিতাস দ্রুত সে বিষয়ে পদক্ষেপ নিতে পারত। কিন্তু ডিজিটাল বাংলাদেশের স্বপ্ন বাস্তবায়নের এগারো বছরে এসেও তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষ সেই তিমিরেই থাকার কারণে এখন পর্যন্ত স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি।

অনুসন্ধানে দেখা যায়, পানি বিতরণ এবং বিদ্যুৎসেবার ক্ষেত্রেও এ ধরনের ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। শুধু ঢাকায় বিদ্যুৎ বিতরণে নিয়োজিত ডিপিডিসি এবং ডেসকোর সীমিত পরিসরে কিছু কিছু জায়গায় স্বয়ংক্রিয় ‘ফল্ট ডিটেকশন’ ব্যবস্থা আছে। এর বাইরে ঢাকা ওয়াসা বা তিতাস গ্যাসের কিংবা অন্য কোনো সংস্থায় এ ধরনের পদ্ধতি নেই।

এ ছাড়া ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন, ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জসহ অন্যান্য সরকারি সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর কোনোটিই অটোমেশন কিংবা সমন্বিত ডিজিটাল সেবা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারেনি।

শেষ হয় না ‘সীমিত পরিসর’: খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, ডেসকোতে এই বিতরণ ব্যবস্থায় ‘অটোমেশন’ এবং ‘ডিজিটাল ম্যাপিং’ ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য দুটি প্রকল্পের কাজ চলছে। এ ছাড়া স্মার্ট মিটার ও ডিজিটাল পদ্ধতিতে বিল পরিশোধের ব্যবস্থা শুরু হয়েছে। বর্তমানে প্রায় ১০ লাখ গ্রাহকের মধ্যে সাড়ে তিন লাখ গ্রাহক স্মার্ট মিটার ও ডিজিটাল পদ্ধতিতে বিল পরিশোধ ব্যবস্থায় সেবা পাচ্ছেন। পর্যায়ক্রমে অন্য গ্রাহকদের নিয়ে আসার প্রক্রিয়া চলছে। এর বাইরে ডিপিডিসিরও একটি প্রকল্প আছে ‘অটোমেশন’ এবং ‘ডিজিটাল ম্যাপিং’-এর জন্য। ডিপিডিসির বিল মোবাইল ব্যাংকিং সেবার মাধ্যমে পরিশোধের ব্যবস্থা চালু হয়েছে।

এর বাইরে তিতাস গ্যাস প্রাথমিকভাবে সীমিত পরিসরে প্রি-পেইড মিটার ব্যবস্থা চালু করেছে। পর্যায়ক্রমে গ্রাহকদের এ মিটারের আওতায় নিয়ে আসা হচ্ছে। অন্যদিকে ঢাকা ওয়াসা চলছে পুরোনো পদ্ধতির ত্রুটিপূর্ণ মিটার ব্যবস্থা দিয়ে। গ্রাহকদের অভিযোগ, ওয়াসা মোবাইল ব্যাংকিং সেবা বিকাশের মাধ্যমে বিল পরিশোধের ব্যবস্থা চালু করলেও অধিকাংশ সময়ই বিকাশে বিল দেওয়া যায় না। গ্রাহকরা অভিযোগ করলে প্রতিবারই বলা হয়, ইন্টারনেট সংযোগ না থাকার কারণে এ সমস্যা হচ্ছে। কোথায়, কীভাবে ইন্টারনেট সমস্যা হচ্ছে তাও বলা হয় না। ফলে ঢাকা ওয়াসা এখন পর্যন্ত পুরোপুরি পুরোনো পদ্ধতিতেই আছে।

ঢাকা ওয়াসার একটি সূত্র জানায়, ওয়াসার পানির লাইনের যে নেটওয়ার্ক আছে তা এত বেশি বিশৃঙ্খল যে ‘অটোমেশনে’র চিন্তা করাটাই মুশকিল। এখন পর্যন্ত একটি সুশৃঙ্খল ও সুসমন্বিত পানি বিতরণ ব্যবস্থাই যেখানে নেই সেখানে অটোমেশন বা ডিজিটাল পদ্ধতি চালুর চিন্তা অবান্তর। তারপরও এ নিয়ে তাদের একটি প্রকল্প আছে বলে সূত্র জানায়। তিতাসের ক্ষেত্রেও একই ধরনের একটি প্রকল্প পরিকল্পনার মধ্যে আছে বলে জানিয়েছে সংশ্নিষ্ট সূত্র। তবে প্রকল্পগুলো কতদিনে বাস্তবায়ন হবে, কেউ জানে না। নানা ধরনের বিশৃঙ্খলার কারণে ‘সীমিত পরিসরে’ চালু হওয়া ডিজিটাইজেশন বছরের পর বছর সীমিতই থেকে যাচ্ছে।

বড় বাধা পুরোনো পদ্ধতির সুবিধাভোগীরা : তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ সুমন আহমেদ সাবির সমকালকে বলেন, ২০০৫ সালে জাপানে গ্রাহকের পানির বিল হিসাব করার জন্য চমৎকার একটি ব্যবস্থা করা হয়। পানি ব্যবহারের পর গ্রাহকের বাসা থেকে কী পরিমাণ পানি স্যুয়ারেজ দিয়ে বের হচ্ছে তার হিসাব করে বিল করা হতো এবং সেটিই সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য ও আধুনিক ব্যবস্থা হিসেবে স্বীকৃত। আমাদের দেশে সেবা খাতের পুরো নেটওয়ার্ক আরও আগেই অটোমেশন করা সম্ভব ছিল। দুর্ভাগ্যজনক হচ্ছে এখন ডিজিটাল যুগেও সেটা সম্ভব হয়নি। এর কারণ হচ্ছে, পুরোনো পদ্ধতির সুবিধাভোগীরা অটোমেশন চান না এবং এটি নানাভাবে ঠেকিয়ে রাখেন।

তিনি বলেন, বাংলাদেশে সেবা খাত অটোমেশন এবং ডিজিটাইজেশন করার জন্য বাইরে থেকে কোনো প্রযুক্তি আনার দরকার নেই। বাংলাদেশে যে প্রযুক্তি আছে তা দিয়েই করা সম্ভব। এ কাজটি করার জন্য তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞও এখন বাংলাদেশে আছেন। দরকার শুধু সদিচ্ছা। দুর্ভাগ্যজনক হচ্ছে বিভিন্ন সরকারি সেবাদাতা সংস্থার কর্তৃপক্ষের ভেতরে সেই সদিচ্ছা দেখা যায় না। এর ফলে দেখা যায়, অটোমেশনের কথা উঠলেই একটা প্রকল্প নেওয়া হয়, তারপর সেই প্রকল্পে কম দামের যন্ত্রপাতি অত্যন্ত চড়া দামে কেনা হয়। এখন চীনা ঋণের কথা বলে চীনের কোম্পানির কাছ থেকে অত্যন্ত বেশি দামে যন্ত্রপাতি কেনার প্রবণতাও প্রকট হয়েছে। যেমন টেলিযোগাযোগের সঙ্গে সম্পৃক্ত একটি সরকারি কোম্পানি যে যন্ত্রপাতি ৫০০ কোটি টাকায় কিনেছে, বেসরকারি একটি কোম্পানি সেই যন্ত্রপাতি কিনতে ব্যয় করেছে মাত্র ৫০ কোটি টাকা। সরকারি কোম্পানিকে সরবরাহ করা চীনা কোম্পানির যন্ত্রপাতি এক-দেড় বছর পরই কাজ করছে না কিংবা সময়ের বাস্তবতায় পুরোনো হচ্ছে। অথচ বেসরকারি কোম্পানির যন্ত্রপাতি পাঁচ বছরেও কিছু হয় না, পুরোনোও হয় না। কারণ, সরকারি কোম্পানি কেনার সময় ওই সময়ের চেয়েও পেছনের জেনারেশনের যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তি কেনে। বেসরকারি কোম্পানি কেনে সময়ের চেয়ে এগিয়ে থাকা যন্ত্রপাতি।

তিনি জোর দিয়ে বলেন, সরকারের উচিত সরকারি সেবা খাতে অটোমেশনের কাজটি পাবলিক-প্রাইভেট অংশীদারিত্ব বা পিপিপির মাধ্যমে করা। সরকারি কোম্পানি বা সংস্থার সঙ্গে অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান কাজ করলে কাজটি অনেক বেশি সহজ ও স্বচ্ছতার সঙ্গে হবে।