দিকভ্রান্ত মানুষের দূর-সামাজিকতা

প্রফেসর ড. মো: ফখরুল ইসলাম: করোনা প্রতিরোধে প্রাথমিক শিক্ষা ছিল মানুষের মধ্যে পারস্পরিক দূরত্ব বজায় রাখা। এজন্য গণমাধ্যমে গুরুত্ব দিয়ে প্রথমেই সামাজিক দূরত্ব কথাটি প্রচারিত হতে থাকে। সংজ্ঞাগত দিক দিয়ে সামাজিক দূরত্ব বলতে সামাজিক ভেদাভেদ ও বৈষম্য বুঝায়, ফলে বিশ্বস্বস্থ্য সংস্থা এটাকে শুধরিয়ে মানুষে-মানুষে দৈহিক দূরত্ব বজায় রাখার কথা বলে। কিন্তু করোনার লক্ষ্যই ছিল মানুষের মধ্যে সামাজিক দূরত্ব সৃষ্টি করে ফেলা। এ পর্যন্ত করোনার আগ্রাসী প্রভাবে সারা পৃথিবীতে যা কিছু ঘটেছে তাতে সে কার্যত: সামাজিক দূরত্ব সৃষ্টিতে বহুলাংশে সফল হয়েছে বলে ধরে নেয়া যায়।

আজ যাবে, কাল যাবে বলে করোনা নামক অনাকাঙ্খিত অদৃশ্য অতিথি ছয় মাস ধরে ন্যাওটামো করছে। এর গতি একদিন বাড়ে আরেকদিন কমে। মনে হয় ছলনাময়ী হয়েছে করোনার চরিত্র। বিচিত্রভাবে রূপান্তর বা মিউটেশন ঘটে চলেছে এর আচরণ ও সংক্রমণে। মানুষ করোনার এই ছলনাময়ী বৈশিষ্ট্যে বুঝতে পেরে বিরক্ত হয়ে ঘরের বাইরে বের হয়ে পড়েছে। তারা এখন জীবন-জীবিকার তাগিদে বেশ বেপরোয়াভাবে চলাফেরা শুরু করে দিয়েছে। করোনাকে আর পরোয়া করে না দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া মানুষ।

সংক্রমণের প্রথম দিকটায় ভীতি তৈরী হলেও ছয়মাস পর এখন মানুষ করোনাকে আর ভয় করছে না। তাই শতকরা ৮০ ভাগ মানুষ বাইরে বের হবার সময় মুখে মাস্ক পরছে না। জার্মানীতে মাস্ক পরতে অনিচ্ছুক মানুষ রাস্তায় নেমে আন্দোলন শুরু করেছে এবং পুলিশের সাথে মারামারি করছে। সেপ্টেম্বর ১০ তারিখে কানাডার ক্যালগ্যারি থেকে টরেন্টোগামী বিমানে ১৯ মাস বয়সী শিশুর মুখে মাস্ক না থাকায় যাত্রীদের সাথে গোলমাল বেধে যায়। কিন্তুু শিশুটি মুখে মাস্ক পরতে অনীহা জানালে ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে। এতে বহু যাত্রীর ক্ষতি হলেও এটাই এখন নিউ নর্মাল অনুভূতি ও সামাজিক পরিস্থিতি।

‘আমাদের কিছু হবে না’- এই আত্মতুষ্টি শুরু হয়েছে সাধারণ মানুষের মধ্যে। শাহেদ-জিকে গংরা করোনা পরীক্ষায় ভেজাল রিপোর্ট তৈরীর ব্যবসা শুরু করার পর থেকে মানুষ করোনা শনাক্ত টেষ্ট করতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছে। তাদেরকে আর টেষ্ট করানোর অনীহা থেকে ফেরানো যায়নি। এখন রেলগাড়ি, বাস, অফিস, বাজার, রাস্তায় গিজ গিজ করছে মানুষ। আমাদের দেশে টেষ্ট হচ্ছে না, তাই প্রকৃত সংক্রমণের অবস্থা জানা যাচ্ছে না। গ্রামের মানুষ করোনায় মারা গেলে জানাজা হবে না ভেবে এবং কুসংস্কারের কারণে করোনার কথা মুখে উচ্চারণ করতে নারাজ। কিন্তু গ্রামে হঠাৎ কোথাও কম্যুনিটি সংক্রমণ শুরু হলে সেই বিপর্যয় রোধ করা কঠিন হতে পারে। তাই ভয়াবহ ঝুঁকি আছে সামনের শীতে।

কিন্তু প্রতিবেশী দেশ ভারতে বিশ্বের একদিনের সর্ব রেকর্ড ছাড়িয়েছে করোনার সংক্রমণ সংখ্যা। মৃত্যু সংখ্যাও হু হু করে বেড়ে চলেছে সেখানে। উভয় দেশের সীমান্ত খোলা। যাত্রী, মালামাল আসছে-যাচ্ছে প্রতিদিন-রাত। ভারতের ভয়াবহ সংক্রমণ আমাদের ভীত করে তুলেছে। অনেক দেশে ২য় ঢেউ শুরু হয়েছে। নভেম্বরে আমাদের দেশে নতুন ঢেউ শুরু হতে পারে বলে বিশেষজ্ঞগণ অভিমত দিয়েছেন। কারণ, তখন শীত শুরু হবে। চরিত্রগতভাবে শীতের রোগ করোনা। ইউরোপ, আমেরিকায় শীতকালে এর ভয়াবহ সংক্রমণ শুরু হয়েছিল। আমরা পেয়েছি গরমে। তাই আগামী শীতে আমাদের করোনার অভিজ্ঞতা কেমন হবে তা নিয়ে মন্তব্য করা বা কিছু বলা মুশকিল।

একমাস আগে জানা গিয়েছিল স্পুৎনিক-৫ এর কথা, এখন এই টিকার কি হাল তা জানা যাচ্ছে না। এরপর সিনোভ্যাক, তারপর অক্সফোর্ডের টিকার কথা। কিন্তু এখনো কারো হাতে এলো না কাঙ্খিত টিকা। দিনে দিনে ভ্যাকসিন নিয়ে বিশ্বরাজনীতি বেড়ে গেছে। এদিকে শীগগীর টিকা তৈরী হলেও নাকি দুই ডিগ্রী সেন্টিগ্রেড ঠান্ডা কার্গো বিমান স্বল্পতার কারণে আফ্রিকা ও দক্ষিণ এশিয়ায় পরিবহন ও সরবরাহ করা কঠিন হবে বলে শোনা যাচ্ছে।

করোনা প্রতিরোধে দূরত্ব সৃষ্টির মাধ্যমে আমাদের দেশে সামাজিক দূরত্ব তৈরী হয়ে গেছে। মানুষ নিজেরা বাইরে বের হলেও বসতবাড়ির ঘরের সদর দরজা এখনও দরিদ্র-ভিক্ষুকদের নিকট থেকে করোনা সংক্রমণের ভয়ে বন্ধই রয়ে গেছে। কঠোর হয়েছে মানুষের মন। কিছু দানশীল মানুষ বিভিন্ন সংগঠনের মাধ্যমে ঘটা করে দান-খয়রাত করলেও নিজের দুয়ারে দাঁড়ানো ভিখারীর হাতে দান-খয়রাত ও খাবার বিলানোর চিরায়ত প্রথা বন্ধ হয়েছে। করোনাভয়ে ভিক্ষুকের থালা শূণ্যই থেকে যাচ্ছে, কারণ তারা মানুষের কাছে ঘেঁষার সুযোগ বা করুণা কোনটাই পাচ্ছে না।

এদিকে দিন দিন নানা অপকর্ম যেন মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। মাদক, দুনীতি, খুন, পারিবারিক সহিংসতা, কিশোর গ্যাং এর অপরাধসহ নানা অপরাধীচক্র এটাকে মোক্ষম সময় ভেবে মাঠে নেমেছে। দেশের এমন কোন গ্রাম নেই যেখানে মাদক পাওয়া যাচ্ছে না বলে খবর প্রচারিত হয়েছে।

করোনার নির্মম প্রভাব মানুষের অন্তরকে কঠিন করে দিয়েছে। করোনা ভাইরাস থেকে আমরা কি শিক্ষা পেলাম- শীর্ষক এক বর্ণনায় উল্লেখ করা হয়েছে, “যে দিন চলে যায়, সে দিন আর ফিরে আসে না। অতএব পৃথিবীতে আগের মতো মানবতা, সামাজিকতা থাকবে না। কারণ করোনা ভাইরাস অধিকাংশ মানুষের মন কঠোর করে ফেলেছে.. করোনা ভাইরাসে মৃত্যুর দরজা থেকে ফিরে আসা মানুষগুলো আর আগের মতো থাকবে না, কারণ তাদের রক্তের মধ্যে জীবাণুর আঘাত পড়েছে, এক বার যার করোনা হয়েছে সেটা আবার ফিরে আসতে পারে” (দৈনিক ইত্তেফাক, ১১.০৯.২০২০)।

করোনার একঘেঁয়েমীতা ও দীর্ঘসূত্রিতার ফলে ফলে মানুষের স্বার্থপরতা ও লোভ বেড়েছে। অপরের প্রতি বিশ্বাস ও আস্থা কমে গেছে। মানুষ অনেক হিংসুক হয়ে পড়েছে। ছোট ছোট স্বার্থ নিয়ে দেশে দেশে অসম প্রতিযোগিতা ও যুদ্ধের হাতছানিতে সম্পর্ক খারাপ হয়ে যাচ্ছে। স্বাভাবিক সামাজিক অনুষ্ঠান বন্ধ। বিয়ে, ধর্মীয় মাহফিল, রাজনৈতিক সভা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এখনও বন্ধ রয়েছে। দুই ঈদ চলে গেল বন্যার কান্নাভেজা পরিবেশের মধ্যে দিয়ে। মানুষের বাড়িতে মানুষের যাতায়ত বন্ধ রয়েছে। করোনার সন্দেহ কোনভাবেই মুছে যাবার নয়- কারণ সে যে ভীতি সৃষ্টি করেছে তাতে মানুষের মানবতা লুন্ঠিত হয়ে গেছে।

মানুষ অলস, কুঁড়ে হয়ে গেছে। তারা নিয়মিত ঘুমায় না। একা থাকতে চায়, শুধু মোবাইল টিপে সময় পার করে দেয়। নাওয়া-খাওয়ায় নিয়মহীনতা এখন স্বাভাবিক ব্যাপার। অফিসের দরজায় বাড়তি সতর্কতা ঝুলিয়ে সাক্ষাৎকার বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। তাই কেউ কাউকে বলে বিরক্ত করতে চায় না।

ভার্চুয়াল সভায় প্রাণ খুলে কিছু বলার উপায় নেই। জুম বা অনলাইন সভায় প্রাণ নেই। এজেন্ডা বা বিষয় পছন্দ না হলে বিদ্যুৎ নেই বা টেকনিক্যাল সমস্যা বলে উঠে চলে যাবার ঘটনা ঘটছে। কারো বক্তব্য কেউ যদি রেকর্ড করে পরে বিপদে ফেলে সেজন্য কোন কোন শিক্ষক দায়সারা বক্তব্য দিয়ে ক্লাস নিচ্ছেন বলে জানা গেছে। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ভয়ে অনলাইন পদ্ধতিতে স্বাভাবিক কাজের গতি ও স্বত:স্ফূর্ততা নষ্ট হচ্ছে।

করোনার প্রভাব সবার নিয়মিত কাজকে কম-বেশী এলোমেলো করে দিয়েছে। তছনছ হয়ে যাওয়া দিনপঞ্জির সময়-সূচি রক্ষা করা এখন বেশ জটিল। গত মার্চ-এপ্রিলে ছুটিতে দেশে বেড়াতে এসে করোনায় আটকা পড়েছেন প্রায় দুলাখ প্রবাসী কর্মী। এরপর করোনায় কর্মহারা হয়ে ফিরে এসেছেন আরো দ’ুলাখ। সেপ্টেম্বর ১৪, ২০২০ শুধু ইরাক থেকে ফিরে এসেছেন ১৪ হাজার। দেশে-বিদেশে মিলে প্রায় আট লক্ষ প্রবাসী শ্রমিক কর্মহীন। গত ছয়মাসে দেশের মধ্যে ছাঁটাইকৃত কর্মহারা মানুষের সঠিক কোন পরিসংখ্যান পাওয়া যায়নি। দেশের লক্ষ লক্ষ শিক্ষিত বেকারদের পাশাপাশি হঠাৎ কর্মহীন হওয়া বেসরকারী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক, প্রাইভেট টিউটর, পোষাক শ্রমিক, দিনমজুর, ভিক্ষুক ও ভসমান মানুষেরা খুবই অসহায় জীবন-যাপন করছে। লজ্জাভেঙ্গে অন্যের কছে হাত পেতেও ধার-দেনা ও সাহায্য পাচ্ছেন না তারা। অনেকে মুখ ফুটিয়ে সেকথা কাউকে বলতে না পেরে পেটে পাথর বেঁধে দিনাতিপাত করে চলেছেন। দিকভ্রান্ত মানুষ অভাবের মধ্যে নানা জটিলতা নিয়ে জীবন-জীবিকার জন্য লড়াই করলেও ক্ষুধা নিবারণের খাদ্যসহ সবকিছুতে সংকোচন নীতির মধ্যে দিনাতিপাত করতে করতে হাঁপিয়ে উঠছেন।

গুমরে কেঁদে ওঠা নিজের কষ্টের বিষয়ে কেউ কারো কাছে একটু বসে প্রাণখুলে শেয়ার করার উপায় খুঁজে পাচ্ছে না। কারণ ড্রপলেটে করোনা সংক্রমণ ছড়ানোর ভয়ে সবার মুখেই যে নিরাপত্তা আবরণ! এই আচ্ছাদন ও মুখোশ আমাদের সামাজিক পরিবেশকে যে আরো কতদূর নিচে ঠেলে দেবে তার কী কোন কূল-কিনারা করার উপায় আছে? বেঁচে থাকার জন্য টিকা হাতে না পাওয়া পর্যন্ত আপাতত: দিকভ্রান্ত মানুষের দূর-সামাজিকতাই চলুক।

*লেখক রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডীন, সমাজকর্ম বিভাগের প্রফেসর ও সাবেক চেয়ারম্যান।E-mail: fakrul@ru.ac.bd

জেড,আই/ঢাকানিউজ২৪ডটকম