সামাজিক নিরাপত্তা সহায়তায় জরুরি তিন পদক্ষেপ

নিউজ ডেস্ক:    প্রতিবছরই আমাদের বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী খাতে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বরাদ্দ থাকে। বর্তমান সরকারের টানা তিন মেয়াদে বছর বছর এ বরাদ্দ বৃদ্ধি করতে দেখা গেছে। ২০১৯-২০ অর্থবছরের চেয়ে ২০২০-২১ অর্থবছরে এ বরাদ্দ প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকা বাড়িয়ে ৯৫ হাজার ৫৭৪ কোটিতে উন্নীত করা হয়েছে। সুবিধাভোগীর সংখ্যা ১৭ লাখ বাড়িয়ে ৮১ লাখ থেকে ৯৮ লাখ করা হয়েছে। সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীতে বরাদ্দকৃত অর্থ জাতীয় আয়ের শূন্য দশমিক ১ শতাংশ।

তবে মনে রাখতে হবে, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে যারা পেনশন পান, তাদের পেনশনের অর্থও কিন্তু সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর ৯৫ হাজার ৫৭৪ কোটি টাকার অন্তর্ভুক্ত। প্রতিবছরের মতো এ বছরও পেনশনের অর্থ সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এর পরিমাণও প্রায় ২৩ হাজার কোটি টাকা।

সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর বরাদ্দে পেনশন অন্তর্ভুক্ত থাকার বিষয়টি নিয়ে মাঝেমধ্যেই প্রশ্ন উত্থাপিত হয়। আমি মনে করি, পেনশনের এ অর্থ দুটি কারণে নিরাপত্তা বেষ্টনীতে অন্তর্ভুক্ত না করে আলাদা করা উচিত। প্রথমত, নিরাপত্তা বেষ্টনী তাদের জন্য, যাদের অর্থনৈতিক অবস্থা ভঙ্গুর, যারা দরিদ্র এবং নিঃস্ব। কিন্তু যারা পেনশন পান, তাদের বেশিরভাগের অর্থনৈতিক অবস্থা ভঙ্গুর নয়। তাদের মধ্যে কিছুসংখ্যক দরিদ্র মানুষ থাকতে পারে, তবে বেশিরভাগই সচ্ছল। দ্বিতীয়ত, পেনশনের অর্থ কিন্তু কোনো সহায়তা নয়। চাকরির শর্ত হিসেবেই তারা এই পেনশন পাচ্ছেন। কাজেই নিরাপত্তা বেষ্টনীতে পেনশন অন্তর্ভুক্ত করা ঠিক নয়। অনেকবার কথা হলেও পেনশনের অর্থ ধারাবাহিকভাবে নিরাপত্তা বেষ্টনীতে অন্তর্ভুক্ত হয়ে আসছে। আমরা প্রত্যাশা করি, ভবিষ্যতে পেনশনকে নিরাপত্তা বেষ্টনী থেকে পৃথক করা হবে।

এ বছরে আরও দুটি কর্মসূচিকে আমি নিরাপত্তা বেষ্টনী হিসেবে বিবেচনা করতে চাই। এ বছর করোনা মোকাবিলায় সহজ শর্তে ঋণ দেওয়া হচ্ছে; যদিও এটা সহায়তা হিসেবে দেওয়া হচ্ছে না; কিন্তু সুদের হার ৪ শতাংশ হওয়ায় এর মধ্যে নিরাপত্তার একটা বিষয় আছে। কারণ, সাধারণ সময়ে তাদের ঋণ নিতে হয় অন্তত ৯ শতাংশ সুদে। এবার সুদের হারে তারা যে ৫ শতাংশ রেয়াত পাচ্ছেন, সেটা একটা সহায়তা। যাদের জন্য এ ঋণের ব্যবস্থা করা হয়েছে, তারা এই সহায়তা পেলে ঘুরে দাঁড়াতে পারবে আশা করা যায়।

করোনা সংকটে প্রধানমন্ত্রী প্রায় এক লাখ কোটি টাকার প্রণোদনা ও সহায়তা প্যাকেজ ঘোষণা করেছেন। এর মধ্যে ১৪ হাজার কোটি টাকা আছে অতিক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের জন্য। আবার এর ৭০ শতাংশ অতিক্ষুদ্র এবং ক্ষুদ্র শিল্পের জন্য। আরও দুই হাজার কোটি টাকা পল্লী কর্মসহায়ক ফাউন্ডেশন, পল্লী সঞ্চয় ব্যাংকসহ আরও দুটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে যারা অর্থনৈতিকভাবে বিধ্বস্ত হয়েছে, তাদের একইভাবে স্বল্প সুদে ঋণ দেওয়া হবে। এটাও সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর অংশ। এ দুই হাজার কোটি টাকা অতিক্ষুদ্র শিল্পের জন্য। এই অর্থ ক্ষুদ্র শিল্পে পৌঁছে যাবে সহজেই; কিন্তু অতিক্ষুদ্র শিল্প পরিচালনা করে যারা, তাদের কাছে সহায়তার অর্থ পৌঁছানো খুব কঠিন হবে। এই অর্থ তাদের কাছে কীভাবে পৌঁছানো হবে, সে বিষয়ে বিচার-বিবেচনা হচ্ছে।

সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর অর্থ থেকে নতুন দরিদ্ররা সহায়তা পাবেন কিনা, সে বিষয়টি দেখতে হবে। নতুন করে ১৭ লাখ সুবিধাভোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি করায় নতুন দরিদ্রদের কিছুসংখ্যক হয়তো স্বাভাবিকক্রমেই সহায়তা পাবেন। নতুন দরিদ্রদের অধিকাংশই হয়তো ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ছিলেন, তাদের ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ হয়ে গেছে। তাদের ঘুরে দাঁড়াতে সহায়তা করতে হবে। কিন্তু তারা সহায়তার অর্থ পাচ্ছেন না।

আসল ব্যাপার হলো, সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী ও স্বল্প সুদে ঋণের যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তার সুবিধা যথাসময়ে দেওয়া গেলে তাদের পক্ষে ঘুরে দাঁড়ানো সহজ হবে। সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর ক্ষেত্রে আমরা দেখেছি, বরাদ্দ অর্থ বিতরণের ক্ষেত্রে অনেক সময় নয়ছয় হয়ে থাকে রাজনৈতিক প্রভাব ও স্বজনপ্রীতির কারণে। করোনাকালে বরাদ্দ সামাজিক নিরাপত্তা সহায়তার ক্ষেত্রে যাতে সে রকম কিছু না ঘটে, সেদিকে দৃষ্টি রাখতে হবে।

সামাজিক নিরাপত্তা সহায়তার ক্ষেত্রে তিনটি পদক্ষেপ খুবই জরুরি। এক, নতুন দরিদ্রদের তথ্য সঠিকভাবে সংগ্রহ ও তালিকা করতে হবে; দুই, যারা সহায়তা পাওয়ার যোগ্য, তাদেরই এই তালিকার অন্তর্ভুক্ত করতে হবে; তিন, তালিকাভুক্তদের কাছে যথাসময়ে সহায়তা পৌঁছে দিতে হবে। আমি মনে করি, এই তিনটি বিষয় যথাসময়ে ও যথাযথভাবে কার্যকর করা গেলে করোনাকালে সামাজিক নিরাপত্তা সহায়তার সুফল পাওয়া সহজ হবে।