কালিকাপ্রসাদ ও আমাদের হাজার বছরের লোকসঙ্গীত

উত্তমকুমার রায়:   হাজার বছরের বাঙালি সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের পথ ধরে লোকসঙ্গীতকে যিনি সেই ধারায় অক্ষুণ্ণ রেখে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছিলেন তিনি কালিকাপ্রসাদ ভট্টাচার্য । আমাদের সংস্কৃতিতে তাঁর আবির্ভাব আকাশের একটি উজ্জ্বল জ্যোতিষ্কের মতো ।
আমাদের ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতিতে যাত্রাশিল্প হয়ে পড়ছিল অপসংস্কৃতির সূতিকাগার। চলচ্চিত্র দিন দিন হারাচ্ছিল তার জৈলুস । ভদ্রজনদের কাছে, সংস্কৃতিবানদের কাছে চলচ্চিত্র হারাচ্ছিল তার সুনাম । চলচ্চিত্র যেন তৈরি হচ্ছিল কেবল বিনোদনের জন্য, যৌন সুড়সুড়ি দেওয়ার জন্য, কেবল মুনাফা অর্জনের জন্য । পপ-রক তথা ব্যান্ড-সঙ্গীতের দাপটে হারিয়ে যাচ্ছিল লোকজ গানগুলো ।

আমাদের সংস্কৃতির এই ক্রান্তিলগ্নে, দুঃসময়ে সুশিক্ষিত হয়েও তিনি যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তুলনামূলক সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নিয়েও অর্থোপার্জনের পথে না-গিয়ে ত্যাগের পথ বেছে নিয়েছিলেন । তাঁর কাকা অনন্ত ভট্টাচার্যের সংগ্রহে ছিল পাঁচ হাজারেরও বেশি লোকসঙ্গীত । লোকসঙ্গীতকে ভালোবেসে তিনি সেইসব গানকে আঁকড়ে ধরেই তা পুনরুজ্জীবনদানে প্রচেষ্টা নেন । তাঁর আন্তরিক প্রচেষ্টাতে লোকসঙ্গীত পেল প্রাণ, পেল জনপ্রিয়তা শুধু দেশের মাটিতেই নয়, বিদেশ-বিঁভূইয়েও । লোকসঙ্গীতের কথা, সুর ও তাল অক্ষুণ্ণ রেখে, মৌলিকত্ব বজায় রেখে তিনি চর্চা, প্রচার ও প্রসার ঘটান । তিনি অসমের ঐতিহ্যবাহী বিহুগান, বাউলগান, সিলেটি গান, কামরূপী গান ও ভাওয়াইয়া-গানকে দেশে-বিদেশে গেয়ে জনপ্রিয় করে তোলেন । তিনি বলেছিলেন,
“আমরা লোকগান গাই । নতুন গান লিখি না বা গাই না । আমাদের গানে পশ্চিমী বাদ্যযন্ত্র ব্যবহার হয় না। সেই জন্যই ‘দোহার’ গানের দল । ব্যান্ড নয়।’’

যতদিন তিনি বেঁচে ছিলেন তাঁর সৃষ্ট ‘দোহার’ লোকসঙ্গীত দলটি অবিকৃতভাবে লোকসঙ্গীতচর্চায় বিশেষ ভূমিকা নিতে সক্ষম হয় । উচ্চাঙ্গসঙ্গীতেও ছিল তাঁর সমান দক্ষতা । দেশি বাদ্যযন্ত্রের যথাযথ ব্যবহার তাঁর লোকসঙ্গীতচর্চায় বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে । পণ্ডিত অনিল ভট্টাচার্যের কাছ থেকে তালিম নিয়েছেন তবলায় ।
নিজের একমাত্র লেখা একটি গানে দুবাংলার অখণ্ডতা, একাত্মতা উঠে এসেছে —
“এপার-বাংলা, ওপার বাংলা মধ্যে জলধি নদী
নির্বাসিত নদীর বুকে বাংলায় গান বাঁধি
আমার বাংলা ভাসে, বেহুলা ভেলায়
দেশ বিভাগের শ্মশানে
একুশে উনিশে রফিক-কমলা জ্বলে
রাজপথে ময়দানে ।”

তিনি বুঝিয়ে দিয়ে গেছেন সংস্কৃতির মূল থেকে বিচ্যুত হলে সংস্কৃতির বিপর্যয় অনিবার্য । তাই আমাদের ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতিকে বাঁচাতে হব, রক্ষা করতে হবে । আমাদের ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতিকে তুলে ধরতে হবে সাধারণ মানুষের কাছে, বিশ্বের কাছে । আমাদের সংস্কৃতি বাঁচলে আমরা সুন্দরভাবে বাঁচতে পারব, আর আমরা বাঁচলে আমাদের সংস্কৃতিরও শ্রীবৃদ্ধি ও বিকাশ ঘটবে । চর্যাগীতির গীতলতার পথ বেয়েই আমাদের সঙ্গীতের প্রবাহ । হাজার বছরের লালিত সঙ্গীতে আছে প্রাণ, আছে চেতনা, আছে মুক্তির মন্ত্র । লোকসঙ্গীত আমাদের প্রাণিত করে, উদ্বেলিত করে, চেতনাকে করে শাণিত ।

বাংলাসঙ্গীতজগতে চর্যাগীতির গীতলতার পথ বেয়ে আসতে থাকে নাথগীতি, জয়দেবের গীতগোবিন্দম্ , বড়ু চণ্ডীদাসের শ্রীকৃষ্ণকীর্তন, বিদ্যাপতির বৈষ্ণবপদাবলি, কীর্তনগান, ঢপকীর্তন, মঙ্গলকাব্য, পাঁচালি, শাক্তগীতি, শ্যামাসঙ্গীত, উমাসঙ্গীত, রামপ্রসাদী সঙ্গীত, উচ্চাঙ্গসঙ্গীত, দুই কবির লড়াইয়ের গান — কবিগান, যাত্রাগান, পালাগীতি (মৈমনসিংহ-গীতিকা ও পূর্ববঙ্গ-গীতিকা), বাউলগান, টপ্পাগান, ব্রহ্মসঙ্গীত, অসমের বিহুগান, মুর্শিদাবাদের আলকাফ-সঙ্গীত, বীরভূম-বাঁকুড়ার টুসুগান-ভাদুগান, নেত্রকোনা-সুনামগঞ্জের ঘাটুগান বা ঘেটুগান, জারিগান, সারিগান, ভাটিয়ালী গান, ভাওয়াইয়া সঙ্গীত, বিয়ের গীত, গোপীচন্দ্রের গান, পঞ্জু শাহ্ র গান, মাইজভাণ্ডারী গান, আগমনী গান, বোলাইন গান, ধামাইল গান, গম্ভীরা, চটকা গান, লালনগীতি, রজনীকান্তের গান (কান্তগীতি), অতুলপ্রসাদের গান, দ্বিজেন্দ্রগীতি, রবীন্দ্রসঙ্গীত, নজরুলগীতি, হিমাংশুসঙ্গীত, আধুনিক গান, সুমনের গান, নচিকেতার গান, প্রতুল মুখোপাধ্যায়ের গান, অঞ্জন দত্তের গান, দেশাত্মবোধক সঙ্গীত, গণসঙ্গীত, বাংলা ব্যান্ডসঙ্গীত প্রভৃতি ।

প্রাচীন বাংলাসঙ্গীত সংস্কৃত স্তোত্রসঙ্গীত-দ্বারা প্রভাবিত । তৎকালীন বৈষ্ণব ভাবাশ্রিত বেশ কিছু ধর্মসঙ্গীত আজো পূর্ব ভারতীয় মন্দিরগুলোতে গীত হতে দেখা যায় । ত্রয়োদশ শতাব্দিতে কবি জয়দেব-বিরচিত গীতগোবিন্দম্ এই জাতীয় সঙ্গীতের অন্যতম দৃষ্টান্ত । মধ্যযুগে নবাব ও বারো ভূঁইয়া নামে খ্যাত ভূস্বামীদের পৃষ্ঠপোষকতায় প্রতিপালিত সঙ্গীতধারায় আবার হিন্দু ও মুসলমান সাঙ্গীতিক রীতির এক অপূর্ব সমন্বয় দেখা যায় । প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় গানগুলোর অধিকাংশই ছিল ধর্মীয় সঙ্গীত ।

ত্রয়োদশ শতাব্দি থেকে অষ্টাদশ শতাব্দি পর্যন্ত ফারসি ও উত্তরভারতীয় সঙ্গীতের মিশ্রিতরূপের প্রসার ঘটে । মুসলিম প্রভাবিত উত্তরভারতে কর্ণাটক বা দক্ষিণভারতীয় সঙ্গীতের চেয়ে উত্তরভারতীয় সঙ্গীতের ওপর ফার্সি প্রভাব বেশি পরিলক্ষিত হয় । ভারতীয় সঙ্গীত সেই সময় থেকে দুটো ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে — এর একটিকে বলা হয় উত্তরভারতীয় বা হিন্দুস্তানি সঙ্গীত যার বিস্তৃতি বিন্ধ্যপর্বতের উত্তরে সমগ্র উত্তরভারতে অর্থাৎ আর্যাবর্তে এবং দক্ষিণভারতীয় বা কর্ণাটি সঙ্গীত যার বিস্তৃতি বিন্ধ্যপর্বতের দক্ষিণে সমগ্র মাদ্রাজ, অন্ধ্র, মহীশূরে ।

বিষ্ণুপুর ঘরানা হলো ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের হিন্দুস্তানি ধারার ধ্রুপদ সঙ্গীতের একটি ঘরানা । দিল্লির বাহাদুর খান, যিনি তানসেনের একজন উত্তরসূরী ছিলেন, তিনি এ বিষ্ণুপুর সঙ্গীতের প্রবক্তা । বাহাদুর খানকে রাজা দ্বিতীয় রঘুনাথ সিংহদেব মল্ল রাজদরবারে আমন্ত্রিত করে নিয়ে আসেন । গদাধর চক্রবর্তী, যদু ভট্ট, ক্ষেত্রমোহন গোস্বামী প্রমুখ বিষ্ণুপুর ঘরনার জনপ্রিয় শিল্পী ।
ডিজিটাল যুগে সঙ্গীতকে কেন্দ্র করে বিশ্বব্যাপী সৃষ্ট হয়েছে এক ধরনের ব্যবসা । এতে সঙ্গীত রচনা করে গ্রাহক কিংবা প্রচারমাধ্যমে বিক্রি করার ব্যবস্থা চলছে । এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে বিভিন্ন রেকর্ড কোম্পানি, ব্রান্ড ও ট্রেডমার্কসহযোগে লেবেল ও বিক্রেতা । সেই সুবাদে গানের শ্রোতার সংখ্যা গিয়েছে বহু গুণ বেড়ে । শ্রোতারা ডিজিটাল মিউজিক ফাইলগুলোকে এমপি-থ্রি প্লেয়ার, আইপড, কম্পিউটার ও অন্যান্য বহনযোগ্য আধুনিক যন্ত্রে সংরক্ষণ করছেন । গানগুলো ইন্টারনেট থেকে ডাউনলোড কিংবা অনলাইনে কিনে মনের ক্ষুধা মেটাচ্ছেন । ডিজিটাল মাধ্যমে গান সংগ্রহ ও দেওয়া-নেওয়ার মাধ্যমে সঙ্গীতব্যবসার বিস্তৃতি ঘটছে ।

ইন্টারনেট থেকে বিনামূল্যে ঢালাও গান ডাউনলোড করার ফলে সঙ্গীতশিল্প হয়ে পড়ছে হুমকির সম্মুখীন । প্রকৃতপক্ষে পাইরেসি ও মনের খোরাক মেটানো সঙ্গীতশিল্পকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে অন্ধকারের দিকে । এ-অবস্থা থেকে উত্তরণের উপায় বের করতে হবে । সাংস্কৃতিক আন্দোলনেই হবে এ-অবস্থা থেকে উত্তরণের উপায় । কারণ আমাদের সংস্কৃতির ইতিহাস সংগ্রামের ইতিহাস ।

কালিকাপ্রসাদ সংস্কৃতিকে দেখেছেন সংগ্রাম হিসেবে, সমাজপরিবর্তনের হাতিয়ার হিসেবে । তিনি কেবল ব্যক্তি নন, একটি প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছিলেন । তাঁর মেধা-মনন, চিন্তা-চেতনা-দ্বারা গানের বাণী, সুর, তালের দ্যোতনায় মেঠো সঙ্গীতকে তিনি অক্ষত রেখে মঞ্চে নিয়ে এসেছিলেন । লোকসঙ্গীতকে মূলধারায় ফিরিয়ে আনতে তাঁর ছিল আপ্রাণ প্রচেষ্টা । তিনি আমাদের হাজার বছরের ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতির ধারক ও বাহক । তাঁর অকালমৃত্যুতে আমাদের সংস্কৃতির বিরাট ক্ষতি হলো । আমাদের উচিত হবে তাঁরই পথ ধরে আমাদের সংস্কৃতিকে সুস্থ ধারায় এগিয়ে নিয়ে যাওয়া । পুনঃপ্রকাশ ।

সহযোগিতা
তবলাবিজ্ঞান — ইন্দুভূষণ রায়
সঙ্গীতশাস্ত্র (প্রথম খণ্ড) — ইন্দুভূষণ রায়
কালিকাপ্রসাদ ভট্টাচার্য — উইকিপিডিয়া
বাংলাসঙ্গীত — উইকিপিডিয়া