মানবিক সমাজের স্বপ্ন দেখতেন তারিক আলী

ডা. সারওয়ার আলী:  যে লক্ষ্য নিয়ে বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জন করেছিল, মুক্তিযোদ্ধা, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি, সম্মিলিত সামাজিক আন্দোলনের সভাপতি জিয়াউদ্দিন তারিক আলী তার প্রতি গভীরভাবে অনুগত ছিলেন। তার সকল কর্মকাণ্ডে এই রাষ্ট্র, সমাজ যেই লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়, তার মধ্যেই আবর্তিত হয়েছে। সেই লক্ষ্য থেকেই তিনি মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর প্রতিষ্ঠা করেছেন, সম্মিলিত সামাজিক আন্দোলনে যোগ দিয়েছেন, সংখ্যালঘু এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠী বিশেষ করে আদিবাসীদের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করে গেছেন। কারণ তিনি বিশ্বাস করতেন এই লক্ষ্যগুলো যদি অর্জিত হয় তাহলেই বাংলাদেশে একটি মানবিক সমাজ গড়ে উঠবে।

আমরা সাধারণ নাগরিক ১৯৯৪ সালের মাঝামাঝি সময়ে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি। তখন দেড় বছরের প্রস্তুতি পর্বে, অধিকাংশ সভা হয়েছে আমাদের আক্কু চৌধুরী এবং তারিক আলীর বাসায়। বেশিরভাগ সভা সন্ধ্যায় শুরু হয়েছে এবং গভীর রাত পর্যন্ত চলেছে। কোনোদিন আমরা ভোরবেলাও ফিরেছি বাসায়। তার পরিবারের ওপর কম যন্ত্রণা আমরা দেইনি। রাজধানীর সেগুনবাগিচার ভাড়া বাড়িতে যখন জাদুঘরটি গড়ে উঠলো, তখন স্বপ্ন ছিল একটি স্থায়ী মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর গড়ে তোলার। আজ থেকে পাঁচ বছর আগে আগারগাঁওয়ে প্রায় এক একর জমির ওপর যে ভবনটি নির্মিত হয়েছে, তার নিচে তিনটি বেজমেন্ট এবং ওপরে ছয়তলা। এই ভবনটির নির্মাণ কাজের সময় তারিক আলী মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য সচিব ছিলেন। এই সম্পূর্ণ নির্মাণ কাজের খুঁটিনাটি বিষয় তিনি নিজে সমন্বয় করেছেন। ঠিকই আমরা পাশে ‘ইনস্টিটিউট অব আর্কিটেক্ট’ পেয়েছিলাম। এই জাদুঘর নির্মাণের ক্ষেত্রে আমাদের একটি সৌভাগ্য যে তারিক আলী একজন বিশ্বমানের প্রকৌশলী।

তারিক আলীর শিক্ষা যন্ত্র প্রকৌশলী বিষয়ে, কিন্তু সব ধরনের প্রকৌশলী বিষয়ে গভীর জ্ঞান ছিল। তিনি কতটা বিশ্বমানের তা প্রমাণ দিতে গেলে বলতে হয়, তিনি চাকরি করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের একটি কোম্পানিতে। প্রকৌশলী বিষয়ে এতই দক্ষতা ছিল তার যে ইন্দোনেশিয়া এবং মিশরে যে প্ল্যান্টে কাজ করেছেন তারা তাদের নিউ জার্সির প্রধান অফিস থেকে অন্যান্য ফ্যাক্টরির যেসব সমস্যা হতো সেটা দেখার দায়িত্ব তাঁকেই দিতেন। অবসরের পরে যখন ফিরে আসেন, তখন চীনে বেশ কয়টি ফার্মাসিউটিক্যালস প্ল্যান্টের পরামর্শক হিসেবে কাজ করেছেন। কাজেই তার দক্ষতার একটি বৈশ্বিক রূপ ছিল। আজকে আমাদের মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের কোন পাশ দিয়ে বৈদ্যুতিক তার গেছে, কোনদিক দিয়ে পানির লাইন গেছে সেখান থেকে শুরু করে যদি এয়ারকন্ডিশনিং সিস্টেম রক্ষণাবেক্ষণের প্রয়োজন হয় তাহলে প্রতি মুহূর্তে তারিক আলীর কথা স্মরণ হবে। কারণ এই সবকিছু তার নখদর্পণে ছিল। তার সবচেয়ে আবেগের জায়গা হচ্ছে, মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি সংরক্ষিত হলে সেসময়কার যে গণহত্যা এবং বীরত্বপূর্ণ কাজগুলো ঘটেছে, সেটি নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে হবে। এটি ছিল তার মূলমন্ত্র। তিনি এতটাই নিরলসভাবে কাজ করতেন যে প্রায় প্রতিদিন মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে গিয়েছেন।

তারিক আলী তার লক্ষ্য অর্জনের জন্য বাঙালি সংস্কৃতি বিশেষ করে সংগীতের প্রতি গভীর অনুরাগী ছিল। তিনি সবসময় মনে করেছেন যে বাঙালি সংস্কৃতির অধিকার প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জন হয়েছিল। বুলবুল ললিতকলা একাডেমির সাবেক শিক্ষার্থী তিনি, কিন্তু সাংস্কৃতিক আন্দোলনের স্বার্থে যুক্ত হয়েছেন ছায়ানট এবং রবীন্দ্রসংগীত সম্মিলন পরিষদের সঙ্গে। দরাজ গলায় গান গাওয়া এবং সংগীত সম্পর্কে গভীর বোধ ছিল তার। মুক্তিযুদ্ধের সময় যখন তাকে দেশ ত্যাগ করতে হয়, তখন মুক্তি সংগ্রামী শিল্পী সংস্থায় যুক্ত হন। মুক্তি সংগ্রামী শিল্পী সংস্থার সঙ্গে এই দলটি শরণার্থী শিবিরে মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে গান গিয়ে তাদের উজ্জীবিত করেছেন। তার দালিলিক প্রমাণ পেয়েছি আমরা মুক্তির গানের প্রধান চরিত্রের ভূমিকায়।

মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সমাজে প্রতিষ্ঠার একটি বড় লক্ষ্য তার ছিল। সেই লক্ষ্য থেকেই প্রায় ৩ দশক ধরে তিনি সম্মিলিত সামাজিক আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তিনি মনে করতেন স্বাধীনতার মর্মবাণী হচ্ছে–সকল ধর্ম, সকল প্রান্তিক জনগণের সমধিকার প্রতিষ্ঠা করা। এজন্য সম্মিলিত সামাজিক আন্দোলন নামে যে সংগঠন গড়ে উঠেছিল, তাদের যাত্রা শুরু হয় ২০০১-০২ সালের নির্বাচনের পর যে সাম্প্রদায়িক হামলা হয় বিভিন্ন এলাকায় সেখানে তিনি সংগীতগুণী ওয়াহিদুল হকের সঙ্গে নানা জায়গায় গিয়ে এই নির্যাতিত মানুষদের উদ্ধারে কাজ করেছেন। মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের বাইরে এটাকেই প্রধান কর্মক্ষেত্র হিসেবে গণ্য করেছেন। দেশের এমন কোনও প্রান্ত নেই, যে প্রান্তে তিনি যাননি। সংখ্যালঘুদের ওপর আক্রমণের পরে কিংবা আদিবাসীদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় কাজ করেছেন এবং আমৃত্যু সম্মিলিত সামাজিক আন্দোলনের সভাপতি।

তারিক আলী খুব আবেগপ্রবণ মানুষ। আমরা যখন মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে জাতীয় সংগীত গাইতাম তখন সাধারণভাবেই তিনি নেতৃত্ব দিতেন। ‘মা তোর বদনখানি মলিন হলে আমি নয়নজলে ভাসি॥’—এই লাইনটি গাওয়ার সময় প্রতিদিন তার চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়তো। তারিক আলীর প্রয়াণের মধ্য দিয়ে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর শুধু তার মূল উদ্যোগীকে হারালো তাই নয়, আমাদের ধারণা বাংলাদেশ একজন মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বীরচিত্ত একজন মানুষকে হারিয়েছে।

লেখক: ট্রাস্টি, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর