এইচএসসি পরীক্ষা নিয়ে কয়েকটি প্রস্তাবনা

মোহাম্মদ আসাদ উজ জামান:   করোনার সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কায় এ বছর এইচএসসি পরীক্ষা হয়নি। বাংলাদেশের জন্য এইচএসসি খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি পরীক্ষা। এই পরীক্ষার পরেই ছাত্ররা ভর্তি পরীক্ষা দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় এবং মেডিক্যাল কলেজে পড়ার সুযোগ পায়। করোনার কারণে এইচএসসি পরীক্ষা না হলে বিশ্ববিদ্যালয় এবং কলেজ লেভেলের শিক্ষায় বেশ জটিলতা দেখা দিতে পারে। তবে করোনাকালে বেঁচে থাকাটাই যেখানে মুখ্য ব্যাপার, সেখানে শিক্ষা ব্যাপারটা খানিকটা হলেও গৌণ বটে! তারপরেও পুরো দেশের শিক্ষা এবং দেশের এগিয়ে যাওয়ার সঙ্গেও এই এইচএসসি পরীক্ষা ওতপ্রোতভাবে জড়িত!

চাইলে করোনার কারণে এইচএসসি পরীক্ষা নাও নেওয়া যেতে পারে। সামগ্রিক বিচারে এই সিদ্ধান্তটা কোনোমতেই খারাপ হতে পারে না। কিন্তু সমস্যাটা শুরু হবে করোনা থেকে উত্তরণের পরে, কিংবা করোনা ভীতি যখন সহনীয় পর্যায়ে চলে আসবে। এটা ঠিক করোনা কবে যাবে, বা করোনার মাঝেই আমাদের বেঁচে থাকতে হবে কিনা, এখনই এটা স্পষ্ট করে কারও পক্ষে বলা হয়তো সম্ভব নয়। তবে আমরা চাইলেই যথেষ্ট সাবধান থাকতে পারি, এবং এই সাবধানতার মাঝেও কিছু কাজ চালিয়ে নিতে পারি।

কোনও কারণে যদি এইচএসসি পরীক্ষা না নেওয়া যায়, তাহলে কলেজের ওপর ভীষণ চাপ পড়বে। এই বছরের ছাত্রদের সঙ্গে আরও নতুন ছাত্র যোগ হবে। তখন দুই বছরের ছাত্রদের একসঙ্গে পরীক্ষা নেওয়া, বা কতটুকু সময়ের ফাঁক রেখে পরীক্ষা নেওয়া যায়, এটা বেশ একটি কঠিন সমস্যা হয়ে দাঁড়াবে। এর সঙ্গে আছে পরীক্ষার আশায় বসে থাকা ছাত্রদের মানসিক চাপ। সারাক্ষণ বাড়িতে বসে থাকার কারণে হয়তো মানসিক চাপ আরও বেশি। ওদের মানসিক চাপের সঙ্গে জড়িয়ে আছে ওদের নিয়ে অভিভাবকদের নানান দুশ্চিন্তা। আর ঘরে বসে থেকেই এই চিন্তা এবং দুশ্চিন্তা নানা কারণেই বেড়ে যেতে পারে।

এইচএসসি পরীক্ষা না হলে বিশ্ববিদ্যালয় লেভেলের শিক্ষাতেও বড় একটি চাপ পড়তে পারে। যদি আগামী বছর দুই বছরের ছাত্রদের একই সঙ্গে পরীক্ষা নেওয়া হয়, অথবা সামান্য গ্যাপ দিয়ে দুটো পরীক্ষা নেওয়া হলেও, দুই বছরের দ্বিগুণ ছাত্রদের বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষে যথাযথভাবে পড়ানো সম্ভব নয়। মোট কথা, নতুন ছাত্র নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাতে বড় একটি ঝামেলা সময়ের ব্যাপার মাত্র। আর দুই বছরের ছাত্রদের একসঙ্গে ভর্তি করতে চাইলে, মেধাবী ছাত্রদের অনেক বড় একটি অংশ বিশ্ববিদ্যালয় লেভেলে পড়ার সুযোগ পাবে না।

বর্তমান প্রেক্ষাপটে, বাংলাদেশের অনেক বিশ্ববিদ্যালয়েই অনলাইনে ক্লাস চলছে। কিছু কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ে অনলাইনে পরীক্ষাও চলছে। এবার এইচএসসি পরীক্ষা না হলে ওরা আবার ছাত্র সঙ্কটে পড়তে পারে। অর্থাৎ, এইচএসসি পরীক্ষা না হলে শিক্ষা ক্ষেত্রে বড় একটা সমস্যা দেখা দিতে পারে। সেক্ষেত্রে এইচএসসি পরীক্ষা নিয়ে একটি প্রস্তাব ভেবে দেখা যেতে পারে। চাইলে আমরা একটি ছাত্রের কলেজ পরীক্ষার রেজাল্টের ওপর ভিত্তি করেই এইচএসসির রেজাল্ট তৈরি করতে পারি। করোনার মতো কঠিন সময়ে এটা মেনে নিতে পারলেই হলো। আর যদি বিভিন্ন কলেজের মানের ওপর নির্ভর করে এই রেজাল্ট সবাই মেনে নিতে নাই পারি, তাহলে অন্য একটি বিকল্প ভাবনাও ভেবে দেখতে পারি।

নৈর্ব্যক্তিক বিষয়ের দুশ’ নম্বরসহ এইচএসসি পরীক্ষা হয় ১২শ’ নম্বরে। এখানে তুলে ধরা হচ্ছে বিজ্ঞানের বিষয়গুলো—বাংলা, ইংরেজি, গণিত, পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, এবং জীববিজ্ঞান। প্রতিটি বিষয়েই দুটো পত্র আছে, এবং একশ’ করে দুটিতে দুইশ’ নম্বরের পরীক্ষা হয়ে থাকে। সেক্ষেত্রে বাংলা আর ইংরেজির যদি কোনও পরীক্ষা না নেওয়া হয়, কলেজে টেস্ট পরীক্ষা হয়ে থাকলে, এর ওপর ভিত্তি করেই বাংলা আর ইংরেজির একটি গ্রেড দিয়ে দেওয়া যেতে পারে। টেস্ট পরীক্ষার পর যেহেতু একজন ছাত্র স্বাভাবিকভাবেই একটু বেশি পড়াশোনা করে, ওর গ্রেডটাও একটু বাড়িয়ে দেওয়া যেতে পারে। বাকি থাকলো বিজ্ঞানের মূল বিষয়গুলো। এগুলোর প্রতিটি বিষয়ে দুটোর পরিবর্তে একটি পরীক্ষা নেওয়া যেতে পারে, দুটো পত্রের বিষয় দিয়েই একটি প্রশ্ন তৈরি করা হবে। একটি পরীক্ষায় যা করবে তার ওপর ভিত্তি করেই দুটো পত্রে একই গ্রেড দেওয়া যেতে পারে। তাহলে একজন ছাত্রকে ১২শ’ নম্বরের ১২টি পরীক্ষার পরিবর্তে মাত্র চারশ’ নম্বরের চারটি পরীক্ষা দিতে হচ্ছে।

আর এই পরীক্ষা নেওয়া যেতে পারে ছাত্রদেরকে তিন ভাগে ভাগ করে। এতে করে বেশ স্বাস্থ্যবিধিও মানে যাবে। পরীক্ষা নেওয়ার এক মাস আগে ঘোষণা দিলেই হবে। এরপর প্রতিটি বিষয়ে তিন সেট প্রশ্নে তিনবার করে পরীক্ষা হবে, যদিও একজন ছাত্রকে একটি পরীক্ষাই দিতে হবে। এতে করে একজন ছাত্রকে দেড় মাসের মতো সময়ে চারবার ঘরের বাইরে এসে পরীক্ষার হলে পরীক্ষা দিতে হবে। এবং পুরো এইচএসসি পরীক্ষা মাত্র দেড় মাসেই শেষ করা সম্ভব। আর ব্যবহারিক বিষয়ে নতুন করে কোনও পরীক্ষা না নিলেও চলবে, পুরো বছরের পারফরমেন্স দেখেই একটি গ্রেড দেওয়া যেতে পারে। ঠিক একইভাবে আর্টস এবং কমার্সেরও চারটি বিষয়ের ওপর পরীক্ষা নেওয়া যেতে পারে। একটি কলেজে এক দিনে এক তৃতীয়াংশ শিক্ষক এবং এক তৃতীয়াংশ ছাত্রের উপস্থিতিতে স্বাস্থ্যবিধির ব্যত্যয় হবে না বলেই ধরে নেওয়া যায়।

এখন একটি প্রশ্ন আসতে পারে, একই পরীক্ষার জন্য তিন সেট আলাদা প্রশ্নে ছাত্রদের শিক্ষার সঠিক মূল্যায়ন হচ্ছে কিনা। এই প্রশ্ন যদি উঠে তাহলে এক সেট প্রশ্ন দিয়েই কি ছাত্রদের মেধা এবং মেধা চর্চার সত্যিকারের মূল্যায়ন হয়! একজন ছাত্র হয়তো কিছু প্রশ্ন পারে না, অন্য প্রশ্ন এলে ঠিকই পারতো! এই প্রশ্নের কোনও ভালো উত্তর নেই, যা সবাই মেনে নিতে পারবে। কিন্তু অবস্থার ভিত্তিতে একটা কিছু মেনে নিতেই হবে। দরকার পড়ে পরীক্ষার পর খাতার সঙ্গে প্রশ্নও নিয়ে নেওয়া হবে, যাতে অন্যরা এই প্রশ্ন দেখে মানসিক টানাপড়েনে না পড়ে। এতে করে ছাত্রদের মাঝে ছোটখাট মানসিক চাপ একটু হলেও দূর করা সম্ভব হবে।

আবার পুরনো প্রশ্নে ফিরে আসছি। করোনাকালে যেহেতু বেঁচে থাকাটাই সবচাইতে জরুরি, সেখানে আদৌ এইচএসসি পরীক্ষা বা বিশ্ববিদ্যালয় লেভেলে পরীক্ষা নিয়ে ভাবার দরকার আছে কিনা। প্রশ্নটা অনেক বড়, এর উত্তর সামগ্রিকভাবে পুরো দেশের মানসিক অবস্থার ওপর নির্ভর করে। যদি বিশ্ববিদ্যালয় লেভেলে শিক্ষার গতিটা ধরে রাখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়, তাহলে এভাবে পরীক্ষা নেওয়া সম্ভব। তবে শর্ত থাকবে, এই পরীক্ষার ফলাফলের কোনও প্রভাব ভর্তি পরীক্ষায় থাকতে পারবে না। শুধু ভর্তি পরীক্ষার নম্বরের ওপর ভিত্তি করেই বিশ্ববিদ্যালয়ে যেন ছাত্র ভর্তি করা হয়। যদি ভর্তি পরীক্ষার ওপর ভিত্তি করেই বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র ভর্তি করা হয়, তাহলে এই ধরনের এইচএসসি পরীক্ষা নেওয়ার কোনও দরকার আছে কিনা!

এই প্রশ্নের উত্তর নির্ভর করে, দেশের সব কলেজের নিজস্ব পরীক্ষার ফলাফলের ওপর আমাদের সমান আস্থা আছে কিনা। যদি আস্থা থাকে তাহলে প্রস্তাবিত বাংলা আর ইংরেজি বিষয়ের মতো, বাকি বিষয়গুলোতেও কলেজের দেওয়া ফলাফলের ওপর ভিত্তি করেই বোর্ডের ফলাফল তৈরি করা যেতে পারে। আর কলেজের পরীক্ষার রেজাল্টের ওপর সামগ্রিকভাবে আস্থা না থাকে, তাহলে মাত্র চারটি পরীক্ষার মাধ্যমেই একটি এইচএসসি পরীক্ষা নেওয়া যেতে পারে। কারণ প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার জন্য একজন ছাত্রের নির্দিষ্ট মেধার সঙ্গে মেধার চর্চাও থাকতে হয়। এইচএসসি পরীক্ষার রেজাল্টের ওপর ভিত্তি করে ঠিক করা হবে কোন ছাত্র কোন কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ পাবে। ভর্তির বিষয়টি শুধুমাত্র ভর্তি পরীক্ষার রেজাল্টের ওপর ভিত্তি করেই ফায়সালা করা হবে।

যদি তাই হয়, তাহলে চারশ’ নম্বরের পরীক্ষা থেকে চারশ’ নম্বরের রেজাল্ট দিলেই তো হয়ে যাওয়ার কথা! এটার একটি বড় সমস্যা আছে। তা হলো, এইচএসসি বরাবরই ১২শ’ নম্বরে হয়ে থাকে। এর থেকে সরে আশা ঠিক হবে না। বিশেষ করে অনেকেই এইচএসসি পর্যন্ত লেখাপড়া করেই চাকরি করেন, বা পরিবর্তী সময়ে এইচএসসি পরীক্ষার রেজাল্টও চাকরিতে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। সেজন্য এই কঠিন সময়ের ওপর নির্ভর করে চারশ’ নম্বরের পরীক্ষা নিয়ে ১২শ’ নম্বরের রেজাল্ট দেওয়া যেতে পারে। কঠিন সময়টা পার করতে পারা নিজেই একটি কঠিন পরীক্ষা। এখানে অনেক হিসাবেরই চুলচেরা বিশ্লেষণের কোনও প্রকার সুযোগ নেই বললেই চলে। পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে এবং দেশের সামগ্রিক অগ্রগতি বিবেচনায় এনে করোনা সময়টি পার করতে পারাটাই বড় একটি সফলতা।

মাত্র চারশ’ নম্বরের বিশেষ ধরনের সংক্ষিপ্ত এইচএসসি পরীক্ষার প্রস্তাবটি নিচে দেওয়া হলো—

এক. বাংলা এবং ইংরেজির জন্য নতুন পরীক্ষা নেওয়া হবে না, এবং এই বিষয় দুটোর ফলাফল কলেজের পরীক্ষার ফলাফলের ওপর ভিত্তি করেই দেওয়া যেতে পারে। যেহেতু ছাত্ররা কলেজের পরীক্ষার তুলনায় বোর্ডের পরীক্ষার গুরুত্ব বেশি দেয়, সেহেতু কলেজের পরীক্ষায় প্রাপ্ত নম্বরকে কিছুটা বাড়িয়ে দেওয়া যেতে পারে। এর জন্য সবার জন্য একটি সার্বজনীন গাণিতিক প্রক্রিয়া ব্যবহার করা যেতে পারে।

দুই. বিজ্ঞানের চারটি বিষয়ে আটটি পরীক্ষার পরিবর্তে মাত্র চারটি পরীক্ষা নেওয়া। দুটো পত্রের বিষয় মিলিয়ে একটি প্রশ্ন করা হবে। এরকম তিন সেট প্রশ্ন থাকবে। একজন ছাত্র একটি পরীক্ষা দেবে, সে যে গ্রেড পাবে, তা দুটো পত্রের জন্য বিবেচিত হবে। পরীক্ষা শেষে খাতার সঙ্গে প্রশ্নপত্রও জমা নেওয়া হবে।

তিন. ব্যবহারিক বিষয়ে কোনও পরীক্ষা নেওয়া হবে না, আগের ক্লাস পারফরমেন্স বিবেচনা করেই একটি গ্রেড দেওয়া যেতে পারে। দরকার পড়লে একটি সার্বজনীন গাণিতিক প্রক্রিয়ায় সবারই গ্রেড কিছুটা বাড়িয়ে দেওয়া যেতে পারে।

চার. এই ফলাফলের ভিত্তিতে শুধুমাত্র বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষা কে দিতে পারবে তাই নির্ধারণ করা হবে। এর বাইরে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তিতে এই ফলাফলের অন্য কোনও ভূমিকা থাকতে পারবে না।

একই পদ্ধতি আর্টস এবং কমার্সের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। আর আর্টস এবং কমার্সে ব্যবহারিক কোনও পরীক্ষা নেই। তাহলে বিজ্ঞান, আর্টস এবং কমার্স মিলিয়ে চারটি করে মোট ১২টি বিষয়ে পরীক্ষা হবে। ১২টি বিষয়ে এক তৃতীয়াংশ ছাত্র নিয়ে তিনবার পরীক্ষা হবে, যদিও একজন ছাত্রকে একবারই পরীক্ষা দিতে হবে, তাহলে মোট পরীক্ষার সংখ্যা দাঁড়ালো ছত্রিশ। প্রতিদিন করে একটি মাত্র পরীক্ষা নিলে, সাপ্তাহিক ছুটি বিবেচনা করে মাত্র দেড় মাসে এই সংক্ষিপ্ত এইচএসসি পরীক্ষা শেষ করা সম্ভব। আর একটি বিষয় হলো, সায়েন্সের তুলনায় আর্টস এবং কমার্সের ছাত্র সংখ্যা বেশ কম থাকে। তাহলে সকালে সায়েন্স আর বিকালে একসঙ্গে আর্টস এবং কমার্সের পরীক্ষা নিয়ে মাত্র ১২ কর্মদিবসেও পরীক্ষা নেওয়া যেতে পারে। এতে যেমন করোনাকালের স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা সম্ভব হবে, তেমনি ছাত্র এবং অভিভাবকদের মাঝে মানসিক চাপ কিছুটা হলেও কমানো সম্ভব হবে। একই সঙ্গে করোনাকালেও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে শিক্ষার গতিটা ধরে রাখা সম্ভব হবে, যা কিনা একটি দেশের সামগ্রিক এগিয়ে যাওয়ার জন্য খুবই জরুরি!

লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, গণিত ও পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়