ভোটকেন্দ্রে ভোট বন্ধের বিধান বাতিল চায় ইসি!

নিউজ ডেস্ক:    ভোটগ্রহণে নিয়ন্ত্রণবহির্ভূত বাধা আসলে বা বেআইনিভাবে ব্যালটবাক্স অপসারিত হলে সংশ্লিষ্ট ভোটকেন্দ্রের ভোটগ্রহণ বন্ধ করার ক্ষমতা আছে কেন্দ্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রিজাইডিং অফিসারের। কিন্তু নির্বাচন কমিশন প্রিজাইডিং অফিসারের এই ক্ষমতা রোধ করার প্রস্তাব দিয়েছে। একইভাবে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তপশিল ঘোষণা এবং আইন লঙ্ঘনে কমিশন কর্তৃক প্রার্থিতা বাতিল ও জরিমানা আরোপের ক্ষমতাসংক্রান্ত বিধান বাদ দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে।

মৌলিক ও পদ্ধতিগত ১০টি ধারার ১১টি উপধারা বাদ দিয়ে ‘গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ-১৯৭২’-এর (আরপিও) সংশোধনীর খসড়া প্রস্তুত করে আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছিল নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এ নিয়ে তীব্র সমালোচনায় পড়েছে কমিশন। নির্বাচন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি বর্তমান নির্বাচন কমিশনের আত্মঘাতী প্রস্তাবনা। অবশ্য সংশোধনীর খসড়া সম্প্রতি ইসিতে ফেরত পাঠিয়েছে আইন মন্ত্রণালয়ের লেজিসলেটিভ ও সংসদবিষয়ক বিভাগ।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ইসির আইন সংস্কার কমিটির প্রধান নির্বাচন কমিশনার কবিতা খানম ইত্তেফাককে বলেন, আইন সংস্কার কমিটির প্রস্তাবনায় সব ধারা রাখা হয়েছিল। মৌলিক ধারাগুলো বাদ পড়ার কথা নয়। প্রস্তাবনা থেকে কীভাবে বাদ পড়ল তা জানি না। এ বিষয়ে আগামী ২৬ আগস্ট সভা আছে। তখন বিষয়গুলো আলোচনা করা হবে।

আরপিওর ২৫ নম্বর ধারায় ভোটকেন্দ্রের ভোট বন্ধ থেকে সবকিছুই করার ক্ষমতা দেওয়া আছে প্রিজাইডিং অফিসারের। এক্ষেত্রে শুধু রিটার্নিং অফিসারকে অবগত করতে হবে। প্রিজাইডিং অফিসারের ভোট বন্ধের ক্ষমতার কারণে গোলযোগের জন্য বিভিন্ন সময়ে ভোট স্থগিত করা হয়। এই গুরুত্বপূর্ণ ধারাটি বাদ দেওয়ায় নির্বাচন সংশ্লিষ্ট সবাই অবাক। একইভাবে কমিশনের প্রার্থী বাতিলের প্রস্তাব নিয়েও।

আইন মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, দুই দফা বর্তমান নির্বাচন কমিশনের পাঠানো আরপিও সংশোধনী প্রস্তাব অসংগতিতে ভরপুর। প্রথম বার পর্যবেক্ষণ দিয়ে ফেরত পাঠানো হয়েছিল। এবার মৌলিক ও পদ্ধতিগত অনেক বিষয় বাদ দিয়ে প্রস্তাব পাঠিয়েছে। এবারও এর ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে। ইসির দুই সিনিয়র কর্মকর্তা এসে ‘ভুল’ স্বীকার করে গেছেন। তবে এটি আইনে রূপ নিচ্ছে না বলে ইসিকে পরোক্ষভাবে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে।

ইসিকে জানানো হয়েছে, জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও সংশ্লিষ্ট বিষয়াবলি সম্পাদনের লক্ষ্যে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সংবিধানের চতুর্থ তপশিলের তৃতীয় অনুচ্ছেদে প্রদত্ত ক্ষমতাবলে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ-১৯৭২ (আরপিও) প্রণয়ন ও জারি করেন। আরপিও একটি ঐতিহাসিক আইনগত দলিল। জাতীয় সংসদ নির্বাচন পরিচালনাসংক্রান্ত মৌলিক ও পদ্ধতিগত বিষয়সংবলিত একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ আদেশ। এ আদেশের অধীনে ১১টি জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। এ আদেশটি এ পর্যন্ত ২০০ বারের বেশি সংশোধন করা হয়েছে। তবুও এটিকে আইনে রূপ দেওয়া হয়নি। বিগত এ টি এম শামসুল হুদা কমিশন আদেশটি আইনে রূপান্তরের উদ্যোগ নিলেও আওয়ামী লীগের আপত্তির কারণে তা করা হয়নি।

সম্প্রতি আইন মন্ত্রণালয় থেকে আরপিওর খসড়া নির্বাচন কমিশনে ফেরত পাঠানো হয়। এ সংক্রান্ত পর্যবেক্ষণে সুনির্দিষ্টভাবে ১০টি ধারার ১১টি বিধান বাদ পড়ার কথা উল্লেখ করেছে আইন মন্ত্রণালয়। এতে বলা হয়েছে—আরপিওর পদ্ধতিগত বিষয়সহ অনেক মৌলিক বিধান বাদ দিয়ে প্রস্তাবিত গণপ্রতিনিধিত্ব আইন-২০২০-এর খসড়া প্রস্তুত করা হয়েছে। প্রস্তাবে যা বাদ পড়েছে সেগুলো আইনে থাকা সমীচীন বলে পর্যবেক্ষণে উল্লেখ করেছে আইন মন্ত্রণালয়।

আরপিও থেকে যা বাদ পড়েছে : বিদ্যমান আরপিও থেকে যে ১০টি ধারার ১১টি বিধান বাদ দিয়ে খসড়া প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে, সেগুলো হচ্ছে—১. আরপিও ধারা-১১-এ উল্লিখিত ইসি কর্তৃক নির্বাচন অনুষ্ঠানের সময়সূচি ঘোষণাসংক্রান্ত বিধান। ২. ধারা-২১-এ প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর নির্বাচনি এজেন্ট নিয়োগসংক্রান্ত বিধান। ৩. ধারা-২২ এ উল্লিখিত প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর এজেন্ট নিয়োগসংক্রান্ত বিধান। ৪. ধারা-২৫-এ উল্লিখিত উদ্ভূত পরিস্থিতিতে প্রিজাইডিং কর্মকর্তার ভোটগ্রহণ বন্ধ করার ক্ষমতাসংক্রান্ত বিধান। ৫. ধারা-২৬-এ উল্লিখিত ভোট প্রদান পদ্ধতি অর্থাত্ গোপন ব্যালটের মাধ্যমে ভোটদানসংক্রান্ত বিধান। ৬. ধারা-৩২-এ উল্লিখিত টেন্ডার্ড ব্যালট পেপারসংক্রান্ত বিধান। ৭. ধারা-৪১-এ উল্লিখিত জামানত বাজেয়াপ্তসংক্রান্ত বিধান। ৮. ধারা-৪২-এ উল্লিখিত রিটার্নিং কর্মকর্তার দলিল দস্তাবেজ সংরক্ষণসংক্রান্ত বিধান। ৯. ধারা ৯০ (৯০এ, ৯০বি, ৯০সি, ৯০ডি, ৯০ই, ৯০এফ, ৯০জি, ৯০এইচ ও ৯০আই) এ উল্লিখিত রাজনৈতিক দলের নিবন্ধনসংক্রান্ত বিধান। ১০. ধারা-৯১সি এ উল্লিখিত নির্বাচনি পর্যবেক্ষক নিয়োগের ক্ষমতাসংক্রান্ত বিধান। ১১. ধারা-৯১ই এ উল্লিখিত কমিশন কর্তৃক প্রার্থিতা বাতিল ও জরিমানা আরোপের ক্ষমতাসংক্রান্ত বিধান। আরপিওর ৯১ই ধারায় প্রার্থিতা বাতিলের সরাসরি ক্ষমতা নির্বাচন কমিশনের হাতে রয়েছে। বিগত কাজী রকিবউদ্দীন আহমেদের কমিশন তা বাতিলের উদ্যোগ নিয়ে চরম সমালোচনার মধ্যে পড়ে। পরে তারা ঐ উদ্যোগ থেকে সরে আসে। এবার অনেকটা গোপনীয়ভাবে একই ধরনের উদ্যোগ নিয়েছে ইসি।

এ বিষয়ে ইসির সিনিয়র সচিব মো. আলমগীর বলেন, পর্যবেক্ষণসহ আইন মন্ত্রণালয় খসড়া আরপিও সংশোধনী ফেরত পাঠিয়েছে। তারা কিছু সুপারিশও করেছে। ঐ সুপারিশগুলো অন্তর্ভুক্ত করে আবারও আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে।