অজ্ঞান পার্টির টার্গেট এখন পশুহাট

 

নিউজ ডেস্ক: আসন্ন ঈদুল আযহা সামনে রেখে রাজধানীতে তৎপর হয়ে উঠেছে অজ্ঞান পার্টির সদস্যরা। সারা বছর তাদের সাধারণত টার্গেট থাকে শপিংমল, বাসস্ট্যান্ড, সদরঘাট ও রেলস্টেশন এলাকায় আগত ব্যক্তিরা। কিন্তু এবার করোনার কারণে ওইসব স্থানগুলো তেমন সরগম না হওয়ায় তারা অন্যতম টার্গেটে রেখেছে পশুর হাটকে। 

এদিকে চক্রকে ধরাতে ইতোমধ্যে মাঠে তৎপর রয়েছে গোয়েন্দারা। গত এক সপ্তাহে রাজধানী থেকে অজ্ঞান পার্টির অন্তত অর্ধশত সদস্যকে আটক করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা।

জানা যায়, অজ্ঞান পার্টির সদস্যরা চা-পান, জুসসহ বিভিন্ন খাবারের সঙ্গে ওষুধ মিশিয়ে অচেতন করে মোবাইল ফোন, টাকা-পয়সাসহ মূল্যবান সামগ্রী ও সর্বস্ব কেড়ে নিয়ে পালিয়ে যায়। এ চক্রটি এখন কাজ করছে ঢাকার চিহ্নিত অপরাধীদের সঙ্গে। ঢাকার পাশের জেলাগুলো থেকে আসা চোর, ছিনতাইকারীরাদের ভাড়া করছে এ অপরাধী চক্রটি। একডজন গ্রুপে শতাধিক অপরাধী কাজ করছে। অপরাধ ঘটিয়ে তারা সহজেই আবার ঢাকার বাইরে পালিয়ে যায়।

গত সোমবার (২৭ জুলাই) রাজধানীর লালবাগ এলাকা থেকে অজ্ঞান ও মলম পার্টির আট সদস্যকে আটক করে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের গোয়েন্দা লালবাগ বিভাগ। এরা হলেন, রানা শিকদার (২৪), জুম্মাত (২৪), সোহেল রানা (৩৫), বিল্লাল (৩০), মোহাম্মদ আলী হোসেন (৪২), মোহাম্মদ সোহেল (২৬), জহুরুল (২৪) ও মোহাম্মদ হেলাল (২৭)। তাদের হেফাজত হতে ১০০ পিস চেতনানাশক ট্যাবলেট, মুভ তরল স্প্রে, মলম ও মরিচের গুড়া উদ্ধার করা হয়।

গোয়েন্দা লালবাগ বিভাগের কোতোয়ালি জোনাল টিমের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার সাইফুর রহমান আজাদ বলেন, লালবাগ এলাকায় কোরবানির পশুর হাটকে টার্গেট করে অজ্ঞান ও মলম পার্টির সদস্যরা অবস্থান করছে এমন সংবাদের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে ৮ জনকে চেতনানাশক বিভিন্ন ওষুধসামগ্রীসহ আটক করা হয়।

জিজ্ঞেসাবাদে তারা জানায়, অজ্ঞান পার্টির দলনেতা রানা সিকদারের নেতৃত্বে তার সহযোগী জুম্মাত ও ভাড়া করা অন্য ৬ জন মহানগরীর পশুর হাটকে টার্গেট করে। তারা ধোলাইখাল এলাকার পশুর হাটে আগত বেপারী ও ক্রেতাদের কৌশলে অজ্ঞান করে তাদের সর্বস্ব লুট করে নিয়ে যাওয়ার উদ্দেশ্যে লালবাগ এলাকায় জড়ো হয়। আটক সবার বিরুদ্ধে বিভিন্ন থানায় একাধিক মামলা রয়েছে। এঘটনায় তাদের বিরুদ্ধে লালবাগ থানায় মামলা হয়েছে।

এদিকে, ২০ জুলাই রাজধানীর বাড্ডা এলাকা থেকে অজ্ঞান পার্টির চার সদস্যকে আটক করে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। তারা হলো মো. মাসুদ, মো. মামুন হোসেন ওরফে সাত্তার, মো. সুমন ওরফে মুসা ও মো. সুমন। এ সময় তাদের থেকে একটি প্রাইভেট কার, চাপাতি, ছুরি, রশি, গামছা ও ঘুমের ওষুধ উদ্ধার করা হয়েছে।

সিআইডির পুলিশ সুপার মোহাম্মদ কামরুজ্জামান বলেন, কোরবানির ঈদ সামনে রেখে পশুর হাট টার্গেট করে মলম পার্টির চক্রগুলো সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করছে। এসব চক্র গবাদি পশুর বেপারি, সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালক, যাত্রী ও পথচারীদের টার্গেট করে কৌশলে চোখে বিষাক্ত মলম লাগিয়ে বা ঘুমের ওষুধ খাইয়ে সবকিছু কেড়ে নিয়ে নির্জন স্থানে ফেলে যায়। এ বিষাক্ত মলমের প্রভাবে অনেক সাধারণ মানুষের চোখ নষ্ট এমনকি মৃত্যু পর্যন্ত হয়। এই চক্রের সদস্যরা মূলত ৪ থেকে ৫ জন একত্রিত হয়ে প্রাইভেট কার নিয়ে অটোরিকশার চালক বা যাত্রীদের থামিয়ে বিষাক্ত মলম লাগিয়ে সব লুট করে। তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।

অপরদিকে ১৭ জুলাই সন্ধ্যায় রাজধানীর বিমানবন্দর গোল চত্বর এলাকা থেকে সংঘবদ্ধ অজ্ঞান পার্টির ৭ সদস্যকে আটক করে র‌্যাব। তারা হলেন, মোশারফ হোসেন মাহিন, মো. আমিনুল ইসলাম, মো. চাঁদ হাওলাদার, মো. রবিন মিয়া, মো. বাবু, মো. রফিক ও সচিত দাস। অভিযানের সময় তাদের কাছ থেকে ৩টি মলম, ৫টি ব্লেড, ৩টি মোবাইল ফোন ও ৭৫০ টাকা উদ্ধার করা হয়।

র‌্যাব-১ এর এএসপি মো. সালাউদ্দিন জানান, সম্প্রতি এই চক্রের সদস্যরা সাধারণ পথচারী যাত্রী এবং বিমানবন্দরে প্রবেশরত হজ যাত্রীদের কাছ থেকে কৌশলে মোবাইল ফোন ও মূল্যবান সামগ্রী ছিনিয়ে নেয়। এ ছাড়াও তারা যাত্রীবাহী বাসে উঠে সাধারণ যাত্রীদের কৌশলে অজ্ঞান করে তাদের কাছ থেকে মোবাইল, টাকা-পয়সা, স্বর্ণালঙ্কার ও মূল্যবান সামগ্রী লুট করে নিয়ে যায়।

এই চক্রের সদস্যরা দীর্ঘদিন ধরে বিমানবন্দর এলাকায় বিদেশ গমনাগমনের উদ্দেশ্যে আগত লোকজন ও এই এলাকায় চলাচলকারী বাসযাত্রী, পথচারীদের গতিরোধ করে কৌশলে বোকা বানিয়ে তাদের চোখে চেতনা নাশক মলম দিয়ে অজ্ঞান করে। পরে তাদের কাছে থাকা মোবাইলফোনসহ নগদ টাকা এবং মূল্যবান অন্যান্য জিনিসপত্র হাতিয়ে নেয়। কেউ টের পেলে কিংবা বাধা দিলে তাকে ভয় দেখিয়ে তাদের কাছে থাকা ব্লেড দিয়ে আঘাত করে। হজযাত্রীসহ অন্য যাত্রীরা বিমানবন্দর ফুটওভার ব্রিজ পার হওয়ার সময় তারা তাদের ব্যাগসহ অন্যান্য মূল্যবান সামগ্রী ছিনতাই করে নিয়ে যায়।

এ ছাড়াও তারা শসা, বরই, আচার ইত্যাদি খাদ্যদ্রব্যে চেতনানাশক রাসায়নিক তরল পদার্থ মিশিয়ে সাধারণ মানুষকে অজ্ঞান করে তাদের সর্বস্ব লুট করে।