শুটিং এ্যা নেড়িকুত্তা

শুটিং এ্যা নেড়িকুত্তা

নিউজ ডেস্ক:   আনিসুর রহমান 

এই করোনাকালে মানুষের কাজ কমে।
আর আমার কাজ বাড়ে।
আমার কেন কেবল, খোদ পুলিশের কাজের কী আর শেষ আছে?
পুলিশের কাজের এখন এখতিয়ার বলে কিছু নাই।
খুন হয়েছে, দে দৌড়।
মারামারি হয়েছে, দে দৌড়।
জামাই বউরে মেরেছে, দে দৌড়।
বউ জামাইরে কিল দিয়েছে, দে দৌড়।
সচিব সাহেবের রক্ষিতা নারী নির্যাতনের মামলা ঠুকেছে, দে দৌড়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের মাস্টার ছাত্রীকে গোপনে বিয়ে করেছে, তার আগের বউ মামলা ঠুকেছে, দে দৌড়।
পলিথিনে করে নবজাতক শিশুকে ফেলে গেছে ডাস্টবিনে, দে দৌড়।
করোনা সন্দেহে ছেলেরা বাবাকে রাস্তায় ফেলে গেছে, দে দৌড়।
করোনা আক্রান্ত মায়ের মৃতদেহ হাসপাতালে ফেলে সন্তানেরা পালিয়েছে,
দে দৌড়।
বিরোধী দল মানববন্ধন করবে, দে দৌড়।
সরকারি দলের মন্ত্রী শ্বশুর বাড়ি যাবে, দে দৌড়।
মন্ত্রীর শ্যালিকার ননদের গায়ে হলুদ, দে দৌড়।
মহিলা কলেজের সরকারি দলের ছাত্রী সংগঠনের দুই দলের চুলাচুলি, দে দৌড়।
খাদ্যগুদাম থেকে খাদ্য উধাও, দে দৌড়।
দুর্নীতিবিরোধী কর্মকর্তা ঘুষ খাইছে, দে দৌড়।
সত্তর বছর বয়সে মন্ত্রী বাবা হইছে, দে দৌড়।
বস্তিতে আগুন লাগাইছে, দে দৌড়।
পাটের গুদামে আগুন দিয়ে মন্ত্রীর লোকজন আলু পোড়া খাইছে, দে দৌড়।
সরকারি দলের ছাত্র সংগঠনের গোলাগুলি, দে দৌড়।
এত দৌড়াদৌড়ি আর ভালো লাগে না।
তারপরও পুলিশের যত দোষ!
পুলিশ খুষ খায়।
সব পুলিশে কী ঘুষ খায়?
ঘুষ কী শুধু পুলিশ একা খায়?
ঘুষ খাব না পণ করেছি।
বউটা চলে গেল।
এখন এটা কী আমি সংবাদ সম্মেলন করে জানিয়ে দেব?
পুলিশের ঘুষ কী পুলিশের পকেটেই যায় শুধু?
আর কোথাও যায় না?
মুখ খুলতে গেলে তো এক শালারও মুখ থাকবে না!
নিজের কল্লাটাও থাকবে না।
বউ গেলে বউ পাওয়া যাবে।
কিন্তু কল্লা গেলে তো আর কল্লা পাওয়া যাবে না।
পুলিশের চাকরি তো আর যাদুকর জুয়েল আইচের যাদু না।
সে যাকগে যে, কথা দিয়ে শুরু করেছিলাম। আমি যেহেতু রাজধানীর অভিজাত এলাকার দায়িত্বে পুলিশের সুপার। ৯৯৯ নম্বরে বিদেশের কোন এক ক্ষমতাধর দূতাবাস থেকে অভিযোগ এসেছে অভিজাত এলাকার নেড়িকুত্তাটার একটা বিহিত করতে হবে।
এটা আবার পত্রিকার খবর হয়ে গেছে।
অভিজাত এলাকা বলে কথা।
উপর থেকেও নির্দেশ এসেছে এটার একটি বিহিত করতে হবে। আরে কত মানুষ রাজধানীর কত জায়গায় নেড়িকুত্তার চেয়েও খারাপ ভাবে রাস্তাঘাটে পড়ে আছে। সেসবের কোন খবর নাই। আর ওনারা খবর করছেন নেড়িকুত্তা নিয়ে। বিদেশি দূতাবাসের দাবি হল এই নেড়িকুত্তাটারে অন্য কোথাও সরিয়ে নিতে হবে। এটা স্বাস্থ্য এবং পরিবেশের জন্যে ঝুঁকিপূর্ণ। এর রোগ জীবাণু আছে।
দূতাবাসের দাবি অনুযায়ী বেশ কয়েকবার এক টোকাইকে কিছু টাকা দিয়ে এটাকে খাবারের টোপ দিয়ে দূরে কোথাও সরিয়ে নিতে। কিন্তু এটা আবার চলে আসে। একবার তো পুলিশের গাড়িতে করে রাজধানীর অন্য এলাকায় রেখে আসা হয়েছিল। কিন্তু কিভাবে যেন এটি চলে এসেছে।
কুকুরটির পক্ষে প্রাণীর অধিকার রক্ষায় আন্দোলনকারীরাও সোচ্চার হয়েছে। তাদের দাবি নেড়িকুত্তা যেখানে থাকতে ভালবাসে সেখানেই থাকবে।
দূতাবাসের সমস্যা হলে দূতাবাস সরে যাবে।
এই দেশ আমার
এই দেশ আপনার
এই দেশ নেড়িকুত্তার
এই দেশ কোন সাম্রাজ্যবাদী দূতাবাসের না।
এই জটিল সমস্যার সমাধানে উপর থেকে নির্দেশ এসেছে কুকুরটিকে রাতের মধ্যেই বিহিত করতে হবে।
আর এরকম বিহিত ভাল লাগে না।
গতরাতেই উপরের নির্দেশে এক মন্ত্রীর অপ্রিয় এক সন্ত্রাসীকে বিহীত করতে হল!
রাতে রাতে এরকম বিহিত আর পারছি না!
সন্ত্রাসীরাও তো মানুষ?
তার বউ!
সন্তান।
তাদের কান্না কানে বড় বেশি বাজে।
আরে পুলিশের বড় অফিসার তাতে কী?
আমিও তো মানুষ।
আমারও তো একটা মন আছে।
মানুষের কান্নায় আমার কষ্ট হয়।
শিশুর কান্নায় আমার চোখেও জল আসে।
আচ্ছা নেড়িকুত্তাটার কী কোন বাচ্চা আছে?
এরকম ভাবতে ভাবতে বিক্ষিপ্ত মনের মনোযোগ অন্যদিকে সরাতে ফেসবুকে ঢুকে দেখি-
বিশ্ববিদ্যালয়ের শতবর্ষ উদযাপন উপলক্ষে আমাদের ব্রিটিশ উচ্চারণে ইংরেজি বলার জন্যে ইংল্যান্ড থেকে ঠোঁটের সার্জারি করে আসা সকলের প্রিয় শিক্ষক সৈয়দ খাবিরুল স্যার তাঁর প্রাক্তন ছাত্রছাত্রীদের ক্লাশে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ শাসনামলে বার্মার রেঙ্গুনে কর্মরত ইংরেজ পুলিশ কর্মকর্তা জর্জ অরওরেলের লেখা ‘শুটিং এ্যান এলিফ্যান্ট’ গল্পটি বিশ বছর আগে আমাদের যিনি পড়িয়েছিলেন। আজকে সেই গল্পটি আবার পড়াবেন, আমাদের স্মৃতিকে ঝালাই করতে। ভাবছি, আমি কী ‘শুটিং এ্যান এলিফ্যান্ট’ এর ক্লাশে যাব? এর মধ্যেই মন্ত্রীর ফোন।