বাংলাদেশে শীতে করোনায় আক্রান্ত রোগী বৃদ্ধির আশংকা বিশেষজ্ঞদের

 

নিউজ ডেস্ক: করোনাভাইরাসের কার্যকর কোনো টিকা না আসা পর্যন্ত এ মহামারি শেষ হওয়ার সম্ভাবনা কম উল্লেখ করে আগামী শীতকালে বাংলাদেশে এ ভাইরাসটি মারাত্মক আকার ধারণ করতে পারে বলে সতর্ক করে দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

তাদের আশঙ্কা, আর্দ্রতা, সূর্যের তাপ, ভিটামিন ডি এর অভাব এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়ায়সহ শীতকালে অন্যান্য ভাইরাস ও ফ্লু জাতীয় শ্বাসকষ্টের রোগের লক্ষণ দেখা দেয় বলে এসময় মানুষ করোনাভাইরাস নিয়ে আরও বেশি সংবেদনশীল হয়ে ওঠতে পারে।

তবে তাদের ধারণা মানুষের মধ্যে সার্বজনীনভাবে মাস্ক ব্যবহার, শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখা, হাত ধোয়ার অভ্যাস বাড়ানো এবং পরীক্ষা ও আইসোলেশনের মতো স্বাস্থ্যবিধির কঠোর প্রয়োগের ওপর এ রোগের বিস্তার অনেকটা নির্ভর করবে।

করোনা নিয়ে আন্তর্জাতিক গবেষণা

ভারত, যুক্তরাজ্য ও অস্ট্রেলিয়াসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পরিচালিত সাম্প্রতিক কিছু গবেষণার দাবি, স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার সম্ভাবনা কমিয়ে দিয়ে শীতকালে এ ভাইরাসটির প্রভাব আরও বাড়তে পারে।

ভারতের দুটি বিশ্ববিদ্যালয় আইআইটি-ভুবনেশ্বর এবং এআইআইএমস– এর গবেষকদের একটি দল সম্প্রতি ওই দেশের নীতিনির্ধারকদের দেশটিতে বর্ষা ও শীতের সময় কোভিড-১৯ সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ার বিষয়ে সতর্ক করেছেন।

এখনো পর্যন্ত পিয়ার পর্যালোচনা না করলেও তিনটি গবেষণাকে ভিত্তি করে তারা বলেন, মৌসুমি বৃষ্টিপাত, ঠান্ডা বায়ুমণ্ডল এবং শীতকাল ঘনিয়ে আসাসহ পরিবেশগতভাবেই ভারতে করোনাভাইরাস সংক্রমণ বাড়তে পারে।

ভারতের ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির (এমআইটি) এক সমীক্ষা অনুসারে, দেশটিতে আগামী শীতকালের শেষে প্রতিদিন প্রায় ২.৮৭ লাখ মানুষ কোভিড-১৯ এ আক্রান্ত হতে পারে।

দেশটির বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয় ও সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি অব রাজস্থানের গবেষকরাও তাদের গবেষণায় শীত মৌসুমে করোনাভাইরাস ছড়ানোর পরিমাণ বাড়তে পারে বলে জানিয়েছেন।

যুক্তরাজ্যের মেডিকেল সায়েন্সেস একাডেমির এক সমীক্ষায় আগামী সেপ্টেম্বর থেকে ২০২১ সালের জুনের মধ্যে শীতকালে নতুন করে সংক্রমণের কারণে কোভিড-১৯ সম্পর্কিত হাসপাতালের মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে ১১৯,৯০০-এর বেশি হতে পারে বলে ধারণা করছে।

অস্ট্রেলিয়ার সিডনি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণা বলেছে, আর্দ্রতার এক শতাংশ কমলে কোভিড-১৯ সংক্রমণের সংখ্যা ৬ শতাংশ হারে বাড়িয়ে দিতে পারে। তারা আরও বলছে, কেবলমাত্র আর্দ্রতা কমে যাওয়াই কোভিড-১৯ সংক্রমণ বাড়ানোর সাথে জড়িত। এর সাথে তাপমাত্রার কোনো সম্পর্ক নেই।

ইউনিভার্সিটি অব মেরিল্যান্ড স্কুল অব মেডিসিনের গবেষকরা বলছেন, ব্রিটেন, মধ্য এশিয়া, ককাস, পূর্ব ও মধ্য ইউরোপ, উত্তর ও মধ্য-পশ্চিমা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং কানাডার ব্রিটিশ কলম্বিয়াতে শীতকালে কমিউনিটি ট্রান্সমিশনের ঝুঁকি বেশি রয়েছে।

বাংলাদেশের বিশেষজ্ঞদের মত

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক নজরুল ইসলাম বলেন, করোনাভাইরাস সংক্রমণ যেভাবে বাড়ছে, তাতে ধরেই নেয়া যায় শীতকালে এ ভাইরাসটির ছড়িয়ে পড়ার প্রকোপ বাড়বে।

তার আশঙ্কা শীতকালে পরিস্থিতির আরও অবনতি হতে পারে কেননা বছরের এসময়টাতে মানুষের মধ্যে শ্বাসকষ্টজনিত আরও অনেক ভাইরাস ও ফ্লু জাতীয় রোগের লক্ষণ দেখা যায়।

তিনি বলেন, শীতে তাপমাত্রা ও কম আর্দ্রতা করোনাভাইরাসকে আরও বেশি সময়ের জন্য বেঁচে থাকার সুযোগ করে দেবে। সেইসাথে ভিটামিন ডি এর ঘাটতি ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়ার ফলে করোনাভাইরাসটি মানুষের ওপর আরও বেশি প্রভাব ফেলবে।

জাতীয় প্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা কমিটির (এনটিএসি) এ সদস্য বলেন, শীতকালে ইনফ্লুয়েঞ্জা, নিউমোনিয়া, হাঁপানি ও অন্যান্য সর্দিজনিত রোগের কারণে করোনায় মৃত্যুর হারও বাড়তে পারে।

তিনি বলেন, শীতে প্রবীণ ব্যক্তি ও শিশুদের এ ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি আরও মারাত্মক হবে।

অধ্যাপক নজরুল বলেন, ‘কার্যকর প্রোগ্রামের মাধ্যমে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ভাইরাসটিকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে আমাদের প্রচেষ্টা আরও জোরদার করতে হবে। লুকিয়ে থাকা করোনা রোগীদের শনাক্ত করতে ও আক্রান্তদের আইসোলেশনের মধ্যে সংক্রমণের মাত্রাকে ধীর করতে আমাদের প্রতিদিন কমপক্ষে ২৫ হাজার নমুনা পরীক্ষা করা উচিত। ভাইরাসের হাত থেকে রক্ষা পেতে স্বাস্থ্যবিধির নিয়ম বজায় রেখে জনগণকেও সরকারের সহযোগিতায় এগিয়ে আসা দরকার।’

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক পরিচালক (রোগ নিয়ন্ত্রণ) অধ্যাপক বি-নাজির আহমেদ বলেন, যদিও অনেক বিশেষজ্ঞরা বলেছেন যে আবহাওয়ার সাথে করোনার কোনো সম্পর্ক নেই, তবে ঋতুর সাথে এর সম্পর্ক রয়েছে।

তিনি মনে করেন, করোনার লক্ষণগুলো শীতজনিত রোগের মতো। এটি মূলত শীতের একটি রোগ। এর অনেকগুলো স্ট্রেন আছে যা গ্রীষ্ম ও বর্ষার মৌসুমে বেঁচে থাকতে পারে। প্রাথমিক পর্যায়ে বিশেষজ্ঞরা ভেবেছিলেন গ্রীষ্মে ভাইরাসটি দুর্বল হয়ে যেতে পারে, তবে গরমকালেও এ ভাইরাস সংক্রমণের তীব্রভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় তাদের ধারণা ভুল প্রমাণিত হয়েছে।’

এমন অনেক ভাইরাস আছে যেগুলো মহামারির মতো ছড়িয়ে পড়তে পারে না, তবে বিভিন্ন ধরনের স্টেনসহ করোনাভাইরাস তাদের থেকে আলদা, বলেন ডা. বি-নাজির।

তিনি বলেন, করোনাভাইরাসের কিছু স্ট্রেন শীতকালে তীব্র ও মারাত্মক হয়ে উঠতে পারে। তাই, আমাদের এখনই পরিকল্পনা করা উচিত যাতে শীতকালে আমরা ভাইরাসকে কার্যকরভাবে মোকাবিলা করতে পারি।’

অধ্যাপক নজরুলের কথার সাথে মিলিয়ে বি-নাজির বলেন, বয়স্করা এবং যাদের দীর্ঘদিন ধরে শ্বাসকষ্টের সমস্যা রয়েছে তাদের জন্য শীতের আবহাওয়ায় এ ভাইরাসটি আরও মারাত্মক হতে পারে।

তিনি বলেন, সরকারের উচিত রেড জোনে লকডাউন কার্যকর করা এবং সংক্রমিত ব্যক্তিদের চিহ্নিত করে আইসোলেশনে পাঠানোর মাধ্যমে ভাইরাসের বিস্তারকে ধীর করা।

আইইডিসিআর -এর প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. আ স ম আলমগীর বলেন, আবহাওয়ার সাথে করোনাভাইরাসের সম্পর্ক রয়েছে তা এখনও প্রমাণিত না হলেও ঠান্ডা আবহাওয়ায় এ ভাইরাসের বেঁচে থাকার সময় বাড়তে পারে বলে ধরে নেয়া যায়।

তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশে অনেকে কোভিড-১৯ এর পরিবর্তে অন্য চারটি সাধারণ সর্দিজনিত সমস্যায় ভুগছেন যেগুলো স্ব-প্রতিরোধক ভাইরাস। তাই, যদি শীতকালে কোভিড-১৯ এবং অন্যান্য করোনাভাইরাসে আক্রান্তরা এক হয়ে যায় তবে পরিস্থিতি খুব খারাপ হতে পারে। যদিও এটি কেবলমাত্র অনুমান, তবে আমাদের সতর্ক থাকা উচিত।’

অধ্যাপক আলমগীর বলেন, ‘মানুষের সচেতনতা ও সহযোগিতা না থাকলে দেশ বিপজ্জনক এ মহামারি থেকে মুক্তি পাবে না। আমাদের দেশের মানুষকে এটি বুঝতে হবে যে ভাইরাসটি নিয়ন্ত্রণে রাখতে আমাদের কমপক্ষে ৬ মাস আরও নিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন করতে হবে। শীত ও করোনায় আক্রান্ত হওয়া থেকে বাঁচতে মানুষকে আরও বেশি সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।’