অনৈতিকতা অনিয়মের জঞ্জাল স্বাস্থ্য খাতে, সমাধানে করণীয়

আবু আহমেদ : অবহেলা, অনৈতিকতা ও অনিয়মের জঞ্জালে ভরে গেছে আমাদের স্বাস্থ্য খাত। এই পরিস্থিতিতে দেশের স্বাস্থ্য খাতের জন্য একটি স্বাধীন রেগুলেটরি কমিশন দরকার। বিভিন্ন দেশে এ ধরনের কমিশন আছে বিভিন্ন নামে। শুধু মন্ত্রণালয় দিয়ে আমাদের বিশাল স্বাস্থ্য খাত নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে না। সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক সেন্টার, চিকিৎসকদের চাকরি, স্বাস্থ্যসেবা ও ওষুধ ব্যবস্থাপনা—এই বিভাগগুলো ভালোভাবে চালাতে হলে শুধু মন্ত্রণালয় দিয়ে হবে না। দেখা যায়, কোনো একজন লাইসেন্স দেখেন, আরেকজন হাসপাতাল দেখেন, কেউ চিকিৎসকদের বিষয় দেখেন, কেউ নার্সিংয়ের দিকটা দেখেন—এভাবে একটা আমলাতান্ত্রিক পাকে পড়ে আছে আমাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা। একসময় স্বাস্থ্য খাত ছোট ছিল। তখন এ ধরনের ব্যবস্থাপনা সম্ভব ছিল। তখন কয়েকটা বেসরকারি হাসপাতাল ছিল এবং এত জটিলতাও ছিল না, এত সরকারি বরাদ্দও ছিল না।

বর্তমানে দেশে শুধু বেসরকারি খাতেই মেডিক্যাল কলেজের সংখ্যা কয়েক ডজন। আর বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক স্থাপন করা হয়েছে শত শত। বহুসংখ্যক চিকিৎসক তৈরি হচ্ছেন বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজগুলো থেকে। অনেক প্রতিষ্ঠানের নৈতিক মান ও চিকিৎসাসেবার মান—এগুলো দেখার জন্য আছে শুধু বিএমএ বা বিএমডিসি। এটা অনেক প্রাচীন এবং তাদের নিজস্ব সংগঠন। তারাই এর পারমিশন দেয়। কিন্তু তাদের কোনো সদস্য, কোনো চিকিৎসক যখন অকাজ করে বসেন অথবা পেশাদারি নৈতিকতা ভঙ্গ করেন, তখন কোনো শাস্তি দেওয়া হয় না। বিএমডিসি কাউকে শাস্তি দিয়েছে এমন কোনো উদাহরণ নেই বললেই চলে।

দেশে যে প্রক্রিয়ায় এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন, টেলিফোন রেগুলেটরি কমিশন আছে, সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন আছে, ঠিক একই প্রক্রিয়ায় স্বাস্থ্য খাতে আরেকটা কমিশন গঠন করা দরকার। এতে নন-প্র্যাকটিসিং ডাক্তারও চেয়ারম্যান হতে পারেন, ব্যুরোক্রেসি থেকে চেয়ারম্যান হতে পারেন, সমাজের গণ্যমান্য ব্যক্তিরাও চেয়ারম্যান ও সদস্য হতে পারেন। দরকার হচ্ছে কমিশনের জন্য একটি শক্তিশালী আইনের। এতে এখন কমিশনে চেয়ারম্যান কে হবেন, সদস্য কতজন হবেন, কারা সদস্য হবেন, তাঁদের ক্ষমতা কেমন থাকবে, কাজের আওতা কেমন হবে—এর সব কিছু উল্লেখ থাকবে নতুন আইনে।

দেশে প্রায়ই রোগীরা ভুল চিকিৎসায় মৃত্যুর অভিযোগ করেন। কোথাও চিকিৎসদের ওপর রোগীর স্বজনরা আক্রমণ করে, মামলাও করে। কিন্তু সেটা ভুল চিকিৎসা কি না, সাধারণ একজন লোক বলতে পারার কথা নয়। এটা বলার জন্য দরকার হচ্ছে বিশেষজ্ঞ বা এক্সপার্ট। যদি স্বাধীন কোনো প্রতিষ্ঠান থাকে, শুধু তারাই এটার পরীক্ষা করাবে। তারা দ্রুত পরীক্ষা করে ফায়সালা দিতে পারবে।

দেশে এখন আনাচকানাচে হাসপাতাল, ক্লিনিক হচ্ছে। কিন্তু জবাবদিহি নেই। স্বাধীন কমিশন থাকলে সবার মধ্যে এটা কাজ করবে যে এথিকস ও সেবার মান না থাকলে ধরা খেতে হবে। বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসার বিল বেশি ধরা হচ্ছে। মরা রোগীকেও আইসিইউতে রাখা হয় অর্থ আদায়ের জন্য। যত্রতত্র ডায়াগনস্টিক সেন্টার গড়ে উঠছে। তাদের যন্ত্রপাতি যথাযথ কি না, লোকবল প্রশিক্ষণধারী কি না—এগুলো যাচাই করার জন্য আমাদের পৃথক বা স্বাধীন কোনো সংস্থা নেই। এখানে যে আইসিইউতে মরা রোগী রাখল, কেউ কি তাকে গ্রেপ্তার করেছে? অথচ দেশে শেয়ারবাজারে যদি কোনো অনিয়ম হয়, বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ কমিশন ঝাঁপিয়ে পড়ে সেখানে। এক ব্রোকারকে তো গ্রেপ্তারও করেছে।

স্বাস্থ্য খাতের ওপর মানুষ অসম্ভব রকম বিরক্ত। তারা না পেরে হাসপাতালে যায়। এখানে ওষুধ কম্পানি, ডাক্তার, ডায়াগনস্টিক সেন্টার, হাসপাতাল মালিক মিলে একটা বেআইনি স্বার্থচক্র গড়ে উঠেছে। চিকিৎসকদের উপহার দেওয়া হচ্ছে, অর্থ দেওয়া হচ্ছে। বাংলাদেশে তো একটা মাল্টিন্যাশনাল ওষুধ কম্পানি চিকিৎসকদের ঘুষ দিতে পারে না বলে লোকসানের মুখে পড়ে বাংলাদেশ থেকেই বিদায় নিয়েছে। এটা দুঃখজনক, লজ্জাজনকও।

আমাদের এখানে চিকিৎসা নৈতিকতা অনেক নিম্ন পর্যায়ে চলে গেছে। অনেক চিকিৎসক ইচ্ছামতো ওষুধ লিখে দিচ্ছেন, অতি সহজেই অ্যান্টিবায়োটিক দিয়ে দেন। বিদেশে রোগীদের যদি দুটি ওষুধ দেন, সেখানে বাংলাদেশে দেওয়া হয় ছয়টা ওষুধ। ওষুধ নিয়ে রীতিমতো নৈরাজ্য চলছে। সরকারি হাসপাতালের ওষুধ বাইরে বিক্রি করে দেয় অনেকে। এসব অনিয়ম যারা দেখে, তাদের আন্তরিকতা ও সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন আছে।

বেসরকারি হাসপাতাল তো ইচ্ছামতো বিল করছে। বেসরকারি কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ে অতিরিক্ত ফি নিলে বাধা দেওয়ার জন্য ইউজিসি আছে। কিন্তু স্বাস্থ্য খাতে বাধাটা কে দেবে? করোনা আসার পর আমরা কী দেখলাম? রোগী যাচ্ছে, কিন্তু বেসরকারি হাসপাতাল বলছে আগে করোনা টেস্ট করিয়ে নিয়ে আসেন, পরে চিকিৎসা। তাহলে মানুষ রক্ষা পাবে কিভাবে? এর মধ্যে রোগী আরেক হাসপাতালে যেতে যেতে মরে যাচ্ছে। এসব ব্যাপারে কারো কোনো জবাবদিহি আছে?

পরিবার পরিকল্পনা খাতে কী হচ্ছে, তা নিয়ে কেউ গবেষণা, জরিপ করে না। কেউ জবাবদিহিও করে না। স্বাস্থ্য খাতে যে অর্থ খরচ হয়, জাতীয় অর্থনীতিতে এর ফলাফল কী? তা-ও আমরা জানি না। এ জন্য স্বাধীন কমিশনে স্বাস্থ্য অর্থনীতির বিষয়টিকেও সংযুক্ত করতে হবে।

বাংলাদেশে বাজেটের সময় এলেই স্বাস্থ্য খাত থেকে দাবি ওঠে আরো হাজার হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের। কিন্তু বাজেটে বরাদ্দ বাড়ানোটাই বড় কথা নয়, ব্যয়দক্ষতাও বাড়াতে হবে। আর দক্ষতা এমনিতেই আসে না। দক্ষতাটা আসে জবাবদিহি থেকে। যদি এমন স্বাধীনতা দেওয়া হয় যে আপনি বেতন-ভাতাও পাবেন, আবার ডায়াগনস্টিক সেন্টারের পরীক্ষার কমিশন এবং ওষুধ লেখার বিনিময়ে কমিশন পাবেন, আবার স্বাস্থ্য খাতের ঠিকাদারের কাছ থেকেও ৫০০ টাকার বিলকে পাঁচ হাজার টাকা করে সুবিধা নেবেন; তাহলে চিকিৎসাসেবা যথাযথ হবে না এটাই স্বাভাবিক।

প্রশ্ন আসতে পারে, অন্যান্য খাতের মতো স্বাস্থ্য খাতের কমিশন ঠিকমতো কাজ করবে কি না। কমিশন বেচাকেনা হয়ে যায়, এটাও অমূলক নয়। কিন্তু কমিশন যদি স্বাধীন হয়, তাহলে অনেক কাজই তারা করতে পারবে। যেমন শেয়ারবাজারের দুরবস্থা নিয়ে সিকিউরিটিজ এক্সচেঞ্জ কমিশনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলা যায়। কিন্তু এ রকম একটা কমিশন আছে বলেই তো মানুষ অভিযোগ জানাতে পারে। এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন আছে বলেই তো নিদেনপক্ষে শুনানিগুলো হয়। মানুষকে শুনানিতে ডাকা হয়। কিন্তু কোনো রোগীকে কি আজ পর্যন্ত কেউ শুনানিতে ডেকেছে?

স্বাস্থ্য খাতে জবাবদিহিমূলক ও নিয়ন্ত্রণ কমিশন গঠনের উদ্যোগ নিলে বহুমখুী বাধা আসবে। আবার যদি কমিশন গঠনের সিদ্ধান্ত হয়েই যায়, তখন এটি যেন কাঠামোগতভাবে দুর্বল থাকে, আইনগতভাবে দুর্বল থাকে—স্বার্থবাদী গোষ্ঠী সে চেষ্টাও করবে। বাস্তবতা হলো, বাধা আসবেই। সিকিউরিটিজ কমিশন গঠনের সময়ও বাধা এসেছিল। যত বাধাই আসুক, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী চাইলে স্বাস্থ্য খাতে এই কমিশন গঠন করা সম্ভব। তবে অন্য অনেক কমিশন গঠনের উদ্যোগের মতো স্বাস্থ্য কমিশন যেন বিদেশিদের পরামর্শে না হয়। আমাদের স্বাস্থ্যের সমস্যা সমাধানে আমাদেরই উদ্যোগ নিতে হবে। তবে উদ্যোগ নিলে বিদেশি অর্থায়ন পেতে কোনো সমস্যাও হওয়ার কথা নয়। আমাদের দরকার হচ্ছে পুরনো আইন বাদ দিয়ে নতুন এমন একটি কমিশন গঠন করা, যা স্বাস্থ্য খাতকে পরিচ্ছন্ন করতে পারে। তবে তা নির্ভর করবে কতটা স্বাধীন ও শক্তিশালী কমিশন গঠন করা হয় তার ওপর। না হলে হাজার হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েও স্বাস্থ্য খাতের উন্নতি হবে না।

 

লেখক : অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়