সাতক্ষীরায় গ্রেপ্তার সাহেদকে আনা হল ঢাকায়

 

নিউজ ডেস্ক : মহামারীর মধ্যে চিকিৎসার নামে প্রতারণা আর জালিয়াতির মামলায় এক সপ্তাহ ধরে পলাতক রিজেন্ট হাসপাতালের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সাহেদ ওরফে সাহেদ করিমকে সাতক্ষীরার দেবহাটা সীমান্ত থেকে গ্রেপ্তার করে ঢাকায় নিয়ে আসা হয়েছে।

বুধবার ভোর সাড়ে ৫টার দিকে দেবহাটা সীমান্তবর্তী কোমরপুর গ্রামের লবঙ্গবতী নদীর তীর থেকে একটি গুলিভর্তি পিস্তলসহ তাকে গ্রেপ্তার করা হয় বলে র‌্যাব-৬ এর সাতক্ষীরা ক্যাম্পের অধিনায়ক সিনিয়র এএসপি বজলুর রশিদ জানান।

র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল আশিক বিল্লাহ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “বোরকা পরে নৌকায় করে পাশের দেশে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টায় ছিলেন সাহেদ। আর কিছুক্ষণ দেরি হলে হয়ত তাকে আর পাওয়া যেত না।“

গ্রেপ্তারের পর একটি হেলিকপ্টারে করে সাহেদকে নিয়ে সকাল ৯টার দিকে ঢাকার পুরাতন বিমানবন্দরে পৌঁছান র‌্যাব সদস্যরা। পরে তাকে বিপুল নিরাপত্তার মধ্যে নিয়ে যাওয়া হয় উত্তরায় র‌্যাব সদরদপ্তরে।

সাহেদকে হেলিকপ্টার থেকে নামানোর পর এক সংক্ষিপ্ত সংবাদ সম্মেলনে র‌্যাবের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপারেশন) কর্নেল তোফায়েল মোস্তফা সারোয়ার বলেন, দালালের মাধ্যমে লবঙ্গবতী নদীর ইছামতিখাল দিয়ে সীমান্ত পার হওয়ার চেষ্টা করছিলেন রিজেন্ট হাসপাতালের চেয়ারম্যান।

“গোপন সংবাদের ভিত্তিতে রাত ২টা থেকে ওই এলাকসয় অভিযান শুরু করেন র‌্যাব সদস্যরা। কিন্তু সে ঘনঘন স্থান পরিবর্তন করায় গ্রেপ্তার করতে একটু সময় লেগেছে।”

বিতর্কিত ব্যবসায়ী সাহেদ এই সাতক্ষীরারই ছেলে। গত ৬ ও ৭ জুলাই উত্তরার রিজেন্ট হাসপাতাল এবং রিজেন্ট গ্রুপের প্রধান দপ্তরে র‌্যাবের অভিযানের পর থেকে তিনি লাপাত্তা ছিলেন।

কোভিড-১৯ পরীক্ষার প্রতিবেদন নিয়ে প্রতারণার অভিযোগ পাওয়ার পর ওই হাসপাতালে অভিযান চালায় র‌্যাব। জানা যায়, ‘কোভিড ডেডিকেটেড’ হাসপাতাল হিসেবে চিকিৎসা দিয়ে আসা এ চিকিৎসালয়ের লাইসেন্সের মেয়াদই পার হয়ে গেছে বহু আগে।

অভিযানে করোনাভাইরাস পরীক্ষার ভুয়া রিপোর্ট, করোনাভাইরাস চিকিৎসার নামে রোগীদের কাছ থেকে অর্থ আদায়সহ নানা অনিয়মের প্রমাণ পাওয়ার পর রিজেন্ট হাসপাতালের উত্তরা ও মিরপুর শাখা বন্ধ করে দেওয়া হয়।

র‌্যাবের ওই অভিযানের পর রিজেন্টের মালিক মোহাম্মদ সাহেদের নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির খবরও সংবাদমাধ্যমে আসতে শুরু করে। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সহসম্পাদক পরিচয়ে ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে কীভাবে তিনি নানা অপকর্ম চালিয়ে আসছিলেন, সেসব তথ্যও এখন গণমাধ্যমে আসছে।

রিজেন্ট হাসপাতালে অভিযানের পর ৭ জুলাই উত্তরা পশ্চিম থানায় প্রতারণার অভিযোগে সাহেদকে এক নম্বর আসামি করে ১৭ জনের বিরুদ্ধে মামলা করে র‌্যাব। সাহেদের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা দিয়ে তার ব্যাংক হিসাবও জব্দ করা হয়।

ওই মামলায় সে সময় মোট আটজনকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে সাহেদসহ ৯ জনকে পলাতক দেখানো হয়েছিল। তাদের মধ্যে সাহেদের অন্যতম সহযোগী, রিজেন্ট গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসুদ পারভেজকে মঙ্গলবার বিকালে গাজীপুরের কাপাসিয়া থেকে গ্রেপ্তার করা হয়।

মামলাটির তদন্তভার মঙ্গলবার গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) হাতে দেওয়া হলেও র‌্যাব ওই দায়িত্ব নেওয়ার জন্য নিয়ম অনুযায়ী স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেছে বলে আশিক বিল্লাহ জানান।

কে এই সাহেদ

সাতক্ষীরার ছেলে সাহেদ স্কুলের শেষ দিকের ছাত্র থাকা অবস্থায় ঢাকায় চলে আসেন। তার মা সুফিয়া করিম এক সময় মহিলা আওয়ামী লীগের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। বাবা সিরাজুল করিম ছিলেন ব্যবসায়ী। শহরের কামালনগরে করিম সুপার মার্কেট নামে একটি বিপণি বিতান ছিল তাদের।

সাহেদের মা মারা যাওয়ার পর তার বাবা ওই মার্কেট বিক্রি করে স্থায়ীভাবে সাতক্ষীরা ছেড়ে ঢাকা চলে আসেন। তবে সাহেদ মাঝে মাঝে সাতক্ষীরায় যেতেন।

২০০৯ সালে প্রতারণার অভিযোগে গ্রেপ্তার হওয়া সাহেদ দুই বছরের মাথায় ধানমণ্ডিতে এমএলএম ব্যবসা শুরু করে বহু লোকের টাকা মেরে দেন বলে অভিযোগ আছে। পরে তিনি প্রভাবশালীদের সঙ্গে সখ্য গড়ে তুলে প্রতিষ্ঠা করেন রিজেন্ট গ্রুপ। হাসপাতালে ছাড়াও কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, আবাসন, হোটেল ব্যবসা রয়েছে এ গ্রুপের।

বেশ কয়েক বছর আগে আওয়ামী লীগের বিভিন্ন প্রভাবশালী নেতাদের বাসায় যাওয়া আসা শুরু করেন সাহেদ। এর মধ্যে বিভিন্ন টেলিভিশনের টক শোতে দেখা যেতে থাকে তাকে। অনেক সাংবাদিকের সঙ্গেও ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়।

২০১৬ সালে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় আন্তর্জাতিক বিষয়ক উপ কমিটির সদস্য হওয়ার মধ্য দিয়ে সরাসরি তিনি রাজনীতিতে যুক্ত হয়ে যান।

সরকারের মন্ত্রী, এমপি, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তা এবং সরকারি আমলাসহ গুরুত্বপূর্ণ বহু ব্যক্তির সঙ্গে তোলা অসংখ্য সেলফি নিজের ফেইসবুক পেইজে দিয়ে রেখেছেন সাহেদ। এর মধ্যে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠানে ‘ভিআইপিদের’ মধ্যে তার উপস্থিতির ছবিও আছে। 

র‌্যাবের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, এমএলএম ব্যবসা খুলে গ্রাহকদের টাকা আত্মসাৎ, চাকরির নামে অর্থ নেওয়া, ভুয়া নাম-ঠিকানা ব্যবহার করে কো-অপারেটিভ থেকে অর্থ আত্মসাৎ, ব্ল্যাকমেইলসহ নানা অভিযোগে ৩০টির বেশি মামলা রয়েছে সাহেদের বিরুদ্ধে।

তার প্রতারণার শিকার হওয়া অনেকেই এখন কথা বলতে শুরু করেছেন। অটোরিকশার রুট পারমিটের কথা বলে এক ব্যবসায়ীর কাছ থেকে ৯১ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগে চট্টগ্রামে নতুন একটি মামলা হয়েছে সাহেদের বিরুদ্ধে। 

আর কোভিড-১৯ পরীক্ষার নামে জালিয়াতির অভিযোগে রাজধানীর উত্তরা পশ্চিম থানায় দায়ের করা র‌্যাবের মামলায় বলা হয়েছে, ভুয়া প্রতিবেদন দিয়ে প্রায় ছয় হাজার লোকের কাছ থেকে দুই কোটি ১০ লাখ টাকা আদায় করেছে রিজেন্ট।

যদিও এক্ষেত্রে রোগীর কাছ থেকে কোনো টাকা তাদের নেওয়ার কথা নয়, কারণ সেসব পরীক্ষা সরকারি পরীক্ষাগারে হওয়ার কথা।

এছাড়া সরকারের সঙ্গে করা চুক্তি ভেঙে রিজেন্ট করোনাভাইরাস চিকিৎসার জন্য রোগীদের কাছ থেকে অর্থ নিয়েছে, আবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরেও এক কোটি ৯৬ লাখ টাকার একটি বিল জমা দিয়েছে বলে জানানো হয় এজাহারে।

সেখানে বলা হয়, “রিজেন্ট হাসপাতালের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সাহেদ নিজেকে ক্লিন ইমেজের ব্যক্তি বলে দাবি করলেও প্রকৃতপক্ষে সে একজন ধুরন্ধর, অর্থলিপ্সু ও পাষণ্ড।”