নগদ সহায়তা কর্মসূচিতে জালিয়াতি, অনিয়ম ভুলে ভরা, সংশোধন হচ্ছে

আবু কাওসার:    সরকারের নগদ সহায়তা কর্মসূচিতে নানা অনিয়ম ও জালিয়াতির ঘটনা ধরা পড়েছে। এ কর্মসূচির আওতায় অনেক ‘অযোগ্য লোক’ সুবিধা পেয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। করোনাকালে ৫০ লাখ কর্মহীন গরিব পরিবারের জন্য এককালীন নগদ দুই হাজার পাঁচশ’ টাকা করে বিতরণের এ কর্মসূচিতে বরাদ্দ পাওয়া ব্যক্তি নিজেই জানে না তালিকায় কী করে তার নাম এলো। ভুল ও নানা অসঙ্গতিতে ভরা ওই তালিকায় একই ব্যক্তি অন্যান্য সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় সুবিধা পান। মাঠপর্যায়ে স্থানীয় প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের তৈরি করা ওই তালিকায় ঢুকে পড়েছে সরকারি চাকরিজীবী, সঞ্চয়পত্রের মালিক ও পেনশনভোগীদের মতো সামর্থ্যবানরা। এভাবে গরিবের টাকা মেরে খাওয়ার নানা অপকর্ম ও দুর্নীতির আশ্রয় নেওয়া হয় এতে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে এ অনিয়মের চিত্র উঠে এসেছে। মাঠ প্রশাসনের তালিকা নিয়ে অভিযোগ ওঠার পরিপ্রেক্ষিতে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ এ বিষয়ে তদন্তে নামে। এ অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে তালিকাটি ফের সংশোধন করা হচ্ছে। অর্থ এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রায় ২৮ লাখ মানুষের তথ্যে গরমিল ধরা পড়েছে। ত্রাণ সচিব মো. মহসিন বলেন, নগদ সহায়তা পাওয়ার জন্য তালিকাটি করেছে মাঠ পর্যায়ের জনপ্রতিনিধি, জেলা ও উপজেলার স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তারা। কেন্দ্রীয়ভাবে এটা হয়নি। তারা কীভাবে করেছে তা জানা নেই। তিনি বলেন, কিছু অনিয়ম হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে তথ্যের গরমিল রয়েছে। সে জন্য তালিকাটি সংশোধন করা হচ্ছে। আশা করছি, কোরবানি ঈদের আগেই তালিকা সংশোধনের কাজ শেষ হবে এবং সবার কাছে টাকা পৌঁছে যাবে। যোগ্যরা যাতে সুবিধা পান সেজন্য ডাটা ব্যাংক গড়ে তোলা হচ্ছে বলে জানান তিনি।

সচিব আরও জানান, যার অ্যাকাউন্ট নেই তার নামে অ্যাকাউন্ট খুলে টাকা পাঠানো হবে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, আমরা বলে দিয়েছি যোগ্য লোকদের টাকা দিতে হবে।

এ বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। তা না হলে পরবর্তীতে আর টাকা ছাড় করা হবে না।

করোনাকালে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে খেটে খাওয়া মানুষ। তাদের সহায়তা করতে প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, যা গত ১৪ মে আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হয়। এ কর্মসূচির আওতায় সারাদেশের ৫০ লাখ পরিবারকে নগদ আড়াই হাজার টাকা বিতরণের নীতিগত সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। এতে সরকারের ব্যয় প্রাক্কলন করা হয় এক হাজার ২৫০ কোটি টাকা। তালিকা তৈরির দায়িত্ব দেওয়া হয় জেলা-উপজেলা প্রশাসন ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের।

অর্থনীতিবিদরা বলেছেন, খাদ্য বিতরণের নানা অনিয়মের ঘটনা অনেক ঘটেছে। কিন্তু নগদ টাকা দেওয়ার ক্ষেত্রেও যে এমন হবে তা ভাবা যায় না। তারা আরও বলেন, সরকারকে মনে রাখতে হবে, এই টাকা জনগণের করের টাকা। এখানে স্বচ্ছতা আনা জরুরি।

অর্থ বিতরণ শুরু হওয়ার পর থেকে দেখা যায়, পুরো তালিকাটি ত্রুটিপূর্ণ ও নানা অসঙ্গতি রয়েছে। অর্থাৎ যারা টাকা পাওয়ার যোগ্য তাদের বদলে তালিকায় ঢুকে পড়েছে তুলনামূলক সচ্ছল ব্যক্তিরা। অথচ এ টাকা পাওয়ার কথা রিকশাচালক, ভ্যানচালক, দিনমজুর, নির্মাণ শ্রমিক, কৃষি শ্রমিক, দোকানের কর্মচারী, ব্যক্তি উদ্যোগে পরিচালিত বিভিন্ন ব্যবসায় কর্মরত শ্রমিক। এ ছাড়া বাস-ট্রাকের পরিবহন শ্রমিক, হকারসহ নানা পেশায় যুক্ত গরিব মানুষের এই টাকা পাওয়ার কথা।

ঢাকা জেলা প্রশাসক শহিদুল ইসলাম বলেন, তালিকাতে কিছু অসঙ্গতি রয়েছে। এগুলো চিহ্নিত করে আইসিটি বিভাগ থেকে সংশোধন করতে বলা হয়েছে। আমরা কাজ শুরু করেছি। শিগগির তা সম্পন্ন হবে বলে জানান তিনি।

প্রতিবেদনে দেখা যায়, আলোচ্য কর্মসূচির আওতায় এ পর্যন্ত ১৭ লাখ পরিবার সহায়তা পেয়েছে। আরও সোয়া দুই লাখ পাবে বলে প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। তথ্য যাচাই করে তালিকা থেকে প্রায় পাঁচ লাখ পুরোপুরি বাদ দিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়। এদের মধ্যে তিন হাজারের মতো সরকারি কর্মচারী ও সাত হাজার পেনশনভোগী রয়েছেন। ৫ লাখ টাকার বেশি সঞ্চয়পত্র আছে এমন ৫৬০ জনের নাম আছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, তালিকায় এক লাখের বেশি লোক আছে, যারা অন্যান্য সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি থেকেও সুবিধা পাচ্ছে। এ ছাড়া প্রায় তিন হাজার ব্যক্তি আছে, যাদের নাম রয়েছে একাধিকবার। প্রায় ২৮ লাখের তথ্য নানা অসঙ্গতি ও ভুলে ভরা। সাড়ে আট লাখ ব্যক্তির জাতীয় পরিচয়পত্রের বিপরীতে মোবাইল ফোনের নম্বর নেই।

সূত্র:  সমকাল