লঞ্চ দুর্ঘটনা : দুর্বল আইন, দোদুল্যমান প্রয়োগ

ড. মো. হাসিবুল আলম প্রধান:   করোনা দুর্যোগের মাঝেই গত ২৯ জুন বুড়িগঙ্গায় লঞ্চ দুর্ঘটনায় আবারও ঝরে পড়ল ৩৪টি তাজা প্রাণ। এটা নিছক ‘দুর্ঘটনা’ নয়- বৃহদাকার ময়ূর-২ লঞ্চ ক্ষুদ্রাকার মর্নিং বার্ডকে ধাক্কা দিয়ে ডুবিয়ে দিয়েছে। নৌ পরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরীও বলেছেন- সিসিটিভির ফুটেজ দেখে মনে হচ্ছে এটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। ঘটনার পর অন্যবারের মতো তদন্ত কমিটি গঠিত হয়েছে। এ ছাড়া ‘অবহেলাজনিত মৃত্যু’ ঘটানোর অভিযোগ এনে ময়ূর-২ লঞ্চের মালিক, মাস্টারসহ সাতজনের বিরুদ্ধে মামলা করেছে নৌ পুলিশ। ইতোমধ্যে লঞ্চটির মালিকও আটক হয়েছে। তবে শাস্তি হবে কি দুর্ঘটনায় জড়িতদের? অতীতে এ ধরনের অনেক নৌ দুর্ঘটনা ও অসংখ্য প্রাণহানি ঘটলেও তেমন কোনো বিচার হয়নি।

এবার অবশ্য তদন্ত প্রতিবেদন জমা হয়েছে। প্রকাশিত প্রতিবেদনের তথ্যমতে, এই লঞ্চ দুর্ঘটনায় প্রাণহানির পেছনে ৯টি কারণ চিহ্নিত করে ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা এড়াতে ২০ দফা সুপারিশ করেছে নৌ মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটি। তবে ময়ূর-২ লঞ্চের ধাক্কায় এমএল মর্নিং বার্ড বুড়িগঙ্গায় ডুবে যাওয়ার ওই ঘটনা তদন্ত করে তদন্ত কমিটি কার কী দায় পেয়েছে, তা প্রকাশ করা হয়নি।

বাংলাদেশে প্রতিবছর বড় বড় লঞ্চ দুর্ঘটনা সংঘটিত হচ্ছে, মারাও যাচ্ছে অনেক মানুষ। গত ২০ বছরে প্রায় ৭০০ লঞ্চডুবি ও ২০ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে। কিন্তু সড়ক দুর্ঘটনার মতো লঞ্চ দুর্ঘটনার ক্ষেত্রেও জড়িতদের শাস্তি না প্রদানের সংস্কৃতি লক্ষণীয়। ধারণ ক্ষমতার অতিরিক্ত যাত্রী বহন, চালকদের অদক্ষতা ও অনভিজ্ঞতা, লঞ্চের নকশায় সমস্যা, লঞ্চের ফিটনেস তদারকির অভাব ইত্যাদি কারণে লঞ্চ দুর্ঘটনা ঘটে থাকে। আর এসব বিষয় নিয়ে কথা ওঠে কেবল তখনই, যখন কোনো লঞ্চডুবিতে শত শত মানুষের মৃত্যু ঘটে। অন্য সময় এ বিষয়গুলো দেখভাল করার কেউ থাকে না।

বাংলাদেশে ছোট-বড় মিলিয়ে ৩০ হাজারেরও বেশি নৌযান রয়েছে, যার মধ্যে ফিটনেস সার্টিফিকেট রয়েছে মাত্র ৯ হাজারের। সরকারি হিসাবেই বাংলাদেশের মানুষের ৩৫ ভাগ যাতায়াতই সম্পন্ন হয় নৌপথে। কিন্তু লঞ্চ দুর্ঘটনা প্রতিরোধের লক্ষ্যে এ দেশে পর্যাপ্ত আধুনিক আইন-কানুন নেই। লঞ্চ দুর্ঘটনার পর দোষী সাব্যস্ত হলে বর্তমান প্রচলিত আইনে মালিক, চালক কিংবা জরিপকারীর বিরুদ্ধে কিছু আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান রয়েছে। যদিও এ ধরনের আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার নজির খুবই কম এবং শাস্তির মাত্রাও হাস্যকর।

২০০৫ সালে আনা সংশোধনীর পর অভ্যন্তরীণ নৌ চলাচল অধ্যাদেশ, ১৯৭৬ (ইনল্যান্ড শিপিং অর্ডিন্যান্স) অনুযায়ী অধ্যাদেশের ৭০ ধারায় অসদাচরণ ইত্যাদি কারণে জাহাজ বিপদাপন্ন করার শাস্তি বিষয়ে বর্ণনা রয়েছে। ধারাটির (২) অনুসারে ‘যেখানে কোনো অভ্যন্তরীণ নৌযান দুর্ঘটনার ফলে প্রাণহানি বা কোনো ব্যক্তি আহত বা নৌযান বা অন্য কোনো নৌযানের সম্পদ নষ্ট হয়ে থাকে এবং এ ধরনের কোনো নৌযানের ত্রুটি বা অভ্যন্তরীণ নৌযানের মালিক, মাস্টার বা কোনো কর্মকর্তা বা ক্রু সদস্যের অযোগ্যতা বা অসদাচরণ বা কোনো আইন ভঙ্গের দরুন ঘটে থাকে, তবে ওই নৌযানের মালিক বা অন্য কোনো কর্মকর্তা বা ক্রু সদস্য বা তাদের প্রত্যেকেই পাঁচ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড বা এক লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানা কিংবা উভয় দণ্ডেই দণ্ডিত হতে পারেন।’ এটাই হচ্ছে এই অধ্যাদেশের মধ্যে সর্বোচ্চ শাস্তি। লঞ্চ দুর্ঘটনার মামলাগুলো সাধারণত নৌ আদালতে দায়ের করা হলেও ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি ও পুলিশ দেওয়ানি ও ফৌজদারি আইনেও মামলা করতে পারে। ফিটনেস ছাড়া লঞ্চ চলবে না- এটা আইন। কিন্তু দেখা যায়, সব লঞ্চই ফিটনেস সার্টিফিকেট সংগ্রহ করে। অভিযোগ রয়েছে, দুর্নীতির মাধ্যমে লঞ্চ মালিকরা কোনো না কোনোভাবে ফিটনেস সনদ বা একটি টোকেন নিয়ে নেয়।

লঞ্চ দুর্ঘটনায় অপরাধীদের যেমন শাস্তি হয় না, তেমনি প্রচলিত আইনের সীমাবদ্ধতার কারণে সবচেয়ে বঞ্চিত হয় ভিকটিমরা। কোনো ধরনের ক্ষতিপূরণ পায় না বললেই চলে। দুর্ঘটনার পর যে ক্ষতিপূরণের ঘোষণা দেওয়া হয়, তা খুবই অপ্রতুল। উপরন্তু সেই টাকা কতজন পায় তা নিয়েও রয়েছে নানা প্রশ্ন। ভিকটিমদের ক্ষতিপূরণ আদায়ের জন্য বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি মামলা নাসরিন-১ লঞ্চ দুর্ঘটনার পর ফাইল করা হয়েছিল মানবাধিকার সংস্থা ব্লাস্টের পক্ষ থেকে। ২০০৩ সালের ৮ জুলাই এমভি নাসরিন-১ লঞ্চ ডুবে গেলে ২০০৪ সালে ব্লাস্ট প্রদেয় ক্ষতিপূরণ পর্যাপ্ত নয় দাবি করে ক্ষতিগ্রস্তদের পক্ষে ঢাকার তৃতীয় যুগ্ম জেলা জজ আদালতে মামলা দায়ের করে। ওই মামলায় ১২১ জনের মৃত্যুর কথা উল্লেখ করে ২৮ দশমিক ৯৩ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ দাবি করা হয়।

২০১২ সালে মামলাটি ঢাকার সপ্তম যুগ্ম জেলা জজ আদালতে পাঠানো হয় এবং ২০১৬ সালের ২ ফেব্রুয়ারি মাননীয় আদালত রায়ে ভিকটিমদের ১৭ দশমিক ১১ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ হিসেবে প্রদানের নির্দেশ দেন। ২০১৬ সালের ২৪ অক্টোবর বিআইডব্লিউটিএ এবং বিবাদীরা ওই রায়ের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে আপিল করে। ২০১৭ সালের ৫ জানুয়ারি হাইকোর্ট বিভাগ নিম্ন আদালতের রায় বহাল রেখে ২০০৩ সালে সংঘটিত এমভি নাসরিন-১ লঞ্চের দুর্ঘটনায় মৃত ব্যক্তিদের পরিবারকে এবং আহতদের ১৭ দশমিক ১১ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ হিসেবে প্রদানের জন্য সরকারকে নির্দেশ দেন। পরে বিবাদীরা সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে আপিল করলে মামলাটি এখন চূড়ান্ত নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে। মামলাটি চূড়ান্তভাবে নিষ্পত্তি হলে এবং ভিকটিমরা ন্যায্য ক্ষতিপূরণ পেলে এটি আইনের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ নজির হয়ে থাকত এবং সরকার ভবিষ্যতে লঞ্চ দুর্ঘটনায় দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হতো।

লঞ্চ দুর্ঘটনায় প্রতিবছর শত শত মানুষের মৃত্যু বন্ধ করতে হলে প্রথমেই কঠোর শাস্তির বিধান করা উচিত। এ জন্য সর্বপ্রথম অভ্যন্তরীণ নৌ চলাচল অধ্যাদেশ, ১৯৭৬ (ইনল্যান্ড শিপিং অর্ডিন্যান্স) এর সংশোধন এবং আধুনিকায়ন করতে হবে। ২০০৫ সালে সংশোধনী আনার পর আর এ অধ্যাদেশটিতে হাত দেওয়া হয়নি। সেই সঙ্গে সঠিক নকশা অনুযায়ী লঞ্চ নির্মাণ, লঞ্চের ফিটনেস নিয়মিত তদারকি ও চালক-সহযোগীদের দক্ষতা-অভিজ্ঞতা নিশ্চিত করতে এই পুরো খাতটির ওপর কড়া নজরদারির ব্যবস্থা অবশ্যই করতে হবে। লঞ্চ দুর্ঘটনার পর যে তদন্ত কমিটিগুলো হয়, সেগুলোর প্রতিবেদন প্রকাশ্যে আনতে হবে এবং সরকারকে সুপারিশমালাগুলো যথাযথভাবে কার্যকর করতে হবে।

নদীপথে আর কোনো লঞ্চ দুর্ঘটনা নয়, লঞ্চ দুর্ঘটনায় বন্ধ হোক মানুষের মৃত্যুর মিছিল। আমাদের নদীমাতৃক সবুজ-শ্যামল এই বাংলাদেশের মানুষ নির্ভয়ে নিরাপদে যেন নৌপথে চলাচল করতে পারে।

অধ্যাপক, আইন বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
hprodhan@yahoo.com