কলকাতার বস্তিতে কম সংক্রমণকে বিস্ময়কর মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা

নিউজ ডেস্ক:   কলকাতাসহ পশ্চিমবঙ্গের কনটেইনমেন্ট এলাকাগুলোতে করোনাভাইরাস আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছেই। করোনার সংক্রমণ বহুতল ভবন বা ফ্ল্যাটবাড়িতে বেশি। তবে আশ্চর্যজনকভাবে বস্তি এলাকায় করোনা আক্রান্তের হার খুবই কম।

কলকাতা পৌর করপোরেশন বলছে, মাত্র ৫টি বস্তি এলাকায় করোনার সংক্রমণ ঘটছে। আর শহরের অধিকাংশ করোনা আক্রান্তই পাকা বাড়ি বা ফ্ল্যাট বাড়ি অথবা বহুতল আবাসনগুলোর বাসিন্দা। এসব অঞ্চলে করোনার সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ায় বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) বিকেল থেকে আবারও লকডাউন শুরু হয়েছে।

কলকাতা পৌর করপোরেশনের স্বাস্থ্য বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রশাসক বোর্ডের সদস্য অতীন ঘোষ বলেন, আমরা ডোর-টু-ডোর যে জরিপ চালাচ্ছি, তা থেকে দেখা যাচ্ছে করোনা আক্রান্তদের মধ্যে ৮৫ শতাংশ পাকা বাড়ি, ফ্ল্যাটবাড়ি বা বহুতল ভবনের বাসিন্দা। অন্যদিকে মাত্র ১৫ শতাংশ বস্তি এলাকার মানুষ। বস্তি এলাকায় একজন করোনা রোগী পাওয়া গেলে তার দুই তিন মাসের মধ্যে নতুন রোগী পাওয়া যাচ্ছে না। অন্যদিকে পাকা বাড়ি বা বহুতল ভবনে একজন রোগী পাওয়ার পর তা দ্রুত অন্যদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়তে দেখা যাচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, বস্তিবাসীরা এসব ক্ষেত্রে বেশি সতর্ক বলেই তারা অতীতেও দেখেছেন। দীর্ঘদিন করপোরেশনের স্বাস্থ্য বিভাগের দায়িত্বে আছেন তিনি। এর আগে ডেঙ্গুর সময়ও দেখেছেন, বস্তিবাসীরা যতটা সতর্ক থাকেন, নিয়ম নির্দেশগুলো যতটা কঠোরভাবে পালন করেন, স্বাস্থ্যকর্মীদের সহযোগিতা করেন, সেটা বহুতল আবাসন বা ফ্ল্যাটবাড়ি বা পাকা বাড়ির বাসিন্দাদের কাছ থেকে পাওয়া যায় না। করোনার ক্ষেত্রেও তাই ঘটছে।

অতীন ঘোষ বলেন, বস্তিবাসীদের মধ্যে করোনা রোগী পাওয়া গেলেই আমরা তাদের চিহ্নিত করে হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছি। রোগীদের সংস্পর্শে যারা এসেছেন, তাদের আমরা কোয়ারেন্টাইন সেন্টারে নিয়ে যাচ্ছি। অন্যদিকে যারা পাকা বাড়ি বা ফ্ল্যাটবাড়িতে থাকেন, তাদের মধ্যে করোনা রোগী পাওয়া গেলে হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকতে চান। বাড়িতে থাকলেও যে কড়া নিয়মের মধ্যে থাকা উচিত, সেগুলো তারা মানছেন না। পাকা বাড়ি বা ফ্ল্যাটবাড়ির মধ্যে রোগী থাকা সত্ত্বেও তারা মাস্ক ছাড়াই থাকছেন এবং এর থেকেই এই শ্রেণির মানুষের মধ্যে বেশি করোনা ছড়াচ্ছে।

তবে মহামারি ও ভাইরাস বিশেষজ্ঞরা এ তথ্যকে বিস্ময়কর বলে মনে করছেন। কারণ বস্তির বাসিন্দারা সাধারণত ছোট ঘরে অনেক মানুষ একসঙ্গে থাকেন। তারা সাধারণ বাথরুম ব্যবহার করেন। তাই সংক্রমণ তাদের মধ্যে ছড়ানোর আশঙ্কাই বেশি। উল্টোদিকে পাকা বাড়ি বা ফ্ল্যাটবাড়ির বাসিন্দাদের পরিচ্ছন্নভাবে বসবাসের সুযোগ থাকে।

এ বিষয়ে মহামারি ও ভাইরাস বিশেষজ্ঞ ডা. অমিতাভ নন্দী বলেন, বসতবাড়ি আর বস্তির মানুষদের মধ্যে করোনা পরীক্ষা কী সংখ্যায় হয়েছে, সেটার তুলনা দরকার। এই তথ্য কি কোনো বিজ্ঞানভিত্তিক সমীক্ষা করে পাওয়া গেছে? আমার তো মনে হয় না! আর যদি তথ্যটা আমরা ফেসভ্যালুতেও নিই, তারা যেটা বলছেন, সেটাই বিশ্লেষণ করি, তাহলেও কতগুলো প্রশ্ন থাকে। বস্তিবাসী আর বহুতল আবাসন বা পাকা বাড়িতে মোট কতজনের পরীক্ষা করা হচ্ছে? আর তার মধ্যে কত শতাংশ বস্তির মানুষ আর বহুতল ভবনের বাসিন্দার শরীরে করোনাভাইরাস পাওয়া যাচ্ছে, সেটার তুলনা করা যেতে পারে।

Kolkata-1.jpg

তিনি আরও বলেন, দুই শ্রেণির মানুষদের মধ্যে সমপরিমাণ পরীক্ষা করালে তবেই এ ধরনের তুলনা করা চলে। এরকম বিশ্লেষণ একেবারেই অবৈজ্ঞানিক। কারণ বস্তিতে একটা ঘরে ৫ থেকে ৭ বা দশ জন পর্যন্ত থাকেন, যেখানে ফ্ল্যাটবাড়ি বা আবাসনে হয়তো একজনের জন্য একটা করে ঘর বরাদ্দ থাকে।

ডা. নন্দী বলেন, উচ্চবিত্ত বা মধ্যবিত্তদের মধ্যে যেহেতু সচেতনতা বেশি, তাই তারা নিজের উদ্যোগেই পরীক্ষা করাতে আসছেন। অন্যদিকে জ্বর বা কাশি যেগুলো করোনার উপসর্গ, সেগুলো থাকা সত্ত্বেও বস্তিবাসী বা নিম্ন আয়ের মানুষ নিজেরাই ওষুধ খেয়ে নিচ্ছেন।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও ইন্ডিয়ান পাবলিক হেলথ অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব ডা. সঙ্ঘমিত্রা ঘোষ বলেন, কোন শ্রেণির মানুষের কতটা করোনা পরীক্ষা করা হয়েছে, সেটা যেমন তুলনা করা দরকার, তেমনই এই বিচারটাও করা দরকার যে বসতবাড়ি আর বস্তিবাসী- এই দুই শ্রেণির মানুষ কে কতটা টাকা দিয়ে নিজে থেকেই করোনা পরীক্ষা করাতে পারছেন। এটা দেখা দরকার যেকোনো শ্রেণির মানুষের স্বাস্থ্য পরিষেবা নেয়ার আর্থিক ক্ষমতা আছে। বস্তিবাসী আর পাকা বাড়ি বা আবাসনের বাসিন্দাদের মধ্যে কার কতটা পরীক্ষা করানো হচ্ছে, বা কারা নিজেরাই পরীক্ষা করাতে সক্ষম সেটাও বিচার করতে হবে।

ডা. সঙ্ঘমিত্রা ঘোষ অভিযোগ করে বলেন, এই মহামারির সময়ে অনেকবারই আমরা এ ধরনের অবৈজ্ঞানিক মন্তব্য বা তথ্য সামনে আসতে দেখেছি। এই জন্যই এক অদ্ভুতভাবে মহামারি মোকাবিলা করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, এরকম একটা তথ্য যদি দেয়া হয় যে, বস্তিবাসীদের মধ্যে করোনার সংক্রমণ কম হচ্ছে, তাহলে তাদের মধ্যে করোনা ছড়াবে না বলে একটা ভ্রান্ত ধারণা তৈরি হবে। এর ফলে তাদের মধ্যে সতর্ক হওয়ার মানসিকতাও কমে যাবে। আর এটা বিপজ্জনক হয়ে উঠবে।

সূত্র : বিবিসি বাংলা