পাট সোনালী আশঁ, আত্মঘাতী সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান

লতিফুল বারী হামিম:   পাট সোনালী আশঁ অর্থকরী ফসল। পাট বস্ত্রসহ বিভিন্ন শিল্পের কাচামাল হিসাবে ব্যবহূত হয়ে আসছে । সোনালী আশঁকে তথা পাটকলকে গলার ফাঁস মনে করছে সরকার। পাঁচ হাজার কোটি টাকার বিনিময় গলার ফাঁসি থেকে রক্ষা পেতে চাইছে । মন্ত্রদাতারা হয়ত জানে না এ শিল্পের সাথে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভাবে কত কোটি মানুষ জড়িত । অবস্হা দৃষ্টে মনে হচ্ছে সরকার মাথা ব্যাথা থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য মাথা কেটে ফেলার পরার্মশ গ্রহন করেছে ।

সরকারের আমলা, ব্যবসায়ী মন্ত্রী, সাংসদ তথা রাজনীতিবিদরা এ শিল্পকে লোকসানী খাত হিসাবে চিন্হিত করতেই মহাব্যাস্ত । মুক্তিযুদ্ধের মধ্যদিয়ে অর্জিত স্বাধীনতার সুফল রাষ্ট্রায়ত্ব পাটকল গুলিকে মুষ্টিমেয় লুটেরাদের হাতে তোলে দেওয়া নিয়ে সরকার ব্যাস্ত । কর্তাব্যক্তিদের মনে রাখা উচিত পাকিস্হান আমল ও স্বাধীন বাংলাদেশের বৈদেশিক মূদ্রা অর্জনের প্রধান ফসল ছিল পাট । পূর্ব-পাকিস্হানের বৈদেশিক মূদ্রা লুট, পাচার করেই পাকিস্হানীরা পশ্চিম ভূ-খন্ডের উন্নয়ন ঘটিয়েছিল । এখনো বাংলাদেশের বকেয়া পাওনা পাকিস্হানীরা পরিশোধ করেনি ।

পাটকলের লোকসানের দায় বিজেএমসির মাথাভারী দূনীতিবাজ প্রসাশনের মানসকিতার, বিভিন্ন সময় সরকারে থাকা রাজনৈতিক দলের শ্রমিক সংগঠন সমূহের হাতে গোনা কয়েক জন দূরনীতিবাজ শ্রমিকনেতার । কাঁচা পাট কেনায় অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতি। সাধারন শ্রমিক এ লোকসানের জন্য দায়ী নয়।  বিগত পাটমন্ত্রীর সময় পাটকমিশন গঠন করে পাটকল লাভের মুখ দেখল কিন্তু সরকারের এত উন্নয়নের মাঝে হঠাৎ কি ঘটলো উপর মহলে । জনগনকে লকডাউনে রেখে বিরাষ্ট্রীয়করনে কেন এত তারাহুরা ।  পাটচাষীদের পক্ষে ক্ষমতাসীনরাও এক সময় কথা বলত, কৃষকদে র স্বার্থে আন্দোলন সংগ্রাম করেছে কিন্তু এখন অনিহা কেন। কাচাপাট পাচার হলে ক্ষমতাসীনরা বেশী খুশি হবেন ।

বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন বিজেএমসির আওতায় ২৬টি পাটকলের মধ্যে বর্তমানে চালু আছে ২৫টি। পাটকলগুলোতে বর্তমানে স্থায়ী শ্রমিক আছেন ২৪ হাজার ৮৫৫ জন। এ ছাড়া তালিকাভুক্ত বদলি ও দৈনিক ভিত্তিক শ্রমিকের সংখ্যা প্রায় ২৬ হাজার। এ খাত সংশ্লিষ্টদের অভিমত, প্রায় এক হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করে পাটকল গুলোর যন্ত্রপাতি আধুনিকায়ন করলেই উৎপাদন তিন গুণ বৃদ্ধি পাবে। এর মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুর জাতীয়করনকৃত সকল জুটমিল পুজিপতিদের হাতে তোলে দেওয়ার পালা সাংগ হলো। সরকারের রাজমুকুটে যুক্ত হলো আরো একটি ব্যার্থতার পলক।

অন্যান্য শিল্প কারখানার মত পাটকলে উন্নত প্রযুক্তির আধুনিক যন্ত্রাংশ স্থাপন, শ্রমিক প্রশিক্ষন, প্রতিযোগীতা মূলক কর্মের মাধ্যমে পদায়ন, প্রনোদনা, পদক প্রদান ও ব্যবস্হাপনা উন্নত করুন। রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল পিপিপি’র নামে লুটপাটকারীদের হাতে তোলে দেওয়া থেকে বিরত থাকুন। ইতিপূর্বে ময়মনসিংহ জুটমিল, আদমজী জুটমিল সহ অনেক গুলি জুটমিল পিপিপি’র নামে লুটপাটকারীদের হাতে তোলে দেওয়া হয়েছিল তা প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী কখনো দৃশ্যমান হয়নি । সরকারী শিল্পকারখানা বিরাষ্টীয়করন করলে দালাল শ্রমিকনেতা, আমলা ও উপর মহলের কিছু ব্যক্তির পকেটভারী হবে, ব্যাংকের হিসাবের খাতায় নতুন করে নগদ যুক্ত হবে, কারো কারো সাময়িক সচ্ছলতা বাড়বে । এমনি অনেক অনিয়ম দেশবাসী প্রত্যক্ষ করল করোনা ভাইরাস মহামারীতে প্রনোদনার নগদ অর্থ ও অসচ্ছলদের জন্য বরাদ্ধকৃত চাল / টাকা বিলি বন্টনের সময় ।

পাটচাষের সঙ্গে সারাদেশে যুক্ত প্রায় ৫০ লাখ কৃষক, পাট ও পাট শিল্পের সঙ্গে জড়িত প্রায় চার কোটি মানুষের জীবন জীবিকা রক্ষা করা সরকারের দায়িত্ব। অন্যথায় পাটচাষীদের সংসার ও তাদের সন্তানদের শিক্ষা জীবন ও সোনালী ভবিষ্যত ধ্বংস হয়ে যাবে । সরকার সংখ্যা গরিষ্ট মানুষের সর্মথনে ক্ষমতায় আসলেও রাষ্টীয় সম্পদকে রক্ষা না করে জনগনের সাথে সংবিধান পরিপন্হি বানিজ্যিক আচরন করছে ।

সরকারী হিসাবে গত ৪৪ বছরে পাট শিল্পে লোকশানের পরিমাণ ১০ হাজার ৫ শ’ কোটি টাকা। সেই হিসাবে প্রতিবছর লোকসান হয়েছে ২৩৮.৬৩ কোটি টাকা মাত্র। অতিতের বিভিন্ন অগনতান্ত্রিক সরকারের মত বর্তমান সরকারও লোকসানের নামে পুরোন শিল্প কলকারখানাকে কম মূল্যে দলীয়/দালাল লুটেরাদের হাতে তোলে দেওয়ার কৌশল গ্রহন করছে । আর উন্নয়নের কথা বলে নতুন  মেগা প্রকল্পের নামে সীমাহীন অর্থ রাষ্টীয় কোষাগার থেকে বের করে নেওয়া হচ্ছে । দেশবাসী জানে না  কোন দাতা, দেশ, গোষ্টি, গ্রুপকে খুশি করার জন্য চামরা শিল্পের মত পাট শিল্পকে ধ্বংস করা হচ্ছে ।

দেশীয় কাচামাল নির্ভর পাট শিল্পকে ধ্বংস না করে ওয়াসা, বিমান, রেল ও বিদ্যুৎসহ অন্যান্য খাতে সরকার প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ টাকা ভর্তুকি প্রদান করে, তাদেরকে আরো জবাবদিহিতার মধ্যে আনা হউক। বিদ্যুতের কুইক রেন্টালকে অলস বসিয়ে রেখে হাজার হাজার কোটি টাকা গচ্চা দেওয়া বন্ধ করুন। প্রকল্প পূন:মূল্যায়নের নামে দূনীতিবাজ কর্মকর্তাদের প্রস্তাব অনুযায়ী বাজেট সংশোধন/বৃদ্ধি তথা রাষ্টীয় অপচয় বন্ধ করুন। মন্ত্রী পরিষদ পরিচালনার ব্যবস্হাপনায় জবাবদিহিতা আনুন, আন্ত:মন্ত্রনালয় কার্যক্রমে ব্যবস্হাপনায় জবাবদিহিতা আনুন, করোনা মহামারী মোকাবেলায় বিভিন্ন দাতা সংস্হা, দেশ ও অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান থেকে প্রাপ্ত অর্থ/টাকা সঠিক ভাবে ব্যবহার করুন। এ সব খাত সঠিক ব্যবস্হাপনা করতে পারলে প্রতিবছর লোকসানের ২৩৮.৬৩ কোটি টাকা সংগ্রহ করা/ভর্তুকি প্রদান করা অসম্ভব কিছু না। এমনি নানাবিধ উদ্যোগের মাধ্যমেই সমাজের সর্বস্হরে অর্থনৈতিক জবাবদিহীতা, সুশাসন তথা আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করার পথ সুগম করা সম্ভব ।

পাট শিল্পকে সুদৃষ্টিতে দেখুন। এ দেশের আবহাওয়া মাটি পানি ও মানুষের জীবন যাত্রার সাথে পাট চাষ মিশে আছে । পাট দেশীয় সম্পদ, একে পরির্চযা করুন । পাট প্রকৃতি বান্ধব । কাচামাল পাটকে ব্যবহার করে নতুন শিল্প গড়ে তুলোন । এ দেশের পাট বিদেশীরা ক্রয় করে চট আর দড়ি তৈরী করছে শুধু তা নয় ছোট বড় অন্যান্য সামগ্রীও তৈরী করছে । বেসরকারী পাটকল লাভ করলে সরকার কেন পারছে না । দৃষ্টি শক্তির তফাতটা কোথায় তা খুজে বের করুন । তথাকথিত হস্তান্তর নয় আধুনিকায়নের মাধ্যমে পাট অর্থনীতিকে বাচানো ও দেশের আরো অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করা সম্ভব ।

একটি প্রস্তাবনা:  সারাদেশে ট্রেড লাইসেন্স ব্যবস্হাকে ডিজিটাল লেজারের মাধ্যমে অনলাইন ব্যবস্হাপনার আওতায় আনতে পারলে এ খাত থেকেই প্রতি বছর ২৩৮.৬৩ কোটি টাকা বেশী অর্থ জোগার করা সম্ভব । এমনি নানাবিধ বাস্তব মুখী উদ্যোগের মাধ্যমেই সরকারী ব্যবস্হাপনায় পাটশিল্পসহ অন্যান্য শিল্পকারখনামত সঠিক ভাবে পরিচালনা করা সম্ভব । অন্যথায় সকল অনিয়মের হিসাব জনতার আদালতেই দিতে হবে ।

করোনা ভাইরাসের কারনে মানষ গৃহবন্দি, কর্মহারা, ক্ষুধার্ত মানুষের সংখ্যা প্রতিদিন বৃদ্ধি পাচ্ছে এমন সময় সরকারের এ অমানবিক আচরন সকল মহলকে ব্যাথিত করেছে, সমালোচনার ঝড় উঠছে । সরকারে মাঝে ঘাপটি মেরে থাকা দুষ্টচক্র যদি সাধারন মানুষের কথা শুনতে না পাড়ে করোনা ভাইরাসের ভয়ে ঘরে বসে না থেকে সরকারের অমানবিক, শিল্প বিরোধী, বানিজ্যিক আচরন তথা আত্মঘাতী সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে রুখে দাড়াতে হবে ।

দেশের মানুষের সম্পদ পাট, পাটকল আমাদের হ্রদপিন্ড । শ্রমজীবি জনগনের দীর্ঘস্বাস এ আন্দোলনের বিজয় হবেই ।

লেখক: সাংবাদিক ও রাজনৈতিক কর্মী