করোনা পরীক্ষা কেলেঙ্কারি: অভিযুক্ত সাহেদ গ্রেপ্তার হচ্ছেন না কেন?

যখন করোনাভাইরাসের সংক্রমণে দেশের মানুষ বিপন্ন ও বিচলিত, তখন রিজেন্ট গ্রুপের দুই হাসপাতাল ও এর মালিক মোহাম্মদ সাহেদ সেটিকে পুঁজি করে জনগণের সঙ্গে কেবল প্রতারণাই করেননি, তাঁদের জীবনকে চরম ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দিয়েছেন। মানুষ করোনাভাইরাস পরীক্ষার জন্য দূরদূরান্ত থেকে হাসপাতালে আসেন এ খবর জানতে যে তিনি আক্রান্ত, না সুস্থ। আক্রান্ত হলে তাঁর চিকিৎসা হবে। গুরুতর না হলে বাড়িতে আর গুরুতর হলে হাসপাতালে।

এ করোনা পরীক্ষা নিয়ে কোনো হাসপাতাল কিংবা এর মালিক এ অসহায় পরিস্থিতিতে কারও সঙ্গে প্রতারণা করতে পারেন, এটা চরম বিস্ময়ের। আর আমাদের স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এমন একটি প্রতিষ্ঠানকে পরীক্ষার অনুমতি দিয়েছে। পত্রপত্রিকার খবর অনুযায়ী, ছয় হাজার মানুষকে পরীক্ষা ছাড়াই রিপোর্ট দিয়েছে মোহাম্মদ সাহেদের মালিকানাধীন দুই হাসপাতাল। একটি পত্রিকা একে ‘বালতি টেস্ট’ বলে অভিহিত করেছে, যার বেশ কিছু নমুনা উদ্ধার করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। ছয় হাজার মানুষকে পরীক্ষা ছাড়াই পজিটিভ বা নেগেটিভ সনদ দেওয়ার অর্থ তাঁদের এবং তাঁদের আশপাশের মানুষকে ভয়াবহ বিপদের মধ্যে ঠেলে দেওয়া।

আক্রান্ত ব্যক্তিকে সুস্থ সনদ দেওয়ার পর তিনি নির্বিঘ্নে বাইরে ঘুরে বেড়িয়েছেন এবং তাঁর সংস্পর্শে যাঁরাই এসেছেন, তাঁদের আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেড়েছে। অন্যদিকে সুস্থ ব্যক্তিকে আক্রান্ত হিসেবে সনদ দেওয়ার পর তাঁর জীবনও কেটেছে গভীর শঙ্কা ও উদ্বেগের মধ্যে।

প্রশ্ন হলো মোহাম্মদ সাহেদ এ ঘৃণ্য অপরাধ করার দুঃসাহস কোথা থেকে পেলেন? তাঁর খুঁটির জোর কোথায়? সামাজিক ও সংবাদমাধ্যমে যেসব তথ্য ও ছবি প্রকাশিত হয়েছে তাতে দেখা যায়, ক্ষমতাসীন দলের মন্ত্রী-সাংসদ থেকে শুরু করে সমাজের অনেক চাঁইয়ের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতা আছে। একদা সাহেদ বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। ক্ষমতার পালাবদল ঘটার পর আওয়ামী লীগে ভিড়ে যান এবং দলের আন্তর্জাতিক কমিটির সদস্য হন। আওয়ামী লীগের আন্তর্জাতিক সম্পাদক বলেছেন, ‘কমিটিতে তিনি আগে ছিলেন, এখন নেই। মাঝেমধ্যে বৈঠকে আসেন।’ একজন লোক কমিটিতে নেই অথচ কমিটির বৈঠকে আসেন, এটি কীভাবে সম্ভব?

দ্বিতীয় ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো এই ব্যক্তির সঙ্গে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর কোভিড-১৯–এর চিকিৎসা ও পরীক্ষার বিষয়ে চুক্তি করল কীভাবে? ২০১৪ সালের পর থেকে এই হাসপাতালের কোনো বৈধ ছাড়পত্রই নেই। এমন একটি অবৈধ প্রতিষ্ঠান স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নজরের বাইরে চলছিল, সেটাই তো অধিদপ্তরের বড় ব্যর্থতা। সেই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর নিজেদের একটি অকার্যকর প্রতিষ্ঠান হিসেবে তুলে ধরেছে। এ চুক্তির পেছনে কোনো স্বার্থের সম্পর্ক বা লেনদেন থাকা অস্বাভাবিক কিছু নয়।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সঙ্গে চুক্তি অনুযায়ী, বিনা পয়সায় করোনা পরীক্ষা ও রোগীদের চিকিৎসা দেওয়ার কথা থাকলেও মোহাম্মদ সাহেদের দুই হাসপাতালই মোটা অঙ্কের অর্থ নিয়েছে। কেবল কোভিড-১৯ পরীক্ষার নামেই তারা তিন কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। আবার রোগীদের বিনা মূল্যে চিকিৎসা দিয়েছে, এ যুক্তি দেখিয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে মোটা অঙ্কের বিল জমা দিয়েছে।

এ ধরনের একটি জালিয়াতির ঘটনা ধরতে পারায় র‌্যাব ধন্যবাদ পেতে পারে। তারা দুটি হাসপাতাল সিলগালার পাশাপাশি ১৭ আসামিকে আটক করেছে। কিন্তু নাটের গুরু সাহেদ পলাতক। অবিলম্বে তাঁকে ধরে বিচারের আওতায় আনা হোক। একই সঙ্গে যাঁদের আশ্রয়–প্রশ্রয়ে সাহেদরা বিষবৃক্ষ হয়ে ওঠেন, তাঁদের মুখোশ উন্মোচন করা হোক। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও এর কর্তাব্যক্তিদের কর্মকাণ্ড নিয়ে একটি স্বচ্ছ ও বিশ্বাসযোগ্য তদন্ত জরুরি।

জেড,আই/ঢাকানিউজ২৪ডটকম