ডেল্টা প্ল্যানের তহবিল ৩৭৫০ কোটি ডলারের

 

নিউজ ডেস্ক: ডেল্টা প্ল্যানের অংশ হিসেবে ২০৩০ সাল নাগাদ উন্নয়ন ব্যয় পরিচালনায় তহবিলের পরিমাণ হবে সাড়ে ৩৭ বিলিয়ন বা ৩৭৫০ কোটি ডলার। এই পরিমাণের অর্থ ব্যয় করে আগামী ১০ বছরে ৮০টি প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে। এটি ২১’শ সাল পর্যন্ত ঐতিহাসিক ব-দ্বীপ পরিকল্পনার অংশ।

সংশ্লিষ্ট ও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ২০৩০ সাল পর্যন্ত সময়ের এই তহবিল গঠনে কোনও আইনের পরিবর্তন প্রয়োজন নেই। প্রতি বছরের উন্নয়ন তহবিল থেকেই এই তহবিলের প্রয়োজনীয় অর্থ যোগান দেওয়া সম্ভব। তবে সরকার চাইলে এর জন্য বিশেষ বরাদ্দ রাখতে পারে।

তারা উদাহরণ হিসেবে বলছেন, সম্প্রতি তারল্য সংকট মেটাতে পুঁজিবাজারের জন্য প্রতিটি ব্যাংকে ২০০ কোটি টাকা করে তহবিল গঠনের প্রস্তাব অনুমোদন করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। গত ১০ বছরে সরকার এ রকমের একাধিক তহবিল গঠন করেছে। ‘ডেল্টা তহবিল’ বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) মধ্যেই অন্তর্ভুক্ত রেখে এ রকমের একটি তহবিল গঠনের পরামর্শ দিয়েছে পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ (জিইডি)। পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

২০১৮ সালের ৪ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের (এনইসি) সভায় অনুমোদন পায় ডেল্টা প্ল্যান- ২১০০। এর পর দীর্ঘদিন কেটে গেলেও গঠিত হচ্ছিল না এর গভর্নেন্স কাউন্সিল। অতঃপর গত ৪ জুলাই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে তাকে চেয়ারম্যান করে ডেল্টা গভর্নেন্স কাউন্সিল গঠন করা হয়েছে। এ কাউন্সিল বাংলাদেশ ডেল্টা প্ল্যান- ২১০০ বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও দিক-নির্দেশনা দেবে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে এ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপনও জারি করা হয়েছে। একই সঙ্গে তহবিল গঠনের রূপরেখাও চূড়ান্ত করা হয়েছে। সেই অনুযায়ী আপাতত ২০৩০ সালের মধ্যে প্রস্তবিত ৮০টি প্রকল্প বাস্তবায়নের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এর জন্য ব্যয় ধরা হয়েছে সাড়ে ৩৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, জিডিপির আড়াই শতাংশ টাকা এ খাতে ব্যয় করা হবে। বর্তমানে ব্যয় করা হচ্ছে ১ শতাংশ।

সূত্র জানায়, বর্তমানে জিডিপির ১ শতাংশ পরিমাণ টাকা এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ব্যয় হচ্ছে, যা ২০৩০ সাল নাগাদ আড়াই শতাংশে উন্নীত করার পরিকল্পনা করছে সরকার। এর মধ্যে ২ শতাংশ নতুন বিনিয়োগ এবং শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ পরিচালন ও রক্ষণাবেক্ষণ খাতে ব্যয় করা হবে। জিডিপির ২ দশমিক ৫ শতাংশের মধ্যে শতকরা ৮০ ভাগ সরকারি তহবিল থেকে এবং শতকরা ২০ ভাগ বেসরকারি খাত থেকে আসবে। ২০৩০ সালের মধ্যে এই ডেল্টা প্ল্যানের আওতায় ৮০টি প্রকল্প বাস্তবায়নের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এরই মধ্যে ছয়টি প্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছে। পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।  

এদিকে পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা গেছে, শতবর্ষী ‘ডেল্টা প্ল্যান-২১০০ প্রণয়নের পরপরই এই প্ল্যান বাস্তবায়নে একটি তহবিল গঠনের প্রক্রিয়া শুরু করে পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ (জিইডি)। দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো অনুমোদিত বদ্বীপ পরিকল্পনার আওতায় সামনের দিনগুলোয় যেসব প্রকল্প ও কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হবে, সেসব প্রকল্প ও কর্মসূচিতে টাকার জোগান দিতে যাতে কোনও সমস্যা না হয়, সে জন্য তহবিল গঠন করার কথা বলা হয়েছে। ‘ডেল্টা ফান্ড’ নিয়ে একটি রূপরেখাও  তৈরি করেছে জিইডি, সেই রূপরেখার আদলেই উপরোক্ত পরিকল্পনা অনুযায়ী ডেল্টা প্ল্যানের আওতায় থাকা প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নের বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে।

একশ বছরের এই ঐতিহাসিক পরিকল্পনাটি পূর্ণাঙ্গ রূপ দিতে যুক্ত থেকেছেন পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের সদস্য সিনিয়র সচিব ড. শামসুল আলম। তিনি জানিয়েছেন, ‘বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির আওতায় ডেল্টা প্ল্যানের আওতায় থাকা প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন খুবই সহজ একটি প্রক্রিয়া। সরকার চাইলে  এর জন্য আলাদা তহবিল গঠন করতে পারে। তবে এর জন্য পৃথক কর্তৃপক্ষ বা পৃথক আইন করার প্রয়োজন নাই। বর্তমানে জিডিপির ১ শতাংশ টাকা ব্যাবহার করা হচ্ছে। আমরা চাচ্ছি এই হার আড়াই শতাংশে উন্নীত হোক। তিনি জানান, ২০৩০ সাল নাগাদ এই পরিকল্পনার আওতায় থাকা ৮০টি প্রকল্প বাস্তবায়নে মোট প্রয়োজন হবে সাড়ে ৩৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের সমান অর্থ।’

মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের জারি করা প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, ডেল্টা প্ল্যান গভর্নেন্সের ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন পরিকল্পনামন্ত্রী। কমিটির সদস্য হচ্ছেন কৃষিমন্ত্রী, অর্থমন্ত্রী, খাদ্যমন্ত্রী, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রী, ভূমিমন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রী, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রী, নৌপরিবহন মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রী, পানি সম্পদ মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রী। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় এবং পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের সদস্য কমিটির সদস্য-সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন।

বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, উন্নত দেশের পথে হাঁটতে হলে প্রবৃদ্ধি ৯ শতাংশ প্রয়োজন। এই প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে হলে ডেল্টা প্ল্যান বাস্তবায়ন অপরিহার্য। তাছাড়া প্রকল্পটির মূল প্রতিপাদ্য হলো জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়ানো। এরই মধ্যে ভূমিতে ক্ষয় হচ্ছে ব্যাপক। নদী ভাঙনের ফলে প্রতিবছর ৫০ থেকে ৬০ হাজার পরিবার গৃহহীন হচ্ছে। বন্যায় অনেক ফসলহানি হচ্ছে। এর বাইরেও বিশেষ করে শহর অঞ্চলে সুপেয় পানি সরবরাহ নিশ্চিত করা, কঠিন বর্জ্য ও আবর্জনা ব্যবস্থপনা, কৃষি জমিতে ব্যাপক রাসায়নিক সারের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণের মতো চ্যালেঞ্জগুলো কাটিয়ে ওঠার পাশাপাশি উৎপাদক শক্তি না কমিয়ে কীভাবে এসব বিষয় যৌক্তিক পর্যায়ে নামিয়ে আনা যেতে পারে  বাংলাদেশের ব-দ্বীপ পরিকল্পনায় এসব বিষয়ের প্রতিফলন ঘটানোর চেষ্টা করা হয়েছে।

ডেলটা প্লান-২১০০ সম্পর্কে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল জানিয়েছেন, ‘ব-দ্বীপ পরিকল্পনা-২১০০ হচ্ছে বাংলাদেশের জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রযুক্তিগত, কারিগরি ও আর্থসামাজিক ঐতিহাসিক দলিল। বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় ও জিডিপি উভয়ই বেড়েছিল। যদিও করোনা কিছুটা সমস্যা তৈরি করছে। তবে এটি আমরা কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হবো। মূল্যস্ফীতি আমাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কিছু প্রভাব রয়েছে। সেই প্রভাবকে মোকাবিলা করে দেশকে কীভাবে উন্নয়নের সঠিক পথে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যাবে, সেই বিষয়টি মাথায় রেখেই তৈরি করা হয়েছে দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বিস্তৃত ব-দ্বীপ পরিকল্পনা  বা ডেল্টা প্ল্যান।’

উল্লেখ্য, সরকারের ৫৮টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের মধ্যে ১০টি মন্ত্রণালয় পানি ব্যবস্থাপনা বা ব-দ্বীপ পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করে। সেগুলো হলো কৃষি মন্ত্রণালয়, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়, পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়, পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়, পার্বত্য চট্টগ্রাম মন্ত্রণালয়, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়, বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয় ও খাদ্য মন্ত্রণালয়। পরিকল্পনা কমিশন বলছে, পানি ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সম্পৃক্ত দশটি মন্ত্রণালয়ের প্রকল্পগুলো বাস্তবায়িত হবে ডেল্টা তহবিলের টাকায়, যেটি এখন বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির আওতায় বাস্তবায়িত হচ্ছে।