বঙ্গবন্ধু ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় : বাঙালির গৌরবের দুই উৎসবিন্দু

মোনায়েম সরকার:  বাঙালি জাতির ইতিহাসে বিংশ শতাব্দীর পুরোটা জুড়েই নানাবিধ ঘটনার জন্ম হয়েছে। ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ এবং ১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গ রদ বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দুই বিশেষ ঘটনা। বঙ্গভঙ্গ রদের ঠিক নয় বছর পরেই ১৯২০ সালের ১৭ মার্চ অবিভক্ত বাংলার গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়া গ্রামে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জন্মগ্রহণ করেন। বঙ্গবন্ধুর জন্মের এক বছর পরেই অর্থাৎ ১৯২১ সালের ৭ জুলাই প্রতিষ্ঠা লাভ করে প্রাচ্যের অক্সফোর্ড খ্যাত মহান বিদ্যাপীঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। বঙ্গবন্ধু ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্মরণীয় ইতিহাস যেন একসূত্রে গাঁথা। একজন দুঃসাহী ব্যক্তি এবং একটি অনন্য প্রতিষ্ঠান কিভাবে বাঙালি জাতির জীবনে গৌরবান্বিত ভ‚মিকা রেখেছে এই নিবন্ধে সেই কথাই সংক্ষেপে আলোচনা করার চেষ্টা করব।

১৯২১ সাল থেকে ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তেমনভাবে জ্বলে ওঠবার সুযোগ পায়নি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তখনই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়, ১৯৪৭ সালে যখন অবিভক্ত ভারতবর্ষ বিভক্ত হয়ে পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্ম হয়। ’৪৭ পূর্ব ভারতবর্ষে শেখ মুজিবের যৌবন কলকাতাতেই অতিবাহিত হয়। তখন তিনি ইসলামিয়া কলেজের তুখোড় ছাত্রনেতা এবং হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক সাহেবের খুবই স্নেহধন্য।

দেশ-বিভাগের পরে তারুণ্য দীপ্ত শেখ মুজিব যখন ঢাকা এসে রাজনীতি শুরু করেন, তখন বাংলা ভাষার আন্দোলনে অগ্নিগর্ভ হয়ে ওঠে পূর্ব বাংলা। সে সময়ে ৫৬ শতাংশ মানুষের ভাষা ছিল বাংলা। সেই ৫৬ শতাংশ মানুষের মাতৃভাষার মর্যাদা পায়ে দলে পশ্চিম পাকিস্তানি সরকার বাংলার মানুষের উপর উর্দু ভাষা চাপিয়ে দেওয়ার অপচেষ্টা করে। এর প্রতিবাদে পূর্ব বাংলার ছাত্রসমাজ প্রতিবাদমুখর হয়। শেখ মুজিব ওই সময় নেতৃত্বের ভ‚মিকা গ্রহণ করেন। মহান ভাষা আন্দোলনে শেখ মুজিবের যে বিরাট একটা ভ‚মিকা ছিল আজ আর তা কেউ অস্বীকার করতে পারেন না। জেলের বাইরে ও ভেতরে থেকে তিনি কিভাবে বাংলা ভাষা আন্দোলনে শক্তি জুগিয়েছেন তা বঙ্গবন্ধু নিজেই লিপিবদ্ধ করে গেছেন। তাই এ বিষয়ে বেশি কথা না বলে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে যাই।

১৯৪৮ সালের ভাষা-আন্দোলন ১৯৫২ সালে গিয়ে পরিণতি লাভ করে, তথা বাঙালি বিজয়ী হয়ে মাতৃভাষা বাংলাকে পাকিস্তানি সংবিধানের অন্যতর রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দিতে পাকিস্তানি সরকারকে বাধ্য করে। শুধু তাই নয় জাতির মননের প্রতীক বাংলা একাডেমিও ভাষা-আন্দোলনের ফসল। আধুনিক মাতৃভাষা ইন্সটিটিউট, অমর একুশের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি এসবও ভাষা আন্দোলনেরই সুফল। ১৯৫৪ সালের নির্বাচন বাংলার ইতিহাসে আরেক গৌরবোজ্জ্বল ঘটনা। এই ঘটনার স্বাক্ষীও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। সে সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক-কর্মচারী মিলে যুক্তফ্রন্টকে নির্বাচিত করার জন্যে যে প্রচেষ্টা গ্রহণ করে তাও অসামান্য। ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে ৩৪ বছরের শেখ মুজিব বিপুল ভোটে বিজয়ী হন এবং যুক্তফ্রন্টের মুখ আলোকিত করেন। পাকিস্তানিরা শুধু অর্থনৈতিক ও ভাষাগত দিক দিয়েই বাঙালিকে দাবিয়ে রাখার চেষ্টা করেনি। তারা শিক্ষাগতভাবেও নিরীহ বাঙালি জাতিকে পিছিয়ে রাখার চেষ্টা করে। ১৯৬২ সালে আইয়ুব সরকারের মদদে প্রণীত শিক্ষানীতির বিরুদ্ধে যে আন্দোলন পূর্ববঙ্গে দানা বেঁধে ওঠে তার মূলেও ছিল বঙ্গবন্ধু ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশংসনীয় ভ‚মিকা।

আমরা যারা সে সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলাম তারা দেখেছি কী জঘন্য নিয়ম দিয়ে সেই শিক্ষানীতি প্রণয়ন করেছিল। ৫০ নম্বরে পাশ, শিক্ষকদের ১৫ ঘন্টা শ্রমের উল্লেখ সেই শিক্ষানীতিকে কলঙ্কিত করেছিল। ১৯৬৬ সালের ৭ জুন বঙ্গবন্ধু বাঙালি জাতির মুক্তির সনদ ৬-দফা ঘোষণা করেন। ৬-দফার ডাক দিয়েই বঙ্গবন্ধু ধীরে ধীরে বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা হিসেবে আবিভর্‚ত হন। বঙ্গবন্ধুর ৬-দফাকে অকুণ্ঠভাবে সমর্থন জ্ঞাপন করে পূর্ববঙ্গের ছাত্রসমাজ তথা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। এর ঠিক দুই বছর পরে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় বঙ্গবন্ধুকে আসামি করা হলে প্রতিবাদ শিখরস্পর্শ করে। হাজার হাজার ছাত্র-জনতা জেলের তালা ভেঙে শেখ মুজিবকে কারাগার থেকে বের করে নিয়ে আসেন। ১৯৬৯ সালের ২৩ ফেব্রæয়ারি শেখ মুজিবকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণেই অর্থাৎ রেসকোর্স ময়দানে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধি প্রদান করা হয়। যে বিশ্ববিদ্যালয় ১৯৪৯ সালে পাকিস্তানি শাসকদের চাপে শেখ মুজিবকে বেদনার সঙ্গে বহিষ্কার করে, সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের শ্যামল প্রান্তরে শেখ মুজিবকে বরণ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাবমূর্তি উজ্জ্বলতর হয়। ১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থানে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে তৎকালীন পূর্ববঙ্গ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ঐতিহাসিক ভ‚মিকা রাখে। বলতে দ্বিধা নেই, ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানেই পরিষ্কার হয়ে যায় পাকিস্তানের অপশাসন বাংলাদেশ কিছুতেই মেনে নিবে না।

এরপরে আসে ১৯৭০ সালের নির্বাচনের কাক্সিক্ষত মুহূর্ত। এই নির্বাচন বাঙালি জাতির ভাগ্য নির্ধারণ করবে মর্মে বঙ্গবন্ধু যে ভাষণ-বিবৃতি দেন তা বাংলার জনমনে ব্যাপকভাবে সাড়া ফেলে। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ এককভাবে আসন সংখ্যা বেশি পেয়ে অভ‚তপূর্ব বিজয় লাভ করে। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিজয় বাঙালিকে উজ্জীবিত করে তোলে। বাংলার মানুষ বুঝতে পারে বাঙালির জীবনমান বদলাতে হলে বাঙালিকেই ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে যেতে হবে। মূলত শেখ মুজিবকে কেন্দ্র করেই সেদিনের নবীন বাংলাদেশ স্বপ্ন দেখতে শুরু করে।

১৯৭১ সালের ৭ মার্চ নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের ‘অলিখিত স্বাধীনতা দিবস’। ঐ দিন অপরাহ্ণে রমনার রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধু যে কাব্যিক ভাষণ প্রদান করেন, তার মধ্যে তিনি স্পষ্টভাবে স্বাধীনতার কথা উল্লেখ করেন। সে সময় পরিস্থিতি এতটাই প্রতিক‚ল ছিল যে সরাসরি স্বাধীনতার ডাক দেওয়া বঙ্গবন্ধুর পক্ষে সম্ভব ছিল না। তাহলে তখন লক্ষ লক্ষ মানুষের প্রাণহানি হওয়ার সম্ভাবনা ছিল। তাই দূরদর্শী বঙ্গবন্ধু একটু কৌশলের আশ্রয় নিয়ে বলেনÑ ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’

বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ শুনেই বাঙালিরা যা বোঝার বুঝে নেয়। তারা ঘরে ঘরে নিজ-উদ্যোগে দুর্গ গড়ে তোলে। এরপরে ২৫ মার্চ মধ্যরাতে বঙ্গবন্ধু যখন আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীনতার ঘোষণা দেনÑ সেই ২৫ মার্চ রাতে সমগ্র বাংলার দুটি স্থান রক্তের অক্ষরে এক নতুন ইতিহাস রচনা করে। একটি হলো রাজারবাগের পুলিশ লাইনস, অন্যটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। স্বাধীনতা ঘোষণার প্রাক্কালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রক্তের বন্যা বয়ে যায়। এখানকার ছাত্র-শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারীর রক্তে সবুজ দূর্বা রঙিন হয়ে ওঠে। লাশের পাহাড় জমে যায় আবাসিক হল ও শিক্ষক নিবাসে। যতদিন বাংলার ইতিহাস থাকবে ততদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই রক্তাক্ত ইতিহাস মলিন হবার নয়। পাকিস্তানি শাসকদের দৃষ্টিতে বঙ্গবন্ধু যতটা চক্ষুশূল ছিলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ও তাই ছিল। এর কারণ সম্ভবত এটা হতে পারে যে, যখন বঙ্গবন্ধু আক্রান্ত হয়েছেন তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আন্দোলন বেগবান করেছে। আর যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বার্থ ভ‚লুণ্ঠিত হয়েছে তখন বঙ্গবন্ধু সর্বশক্তি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন। আর এ কারণেই বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ও পাকিস্তানি স্বৈরশাসকদের শ্যৈনদৃষ্টির শিকার হয়েছে।

বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের যে তিনটি ঘটনা স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে তাহলোÑ ৭ মার্চ ১৯৭১-এর ঐতিহাসিক ভাষণ, ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১-এর মহান বিজয় এবং ১০ জানুয়ারি ১৯৭২-এ বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন। তিনটি ঘটনার জন্মই হয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিক্ষত বুকে, ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানে। এর প্রথম এবং শেষটিতে বঙ্গবন্ধু সশরীরে উপস্থিত ছিলেন। বিজয় দিবসে তিনি পাকিস্তানের কারাগারে বন্দী ছিলেন বলে অংশগ্রহণ করতে পারেননি। তা নাহলে হয়তো তিনটি ঘটনারই অংশীদার হতো বঙ্গবন্ধু ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু সপরিবারে নিহত হন, ১৫ আগস্ট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনে বঙ্গবন্ধুকে ‘আজীবন সদস্য’ পদ দিয়ে সম্মানিত করার কথা ছিল। কিন্তু নির্মম ঘাতকেরা এই বিরল সম্মান থেকে বঙ্গবন্ধু ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে চিরতরে বঞ্চিত করে।

২০২০-২০২১ সালকে বাংলাদেশ সরকার ‘মুজিববর্ষ’ বলে ঘোষণা দিয়ে নানামুখী কর্মকা হাতে নিয়েছেন। এই দুই বছরে বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবর্ষ উদ্যাপিত হবে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শতবর্ষ পূর্তি হবে, আবার আমাদের প্রিয় স্বাধীনতা ‘সুবর্ণ জয়ন্তী’তে পা রাখবে। অর্থাৎ বাঙালির দুই পাশে থাকবে দুই ঐতিহাসিক উৎসবিন্দু মাঝখানে রক্তলাল স্বাধীনতা। দারুণ একটি অবর্ণনীয় মুহূর্তই বলা যায়।

বিশ্ববিদ্যালয় একটি কাঠামোর নাম। একটি ধরাবাঁধা নিয়মের অধীন প্রতিষ্ঠানের নাম। বঙ্গবন্ধু তিনিও একটি ধরা-বাঁধা নিয়ম অনুসরণ করে তাঁর পঞ্চান্ন বছরের সংগ্রামমুখর পথ পাড়ি দিয়েছেন। বাঙালি জাতির মুক্তির ইতিহাসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হলো ‘প্রাতিষ্ঠানিক রূপ’, বঙ্গবন্ধু হলেন ‘মানবীয় প্রতীক’। একটিকে আমরা ‘তত্ত¡’ বললে, অন্যটিকে বলব ‘প্রাকটিক্যাল’। বঙ্গবন্ধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাকটিক্যাল উদাহরণ ছিলেন। পরাধীন বাংলার স্বপ্নকে বাস্তবায়ন করতে, বঙ্গবন্ধু ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের যে অসামান্য অবদান তা জাতি কোনোদিন ভুলতে পারবে না।

একজন ব্যক্তি এবং একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পৃথিবীতে কত আশ্চর্যজনক ঘটনার জন্ম দিতে পারে বঙ্গবন্ধু ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ই তার উজ্জ্বল উদাহরণ। বঙ্গবন্ধুর ব্যক্তিশক্তি এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাতিষ্ঠানিক শক্তি একটি পরাধীন, বিচ্ছিন্ন জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করে স্বাধীনতা এনে দিয়েছে। বাঙালিকে করেছে মরণজয়ী, অকুতোভয়, স্বাধীনচেতা।
০৬ জুলাই, ২০২০

মোনায়েম সরকার : রাজনীতিবিদ, কলামিস্ট ও মহাপরিচালক, বাংলাদেশ ফাউন্ডেশন ফর ডেভেলপমেন্ট রিসার্চ।