মার্কিন মুল্লুকে মহাসঙ্কট

নিউজ ডেস্ক:    গত কয়েক দিন ধরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ঘটেছে বিংশ শতাব্দীর ভয়াবহতম অচলাবস্থা। ১৯৬৮ সালে মার্টিন লুথার কিংয়ের হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে সংঘটিত বিক্ষোভ ও সহিংসতার পর এত বড় গণ-অসন্তোষ যুক্তরাষ্ট্র আর দেখেনি। ওই ঘটনার পটভূমিতে বর্ণবাদ, যুগ যুগ ধরে কৃষ্ণাঙ্গদের প্রতি নিবর্তনমূলক আচরণ এবং হালে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের উদ্ভট কথা ও কার্যকলাপ থাকলেও মূলত ‘কোভিড-১৯’-এর প্রভাব এতে উদ্দীপক হিসেবে শক্তি জুগিয়েছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।

গত ২৫ মে আমেরিকার মিনেসোটা রাজ্যের মিনিয়াপোলিস শহর থেকে ঘটনার সূত্রপাত। জর্জ ফ্লয়েড নামক ৪৬ বছর বয়স্ক একজন কৃষ্ণাঙ্গ নাগরিক স্থানীয় একটি মার্কেট থেকে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র ক্রয় করে দোকানে বিল পরিশোধ করতে বিশ ডলারের একটি নোট দেন। দোকান কর্তৃপক্ষ ডলারটি ‘জাল’ বলে পুলিশের কাছে অভিযোগ করে। তৎক্ষণাৎ পুলিশ এসে ফ্লয়েডকে ধরে নিয়ে গাড়িতে তোলার সময় সে পড়ে যায়। এতে পুলিশ সদস্য ‘ডেরেক শভিন’ তাকে মাটির দিকে মুখ করে হাঁটু দিয়ে ঘাড়ে চেপে আট মিনিট ৪৬ সেকেন্ড ধরে রাখে। সে বারবার বলছিল, আমার শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। কিন্তু পুলিশ এতে কর্ণপাত করেনি। ফলে জর্জ ফ্লয়েডের দেহ নিথর হয়ে পড়ে কিছুক্ষণ পরেই। এ ঘটনায় চারজন পুলিশ জড়িত ছিল এবং তারা সবাই শ্বেতাঙ্গ। পরে জর্জ ফ্লয়েডকে হাসপাতালে নিয়ে গেলে ডাক্তার তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

এক পথচারীর রেকর্ড করা এই মৃত্যুর ঘটনার ভিডিও সাথে সাথেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে দেশজুড়ে ব্যাপক বিক্ষোভের সূত্রপাত হয়। বড় বড় শহরে হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় নেমে আসে এর প্রতিবাদে। দ্রুত এই প্রতিবাদ সহিংসতায় রূপ নেয়। বিক্ষুব্ধ জনতা পুলিশ স্টেশন ঘেরাও করে, পুলিশের গাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয় এবং তাদের সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। সেই সাথে চলে ভাঙচুর ও লুটতরাজ। এই সহিংসতা দ্রুত যুক্তরাষ্ট্রের সর্বত্রই ছড়িয়ে পড়েছে। বর্তমানে প্রায় ১৪০টি বড় শহর বিক্ষোভে উত্তাল। কারফিউ জারি করতে হয়েছে প্রায় ৪০টি শহরে। তবে কারফিউ লঙ্ঘন করে বিক্ষোভকারীরা রাস্তায় নেমে এসেছেন। গ্রেফতার করা হয়েছে প্রায় সাড়ে চার হাজার বিক্ষোভকারীকে। তবু কিছুতেই ক্ষোভের এই দাবানল থামানো যাচ্ছে না। যুক্তরাষ্ট্রের রিজার্ভ মিলিটারি ফোর্সের পাঁচ হাজার সদস্যকে নিরাপত্তার জন্য তলব করা হয়েছে রাজধানী ওয়াশিংটন ডিসিসহ ১৫টি অঙ্গরাজ্যে। খুনের জন্য দায়ী পুলিশ অফিসার শভিনকে গ্রেফতার করে তৃতীয় মাত্রার (‘অনিচ্ছাকৃত’ হত্যা) হত্যাকারী হিসেবে মামলা দেয়া হয়েছে আর বাকি তিনজনকেও বরখাস্ত করা হয়েছে। এত কিছুর পরেও বিক্ষোভকারীদের শান্ত করা যাচ্ছে না। তারা প্রেসিডেন্টের সরকারি বাসভবন হোয়াইট হাউজের সামনে অবরোধ কর্মসূচি পালন করেছেন। ফলে আত্মরক্ষার জন্য প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে আশ্রয় নিতে হয় ভূগর্ভের বিশেষ নিরাপত্তা বাংকারে। আমেরিকার এই ক্ষোভের বাষ্প সারা বিশ্বেই ছড়িয়ে পড়েছে দ্রুত। ইতোমধ্যে যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, জার্মানি, নিউজিল্যান্ড, কানাডা, নেদারল্যান্ডস, ডেনমার্কসহ ইউরোপ, এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার বেশ কিছু দেশের বড় শহরে এই বর্ণবাদী হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধেও মার্কিন দূতাবাসের সামনে বিক্ষোভ হয়েছে। চীন এবং ইরান যুক্তরাষ্ট্রের বর্ণবাদী নীতির কড়া সমালোচনা করে বিক্ষোভকারীদের সমর্থন দিয়েছে।

বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশকের শেষপর্যায়েও পৃথিবীর সবচেয়ে ক্ষমতাধর দেশে এ ধরনের অরাজক পরিস্থিতির সৃষ্টি হওয়া বড়ই আশ্চর্যজনক বিষয়। সভ্য দেশের অসভ্য এ ঘটনা হঠাৎ এসে উপস্থিত হয়নি। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তার কার্যকলাপের মাধ্যমে এ পরিস্থিতির পটভূমি সৃষ্টি করেছেন। ২০১৭ সালে ক্ষমতায় আসীন হওয়ার পর থেকেই তিনি যুক্তরাষ্ট্রে বর্ণবাদের পুরনো লতাপাতায় পানি সিঞ্চন করে একে তরতাজা করে তোলেন। তার অভিভাবকত্বে চরম শ্বেতাঙ্গপন্থী সংগঠন ‘কু ক্লাক্স ক্লান’ (ককক)-এর প্রেতাত্মারা সব ফিরে আসতে শুরু করে। শ্বেতাঙ্গদের কথিত শ্রেষ্ঠত্ব মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। এমনিতেই সেখানে কৃষ্ণাঙ্গরা যুগ যুগ ধরে বৈষম্যের শিকার। ‘নিউ ইয়র্ক টাইমস’-এর বিশ্লেষণে দেখা যায় যুক্তরাষ্ট্রে পুলিশি হেফাজতে কৃষ্ণাঙ্গ মৃতের সংখ্যা শ্বেতাঙ্গের চেয়ে তিনগুণ বেশি। কৃষ্ণাঙ্গরা এদেশে এতই অবহেলিত যে, শ্বেতাঙ্গদের চেয়ে কৃষ্ণাঙ্গদের গড় আয়ু কম। তাদের বসবাস অপেক্ষাকৃত বেশি ঘনবসতিপূর্ণ, ঝুঁকিপূর্ণ ও অপরাধপ্রবণ এলাকায়। দারিদ্র্য তাদের নিত্যদিনের সঙ্গী। এমনকি হালের করোনায় আক্রান্তের সংখ্যাও কালো জনগোষ্ঠীর মানুষের সংখ্যা বেশি। ‘ইউনিভার্সিটি অব মেরিল্যান্ডের’ সমাজতত্ত্ববিদ অধ্যাপক বায়শান রয় বলেন, ‘কৃষ্ণাঙ্গ জনগণ পুলিশের অতিরিক্ত তৎপরতার শিকার বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই।’

নিউ ইয়র্কে সামাজিক দূরত্ব না মানার দায়ে যারা গ্রেফতার হয়েছিল তাদের ৮০-৯০ শতাংশই কালো। ২০১০ সালে সমাজবিজ্ঞানী ইভলিন জে প্যাটারসন গবেষণায় দেখান, ‘কারাগারে কালোদের মৃত্যুহার কম। কারণ, তারা কারাগারে বাইরের তুলনায় ভালো চিকিৎসাসেবা পায়’ (প্রথম আলো ০১ জুন ২০২০)। যুক্তরাষ্ট্রের কালো জনগোষ্ঠী ঐতিহাসিকভাবেই বৈষম্যের শিকার হওয়ায় তাদের ক্ষোভ দীর্ঘ দিনের। চলমান বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের স্বভাবসুলভ অপরিণামদর্শী মন্তব্য ক্ষোভানলে ঘি ঢেলে দিয়েছে। বিক্ষোভকারীদের তিনি ‘বামপন্থী সন্ত্রাসী’ বলে আখ্যায়িত করেন। টুইট করে তিনি বলেছেন, ‘হোয়াইট হাউজের ভেতরে অত্যন্ত নিরাপদ বোধ করছি। কারণ, বিক্ষোভকারীরা যদি হোয়াইট হাউজের নিরাপত্তাবেষ্টনী ভেঙে ঢুকেই পড়ত, তাহলে সবচেয়ে হিংস্র কুকুর আর ভয়ঙ্করতম অস্ত্রের মুখে পড়তে হতো তাদের।’ তার শ্বেতাঙ্গপ্রীতির বড় উদাহরণ হলো, মে মাসে শ্বেতাঙ্গ গোষ্ঠীগুলো করোনার কারণে আরোপিত লকডাউন তুলে নেয়ার দাবিতে বিক্ষোভ করলে পুলিশ তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা তো নেয়ইনি; বরং ট্রাম্প তাদের সমর্থন দিয়ে গভর্নরদের চাপ সৃষ্টি করেছেন লকডাউন তুলে নেয়ার জন্য। এ বিষয়টি সাধারণ মানুষকে ক্ষুব্ধ করে তোলে।

অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, গণতান্ত্রিক উপায়ের চেয়ে শক্তি দিয়ে এই বিক্ষোভ দমনের নীতিই গ্রহণ করেছে মার্কিন প্রশাসন। ইতোমধ্যে দু’টি অঙ্গরাজ্যে দু’জন বিক্ষোভকারী পুলিশ বা অজ্ঞাত বন্দুকধারীর গুলিতে নিহত হলেন। পুলিশের কাঁদানে গ্যাস, রাবার বুলেট ও মরিচের গুঁড়া নিক্ষেপ, লাঠিচার্জ ইত্যাদি বিক্ষোভকে আরো উসকে দিচ্ছে।

কোথাও কোথাও উগ্র শ্বেতাঙ্গবাদীরাও বিক্ষোভে শরিক হয়ে লুটতরাজ ও ভাঙচুর করে আন্দোলনকারীদের কলঙ্কিত করার প্রয়াস পাচ্ছে বলে অনেকে মনে করছেন। এ দিকে কী ধরনের পদক্ষেপের মাধ্যমে বিক্ষোভ দমন করবেন তা নিয়ে বিভ্রান্তিকর পরামর্শ দিচ্ছেন ট্রাম্পের পরামর্শদাতারা। তারা পরস্পরবিরোধী দু’ধরনের পরামর্শ দিচ্ছেন প্রেসিডেন্টকে। কাজেই মার্কিন প্রশাসন বিক্ষোভ মোকাবেলায় নরম বা গরম কোন ধরনের পদ্ধতি অবলম্বন করবে তা নির্ধারণে দোদুল্যমানতার মধ্যেই ট্রাম্পের ইতস্তত মন্তব্য ক্ষোভকে বাড়িয়ে দিচ্ছে বলে মনে করেন অনেকে। তা ছাড়া আগামী প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের কথাও তাদের ভাবতে হচ্ছে। কারণ বিক্ষোভ দমনের পদ্ধতির ওপর পরবর্তী নির্বাচনে কাদের হারাবেন আর কাদেরটা অর্জন করতে পারবেন এটা তাদের ভাবিয়ে তুলছে। কিন্তু এ দিকে বিক্ষোভ ক্রমেই ফুঁসে উঠছে। এমনকি বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ছে। কাজেই শক্তি প্রয়োগের পদ্ধতিই মার্কিন প্রশাসন পছন্দ করছে বলে মনে হচ্ছে। তবে তা গণ-অসন্তোষকে আরো বাড়িয়ে দিতে পারে।

আসলে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বা প্রশাসন বিরোধী আন্দোলনের পটভূমি আগে থেকেই বর্ণবাদী আচরণের কারণে প্রস্তুত ছিল। বর্তমান ‘কোভিড-১৯’ মহামারী মানুষের সেই ক্ষোভের আগ্নেয়গিরির মুখে বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে। প্রকৃতপক্ষে করোনা মহামারীতে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থা লণ্ডভণ্ড হয়ে পড়েছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের অবহেলা আর অদূরদর্শী নেতৃত্বের কারণে তারা যেন মহামারীর কাছে নীরবে আত্মসমপর্ণ করেছে। এ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে এক লাখের বেশি মানুষ মৃত্যুবরণ করেছে আর আক্রান্ত প্রায় ১৮ লাখের বেশি।

এতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তুতির অপ্রতুলতা এবং স্বাস্থ্য অবকাঠামোর চরম দুরবস্থা দেশবাসীর সামনে নগ্ন হয়ে পড়েছে। অন্য দিকে, প্রায় ৩০ মিলিয়ন মানুষ চাকরি হারিয়ে বেকার হয়ে পড়েছে (ডেইলি স্টার : ০৯-০৫-২০২০)। অর্থনৈতিক মন্দার প্রভাব সমাজের সর্বক্ষেত্রে থাবা মেলেছে। বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ৭৫ হাজার মানুষ হতাশার মুখে আত্মহত্যা করতে পারে। অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্রে আগে থেকেই গণবিস্ফোরণের পটভূমি সৃষ্টি হয়েছিল। এর মাঝে করোনা এই বিস্ফোরণের বারুদে আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছে। কাজেই যুক্তরাষ্ট্রের এই গণবিক্ষোভ সারা বিশ্বের জন্য একটি সতর্কবার্তা। বর্তমানে করোনা মহামারী পরিস্থিতিতে বিশ্বের দেশগুলো বারুদের ওপর অবস্থান করছে বলে মনে হয়। অর্থাৎ যেকোনো হালকা স্ফুলিঙ্গই যথেষ্ট হবে গণরোষের বিস্ফোরণের উপাদান; বিশেষ করে অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য। করোনা মহামারীর চাপে মানুষ এমনিতেই বিক্ষুব্ধ। এর মধ্যে যেকোনো ধরনের অবাঞ্ছিত ঘটনা গণ-অসন্তোষের অবতারণা করতে পারে। সুতরাং সরকারগুলোকে সর্বতোভাবে জনকল্যাণমূলক পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করতে হবে। বিশেষ করে স্বাস্থ্যকাঠামোর ব্যাপক উন্নয়ন, ক্ষুধাপীড়িত মানুষকে খাদ্য দেয়া আর বেকারত্ব দূরীকরণের মতো কঠিন পদক্ষেপগুলো এখনই গ্রহণ করতে হবে। এভাবে রাষ্ট্রগুলো কল্যাণমূলক রাষ্ট্রের মতো আচরণ করলেই হয়তোবা এ ধরনের অরাজক পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে হবে না।

লেখক :  অধ্যক্ষ এ কে এম মাকসুদুল হক