ব্রহ্মপুত্রে বাড়ছে, ২২ সেন্টিমিটার ওপরে তিস্তার পানি, যমুনা-পদ্মা-সুরমায় কমছে

 

নিউজ ডেস্ক: লালমনিরহাট-নীলফামারী জেলার সীমানা দিয়ে ভারত থেকে প্রবেশ করা তিস্তা নদী আর কুড়িগ্রাম দিয়ে প্রবেশ করা ব্রহ্মপুত্র নদীতে পানি বাড়ছেই। এরমধ্যে তিস্তা বইছে বিপৎসীমার ২২ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে। ব্রহ্মপুত্র বিপৎসীমার ওপরে হলেও কয়েকটা দিন শুকনো গেলে এর পানি স্বাভাবিক মাত্রায় নেমে আসবে বলে জানিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ড। আর বিপৎসীমার সামান্য নীচ দিয়ে বইছে যমুনা-পদ্মা ও সুরমা। তবে এসব নদী তীরে বসবাসকারী মানুষের ঘর-বাড়িতে পানি ঢুকে গিয়ে ও ফসলি জমি তলিয়ে ভয়াবহ বিপদে পড়েছেন তারা। নদী তীর ভেঙে সমানে আগ্রাসী হয়ে উঠছে উত্তাল নদীগুলো। অনেকেই হারিয়ে ফেলছেন ভিটেমাটি, বাপদাদার কবরস্থান, ফসলিজমি, দোকানপাট। কেউ কেউ বাড়ি-ঘর ভেঙে মালপত্র সরিয়ে নিচ্ছেন রাস্তাসহ উঁচু জায়গায়। সরকারি ত্রাণ বেশিরভাগ জায়গাতেই এখনও পৌঁছেননি। খুব সংকট তৈরি হয়েছে গবাদি পশুর খাদ্যের।

জামালপুরে যমুনায় পানি কমলেও বাড়ছে  ব্রহ্মপুত্রে

জামালপুর প্রতিনিধি জানান, জেলায় যমুনা নদীর পানি কমলেও ব্রহ্মপুত্র নদের পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। এতে বন্যা কবলিত হয়ে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন  ব্রহ্মপুত্র পাড়ের বাসিন্দারা। বন্যা কবলিতরা আশ্রয় নিচ্ছেন বিভিন্ন বাঁধ ও উচু সড়কে। দুর্ভোগ  কমাতে ত্রাণ বিতরণ অব্যাহত রেখেছে জেলা প্রশাসন।

জামালপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ আবু সাঈদ জানান, শনিবার দুপুরে যমুনা নদীর পানি বাহাদুরাবাদ ঘাট পয়েন্টে  বিপৎসীমার ৫৯ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। এছাড়া ব্রহ্মপুত্র নদের  পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকলেও বিপৎসীমা অতিক্রম করেনি এবং শাখা নদ-নদীর পানি বাড়ছেই। তিনি আরও জানান, যদি কয়েকদিনের ভেতর ভারি বর্ষণ না হয় তবে পানি আর বাড়বে না।

শনিবার দুপুরে জামালপুর পৌরসভার দেওয়ানপাড়া এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, ব্রহ্মপুত্র নদের পাশে অবস্থিত নাওভাঙ্গা চর এলাকা বন্যার পানিতে প্লাবিত হওয়ায় দুর্ভোগে পড়েছেন সেখানকার বাসিন্দারা।

নাওভাঙ্গা চর এলাকার অধিকাংশ  জায়গা বন্যার পানিতে ডুবে যাওয়ায় সেখানকার বাসিন্দা শহরের আত্মীয় স্বজনের বাড়ি ও নতুন বাইপাস সড়কের ধারে আশ্রয় নিয়েছেন।

.নতুন বাইপাস সড়কে আশ্রয় নেওয়া মো. জামাল উদ্দিনের সঙ্গে কথা হলে তিনি জানান, হঠাৎ করেই বন্যার পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় বাড়ির প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিয়ে সড়কের পাশে আশ্রয় নিয়েছেন তারা। আশেপাশের অনেকেই আত্মীয় স্বজনের বাড়িতে চলে গেছে।

কিন্তু, এখন পর্যন্ত কোনও সরকারি সহায়তা পাননি তারা।

ত্রাণের বিষয়ে জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মো. নায়েব আলী জানান, বন্যা কবলিতদের জন্য নতুন করে ৪৩৪ মেট্রিক টন চাল এবং নগদ ১১ লাখ টাকা বরাদ্দ পাওয়ার পর তা পর্যায়ক্রমে সুষ্ঠুভাবে বিতরণ করা হচ্ছে। সবার কাছে ত্রাণ পৌঁছাতে একটু সময় লাগবে বলে জানান তিনি।

জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, এ যাবত জেলার ৮টি পৌরসভাসহ ৭ উপজেলার ৪৩টি  ইউনিয়নের ৩১৯টি গ্রাম বন্যায় আক্রান্ত হয়েছে। আক্রান্ত ৮৫ হাজার  ১৯৭টি পরিবারের ৩ লাখ ৫৯ হাজার ৪২ জন মানুষ পানিবন্দি রয়েছে। ২২০টি  ঘরবাড়ি সম্পূর্ণ এবং ৫ হাজার ৯৮৭টি ঘরবাড়ি আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ১০ হাজার  ১৯১ হেক্টর জমির ফসল পানিতে নিমজ্জিত রয়েছে। এছাড়া ৪৮.৫ কিলোমিটার কাঁচা

রাস্তা ও ৬.৭৫ পাকা রাস্তা আংশিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ৫০টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ২৫টি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও ৪টি ব্রিজ কালভার্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বন্যা কবলিতদের স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য ৪৩টি মেডিক্যাল টিম কাজ করছে বলে জানা যায়।

 এ যাবত পুরো জেলায় বন্যার পানিতে ডুবে ১০ জন এবং সাপের কামড়ে ১ জনের মৃত্যু হয়েছে।

নীলফামারী প্রতিনিধি- জানান, তিস্তা নদীর পানি আবারও বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। ভারী বর্ষণ আর উজানের ঢলের কারণে শনিবার (৪ জুলাই) সকাল ৯টা পর্যন্ত নীলফামারীর ডালিয়া পয়েন্টে বিপৎসীমার ২২ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে তিস্তার পানি। ব্যারাজে ঘোষিত বিপৎসীমা ৫২ দশমিক ৬০। বন্যার পানি সামাল দিতে ৪৪টি স্লুইস গেট খুলে রেখেছে পাউবো।

ব্যারাজের গেজ পাঠক (পানি পরিমাপক) নুরুল ইসলাম জানান, আজ দুপুর ১২টার দিকে ওই পানি কমে বিপদসীমার ১৮ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। 

ডালিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানায়, ভারী বৃষ্টিপাতের ফলে ডিমলা, জলঢাকা ও লালমনিরহাটের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। পানিবন্দি হয়ে পড়েছে ডিমলার বাইশ পুকুর এলাকার ২৩ পরিবার।

পাউবোর উপ-সহকারী প্রকৌশলী (পানি শাখা) আমিনুর রশিদ জানান, ভারত থেকে নেমে আসা ঢল ও ভারী বৃষ্টিপাতের কারণে নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। বন্যার পানি সামাল দিতে ৪৪টি স্লুইস গেট খুলে রেখেছে পাউবো। এছাড়া ব্যারাজের সব গেট খুলে রাখায় ভাটি এলাকার খালিশা চাঁপানীর চরাঞ্চল প্লাবিত হয়ে বাড়ি ঘর বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে।

উপজেলার পূর্ব ছাতনাই ইউনিয়ন চেয়ারম্যান আব্দুল লতিফ খাঁন মুঠোফোনে জানান, অনেকেই বাড়ি ঘর উঁচু জায়গায় সরিয়ে নিয়েছে।

এদিকে তিস্তার বন্যায় জেলার ডিমলা উপজেলার পূর্ব ছাতনাই, খগাখড়িবাড়ি, টেপাখড়িবাড়ি, খালিশা চাপানী, ঝুনাগাছ চাপানী, গয়াবাড়ী নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়ে ৩ হাজার পরিবারে পানি ঢুকেছে। এছাড়াও জেলার জলঢাকার গোলমুন্ডা, ডাউয়াবাড়ী, শৌলমারী ও কৈমারী ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকায় ১০টি চর ও চর গ্রামের ৫ হাজার পরিবারে বন্যার পানি প্রবেশ করেছে বলে জনপ্রতিনিধিদের দাবি।

ডালিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রবিউল ইসলাম জানান, শুক্রবার সন্ধ্যা ৬ টায় ডালিয়া পয়েন্টে তিস্তার পানি বিপৎসীমার (৫২ দশমিক ৬০ সে.) ৫ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হয়। আজ শনিবার ভোর থেকে ওই পানি বৃদ্ধি পেয়ে বিপদসীমার ২২ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হতে থাকে।

পাবনা প্রতিনিধি জানান, পাবনায় যমুনা নদীর পানি স্থিতিশীল থাকলেও কমতে শুরু করেছে পদ্মার পানি।

পাবনা পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-সহকারী প্রকৌশলী মোফাজ্জল হোসেন জানান, শনিবার (৪ জুলাই) থেকে কমতে শুরু করেছে পদ্মা নদীর পানি। সকালে পাকশী হার্ডিঞ্জ ব্রিজ পয়েন্টে পদ্মার পানি শুক্রবারের তুলনায় ০.০২ সেন্টিমিটার কমে বিপদ সীমার ২.২৭ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। গত শুক্রবার যা ছিল ২.২৯ সেন্টিমিটার।

বেড়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আব্দুল হামিদ জানান, শুক্রবার ও শনিবার স্থিতিশীল অবস্থায় রয়েছে যমুনা নদীর পানি। শনিবার সকালে যমুনার পানি নগরবাড়ি পয়েন্টে বিপদ সীমার ১১ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। শুক্রবারও ছিল একই অবস্থায়। ইতোমধ্যে ডুবে গেছে নদী সংলগ্ন এলাকাগুলো।

গত ২৪ ঘণ্টায় যমুনার পানি বৃদ্ধি না পাওয়ায় স্বস্তি ফিরে এসেছে নদীপাড়ের মানুষদের মনে। তবে পদ্মার তীরবর্তী মানুষের কৃষিজমি নদী ভাঙনের শিকার হওয়ায় তাদের মধ্যে আতঙ্ক আর উৎকণ্ঠা বিরাজ করছে।

 

সুরমা বইছে বিপৎসীমার নিচ দিয়ে

সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, সুনামগঞ্জে সুরমা নদীর পানি বিপৎসীমার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হতে শুরু করায় মানুষের ঘরবাড়ি থেকে বন্যার পানি সরে যেতে শুরু করেছে। তবে গ্রামে যাতায়াতের সড়কগুলো এখনও পানিতে ডুবে আছে। হাওর এলাকার কাঁচা ঘর-বাড়ি ব্যাপক ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। হাওর এলাকার ঘরবাড়ি রাস্তা-ঘাটে এখনও পানি রয়ে গেছে।

জেলা প্রশাসনের কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, জেলায় ৪৬ হাজার ৫৮০টি পরিবার বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এছাড়া ৩ হাজার ২৬৫ হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রসস্ত হয়েছে। গবাদি পশুর রাখার জায়গাগুলো পানিতে নিমজ্জিত হয়ে যাওয়ায় দুর্গতরা গবাদি পশু নিয়ে বিপাকে পড়েছেন। বন্যার পানিতে ভিজে নষ্ট হয়েছে ঘর ও গো-খাদ্য। 

প্রশাসনের পক্ষ থেকে দুর্গত এলাকায় ৫১০ মেট্রিক টন চাল, ৩২ লাখ ৭০ হাজার টাকা ও ২ হাজার ৪০০ প্যাকেট শুকনো খাবার চিড়া, মুড়ি, গুড়, বিস্কুট, দিয়াশলাই, মোমবাতি, খাবার স্যালাইন,পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেটসহ প্রয়োজনীয় ওষুধ বিতরণ করা হয়েছে। 

দুর্গতরা জানান, তাদের বাড়ি ঘরের পানি নেমে গেলেও গ্রামের সড়কগুলো এখনও পানিতে তলিয়ে আছে, দেখা দিয়েছে গো-খাদ্যের সংকট।