দুর্বলরা কখনও শান্তি স্থাপন করতে পারে না, সাহসীরা পারে: মোদি

লাদাখে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী

নিউজ ডেস্ক:    কথা ছিল, ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিংহ সকালে লাদাখ যাবেন। তার বদলে নরেন্দ্র মোদি নিজেই লাদাখে পা রাখলেন।

গালওয়ান উপত্যকায় চীনা সেনার হামলায় ভারতের ২০ জন সেনা মৃত্যুর পরে লাদাখে পৌঁছে মোদি এক দিকে সেনার মনোবল বাড়ানোর চেষ্টা করেছেন। ‘সম্প্রসারণবাদী’ বলে সমালোচনা করেছেন চীনের। অন্যদিকে, গোটা দেশকে রাজনৈতিক বার্তা দিয়েছেন- তিনিই লাদাখ পৌঁছে সেনার পাশে দাঁড়ানোর সাহস দেখাতে পারেন। সীমান্তে ভারতের রাস্তা নিয়ে চীন আপত্তি জানালেও দিল্লি পিছু হটবে না বলেও জানিয়ে দিয়েছেন মোদি।

মোদি বলেন, সম্প্রসারণবাদের যুগ সমাপ্ত হয়েছে। কারও সম্প্রসারণের জেদ চাপলে সে বিশ্ব শান্তির পক্ষে বিপদ হয়ে ওঠে। ইতিহাস বলছে এমন শক্তি বরাবরই ধুলায় মিশে গিয়েছে বা পিছু হটতে বাধ্য হয়েছে।’’

ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের দাবি, ‘মোদির যে সামনে থেকে নেতৃত্ব দেন, তা ফের প্রমাণিত হলো।’’ প্রাক্তন সেনাপ্রধান বিক্রম সিংহও বলেছেন, ‘‘চীনকে কড়া বার্তা দেওয়া গেছে। এটা কৌশলগত ভাবে উপযুক্ত পদক্ষেপ।’’

মোদি বলেন, ‘ভারত মাতার মানসম্মান রক্ষার জন্য আপনাদের সমর্পণ অতুলনীয়। যে কঠিন পরিস্থিতিতে, যে উচ্চতায় ভারতমাতার ঢাল হয়ে আপনারা তাকে রক্ষা করেন, তার সেবা করেন, তার মোকাবিলা পুরো বিশ্বে কেউ করতে পারে না। শত্রু আপনাদের তেজ ও ক্রোধ দেখেছে।’

দুর্বলরা কখনও শান্তি স্থাপন করতে পারে না, সাহসীরা পারে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

প্রধানমন্ত্রী তাঁর লাদাখ সফরের মাধ্যমে আসলে একাধিক বার্তা দিয়েছেন। প্রথম বার্তাটি নিজের সেনাবাহিনীর প্রতি। বীরভোগ্যা বসুন্ধরা শব্দবন্ধটির প্রয়োগ কোনও সামান্য ঘটনা নয়, এর দ্যোতনা অপরিসীম। ভারতের জনগণের দ্বারা নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী ভারতের আমজনতার প্রতিনিধিরূপেই লাদাখ গিয়েছিলেন। ওঁর প্রতিটি বক্তব্যের মধ্যে তাই সেনার প্রতি সম্মান, তাঁদের ত্যাগ ও শৌর্য্যের প্রতি অসীম শ্রদ্ধা আর তাঁদের অটল নিশ্চয়তার প্রতি দেশবাসীর অটুট বিশ্বাস ঝরে ঝরে পড়ছিল।

এই সফরের ফলে সীমান্তে এবং সারা দেশ জুড়ে সেনাবাহিনীর মনোবল যে এখন গগনচুম্বী, সে কথা নিশ্চয়ই আর বলার অপেক্ষা রাখে না।

প্রধানমন্ত্রীর বার্তা ছিল দেশবাসীর প্রতি। অস্মিতার প্রশ্নে, সার্বভৌমত্ব রক্ষার প্রশ্নে এবং অন্যায়কে আর প্রশ্রয় না দেওয়ার ক্ষেত্রে দেশ দৃঢ় পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে, সেটা স্পষ্ট। এই লড়াইয়ে দেশের মুখিয়া সোজাসুজি জমিতে নেমে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিতে প্রস্তুত, তিনি রাজধানীর ঠান্ডা ওয়াররুমে নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখতে রাজি নন, দেশ তাঁর ওপর যে দায়িত্ব দিয়েছে তা অক্ষরে অক্ষরে পালন করতে তিনি যে বদ্ধপরিকর, দেশবাসীর প্রতি সেই বার্তাটিও অত্যন্ত দৃশ্যময় ছিল।

তাঁর বার্তাটি ছিল চিন এবং পাকিস্তানের প্রতি। এবং সেই দেশগুলির নাম না করেই তিনি সুকৌশলে বার্তাটি দিলেন, অর্থাৎ যাকে ‘অনারেবেল এক্সিট’ বলে অর্থাৎ সম্মানজনক পশ্চাদপদ, তাদের জন্য সেই রাস্তাও খোলা রাখলেন।

কিছু কথা প্রধানমন্ত্রী মুখে বলেছেন আর কিছু কথা তাঁর শরীরী ভাষায় ফুটে উঠেছে। ইংরেজিতে স্ট্র্যাটেজিক অপটিক্স বলে একটি কথা আছে, অর্থাৎ সুকৌশলী দৃশ্যময়তা। উনি যখন আকসাই চিনের সীমান্তে দাঁড়িয়ে বিস্তারবাদ এবং বিকাশবাদের কথা বলেন, দিল্লিস্থিত চিনা দূতাবাসের আত্মরক্ষামূলক প্রতিক্রিয়া থেকেই স্পষ্ট হয়ে যায় আঘাতটি ঠিক কোথায় এবং কতটা লেগেছে।

আবার যখন মুষ্টিবদ্ধ হাত তুলে ‘ভারত মাতা কি জয়’ আর ‘বন্দে মাতরম’ ধ্বনি দেন, যখন লেহ্‌তে সেনা হাসপাতালে বীর সন্তানের জন্মদাত্রীদের শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করেন অথবা ১৪ কোরের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে দাঁড়িয়ে বলেন যে শত্রুপক্ষ ভারতীয় সেনার ‘ফায়ার অ্যান্ড ফিউরি’ অর্থাৎ শক্তি এবং প্রকোপ দুটোরই সাক্ষী, তখন চিন বা পাকিস্তান কারওরই বুঝতে বাকি থাকে না, কাদের উদ্দেশে উনি বার্তা দিচ্ছেন।

তাঁর এই সফরে সারা পৃথিবীর জন্য আরও একটি না বলা বার্তা অন্তর্নিহিত ছিল। ভারত একটি গণতান্ত্রিক দেশ। আমাদের প্রধানমন্ত্রীকে দেশের মানুষ ভোট দিয়ে নির্বাচন করেন। অন্য দিকে চিন বা পাকিস্তানে মানুষের ভোটে জিতে নয়, আইএসআই বা কমিউনিস্ট পার্টির মতন একটি তৃতীয় শক্তি মিথ্যা নির্বাচনের মাধ্যমে এক জন পুতুল শাসক নিযুক্ত করে বকলমে তাদের দিয়ে স্বৈরাচারী শাসন চালায়।

এক দিকে প্রতিবেশী দেশে জমি দখলকারী, দুর্নীতিগ্রস্ত, বিবাদকামী নেতৃত্ব আর অন্য দিকে ভারতে শান্তিপ্রিয়, স্বচ্ছ, উন্নয়নকামী জননেতা— দু’পক্ষের নেতৃত্বের পার্থক্যটিও নেতৃত্বের আচরণের মাধ্যমেই পরিষ্কার হয়ে যায়।

ভারত ন্যায়ের ভূমিও বটে এবং ক্ষমার অযোগ্য অন্যায় সহ্য করা ভারতের রাষ্ট্রধর্ম নয়। ভারত তার ভূমিকা স্থির করে নিয়েছে এবং গত কাল সারা বিশ্বকে সেটা চোখে আঙুল দিয়ে প্রধানমন্ত্রী দেখিয়েও দিয়েছেন। এ বার সারা বিশ্বকে তাদের নিজেদের অবস্থান স্থির করতে হবে।

সূত্র: আনন্দবাজার