মানুষ ও বসতির দেহ-সামাজিক দূরত্ব সংকটে

প্রফেসর ড. মো: ফখরুল ইসলাম: শুধু রাজধানীর দালান-বস্তির কথা নাইবা বল্লাম। ঢাউস অট্টালিকার মাথা উঁচু করার প্রবণতা এখন দেশের সব বড় শহর ছাড়িয়ে জেলাগুলোতেও দেখা যাচ্ছে। রাজধানীর আশে পাশের সব উপজেলাগুলোতে পোষাক তৈরীর কারখানা সম্প্রসারিত হওয়ায় বসতবাড়ির চাহিদা ও ভাড়া দু’টোই বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে তিলমাত্র জায়গা ছাড় না দিয়ে গড়ে উঠেছে উঁচু উঁচু দালান কোঠা। নাগরিক সুবিধার ধার না ধেরেই সেগুলোতে গড়ে উঠেছে দোকান, অফিস, মেসবাড়ি। এগুলোর জন্য আলাদা জোন থাকার কথা সবসময় বলা হলেও একই জোনে সব্ইা থাকে সবকিছু পাওয়া যায়।এতদিন এসব নিয়ে মাথা ঘামানোর প্রয়োজন হলেও ততটা গুরুত্ব দেয়া হয়নি। করোনার আতঙ্ক চতুর্মুখী সমস্যা সৃষ্টি করায় বিষয়টি নিয়ে নতুন করে মাথা ঘামাতে হচ্ছে।

আমার এক পরিচিতজনের পাশের বাড়িটি সাত তলা বিশিষ্ট একটি বৃহৎ মেস। নিম্ন আয়ের অনেকগুলো মানুষ স্বল্প ভাড়ায় সেখানে বসতি গেড়েছেন। কোন কোন তলায় এক কক্ষে চার-পাঁচটি বেড। তবে প্রতি বেডে ডাবল করে ঘুমানোয় এককক্ষে থাকেন অনেকজন। টয়লেট স্বল্পতা, রান্না করার সংকট তো আছেই। ওদিকটা না ভেবে শুধু ভাবতে অবাক লাগে -করোনা সংকট মোকাবেলায় যে ধরনের ব্যক্তি-দৈহিক ও সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে স্বাস্থ্য বিধি মেনে চলার কথা বার বার বলা হচ্ছে সেটা তাদের জন্য পালন করার চিন্তা করাটাই অবান্তর।

এর ওপর পাশের বাড়িতে সংক্রমণ চিহ্নিত হওয়ায় লক-ডাউন জারি করা হয়েছে। সেটা আরো উঁচু। দুই বিল্ডিং-এর মধ্যে দৈহিক দূরত্ব খুব কম। যখন পাশের বাড়িটা বানানো হয়নি তখন এখানে জানালা খোলা রেখে প্রাকৃতিক বাতাস খেয়ে বিছানায় ঘুমানো যেত। পাশের বিল্ডিং দুই ফুট উচু করে ফ্লোর তৈরী করায় ঐবাড়ির জানালা থেকে এই বাড়ির বেডরুম দেখা যায়। তাই চব্বিশ ঘন্টাই জানালা বন্ধ রাখতে হয় অথবা ভারী পর্দা টাঙ্গিয়ে রাখতে হয়। ডাবল পর্দা ছাড়া এদের বেডরুমে আলো জালানোই মুষ্কিল।

কয়েকটি ফ্লোরে উচ্চ বেতনভোগী কিছু চাকুরীজীবি পরিবার-পরিজন নিয়ে বসবাস করেন। ছোট সন্তানরা আগে জানালা দিয়ে বাইরে তাকাতো, কথা বলতো। এখন করোনার ভয়ে তাদের মা বাসার জানালা বন্ধ করে দেয়। ওনারা এখন সার্বক্ষণিক এসি চালান। এজন্য বিদ্যূৎ বিল বেশী আসলেও দেরীতে বিল দেয়া যাবে, এই ভেবে গত তিন মাস বকেয়া বিল দেয়া হয়নি। এজন্য এতদিন ভাবতে হয়নি। এখন বিদ্যূৎ প্রতিমন্ত্রী নতুন ঘোষণা দিয়েছেন যে, ৩০ শে জুনের মধ্যে বিদ্যূৎ বিল পরিশোধ করতে হবে। তা না হলে ব্যবস্থা নেয়া হবে। বকেয়া পরিশোধের জন্য আর সময় বাড়ানো হবে না। একসংগে এত টাকা বিল কিভাবে শোধ দেবেন তা নিয়ে দুশ্চিন্তাটা বেড়ে গেল তাঁর।

পাশের বাড়িতে লক-ডাউন জারি করার পর নতুন চিন্তা মাথায় দেখা দিয়েছে। ওদের মা টিভিতে শুনেছেন- করোনা ভাইরাস নাকি ছয় ফুটের বেশী দূরত্বেও সংক্রমিত হতে পারে। বাতাস দ্বারা সংক্রমিত না হলেও নাকি এরা বাতাসে ১২/১৩ ফুট উড়ে যেতে পারে। ওদের জানালায় কেউ হাঁচি-কাশি দিলে বা কেউ থুথু ফেললে এবং সেসময় আমাদের জানালা যদি খোলা থাকে তাহলে কি হবে? নানা চিন্তা ওদের মায়ের মনের মধ্যে। তাই আজকাল বাচ্চারা আর জানালার ধারে যেতে পারে না। এমনকি ওদরে ছাদটা পাশের বিল্ডিং-এর ছদের চেয়ে নিচু হওয়ায় এখন এদের ছাদে খেলতে যাওয়া বারণ। এদিকে বিদ্যুৎ চলে গেলে ভ্যাপসা গরমে ত্রাহি অবস্থা শুরু হয়ে যায়। এ কেমন জীবন যন্ত্রণা! দাদু আগে ছাদে যেতেন স্টীলের সিঁড়ির হাতল ধরে ধরে একাই। এখন ঐ হাতলটা ধরতেই ভয়! স্টীলের মধ্যে নাকি করোনার জীবাণু বেশীদিন বেঁচে থাকে! ঘরে ঢুকে বার বার সাবান দিয়ে হাত ধুতে তাঁর ভাল লাগে না। এখন হাতল ধরতেই তাঁ গা শিউরে উঠে! ঘরের মধ্যে বসে থাকতে থাকতে তাঁর দু’পা ফুলে ঢোল হয়ে উঠেছে। ব্লাড সুগার বেড়ে গেছে। এমন ভীতিকর জীবন যন্ত্রণা আর ভাল্লাগে না তাঁর। তিনি প্রতি রাতেই আক্ষেপ করে বলে উঠেন-কবে যে ঘর থেকে বের হয়ে পার্কে একটু হাঁটতে যেতে পারবো! ঘরের জানালা খুলেও ঘুমাতে পারি না। আমাকে তোরা গ্রামে রেখে আয়, এখানে আর পারি না।

আধুনিক অট্টালিকা গড়ে উঠেছে কবুতরের বাসার খোপের মত। একটা বিল্ডিং থেকে অন্যটার তেমন ফাঁক নেই। একটা ভেঙ্গে আরেকটার গায়ে পড়লে বা আগুন লাগলে ফায়ার ব্রিগেডের গাড়ি ঢোকার মত প্রশস্ত রাস্তাও রাখা হয়নি এসব এলাকায়। দাদু বলতে লাগলেন- এরই মধ্যে একদিন সর্দ্দিজর হওয়ায় বাসার সবাই আমাকে সন্দেহ করতে শুরু করে বলল- যান করোনা টেষ্টটা করিয়ে আসেন। এক সকালে ছেলের গাড়িতে যেতে রাজি হলাম। পথের দৃশ্য তাকিয়ে দেখলাম- দু’মাস পর রাস্তায় গাড়ি নেমেছে। পিঁপড়ার সারির মত গাড়ির সারি। ফুটপাতগুলোতে মানুষ আগের মতই ঠেলাঠেলি করে চলাফেরা করছে। ড্রাইভার আমাকে হাসপাতালে নমিয়ে দিয়ে ছেলেকে নিয়ে অফিসে চলে গেল। লাইনে দাঁড়ালাম। দীর্ঘক্ষণ দাড়িয়ে থেকে বিরক্তি বেড়ে যাচ্ছে।

সেখানে একজনের সাথে কথা বলার সুযোগ হলো। তিনি তাঁতীবাজার থেকে এসেছেন। গতকালও এসছিলেন। সকাল নয়টা থেকে বারোটা পর্যন্ত লইনে দাড়িয়ে থাকার পর জানলেন-আজ আর হবে না। আজও অনেক ভীড়। প্রতিদিন দেড়শ’ টেষ্ট করা হয়। লাইনে চার-পাঁচশ’ মানুষ দাঁড়িয়ে ভীড় করছে, টেষ্ট হবে তো? ব্যক্তি থেকে ব্যক্তি দূরত্ব কেউই মানছেন না। মনে মনে ভাবলাম, এখন অনলাইনে নাকি সবকিছু করা হয়। তবে টেষ্ট করানোর জন্য আগেভাগে অনলাইনে রেজিষ্ট্রেশন করিয়ে সিরিয়াল নম্বর দিয়ে শুধু নির্দিষ্ট সংখ্যক মানুষকে ঐদিন টেষ্টের জন্য ডাকলেই ঝামেলা চুকে যায়।

এখন লাইনে যারা দাড়িঁয়েছেন তাদের শতকরা ২২ ভাগ করোনায় পজিটিভ শনাক্ত হচ্ছেন। সেক্ষেত্রে একজন করোনা নেগেটিভ সুস্থ মানুষও তো এভাবে গিজ গিজ করে লাইনে দাঁড়ানোর ফলে সংক্রমিত হবার ভয় রয়েছে। এতটুকু চিন্তাও কি ওনাদের মাথায় আসছে না? করোনার কথা মাথায় রেখে স্বাস্থ্য সুরক্ষাকে বাঁচিয়ে রাখতে এবছর স্বাস্থ্য খাতে বাজেটের ৫% বরাদ্দ দাবী করা হলেও তা সামান্যই বাড়ানো হয়েছে। এতে স্বাস্থ্য খাত এবার গুরুত্বের দিক থেকে আট নম্বর সিরিয়ালে পিছিয়ে গেছে। এবারে ১৩৬ পৃষ্ঠার বাজেট বক্তৃতায় কোভিড শব্দটি ৬২ বার ও করোনাভাইরাস শব্দ দুুটি ৩৬ বার উচ্চারণ করা হলেও দেশের বর্তমান জনস্বাস্থ্য ও আর্থিক পরিস্থিতি নিয়ে কোন বিশ্লেষণ নেই। রোগী ও স্বজনদের করোনা চিকিৎসায় ভোগান্তি ও অপমৃত্যুর জন্য সমবেদনাটুকু জানানোর বা কোন জবাবদিহিতার প্রচেষ্টা লক্ষ্য করা যায়নি।

বড় শহরগুলোতে যে কী হলো- অট্টালিকা বানানো হয়েছে ঘেঁষাঘেষি করে। মানুষ একজন আরেকজনের গা ঘেঁষেই চলাফেরা করতে অভ্যস্থ। কনুইয়ের গুঁতো, আরেকজনের গায়ের ঘাম মাখামাখি করে বাসায় না ফিরলে নাকি আমাদের অনেকের পেটের ভাত হজম হয় না। এজন্য নাকি আমরা লাইভলি শহরে বসবাস করার খেতাবও পেয়েছি। মানুষের দলীয় বা পশুর মত পাল ধরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা (হার্ড-ইমিউনিটি) তৈরীর জন্য নাকি সবকিছু খোলা রেখে কাজ করার জন্য সীমিত চলাফেরা করতে বলা হয়েছে। সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষেরা সীমিত চলাফেরা করে জীবিকা অন্বেষণে টিকতে পারবে না। আবার ‘হার্ড-ইমিউনিটি’ তত্তনুযায়ী তারাই বেশী সংখ্যায় বিলীন হয়ে যাবার আশঙ্কা রয়েছে। আমি তো দেখছি এই অসীমের মাঝে মানুষ সীমাহীন চলাফেরা করছে।

এভাবে ভাবতে ভাবতেই হঠাৎ আমার ডাক পড়লো। নমুনা দিয়ে দিলাম। ক’দিন পর ফোন করে ফলাফল জানাতে চাইলো। ছেলের ড্রাইভারকে ফোন করলে সে কিছুক্ষণ পর আমাকে নিতে আসলো।

উপরের কথাগুলো হাঁটার জন্য স্টীলের সিঁড়ি ধরে ছাদে ওঠা ওই বাসার দাদুর অভিজ্ঞতার ঝুলি থেকে নেয়া।

করোনায় পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষের উপার্জন আজ ক্ষতিগ্রস্থ। সংবাদে জানা গেছে করোনার করাল আক্রমণে ইতোমধ্যে আমাদের দেশে ৯৫% মানুষের উপার্জন ক্ষতিগ্রস্থ হয়ে পড়েছে। আমাদের মানুষ বেশী, বাড়ি-ঘরের সংখ্যাও বেশী। গ্রামে অনেকটা সহনশীল পর্যায়ে হলেও বড় শহরগুলো মানুষের চাপে নূব্জ্য হয়ে পড়েছে। এগুলোর শিল্প ও বস্তি এলাকায় মানুষ ও বসতবাড়ির পারস্পরিক সম্পর্কটা যেন দায়সারা গোছের। এগুলোতে স্বাস্থ্যবিধি মেনে বসবাস করা যেমন দূরূহ, করোনা প্রতিরোধ করার জন্য নির্দেশিত ব্যক্তি-সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখাও তত বেশী কঠিন। এ পর্যন্ত করোনা রোগের সুনির্দিষ্ট কোন চিকিৎসা পদ্ধতি নেই। কার্যকরী টিকা আবিষ্কারের কথা বহুদিন ধরে অনেকেই শোনাচ্ছেন। সেই যাদুকরী আশার কথা শুনতে শুনতে আশাহত হয়ে অনেকে পরপারে চলে গেছেন। দেশে ইতোমধ্যে এ লক্ষ দু’হজারের অধিক মানুষ আক্রান্ত হয়েছেন, মারা গেছেন এক হাজার তিনশত আটাশি জন। সিজিএস-এর গবেষণায় বলা হয়েছে- করোনার লক্ষণ নিয়ে আরো মারা গেছেন এক হাজার সত্তর জন।

দেশে জুন ২৯ পর্যন্ত ৬০ জন চিকিৎসক এবং সাবেক একজন স্বাস্থ্যমন্ত্রী ও ধর্মমন্ত্রী মহোদয়ও সবাইকে কাঁদিয়ে না ফেরার দেশে চলে গেছেন। করোনাতঙ্কে মানুষের মন ভেঙ্গে যাবার মধ্যেও অনেক দেশে বিভিন্ন ইস্যূতে সামাজিক ও রাজনৈতিক আন্দোলন ও দাবী শুরু হয়েছে। ফলে রাষ্ট্রগুলো করোনা সংকট সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে। বেকারত্ব বেড়ে যাওয়ায় অর্থনৈতিক সংকটে সারা পৃথিবীর অগণিত মানুষ এখন দিশেহারা। সামনের দিনগুলো আরো ভয়ংকর বলে অনেক অভিমত দিয়েছেন। অনাগত সেই যুগে করোনার চেয়ে অতি ভয়ংকর কোন মনো-সামাজিক ব্যাধি বা পরি-সামাজিক দুর্যোগ এলে হয়তো পৃথিবীতে প্রতিবাদ করার মত কোন মানুষকে সেদিন খুঁজেই পাওয়া যাবে না। তাই এখনও সময় আছে আমরা নিজেদের নিরাপত্তা নিজের মত করে ভাবি ও মেনে চলি। পাশাপশি, পরিবার, সমাজ ও সমষ্টি পরিবেশের জন্যেও যথাযথ উপকার করতে না পারলেও সাধ্যমত সহযোগিতা করতে সবাই এগিয়ে আসি।

*লেখক রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডীন, সমাজকর্ম বিভাগের প্রফেসর ও সাবেক চেয়ারম্যান।E-mail: fakrul@ru.ac.bd

জেড,আই/ঢাকানিউজ২৪ডটকম