লতিফুর রহমানের কাছ থেকে পাওয়া তিন শিক্ষা

তাজদিন হাসান:  খ্যাতনামা উদ্যোক্তা ও শিল্পপতি, ট্রান্সকম গ্রুপের চেয়ারম্যান লতিফুর রহমানের চিরবিদায়ে শোকাহত দেশবাসী। মৃত্যুর খবর শোনার পর থেকেই স্যারের সঙ্গে বেশ কিছু স্মৃতি মনে পড়ে যাচ্ছিল আমার। একবার তার বাসায় গিয়েছিলাম দাওয়াতের সুবাদে। সেদিন খেয়াল করলাম, আমি পাতে খাবার না নেয়া পর্যন্ত পুরোটা সময় তিনি দাঁড়িয়ে রইলেন। এই দৃশ্যটি সারাজীবন চোখে ভাসবে আমার। হ্যাঁ, তিনি এতটাই বিনয়ী ছিলেন।

আমি যে প্রতিষ্ঠানে কাজ করছি, তার পরিচালনা পরিষদের একজন ছিলেন লতিফুর রহমান। সে সুবাদে তার নেতৃত্বে কাজ করার সৌভাগ্য হয়েছিল। তার কাছ থেকে পাওয়া তিনটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষার কথা বলছি। এগুলো সারাজীবন মনে রাখবো এবং মেনে চলবো।

প্রথমত, নৈতিকতা। কিছু কিছু সময় গিয়েছে যখন ব্যবসা বেশ কঠিন অবস্থার সম্মুখীন হয়েছিল। সে সময়গুলোতে উদ্ভূত সমস্যা সমাধান করতে যেকোন পরিকল্পনা, কার্যক্রমে কোন ধরনের পরিবর্তন আনা, ইত্যাদি বিষয়ে যখনই কোন আলোচনায় বসতাম আমরা, লতিফুর রহমান স্যার সবসময় বলতেন- ‘যা কিছুই করো না কেনো, তোমার প্রতিষ্ঠানের নৈতিকতাকে কখনো ভুলে যাবে না। ভালো সময় এবং খারাপ সময় সব ব্যবসাতেই আসবে, কিন্তু এর নীতি সব সময় থেকে যাবে। সুতরাং, নীতি থেকে কখনোই সরে যাওয়া যাবে না’। তার এই অসামান্য চিন্তা আমি সেদিন থেকে লালন করে আসছি।

দ্বিতীয়ত, সবার ক্ষমতায়ন। লতিফুর রহমানের সঙ্গে যারাই কাজ করতেন, তাদের সবারই ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন অসাধারণ। বন্ধুসুলভ বাচনভঙ্গি তো তার ছিল বটেই, তাছাড়াও তিনি সবসময় নিশ্চিত করতেন তার সাথে কর্মরত মানুষগুলো যেন তাদের কাজকে উপভোগ করে। আর তা তিনি করতেন ক্ষমতায়নের মাধ্যমে। একবার আমাদের একটি মার্কেটিং প্রজেক্ট ওয়ান-ইফরা এবং গুগলের মতো খ্যাতনামা প্রতিষ্ঠান থেকে সম্মাননা পায়। আমাদের এই অ্যাওয়ার্ড পাওয়ার খবরটি যখন তাকে জানাই, তিনি শুধু আমাকে সাধুবাদই জানাননি, বরং তিনি আমাকে উৎসাহ দিয়েছিলেন ভবিষ্যতে কাজে আরো বেশি পরিশ্রমী হবার। হ্যাঁ, তিনি এভাবেই সারাজীবন তার সঙ্গীদের ক্ষমতায়ন করে গিয়েছেন।

তৃতীয়ত, দূরদর্শিতা। হ্যাঁ, ব্যবসায়িক ক্ষেত্রে লতিফুর রহমান ছিলেন যথেষ্ট দূরদর্শী মানুষ। তার ব্যবসায়ীক দৃষ্টিকোণ এবং কল্পনা সব সময় থাকতো যথাযথ, অর্জনযোগ্য ও প্রাসঙ্গিক। তিনি চাইতেন তার সঙ্গে যারা কাজ করছে তারাও তার সঙ্গে ঠিক একই স্বপ্ন দেখবে এবং একই পথে চলবে সে স্বপ্নকে বাস্তবায়ন করতে। এটিও ছিলো তার একটি বিশাল গুণ যার কারণে তিনি এদেশের একজন অবিস্মরনীয় মানুষ হয়ে থাকবেন।

ব্যক্তিগত জীবনে বেশ ক’টি দুর্ঘটনার সম্মুখীন হয়েছেন লতিফুর রহমান। যেদিন আমাদের ছেড়ে অনন্তের পানে চলে গেলেন, ঠিক তার চার বছর আগে একই দিনে নাতি ফারাজ হোসেনকে হারিয়েছিলেন হলি আর্টিসান হামলায়। এত কঠিন বাস্তবতাগুলোর সঙ্গে লড়াই করেও মনোবলকে স্থির রেখে অসামান্য নেতৃত্বের দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে সক্ষম হয়েছেন যিনি, তিনি আর কেউ নন, আমাদের সবার শ্রদ্ধেয় লতিফুর রহমান।

নিজেকে ভাগ্যবান মনে করি লতিফুর রহমানের মত একজন অসামান্য ব্যক্তিত্বের সান্যিধ্যে আসতে পেরেছিলাম বলে। আমি মনে করি, তার চলে যাওয়াটা এদেশের জন্য একটি বড় ক্ষতি। তার নেতৃত্বে থাকা প্রতিটি ব্র্যান্ড ও প্রতিষ্ঠানের জন্য একটি ক্ষতি। তবে বলা বাহুল্য যে তার অসামান্য জীবনী অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে এদেশের প্রতিটি তরুণ স্বপ্নবাজের জীবনে।

আমি লতিফুর রহমানের বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করছি। তার পরিবার ও স্বজনের প্রতি গভীর শোক ও সমবেদনা।

লেখক: হেড অব মার্কেটিং, দ্য ডেইলি স্টার; অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ‘মিশন সেভ বাংলাদেশ’