করোনা ভাইরাস প্রতিরোধে গর্ভবতী মায়েদের সচেতনতা

সেলিনা আক্তার:  করেনা ভাইরাস আতঙ্কে ভুগছে পুরো বিশ্ব। এমন অবস্থায় গর্ভবতী নারীর ভয় পাওয়াটাই স্বাভাবিক। আক্রান্ত দেশগুলোতে গর্ভবতী নারীদের ভ্রমণের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে কিছু দেশ। আমরা সবাই জানি যে এখন আমাদের জীবন স্থবির হয়ে দাঁড়িয়েছে এবং প্রতিদিনের জীবনে এই পরিবর্তনের পিছনে একটি নির্দিষ্ট কারণ হিসেবে রয়েছে কোভিড-১৯ করোনা ভাইরাস।

যেকোনো ব্যক্তি যে কোনো সময় করোনা ভাইরাসে সংক্রামিত হতে পারেন এবং অন্যকে সংক্রমিত করতে পারেন- শিশু থেকে বয়স্ক এমনকি গর্ভবতী মহিলারা পর্যন্ত।

সালেহা চৌধুরী (৩০) নয় মাসের অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন। জুন মাসের প্রথম সপ্তাহে তার ডেলিভারি হওয়ার কথা ছিলো। মে এর প্রথম সপ্তাহে তিনি করোনা পজেটিভ হন। এতে তিনি, তার পরিবার এবং তার চিকিৎসকও ঘাবড়ে যান। চিকিৎসকের পরামর্শে তিনি করোনার চিকিৎসা নেন এবং তা সেরে যাওয়ার পর সিজারিয়ান অপারেশনের মাধ্যমে তার একটি পুত্র সন্তান জন্মগ্রহণ করে। বর্তমানে সালেহা ও তার পুত্র সন্তান ভালো আছেন।

কোভিড-১৯ করোনা ভাইরাস একটি শ্বাসযন্ত্রের রোগ যা মানুষের মাধ্যমে মানুষের মধ্যে সংক্রমণে ছড়িয়ে পড়ে। আক্রান্ত ব্যক্তির শ্বাস প্রশ্বাসের মাধ্যমে কোনো ফোঁটা ড্রপলেট বাতাসে ছিটকে বা কাশির সময় ভাইরাসটি ছড়িয়ে পড়ে। কেউ যখন কোনো সংক্রমিত ব্যক্তি যিনি ইতিবাচকভাবে পরীক্ষিত হয়েছেন, তার ছোঁয়া বা সরাসরি কোনো সংক্রমিত ব্যক্তির দ্বারা সংক্রমণটি ছড়িয়ে যেতে পারে।

সাধারণত গর্ভবতী নারীর করোনা হলে অন্যান্য সাধারণ লোকের মতোই লক্ষণ দেখা দেয়। খুব বেশি কিছু পার্থক্য হয় না। ধারণা করা যায় সন্তানসম্ভাব্যরাও অন্যদের মতোই মাঝারি ধরনের ঠাণ্ডা, জ্বর, কাশি ইত্যাদি উপসর্গে ভুগে থাকেন। খুব বেশি খারাপ অবস্থা যেমন- নিউমোনিয়ার মতো শ্বাসকষ্ট ইত্যাদি হয় সাধারণত যারা বয়োবৃদ্ধ, তাদের। গর্ভবতী মায়ের যদি শ্বাসকষ্ট, অ্যাজমা থেকে থাকে, তবে করোনার প্রভাবে তার অবস্থা মারাত্মক হবার সম্ভাবনা রয়েছে। মনে রাখতে হবে একজন সন্তানসম্ভাব্য মায়ের করোনায় আক্রান্ত হবার ঝুঁকি একজন সাধারণ নারীর চেয়ে বেশি।

মায়ের করোনা হলে গর্ভের সন্তানের করোনা হবেই কিনা বিষয়ে এখনো নিশ্চিত নন চিকিৎসকরা। তবে এটি বলা যায় যে, সম্ভবত করোনার কারণে মিসক্যারেজ বা গর্ভপাতের সম্ভাবনা নেই। এমনকি ভাইরাসটি গর্ভস্থ সন্তানের দেহে ছড়িয়ে পড়বেই, এমনও না। তবে হ্যাঁ, সন্তান জন্মের সময় যদি মায়ের করোনা হয়ে থাকে তবে নবজাতকেরও করোনা সংক্রমণের পরীক্ষা করতে হবে।

শেখ রাসেল গ্যাস্ট্রোলিভার ইন্সটিটিউট এন্ড হাসপাতালের মেডিকেল অফিসার বলেন, “গর্ভধারণকালে একজন গর্ভবতী মায়ের এমনিতেই রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়। করোনায় আক্রান্ত হলে তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা আরো কমে যায়। এ সময় তাদেরকে সাধারণত আয়রন, ফলিক এসিড এবং ক্যালসিয়াম ছাড়া অন্য কোনো বড়ি বা ওষুধ সেবন করতে দেওয়া হয় না। যদি তারা কোভিড-১৯ এ আক্রান্ত হন তাহলে তাদেরকে যে সমস্ত ওষুধ দিয়ে চিকিৎসা করা হবে সেগুলো মা ও গর্ভস্থ ভ্রুণের জন্য কতটা নিরাপদ বা তার ফলাফল কি হবে তা এখনো জানা যায়নি। সবকিছু একটা ট্রায়েলের মধ্যে আছে। ফলে করোনাকালে গর্ভধারণ আক্ষরিক অর্থেই ঝুঁকিপূর্ণ।

এই ঝুঁকির বিষয়গুলো জানতে ‘বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাসহ বিভিন্ন সংস্থা গবেষণা করছে। ইউনিসেফের ৭ মে ২০২০-এর এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে দেখা যায়, “বাংলাদেশে কোভিড-১৯ মহামারীকালীন সময়ের মধ্যে আনুমানিক ২৪ লাখ শিশুর জন্ম হবে এবং বৈশ্বিকভাবেও এর প্রভাবের মধ্যে আনুমানিক ১১ কোটি ৬০ লাখ শিশুর জন্ম হবে। গত ১১ মার্চ কোভিড-১৯ মহামারি হিসেবে চিহ্নিত হওয়ার ৪০ সপ্তাহের মধ্যে এইসব শিশুর জন্ম হওয়ার কথা রয়েছে। এই মহামারীর প্রভাবে বিশ্বজুড়ে স্বাস্থ্যসেবা চাপের মুখে এবং চিকিৎসা সরঞ্জাম সরবরাহ প্রবাহ ব্যবস্থা বিঘ্নিত হচ্ছে।”

ইউনিসেফ আরো বলেছে, “প্রসূতি মা ও নবজাতকদের রুঢ় বাস্তবাতার সম্মুখীন হতে হবে। বিশ্বজুড়ে লকডাইন ও কারফিউয়ের মতো নিয়ন্ত্রণমূলক নানা পদক্ষেপ, মহামারি সামলাতে স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলোর হিমশিম অবস্থা ও সরঞ্জামের ঘাটতি এবং ধাত্রীসহ অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীরা কোভিড-১৯ এর সেবাদানে নিয়োজিত হওয়ায় শিশুর জন্মের সময় দক্ষ লোকবলের ঘাটতি থাকবে।”

-২-

স্বাস্থ্য অধিদফতরের তথ্য মতে বাংলাদেশে করোনা আক্রান্ত নারীর দুই শতাংশই গর্ভবতী। এ কারণে এই সময়ে গর্ভধারণ না করার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক অধ্যাপক এবিএম আব্দুল্লাহ এ সময়ে গর্ভধারণ না করার পরামর্শ দিয়ে বলেন, গর্ভবতী মায়ের নিয়মিত চেকআপ করতে না পারাটা যেমন বিপজ্জনক, তেমনি গর্ভবতী মা করোনায় আক্রান্ত হলে বিপদ আরো বেশি। করোনায় আক্রান্ত মায়ের সন্তান জন্মগত ত্রুটি নিয়ে জন্মাতে পারে। আবার মৃত সন্তানও প্রসব করতে পারে।

ভাইরাসের ভয়ে অনাগত শিশুটির চিন্তায় গর্ভবতী নারীদের আতঙ্কিত না হলেও চলবে। তবে ঝুঁকির কারণগুলো এড়িয়ে এবং সচেতন থেকে প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলাই হবে বুদ্ধিমানের কাজ। যেহেতু লক্ষণগুলো ফ্লুর মতোই সংক্রমিত হয়, তাই অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বন করা ভালো।

নিয়মিত হাত ধোয়া জরুরি। সদ্য প্রকাশিত ডাব্লুএইচও-এর নির্দেশনাবলী অনুসারে সংক্রমণ ও জীবাণু ছড়িয়ে পড়া এবং অন্যান্য সংক্রমক রোগের বিস্তার রোধ করতে মাস্ক পাবার চেয়েও হাত পরিস্কার রাখা স্বাস্থ্যকর এবং কঠোর হ্যান্ডওয়াশ অনুশীলন করা আরও গুরুত্বপূর্ণ। যদি গর্ভাবস্থায় কেউ অসুস্থ বোধ করেন বা সমস্যা মনে করেন তবে সেদিকে নজর দিন। বাড়িতে থাকা এবং প্রচুর বিশ্রাম নেওয়া জরুরি। এছাড়াও প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন সি জাতীয় খাবার ও হালকা গরম পানীয় গ্রহণ করুন। প্রতিদিনের পরিহিত কাপড় ভালো করে সাবান দিয়ে ধুয়ে ফেলুন। পরিবারের সবার থেকে দুরুত্ব বজায় রাখুন। এই সময় নিজের ইচ্ছায় ওষুধ না খাওয়াই ভালো।

তবে গর্ভাবস্থায় কিছু ওষুধ শরীরের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। ওষুধ খাওয়ার আগে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

করোনা আক্রান্ত মা শিশুকে বুকের দুধ খাওয়াতে পারবেন। তবে এক্ষেত্রে কিছু সাবধানতা চাই সেগুলো হলো-বাচ্চাকে দুধ খাওয়ানোর আগে হাত ভালো করে ধুয়ে নিয়ে তাকে স্পর্শ করতে হবে। ব্রেস্ট পাম্প ও বোতল দরকার হলে সেগুলো ভালো করে জীবাণুমুক্ত করে নিতে হবে। দুধ খাওয়ানোর সময় যথাসম্ভব চেষ্টা করতে হবে হাঁচি বা কাশি না দেওয়া। সম্ভব হলে একটা মাস্ক পরে নিয়ে বাচ্চাকে দুধ খাওয়াতে হবে। সবচেয়ে ভালো উপায় করোনা আক্রান্ত মা যদি ব্রেস্ট পাম্প দিয়ে দুধ বের করে দেন এবং অন্য কেউ যদি সেটা খাইয়ে দেয়। প্রতিবার খাওয়ানোর পর পাম্প ও বোতল ভালো করে ধুয়ে রাখতে হবে।

সরকারের জনগণের স্বাস্থ্যসেবায় জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। সরকার করোনা ভাইরাস প্রতিরোধ জনগণ যাতে ঘরে বসেই ডিজিটাল সেবা পান সেই ব্যবস্থা করেছেন। কর্মস্থলে বয়স্ক ও গর্ভবতী মহিলারা যাতে না আসেন সেই ব্যবস্থা করেছেন। এছাড়া প্রতিটি সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে করোনা রোগীর চিকিৎসা অব্যাহত রয়েছে। গর্ভবতী মায়ের চিকিৎসা সেবা দিতে ৫০ শয্যা বিশিষ্ট সকল হাসপাতাল বদ্ধপরিকর। তাই করোনা আক্রান্ত হলে গর্ভবতী মা হাসপাতালে এসে নিঃসন্দেহে চিকিৎসা নিতে পারবেন।

গর্ভবতী মায়েদের বাসায় থেকে নিয়মিত ফোন করে ডাক্তারকে অবগত করবেন এবং যথাসম্ভব বাসায় থাকার চেষ্টা করতে হবে। খুব বেশি সমস্যা হলে চিকিৎসকের শরাণাপন্ন হওয়াই ভালো। আর এই জন্য চাই পরিবার থেকে শুরু করে দেশের সকলকে এই সংকটাপন্ন অবস্থায় জনগণের পাশে এসে দাঁড়ানো। তবেই আমরা এই করোনা যুদ্ধে সফল হবো ইনশাআল্লাহ।