গৃহশ্রমিকদের অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় আইনি স্বীকৃতি

নিউজ ডেস্ক:   প্রশিক্ষণ, কর্মসংস্থান এবং আইনি স্বীকৃতির মাধ্যমে গৃহশ্রমিকের সামাজিক মর্যাদা ও নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং কোভিড-১৯ মহামারী পরিস্থিতিতে তাদের সামাজিক সুরক্ষা জোরদার করার জন্য নীতি নির্ধারক ও সরকারের প্রতি দাবি জানিয়েছেন ট্রেড ইউনিয়ন, নাগরিক সমাজ, মানবাধিকার ও উন্নয়ন সংগঠন এবং গণমাধ্যমের প্রতিনিধিবৃন্দ। আর্ন্তজাতিক গৃহশ্রমিক দিবস-২০২০ উপলক্ষে সুনীতি প্রকল্পের উদ্যোগে ও দৈনিক সমকালের সহযোগিতায় আজ ২৫ জুন ২০২০ (বৃহস্পতিবার) সকালে এক অনলাইন সেমিনারে (ওয়েবিনার) বক্তারা এ দাবি জানান।

বিল্স চেয়ারম্যান মোঃ হাবিবুর রহমান সিরাজের সভাপতিত্বে সেমিনারে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য যথাক্রমে মোঃ ইসরাফিল আলম এমপি ও শামসুন্নাহার ভূঁইয়া এমপি। এ ছাড়াও সেমিনারে সম্মানিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে বক্তব্য রাখেন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ও গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধুরী, শ্রমিক কর্মচারী ঐক্য পরিষদ-স্কপ এর যুগ্ম সমন্বয়কারী নইমুল আহসান জুয়েল, স্কপ প্রতিনিধি রাজেকুজ্জামান রতন, গৃহশ্রমিক অধিকার প্রতিষ্ঠা নেটওয়ার্কের ভারপ্রাপ্ত সমন্বয়কারী আবুল হোসাইন, অক্সফ্যাম বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর ড. দীপঙ্কর দত্ত, জগন্নাথ বিশ^বিদ্যালয়ের সমাজকর্ম বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মোস্তাফিজ আহমেদ, লেবার রাইটস জার্নাালিস্ট ফোরামের সভাপতি কাজী আব্দুল হান্নান, নারী মৈত্রীর নির্বাহী পরিচালক শাহীন আক্তার ডলি, অভিনেত্রী ও সুনীতি প্রকল্পের ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর দীপা খন্দকার, হ্যালোটাস্ক এর সিইও মাহমুদুল হাসান লিখন, ইউসেপ বাংলাদেশের প্রকল্প পরিচালক শেখ রওশন আমিন, রেড অরেঞ্জ লিমিটেড এর হেড অব প্রোগ্রাম নাকীব রাজীব আহমেদ প্রমুখ। অনুষ্ঠানে বিল্স এর পক্ষ থেকে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করে বক্তব্য রাখেন বিল্স মহাসচিব ও নির্বাহী পরিচালক নজরুল ইসলাম খান।

সেমিনারে মূল বিষয়বস্তু উপস্থাপন করেন গৃহশ্রমিক অধিকার প্রতিষ্ঠা নেটওয়ার্কের সদস্য সচিব নাজমা ইয়াসমিন এবং অনুষ্ঠান সঞ্চালনায় সহযোগিতা করেন বিল্স উপ পরিচালক মোঃ ইউসুফ আল মামুন। স্কপভূক্ত ও বিল্স সহযোগী জাতীয় ট্রেড ইউনিয়ন ফেডারেশনের নেতৃবৃন্দ, নাগরিক সমাজ সংগঠন, গবেষক, বেসরকারি সংস্থা ও সাংবাদিকসহ প্রকল্পের সহযোগী সংগঠনের প্রতিনিধিবৃন্দ ও বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠনের নেতৃবৃন্দ অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন।

রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, গৃহশ্রমিক নীতিমালার পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন প্রয়োজন। এটি বাস্তবায়ন করতে না পারলে গৃহশ্রমিকদের অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। এর জন্য একটি আইনী কাঠামো খুবই প্রয়োজন। তিনি বলেন, উপযুক্ত কারিকুলাম উন্নয়ন ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে গৃহশ্রমিকদের সনদ প্রদান করে তাদের পেশাগত মানোন্নয়নে মনোযোগী হওয়ার পাশাপাশি নিয়োগকারীদের মানসিকতার পরিবর্তন আনাও জরুরী।

শামসুন্নাহার ভূঁইয়া, এমপি বলেন, করোনায় দেশের ৮৫ শতাংশ শ্রমিক কর্মহীন। শ্রমিকরা খুবই দুঃসহ জীবন যাপন করছে। গৃহশ্রমিকরা অনেকেই খন্ডকালীন কাজ করতেন। এদের সিংহভাগই এখন কাজ হারিয়েছেন। সরকারী সামাজিক নিরাপত্তা তহবিল বৃদ্ধি করে গৃহশ্রমিকদের তার আওতায় আনা জরুরী।

গৃহশ্রমিকদের সংখ্যা নিয়ে তথ্যের ঘাটতি আছে উল্লেখ করে মোস্তাফিজ আহমেদ বলেন, গৃহশ্রমিকদের একটি সুনির্দিষ্ট ডাটাবেজ থাকা দরকার। শতকরা ৯৫ ভাগ গৃহশ্রমিক কাজে যেতে পারছে না উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, এমনিতেই গৃহশ্রমিকরা সুরক্ষিত নয়, তার ওপর করোনা তাদের আরও ঝুঁকির মুখে ফেলেছে।

স্কপ গৃহশ্রমিকদের আইনী সুরক্ষা নিশ্চিত করার জন্য কাজ শুরু করেছে জানিয়ে নইমুল আহসান জুয়েল বলেন, গৃহশ্রমিকরা যে কত অসহায় করোনা সেটি পরিষ্কারভাবে বুঝিয়ে দিয়েছে। তিনি বলেন, গৃহশ্রমিকদের শুধু নীতিমালা থাকলেই চলবে না, তার বাস্তবায়ন হতে হবে এবং তাদের সংগঠিত হওয়ার অধিকার দিতে হবে।

রাজেকুজ্জামান রতন বলেন, অদৃশ্য করোনা গৃহশ্রমিকদের কর্মক্ষেত্রের অনুপস্থিতিকে আরও দৃশ্যমান করে দিয়েছে। কোন কোন পরিবারে গৃহশ্রমিককে এতদিন গুরুত্বহীন মনে করা হলেও এখন তাদের অনুপস্থিতির যাতনা উপলব্ধি করা যাচ্ছে। বিপদে যাদের গুরুত্ব বোঝা গেছে, তাদের বিপদে পাশে দাঁড়াতে সকলের প্রতি তিনি আহ্বান জানান। গৃহশ্রমিকদের সুরক্ষায় রেজিস্ট্রেশন কার্যক্রম শুরু করার বিষয় গুরুত্ব আরোপ করে তিনি বলেন, কাজের দক্ষতা উল্লেখ করে গৃহশ্রমিকদের পরিচয়পত্র প্রদান করা প্রয়োজন। এছাড়া গৃহশ্রমিকদের জন্য একটি মজুরির মানদন্ড নির্ধারণ করাও দরকার বলে তিনি উল্লেখ করেন। নির্যাতনের শিকার হলে সে কোথায় যাবে সেটি নির্ধারণ করে প্রতিটি ওয়ার্ড কাউন্সিলে ওয়ান স্টপ সার্ভিস চালু করা ও গৃহশ্রমিকদের স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করতে এলাকা ভিত্তিক কার্যক্রম পরিচালনার দাবি জানান তিনি।

আবুল হোসাইন বলেন, গৃহশ্রমিকরা কাজ হারিয়ে আর্থিক সংকটের মধ্যে রয়েছেন। তাদের কাজের নিশ্চয়তা, নিয়োগপত্র ও নির্দিষ্ট মজুরি নেই। বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তা তহবিলে বরাদ্দ বৃদ্ধি করে তা বাস্তবায়নের দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, গৃহশ্রমিকদের জন্য সরকারী সহায়তা ছাড়া তাদের সুরক্ষা সম্ভব নয়।

গৃহশ্রমিকদের অধিকার বিষয়ে বেশি বেশি প্রচার প্রচারণা চালাতে হবে উল্লেখ করে অভিনেত্রী দীপা খন্দকার বলেন, অনেক নিয়োগকারী জানেন না গৃহশ্রমিকের প্রতি তাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য। তিনি মিডিয়ায় প্রচারের মাধ্যমে প্রত্যেক ঘরে ঘরে গৃহশ্রমিকদের অধিকার বিষয়ক বার্তা পৌঁছে দেয়ার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন।

সেমিনারে স্বাগত বক্তব্যে ড. দীপঙ্কর দত্ত বলেন, কোভিড-১৯ এ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে শ্রমজীবী মানুষ। এর মধ্যে গৃহশ্রমিক অন্যতম। তিনি বলেন, গ্রামীণ জনগোষ্ঠির অংশ গৃহশ্রমিকরা কাজের উদ্দেশ্যে শহরে আসে কিন্তু করোনা তাদের শহর থেকে বিতাড়িত করেছে। এ ক্ষেত্রে সরকারী সাহায্য কতটুকু তাদের কাছে পৌঁছেছে সেটি মনিটরিং করার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

সভাপতির বক্তব্যে মোঃ হাবিবুর রহমান সিরাজ বলেন, গৃহশ্রমিকদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় আইএলও কনভেনশন-১৮৯ প্রণয়নে সরকার আইএলসিতে ভোট দিয়েছে এবং তার আলোকে নীতিমালা তৈরি করেছে। কিন্তু নীতিমালা বাস্তবায়নে আইনের দরকার রয়েছে। আইন হলেই নীতি বাস্তবায়ন সম্ভব হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

সেমিনারে বক্তারা গৃহশ্রমিকদের শ্রম আইনে অন্তর্ভূক্ত করে তাদের শ্রমিক হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া, গ্রামীন এবং শহর কেন্দ্রীক বৈষম্য দূর করা, গৃহশ্রমিকদের জন্য মনিটরিং সেলের কার্যক্রম বৃদ্ধি ও সহজ করা, তাদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং ওয়ার্ড ভিত্তিক কমিটি গঠনের জোর দাবি জানান।

উল্লেখ্য, সারা বিশ্বে প্রতি বছর ১৬ জুন আর্ন্তজাতিক গৃহশ্রমিক দিবস পালিত হয়ে থাকে। এ বছর দিবসটি পালনের অংশ হিসেবে বিল্স, গণসাক্ষরতা অভিযান, হ্যালোটাস্ক, নারী মৈত্রী, রেড অরেঞ্জ লিমিটেড ও ইউসেপ বাংলাদেশ যৌথভাবে অক্সফ্যাম বাংলাদেশের সহযোগিতায় ও গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্স কানাডার অর্থায়নে সুনীতি প্রকল্পের উদ্যোগে এই অনলাইন আলোচনার আয়োজন করে।