চতুর্থ শিল্প বিপ্লব, শিক্ষানীতি দক্ষ জনশক্তি ও বাজেট

আবু দস্তগীর:   এক. এরই মধ্যে দেশী-বিদেশী নিউজ আউটলেটের বরাতে আমরা সবাই জেনে গেছি যে লাদাখের সীমান্তবর্তী এলাকায় ভারত-চীন যুদ্ধাবস্থা বিরাজ করছে। এ পরিস্থিতির মধ্যেও চায়নিজ বেকড এআইআইবি ব্যাংক ভারতকে ৭৫০ মিলিয়ন ডলার ঋণ দিতে রাজি হয়েছে। হয়তো প্রয়োজনে আরো বরাদ্দ দেবে (সূত্র: দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, দ্য ডেইলি স্টার)। অর্থাৎ দুনিয়া যেদিকে যাবে যাক, অর্থনীতির চাকা সচল রাখতেই হবে। চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের নেতৃত্ব ধরে রাখার প্রত্যয়ে বিশ্বের ‘ম্যানুফ্যাকচারিং পাওয়ার হাউজ’ খ্যাত চীন করোনার মতো বৈশ্বিক মহামারীর উত্পত্তিস্থল হওয়া সত্ত্বেও শক্ত হাতে মহামারী দমনের মাধ্যমে তারা তাদের অর্থনীতির চাকা ঠিকই সচল রেখেছে। ব্যাপারটা শুধু বাংলাদেশের জন্যই নয়, পৃথিবীর যেকোনো দেশের জন্য একটি শিক্ষণীয় বিষয়। সোজা কথায়, প্রযুক্তির সঙ্গে দক্ষ জনশক্তি যার হাতে থাকবে, সেই হবে ভবিষ্যৎ বিশ্বের অর্থনৈতিক মোড়ল। আপাতত এই অর্থনৈতিক যুদ্ধে বিশ্বের সব দেশ থেকে চীন অনেকাংশে এগিয়ে আছে।

দুই. নভেল করোনাভাইরাস মহামারীর বেপরোয়া আগ্রাসনে ভারতের অর্থনীতি যখন পুরোপুরি স্থবির হয়ে পড়েছে, ঠিক সেই সময়ে ভারত লাদাখের ওই অঞ্চলে চীনের সামরিক শক্তির বিপরীতে নিজেদের সক্ষমতা বাড়াতে চাইছে। সে চিন্তা মাথায় রেখে ১২টি সুখোই ও ২১টি মিগ-২৯ যুদ্ধবিমান চেয়ে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেছে ভারতীয় বিমান বাহিনী (সূত্র: বাংলা ট্রিবিউন)। হ্যাঁ, ব্যাপারটা খুব বিস্ময়কর হলেও সত্য। ভাবছেন, ভারত একদিকে চীন থেকে ঋণ নিচ্ছে, অন্যদিকে সেই চীনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য শত শত মিলিয়ন ডলারের যুদ্ধবিমান ক্রয়ের সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, তাই না?

আসুন, উপরের দুটি ঘটনাকে একটু বিশ্লেষণ করি। প্রথমেই বলে রাখি, আমার বিশ্লেষণটা প্রথম দিকে আপনাদের কিছুটা অপ্রাসঙ্গিক মনে হলেও পরে ধাপে ধাপে পরিষ্কার হয়ে উঠবে। আমেরিকার বিখ্যাত অ্যাপল ব্র্যান্ডের একটি আইফোনকে (প্রসংগত বলে রাখি আইফোন তৈরি হয় চীনে) যদি আগুনে গলিয়ে নিই, তাহলে কয় ডলার মূল্যের প্লাস্টিক, লোহা, তামা, স্বর্ণ পাওয়া যাবে বলে মনে করেন? সাকল্যে ১ থেকে ৫ ডলারের ম্যাটেরিয়াল (সূত্র: স্টাটিস্টা ডটকম)। সেই সামান্য টাকার ম্যাটেরিয়ালে যখন বিজ্ঞান বা টেকনোলজির ছোঁয়া লাগে, তখন সেই ৫ ডলারের ম্যাটেরিয়ালের মূল্য হয়ে যায় ৪০০ থেকে ৬০০ ডলার বা ক্ষেত্রবিশেষে তারও বেশি। এবার একটি এফ১৬ অথবা মিগ১৯ ফাইটার জেটের কথা ভাবুন। কোনো প্রকার মিসাইল, ওয়ারহেড ছাড়াই প্রতি ইউনিটের মূল্য ১৬ থেকে ২০ মিলিয়ন ডলার বা তারও বেশি (সূত্র: উইকিপিডিয়া)। তার ওপর মিসাইল, ওয়ারহেডের খরচ, বার্ষিক মেনটেইন্যান্স ও ইন্স্যুরেন্সের পেছনে কত মিলিয়ন খরচ হবে, তা কল্পনা করলে হয়তো মাথা ঘুরে উঠতে পারে। কিন্তু এই ১৬-২০ মিলিয়ন ডলারের প্রতিটি ইউনিটের পেছনে প্রস্তুতকারী দেশগুলোর মূলধন কত এবং প্রফিট কত? জানতে পারলে হয়তো চোখ ছানাভরা হয়ে যাবে।

এতক্ষণ তো আমরা আদার ব্যাপারী হয়ে জাহাজের খবর নিচ্ছিলাম। এখন আমরা আমাদের হিসাবে আসব। যে পরিমাণ বাংলাদেশী মানুষ জীবিকার উদ্দেশ্যে প্রবাসী হিসেবে দেশের বাইরে থাকে, সেই পরিমাণ মানুষ বিশ্বের অনেক দেশের মোট জনসংখ্যা থেকেও বেশি। বাংলাদেশের প্রায় ১ কোটি ২৫ লাখ নাগরিক দেশের বাইরে থাকে। প্রবাসীদের বিষয় যখন টেনেই আনলাম, তখন ছোট একটা তুলনামূলক পার্থক্য আপনাদের সামনে হাজির করতে চাই। আমাদের এশিয়ারই দেশ ফিলিপাইনের ১৫ লাখ প্রবাসী আছে, যারা বছরে ৩৭ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স পাঠায়। তবে তারা প্রায় সবাই প্রশিক্ষিত। ঠিক সেই সময়ে বাংলাদেশের ১ কোটি ২৫ লাখ প্রবাসী, যারা বছরে পাঠায় ২০ বিলিয়ন ডলার (সূত্র: বাংলা ট্রিবিউন)। কেন এই বিশাল পার্থক্য? উত্তর, তারা প্রশিক্ষিত দক্ষ জনশক্তি আর আমাদের জনশক্তি প্রশিক্ষিত নয়। ২০২০ সালের এক গবেষণায় জানা গেছে যে বাংলাদেশে প্রায় ৮৫ হাজার বিদেশী ওয়ার্ক পারমিট নিয়ে কাজ করে। তাদের বেশির ভাগই আমাদের রফতানিনির্ভর রেডিমেড গার্মেন্ট সেক্টরের প্রযুক্তিগত দক্ষতার কোনো না কোনো পজিশনে কাজ করেন এবং তারা বছরে ৬ বিলিয়ন ডলারের অধিক বাংলাদেশ থেকে তাদের দেশে পাঠান। আন-অফিশিয়াল আরেকটি সূত্রে জানা গেছে, শুধু বাংলাদেশে অবস্থানকারী ভারতীয়রাই বাংলাদেশ থেকে বছরে ৪ বিলিয়ন ডলার ভারতে পাঠান (সূত্র: প্রথম আলো, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড)।

এবারের ২০২০-২১ অর্থবছরের বাজেটে শিক্ষা খাতে মোট বরাদ্দ ৬৬ হাজার ৪০১ কোটি টাকা, যা মোট বাজেটের ১১ দশমিক ৬৯ শতাংশ। তার মধ্যে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি খাতে বরাদ্দ থাকছে ১৮ হাজার ৪৪৮ কোটি টাকা এবং কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডে মাত্র ৮ হাজার ৩৪৪ কোটি টাকা। গবেষণা খাতে মাত্র ১০০ কোটি টাকার সমন্বিত স্বাস্থ্যবিজ্ঞান গবেষণা ও উন্নয়ন তহবিল গঠনের প্রস্তাব করা হয়েছে (সূত্র: বাজেট ২০২০-২১ প্রথম আলো, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, বাংলা ট্রিবিউন, বণিক বার্তা)।

২০২০-২১ অর্থবছরের বাজেট অধিবেশনে মাননীয় অর্থমন্ত্রী বাংলাদেশে মোট শিক্ষার্থীর সংখ্যা চার কোটি বললেও সঠিক হিসাবে বর্তমানে বাংলাদেশে মোট শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৪ কোটি ৯০ লাখের মতো। ২০০৮ সালের একটি গবেষণায় বলা হয়েছে, বাংলাদেশে প্রতি তিনজন ছাত্রের মধ্যে একজন মাদ্রাসা ছাত্র (সূত্র: জনকণ্ঠ, প্রকাশিত জানুয়ারি ২৮, ২০১৮)। আবার ২০১৯ সালের একটি তথ্যে দেখা গেছে সারা দেশে মোট মাদ্রাসা শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৪১ লাখ ৪০ হাজার (সূত্র: প্রথম আলো, প্রকাশিত ৭ নভেম্বর, ২০১৯)। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, দেশে ন্যাশনাল কারিকুলামে লেখাপড়া করা শিক্ষিত, উচ্চশিক্ষিত ছেলেমেয়েরা যেখানে চাকরি না পেয়ে বেকার ঘুরছে, সেখানে এই মাদ্রাসার ছাত্রছাত্রীদের আদৌ কি কোনো ভবিষ্যৎ আছে? বিবিসির একটি অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এই মাদ্রাসা কারিকুলাম থেকে পাস করা ছাত্রদের বেশির ভাগই শিক্ষা শেষে চলে যায় মধ্যপ্রাচ্যে এবং বাকিরা দেশে মসজিদ, মাদ্রাসা, হেফজখানায়, এতিমখানাগুলোয় শিক্ষকতা করে (সূত্র: বিবিসি বাংলা)। এটা কি জনশক্তির অপচয় নয়?

আমার বক্তব্য হচ্ছে, যদি মাদ্রাসা শিক্ষা কারিকুলামের পাশাপাশি তাদের কর্মমুখী কারিগরি শিক্ষাটা বাধ্যতামূলক করা যায়, তাহলে তাদের বড় একটি অংশ অতিসামান্য কিছু টাকা মাসিক বেতন পাওয়ার আশায় আজকে মধ্যপ্রাচ্যে গিয়ে অমানবিক পরিশ্রম করতে হতো না। ফিলিপাইনিদের মতো প্রশিক্ষিত দক্ষ জনশক্তি হলে আজ তারাও তাদের শ্রমের ন্যায্যমূল্য পেত, আর বিনিময়ে বাংলাদেশ পেত শত বিলিয়ন ডলারের রেমিট্যান্স। আবার টেকনোলজি খাতে দেশে দক্ষ বা স্কিলড জনশক্তি থাকলে পৃথিবীর অনেক দেশের প্রযুক্তি খাতের উৎপাদনকারীদের আমরা দেশে বিনিয়োগের জন্য আকৃষ্ট করতে পারতাম। এক্ষেত্রে দেশের মানুষদের আর সামান্য বেতনের চাকরির জন্য বিদেশ যেতে হতো না। দেশের মানুষের কর্মসংস্থান দেশেই হয়ে যেত। তাই আমি বিশ্বাস করি, শুধু মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের জন্যই নয়, ন্যাশনাল কারিকুলামে ও একটি শ্রেণী পর্যন্ত কর্মমুখী কারিগরি শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা হোক। এজন্য যদি ২০১০ সালে নেয়া জাতীয় শিক্ষানীতিতে কোনো পরিবর্তন আনতে হয়, তবে তা করা হোক।

দেশের স্বাস্থ্য খাতে ব্যবহূত চিকিৎসা সরঞ্জামের ১০০ ভাগই বিদেশ থেকে আমদানি করা হয়। করোনাকালে সরকারি ও বেসরকারি খাতে এই যে কভিড টেস্টের জন্য আরটি পিসিআর মেশিনসহ চিকিৎসার জন্য যাবতীয় ভেন্টিলেটর, হাই ফ্লো ন্যাশনাল কেনুলাসহ যত ভারী, সূক্ষ্ম ও দামি যন্ত্রপাতি ব্যবহার করা হচ্ছে, তার শতভাগই আমাদের বিদেশ থেকে আমদানি করতে হচ্ছে। দেশে তো এখন পর্যন্ত একটি থার্মোমিটারও প্রস্তুত হয় না। ওয়াল্টন, আরএফএল, মিনিস্টারের মতো দেশীয় প্রাইভেট কোম্পানিগুলো যা করছে, তা অ্যাসেম্বলিং ছাড়া বেশি কিছু বলা যাবে না। তারা মূলত পার্টসগুলো চীনা বা বিদেশ থেকেই আমদানি করে দেশে অ্যাসেম্বলিং করে। তার পরও প্রাইভেট সেক্টরে দেশীয় কোম্পানিগুলোর উদ্যোগে দেশীয় প্রযুক্তি খাতে জনশক্তির যেটুকু সদ্ব্যবহার হচ্ছে, সেটাকেও খাটো করে দেখানো যাবে না।

দেশের উৎপাদনমুখী বেসরকারি শিল্প খাতেও একই অবস্থা। উৎপাদনমুখী শিল্প খাতে ব্যবহূত মূলধনি যন্ত্রপাতির প্রায় ৯৯ শতাংশই আমদানিনির্ভর। এতে স্বাস্থ্য ও উৎপাদনমুখী শিল্প খাতে বিশাল অংকের একটি বৈদেশিক মুদ্রা প্রতি বছর দেশের বাইরে চলে যাচ্ছে। মাননীয় অর্থমন্ত্রী প্রায় প্রতিবারই তার বক্তব্যে চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের কথা বললেও প্রস্তাবিত বাজেটে সেই শব্দের তেমন একটা প্রতিফলন পরিলক্ষিত হচ্ছে না। প্রথমত, সরকারের উচিত ছিল বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও গবেষণা খাতে বাজেট বৃদ্ধি করা, দেশী বিজ্ঞানী ও গবেষকদের বিভিন্ন স্কলারশিপ ও রিওয়ার্ড প্রোগ্রামের মাধ্যমে বাংলাদেশে অবস্থান করে গবেষণা করতে আকৃষ্ট এবং উৎসাহিত করা। দেখা যাচ্ছে, গবেষণা খাতে সরকারের উৎসাহ এবং যথেষ্ট বরাদ্দ না থাকায় দেশের অনেক মেধাবী প্রতিভাবান গবেষক বাইরে চলে যান এবং তাদের এক বড় অংশই সেসব দেশে নাগরিকত্ব নিয়ে থেকে যান। কারণ তারা জানেন যে দেশে তাদের মেধার কোনো মূল্যায়ন নেই। এটা খুব দুঃখজনক ও হতাশার বিষয়। যদি সরকার মেধাবীদের মূল্যায়ন করতে গবেষণা খাতে বাজেট বৃদ্ধি করত, তাহলে বাংলাদেশে ধীরে ধীরে গবেষণা খাত বিকশিত হতো এবং একই সঙ্গে দেশে নানা ধরনের উদ্ভাবনী শিল্পের বিকাশ ঘটত। আর বিনিময়ে বাংলাদেশ পেত দেশীয় উদ্ভাবকদের হাতে তৈরি অনেক টেকনোলজিক্যাল প্রডাক্ট। ফলে উৎপাদনমুখী শিল্প খাতের মূলধনি যন্ত্রপাতিসহ স্বাস্থ্য খাতে চিকিৎসার জন্য ব্যবহূত অনেক যন্ত্রপাতির ক্ষেত্রে আমাদের বিদেশনির্ভরতা কমে আসত এবং এতে অনেক বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয় হতো।

দ্বিতীয়ত, চতুর্থ শিল্প বিপ্লব এবং ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত করার পরিকল্পনা মাথায় রেখে একটি সুদক্ষ জাতি গঠনের নিমিত্তে কর্মমুখী কারিগরি শিক্ষাকে ন্যাশনাল কারিকুলামের পাশাপাশি মাদ্রাসা শিক্ষায়ও বাধ্যতামূলকভাবে অন্তর্ভুক্ত করা। উল্লিখিত পরিসংখ্যানগুলো দ্বারা এটাই প্রতীয়মান হয় যে পৃথিবীর বাকি উন্নত দেশগুলোর সঙ্গে তাল মিলিয়ে অর্থনীতির প্রতিযোগিতায় তথা চতুর্থ শিল্প বিপ্লবে যদি আমাদের টিকে থাকতে হয়, তাহলে আমাদের প্রয়োজন শিক্ষিত ও প্রযুক্তিগতভাবে প্রশিক্ষিত দক্ষ জনশক্তির; অশিক্ষিত বা স্বল্পশিক্ষিত সস্তা শ্রম নয়।

আবু দস্তগীর: বিজনেস কমপ্লায়েন্স প্রফেশনাল