‘থিয়েটার’

মোঃ কবির সরকার,

আমাদের গ্রামে একজন মানুষ ছিলেন। যিনি আর চার, পাঁচটা মানুষের থেকে আলাদা। গ্রামটা কে নিয়ে ভাবতেন। আমি ছোটবেলা থেকে দেখতাম গ্রামের পাশে যে বড় নদীটি আছে, সেখানে নৌকা বাইচের আয়োজন করতেন। গ্রামের নানারকম সামাজিক সমস্যার সমাধানে, উনার বিকল্প কেউ ছিল না। গ্রামে উনার প্রতিষ্ঠিত নাট্যসংগঠন ছিল, যার নাম ছিল, “পরিবর্তন নাট্যদল”। উনি খুব গাছ ভালবাসতেন আর উনার একটা লাইব্রেরী ছিলো, যেখানে আমরা পড়তে গেলে, আমাদের বাড়িতে পড়ার জন্য বই দিতেন। উনার নাম হল বিজয়।

আমরা বিজয় আংকেল বলে ডাকতাম। উনি, অনেক আগে ঢাকা কলেজ থেকে ইংরেজী সাহিত্যে পড়াশোনা শেষ করেছেন। তারপর আর কোন চাকুরী করেন নাই। গ্রামেই থাকেন আর মানুষগুলোকে বড় আপন করে নিয়েছেন। উনার বাবার অনেক সম্পদ ছিলো। দুই ভাই ভাগ করে নিয়েছেন। একদিন আমাকে উনি বললেন, কিরে অভিনয় করবি, আমি তখন টগবগে জোয়ান কলেজে পড়ি। আমি বললাম হ্যা, অভিনয়ের শখটা আমার ছোটবেলা থেকেই। কারন গ্রামে প্রতিবছর নাটক হত আমি তখন থেকেই অভিনয় করার স্বপ্ন দেখতাম। নাটক করলাম উনি তো ভীষন খুশি হলেন। বিজয় আংকেল বিয়ে করেন নাই। তাই তার নিজের ভাইয়ের ছেলে ছাড়া আর কেউ ছিল না। আমাকে খুব ভালবাসতো। আমাকে মাঝেমধ্যেই উনি বাড়িতে, থাকতে বলতেন। আমিও থাকতাম ঐ রকম একজন জ্ঞানী মানুষের কাছে থাকতে পারাটাও একটা অন্যরকম অভিজ্ঞতা। উনি অবসরে ঘোড়া নিয়ে হাটে যেতেন আর নদীতে ছিপ ফেলে মাছ ধরতেন।

রাতে যখন বাসায় আসতেন কলের গান ছিল তখন। সেখানে দুঃখের গান শুনতেন আর মদ খেতেন। আমি একদিন রাতে মদ খাওয়ার সময় তাকে বলেছিলাম। যে কথা তাকে কেউ বলার সাহস পেত না, আমি বলেছিলাম তুমি এত মদ খাও, সিগারেট খাও আর বিয়ে করো নাই কেন?? উনি আমার দিকে খুব রাগে কিছুক্ষন তাকিয়ে বলেছিল আউট, এখান থেকে চলে যা। আমি ভয় পেয়ে সে রাতে চলে এসেছিলাম। পরের দিন উনি আমাকে নিজেই তার বাড়িতে ডেকেছিল। সেদিন রাতে বৃষ্টি হচ্ছিল। উনি মদ খেতে খেতে বললেন যে, শোন কাউকে বলিস না, আমি যখন ঢাকায় থাকতাম, তখন একটা মেয়েকে খুব ভালবাসতাম। সেও খুব ভালবাসত। আমার পড়ার শেষের দিকে ওর বাবা বিলেত ফেরত এক ভাল পাত্রের সাথে তার বিয়ে দেয়। মেয়েটির নাম ছিল নীলু। তারপর আমি ঢাকা ছেড়ে চলে এসেছি কত পোগ্রাম গেছে আর যায়নি। তাই ওকে আর ভুলতে পারি নি, এখন তুই বল নতুন করে কাকে, ভালবাসব আর বিয়েই বা করব কিভাবে। তাই এই সমাজের মানুষকে ভালবাসি। শুনে আমি খুব কষ্ট পেলাম। উনি বললেন আমাকে, শোন আশা করবি কিন্তু দুরাশা করাটা খারাপ। উনি ছাত্রজীবনে একটু বামরাজনীতিকে ভালবাসতেন। উনি আমাকে চে, লেনিন, মাও সেতুং, সুর্যসেন, প্রিতীলতা, ইলামিত্রের গল্প শুনিয়েছেন। আর মঞ্চনাটক ছিল তার প্রানের জায়গা। বড় বড় ইংরেজী সাহিত্যিকদের নাম উনি শুনিয়েছেন। বাংলা কবিতা, গান, নাটক, আমাদের সাহিত্য, আমাদের শেকড়, আমাদের ইতিহাস সব বলতেন।

তারপর একদিন বড় মঞ্চনাটকের কাজ ধরলেন ওখানে আমাকে ছোট একটা চরিত্র দেওয়া হয়েছিল। সেটাও আমার জন্য পরম পাওয়া, ঐরকম বড় বড় অভিনেতাদের সাথে কাজ করতে পারাটা সৌভাগ্য ছিল আমার। শহর থেকে নায়িকা আনা হল। কালকে সবাই টিকেট কেটে নাটক দেখবে। ঠিক রাতের বেলা নাটকের নায়ক রতন দা কি একটা বিষয়ে বনিবনা না হওয়ায় বিজয় আংকেলের সাথে ঝগড়া করে চলে গেল। সেই বিকল্প চরিত্র না পেয়ে উনি অনেক টেনশন করলেন। সারারাত মদ খেলেন। কাল নাটক না হলে মানুষকে মুখ দেখাবে কিভাবে। আমি চলে আসলাম পরের দিন সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখি যে মঞ্চটা বানানো হয়েছিল ঠিক তার পাশে তার প্রিয় বকুল গাছটায় বিজয় বাবু রশিতে ঝুলঝে। হাতে চিরকুটে লেখা ছিলঃ-

“সুপ্ত আমার বাকি কাজটা তুই সম্পন্ন করিস।”

হ্যা আমি সুপ্ত বলছি, আমি তার ঠিক পাঁচ বছর পরে সেই খানে উনার সেই নাটকটা মঞ্চায়ন করি। তারপর আমার চাকুরি হয়। তার ঠিক কয়েকবছর পরে গ্রামে গিয়ে দেখি কিছুই আর নাই। থিয়েটার ভেঙে গেছে। বিজয় বাবুর ভাতিজা সুজয়, এখন সব ধরনের মাদক বিক্রি করে। নাটক তার ভাল লাগে না। গ্রামের ছেলেরা এখন মাঠে খেলাধুলা, গান, নাটক সব বাদ দিয়ে, পাড়ার মোড়ে বসে মোবাইল ফোনে লুডু খেলে। তাদের মধ্যে পড়াশোনা জানা ছেলেকে যদি বলা হয়, যে সুকান্ত কে ছিলেন তারা বলে বড় মাপের বিজ্ঞানী।
এই তো গ্রাম, বেশ ভালো আছে।

*লেখক, মোঃ কবির সরকার বি. এ. অনার্স, এম. এ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, ইতিহাস বিভাগ।

জেড,আই/ঢাকানিউজ২৪ডটকম।