রাজধানীর হোটেল কর্মচারীদের কান্না দেখার কেউ নেই

নিউজ ডেস্ক:   রাজধানীর ফকিরাপুলের দি গাউছিয়া হোটেল অ্যান্ড রেস্টুরেন্টে ৩০ বছরেরও বেশি সময় ধরে ‘বয়’ হিসেবে নিয়োজিত আবুল বাশার। মুগদার ওয়াপদা গলিতে জাহিদের বাড়ির ছোট্ট একটি ঘরে দুই মেয়ে ও এক ছেলেকে নিয়ে বাশার দম্পতির বসবাস। মাসিক বেতন ৪ হাজার টাকার সঙ্গে খদ্দেরের বকশিশ মিলিয়ে যে আয় হয়, তাতে ভালোই চলছিল সংসার। কিন্তু সেই ভালো থাকার দিন ।

২৬ মার্চ থেকে সরকার ঘোষিত সাধারণ ছুটির পর বন্ধ হয়ে গেছে হোটেলটি। সেই থেকে বয় আবুল বাশারও বেকার। এ পর্যন্ত বেতন-ভাতা কিছুই পাননি। সংসারের চাকা সচল রাখতে রেস্টুরেন্ট মালিক তো বটেই, পরিচিত অনেকের দুয়ারেই ধরনা দিয়েছেন আবুল বাশার। গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে মুগদা স্টেডিয়াম চত্বরে কথাগুলো বলার সময় আবুল বাশারের দুচোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়ছিল অশ্রু। বলছিলেন, এভাবে চলতে থাকলে আত্মহত্যা করা ছাড়া আর কোনো পথ খোলা দেখছেন না তিনি।

গাউছিয়া হোটেল অ্যান্ড রেস্টুরেন্ট’-এর বয় মুসলিম ও মানিক, শ্যামলীর আমতলা এলাকার হারুন হোটেলের হেড বাবুর্চি ইসমাঈল, রামপুরার খানাবিলাসী হোটেলের কর্মচারী জিলানী জমাদ্দার ছাড়াও করোনা পরিস্থিতিতে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে বেকায়দায় পড়া রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় বসবাসকারী অন্তত ২০ হোটেল কর্মচারীর সঙ্গেও কথা হয় গতকাল।

তাদের ভাষ্য, লকডাউন পরিস্থিতির আগে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় কর্মরত প্রায় ৭০ হাজার হোটেল কর্মচারী ও তাদের পরিবারের বর্তমান পরিস্থিতিও অভিন্ন। সরকারি সহায়তা, বেতন-ভাতা কোনো কিছুই পাননি।  একাধিকবার খাদ্য সহায়তা চেয়ে ঢাকার জেলা প্রশাসক, সিটি মেয়র, শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়, পুলিশ কমিশনারসহ সরকারি কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরে লিখিত আবেদন জানিয়েছেন। সর্বশেষ গত ১ জুন শ্রম ও কর্মসংস্থান অধিদপ্তরের সচিবের দপ্তরেও সাহায্য প্রার্থনা করে আবেদন করেছে ঢাকা মহানগর হোটেল অ্যান্ড রেস্টুরেন্ট শ্রমিক লীগ। কিন্তু অদ্যাবদি সাড়া মেলেনি সংশ্লিষ্ট কারোরই। কেউ নেই রাজধানীর অর্ধ লক্ষাধিক হোটেল কর্মচারীর কান্না দেখার কেউ নেই!

ঢাকা মহানগর হোটেল শ্রমিক জানান, রাজধানীর ৫০টি থানায় ছোট-বড় আড়াই হাজার হোটেল-রেস্টুরেন্ট রয়েছে। গড়ে ৩০ জন থেকে শুরু করে শতাধিক কর্মী কাজ করে এক একটি প্রতিষ্ঠানে। সেই হিসাবে লক্ষাধিক কর্মী কাজ করেন রাজধানীর হোটেল-রেস্টুরেন্টে। লকডাউনের শুরু থেকে গত ৩০ মে পর্যন্ত বন্ধ থাকায় ৩ মাস বেকার ছিলেন প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মীরা। সরকারি ছুটি উঠিয়ে নেওয়ার পর সীমিত পরিসরে ১০ শতাংশ কর্মী কর্মস্থলে যোগদান করতে পেরেছেন। বর্তমানে মানবেতর জীবনযাপন করছেন ৭০ হাজারেরও বেশি হোটেল শ্রমিক।

হোটেল মালিকরা কোনো হোটেল কর্মচারীকে নিয়োগপত্র বা পরিচয়পত্র দেন না। ফলে শ্রম আইন অনুযায়ী হোটেলের কর্মচারীরা সব সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার হকদার হলেও সব কিছু থেকেই আমরা বঞ্চিত। হোটেল শ্রমিকদের ত্রাণ বরাদ্দ ও বকেয়া বেতন দেওয়ার ব্যবস্থার জন্য ঢাকা জেলা প্রশাসক থেকে শুরু করে সরকারের বেশ কয়েকটি দপ্তরে একাধিকবার আবেদন করা হয়েছে। সরকারের তরফ থেকে প্রণোদনা দেওয়ার কথা বলা হলেও ত্রাণ-প্রণোদনা-বেতন কোনো কিছুই আমরা পাইনি । হোটেলের কর্মচারীদের প্রণোদনা প্রদানে যে তালিকা করা হয়েছে, তাও পরিপূর্ণ নয়। মালিকরা তাদের মতো করে সরকারের কাছে তালিকা পাঠিয়েছেন। এ পরিস্থিতিতে হোটেল শ্রমিকরা যেন দুবেলা দুমুঠো ভাত খেতে পারেন সে লক্ষ্যে সবার প্রতি সহানুভূতির হাত বাড়িয়ে দেওয়ার অনুরোধ জানান তিনি।

ঢাকা মহানগর হোটেল শ্রমিক লীগের সভাপতির অভিযোগ সত্য নয় জানিয়ে সারাদেশের রেস্তোরাঁ মালিক সমিতির সহসভাপতি ও ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সাধারণ সম্পাদক শাহ সুলতান খোকন জানান, লকডাউনের আগ পর্যন্ত সমিতির অন্তর্ভুক্ত সব হোটেল-রেস্টুরেন্টের শ্রমিক-কর্মচারীদের বকেয়া বেতনাদি পরিশোধ করা হয়েছে। এমনকি লকডাউনের মধ্যেও অনেকেই আলাদাভাবে সাহায্য পেয়েছেন বলে জানতে পেরেছেন তিনি।

ঢাকার অভিজাত এলাকায় কিছু হোটেল-রেস্টুরেন্ট খোলা থাকলেও ৮০ ভাগ হোটেলই এখন বন্ধ। এসব প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় শ্রমিকদের পাশাপাশি মালিকরাও বিপাকে রয়েছেন। তবে তারা যে যেভাবে পারছেন, শ্রমিকদের সাহায্য করার চেষ্টা করছেন। সরকারের পক্ষ থেকে হোটেলের শ্রমিকদের যে প্রণোদনা দেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল তা এখনো পাওয়া যায়নি। সরকারের পক্ষ থেকে সাহায্য পেলে একজন কর্মচারীও কষ্টে থাকবেন না।

ঢাকার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (এডিসি-সার্বিক) মো. শাহিদুজ্জামান বলেন, ত্রাণের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে যাবতীয় ত্রাণ, সাহায্য ও অনুদান জেলা প্রশাসক কার্যালয় থেকে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। সেখান থেকেই ভুক্তভোগীদের বণ্টন করা হয়, এটিই নিয়ম।