ভার্চুয়াল শুনানীতে শেরপুর জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেসীর রেকর্ড

 

মো. নজরুল ইসলাম, ময়মনসিংহ: করোনা ভাইরাসজনিত পরিস্থিতিতে সারাদেশে আদালতের ভার্চুয়াল শুনানীতে রেকর্ড সৃষ্টি করেছে শেরপুরের জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেসী। ওই শুনানীর আওতায় উচ্চ আদালতসহ সারাদেশের নিম্ন আদালতগুলোতে যখন কেবল হাজতী আসামিদের জামিন শুনানীসহ জরুরি কিছু বিষয়ে শুনানী চলছে, ঠিক তখন আরও এক ধাপ নয়, অনেকটাই এগিয়ে এখানকার জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেসিতে চলছে হাজতী আসামির জামিন শুনানীর পাশাপাশি জরুরি নালিশী মামলা দায়ের, ফৌজদারী মামলায় আসামিদের সারেন্ডার বা আত্মসমর্পণ, গুরুত্বপূর্ণ মামলায় গ্রেফতারকৃত আসামিদের রিমান্ড শুনানী, মামলায় জব্দকৃত আলামত গ্রহণের বিষয়ে শুনানীসহ বেশ কিছু কার্যক্রম। এতে মঙ্গলবার (৯ জুন) পর্যন্ত ৫ কার্যদিবসে ওই কার্যক্রমের আওতায় জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেসিতে জেলার ৫ উপজেলার আমলী আদালতগুলোতে জামিনসহ বিভিন্ন বিষয়ে মোট প্রায় ১৫০ আবেদন শুনানী ও নিস্পত্তিসহ কেবল জামিনই পেয়েছেন প্রায় ৩৫০ আসামি। সরকারের স্বাস্থ্যবিধিসহ সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে চলমান ওই কার্যক্রমে একদিকে যেমন ন্যায়বিচারের পথ সুগম হয়েছে, অন্যদিকে তেমনি বিশেষ পরিস্থিতিতেও ন্যায়বিচার পেয়ে বেজায় খুশি সংশ্লিষ্ট পক্ষসহ সচেতন মহল।
আইনজীবীসহ আদালতের সাথে সম্পৃক্ত দায়িত্বশীল একাধিক সূত্র জানায়, সরকার ও বিচার বিভাগের যুগান্তকারী পদক্ষেপ ভার্চুয়াল আদালতের আওতায় সারাদেশের মতো শেরপুরে ১২ মে থেকে চীফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট, ১৪ মে থেকে জেলা ও দায়রা জজ এবং নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালসহ শিশু আদালতে হাজতী আসামিদের জামিন শুনানী শুরু হয়। প্রক্রিয়াটি সব আদালতে চলমান থাকলেও ৩ জুন থেকে চীফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট এসএম হুমায়ুন কবীরের আগ্রহে এবং স্থানীয় আইনজীবীদের সহযোগিতায় জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেসিতে সীমিত পরিসরে শুরু হয়েছে ফৌজদারী মামলায় আসামিদের আত্মসমর্পণ ও জামিন শুনানী, নালিশী মামলা দায়ের, গুরুত্বপূর্ণ মামলায় গ্রেফতারকৃত আসামিদের রিমান্ড শুনানীসহ মামলায় জব্দকৃত আলামত গ্রহণের বিষয়ে শুনানী। এছাড়া ফৌজদারী মামলায় ১৬৪ ধারা মোতাবেক আসামির স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি এবং নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের মামলায় ২২ ধারা মোতাবেক ভিকটিম বা সাক্ষীর জবানবন্দি রেকর্ডসহ ভিকটিমকে জিম্মায় নেওয়ার বিষয়েও চলছে শুনানী। এজন্য কাজ করছেন সিজেএমসহ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেসিতে কর্মরত মোট ৮ জন বিচারকই। তাদের জ্যেষ্ঠতা অনুসারে দেওয়া হয়েছে বিভিন্ন আদালতের দায়িত্ব। ফলে কঠিন পরিস্থিতিতেও তাদের কাজের গতিতে নেই কোন কমতি। যে কারণে ৩ জুন থেকে ৯ জুন পর্যন্ত ৫ কার্যদিবসে জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেসির আওতায় জেলার ৫ উপজেলার আমলী আদালতগুলোতে অন্ততঃ ৫০টি জরুরি নালিশী মামলা দায়ের, দীর্ঘদিন যাবত ঝুলে থাকা ১২টি মামলায় রিমান্ড শুনানী ও ১০টি মামলায় জব্দনামা গ্রহণের বিষয়ে শুনানী নিস্পত্তি হয়েছে। সেইসাথে ওইসময়ে চীফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ও অধস্তন আমলী আদালতগুলোতে অন্ততঃ ৩৫০ জন আসামির জামিন হয়েছে। ফাইলিং, সারেন্ডারসহ যাবতীয় অতীব জরুরী দরখাস্ত ভার্চুয়ালী আদালতের সংশ্লিষ্ট ই-মেইল দাখিল করার পর আদালত ফিরতি মেইল/এসএমএস দিয়ে শুনানির তারিখ ও সময় জানিয়ে দিচ্ছেন এবং ওই দিন ও সময়ে সংশ্লিষ্ট বিচারক, আইনজীবী ও রাষ্ট্রপক্ষ স্ব-স্ব চেম্বার বা বাসা থেকে ভার্চুয়ালী শুনানীতে অংশ নিচ্ছেন। কেবল নালিশী মামলায় সংবাদদাতা বাদী/বাদীনি, সারেন্ডার আসামির ক্ষেত্রে এক মামলায় সর্বোচ্চ দু’জনকে গিয়ে উঠতে হচ্ছে আদালতের কাঠগড়ায়। সংশ্লিষ্ট পেশকার বা জিআরও সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে কাঠগড়ায় দাঁড়ানো বাদী বা আসামিদের যুক্ত করছেন সেই শুনানীতে। আর রিমান্ড শুনানীর ক্ষেত্রে কারাগার থেকে সংশ্লিষ্ট আসামিদের ভার্চুয়ালী শুনানীতে যুক্ত করছেন জেলার।
এদিকে শুরু থেকে এ পর্যন্ত (৮ জুন) চীফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ও অধস্তন আদালতগুলোতে জামিনের বিষয়ে মোট দায়েরকৃত ৬৯৫টি আবেদনের মধ্যে ৬৭৫টি আবেদনের শুনানী নিস্পত্তি হয়েছে। সেইসাথে মোট ২১২টি আবেদন নাকচ হওয়ায় অবশিষ্ট ৪৮৩ টি আবেদন মঞ্জুরক্রমে জামিন মিলেছে ৫৩৫ আসামির। এর আগে ঈদের পূর্ব পর্যন্ত (২০ মে) একই আদালতগুলোতে ৭ কার্যদিবসে মোট জামিন পাওয়া আসামির সংখ্যা ছিলো ১৬৫ এবং সারেন্ডার নেওয়ার পূর্ব পর্যন্ত (২ জুন) ৫ কার্যদিবসে তার মোট সংখ্যা ছিল ১৯২। অর্থাৎ শুরু থেকে ১২ কার্যদিবসে মোট জামিনপ্রাপ্ত আসামির সংখ্যা যেখানে ছিল ১৯২ জন, সেখানে সারেন্ডার নেওয়া থেকে ৮ জুন পর্যন্ত মোট ৫৩৫ জন আসামির জামিন হওয়ায় শেষ ৫ কার্যদিবসে জামিন পেয়েছে প্রায় ৩৫০ জন আসামি, যাতে কাজের পরিধি বাড়ার পাশাপাশি দ্বিগুণের বেশি বেড়েছে সুবিধাভোগীর সংখ্যা।
অন্যদিকে একই সময়ে জেলা ও দায়রা জজ আদালতে মোট ৫৯ জন এবং নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালসহ শিশু আদালতে মোট ২৩ জন আসামির জামিন হয়েছে। আদালত সূত্র জানিয়েছে, উচ্চ আদালতের নির্দেশনা মোতাবেক ইতোমধ্যে জেলা ও দায়রা জজ মোহাম্মদ আল মামুন তার অধস্তন আদালতগুলোতেও জরুরী ফৌজদারী ও দেওয়ানী আবেদন গ্রহণ ও শুনানীর সুযোগ করে দিয়েছেন। কিন্তু এখন পর্যন্ত ওই আদালতগুলোতে ফৌজদারী বা দেওয়ানী মামলায় কোন আবেদন পড়েনি।
ভার্চুয়াল শুনানীতে বিচারক ও আইনজীবীসহ তাদের সংশ্লিষ্টদের পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ও কোর্ট পুলিশ। এ বিষয়ে কোর্ট পুলিশ পরিদর্শক খন্দকার শহীদুল ইসলাম জানান, করোনা পরিস্থিতিতে সব ক্ষেত্রেই পুলিশ ফ্রন্টলাইনে কাজ করছে। ভার্চুয়াল শুনানীতেও ব্যতিক্রম নয়। তার মতে, হাজতী আসামিদের জামিন শুনানীর পাশাপাশি শেরপুরে আসামিদের সারেন্ডারসহ বেশ কিছু জরুরি ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে শুনানীর কার্যক্রম শুরু হওয়ায় মানুষের ন্যায় বিচার পাওয়ার পথ সুগম হয়েছে। আর ভার্চুয়াল শুনানীতে শেরপুরের জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেসির রেকর্ড প্রসঙ্গে ওইসব শুনানীতে সর্বাধিক অংশ নেওয়া আইনজীবী, জেলা বারের সাবেক সভাপতি রফিকুল ইসলাম আধার বলেন, হাজতী আসামিদের জামিন শুনানীর ক্ষেত্রে এমনিতেই ক্ষুদে জেলা শেরপুরের জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেসী একটি মডেল হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে- যা সম্ভব হয়েছে নবাগত চীফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট এসএম হুমায়ুন কবীরের সদিচ্ছা ও কাজের উদ্যমের পাশাপাশি সকলকে নিয়ে ভার্চুয়ালী প্রশিক্ষণসহ সুষ্ঠু পরিবেশ সৃষ্টি করার কারণে। আর এবার দেশের সব জেলাকে তাক লাগিয়ে শেরপুরে হাজতী আসামিদের জামিন শুনানীর পাশাপাশি কেবল বাদী/আসামিদের সাধারণ হাজিরা এবং বিচারিক কার্যক্রম ব্যতীত প্রায় সব ধরনের শুনানী ও কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে। নিস্পত্তিও হচ্ছে রেকর্ড পরিমাণ।
জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক এডভোকেট এমকে মুরাদুজ্জামান বলেন, সুপ্রীম কোর্টের সার্কুলারে অতীব জরুরী সকল কাজ ভার্চুয়ালী সম্পন্ন করবার কথা বলা হলেও একমাত্র শেরপুর ছাড়া আর কোথাও অতীব জরুরী সকল কাজ ভার্চুয়ালী শুনানির মাধ্যমে নিষ্পত্তি হচ্ছে না। এটি শেরপুরের জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেসির এক সাহসী ও বিরল দৃষ্টান্ত। একই কথা জানিয়ে আইনজীবী সমিতির সভাপতি এডভোকেট একেএম মোছাদ্দেক ফেরদৌসী বলেন, সরকার ও উচ্চ আদালতের যুগান্তকারী পদক্ষেপের আওতায় শেরপুরে জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেসিতে হাজতী আসামিদের জামিন শুনানীর পাশাপাশি জরুরি নালিশী মামলা দায়ের এবং সীমিত পরিসরে হলেও আসামিদের সারেন্ডারসহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম এতোদিন যার প্রায় সবগুলোই ঝুলে ছিল, সেগুলোও নিস্পত্তি হওয়ায় বা নিস্পত্তির সুযোগ সৃষ্টি হওয়ায় বিচারপ্রার্থী মানুষের ন্যায়বিচারের পথ অনেকটাই প্রশস্ত হয়েছে।