রাজনীতিতে একটি ব্যাপক শুদ্ধি অভিযান লাগবে

বিভুরঞ্জন সরকার:    জীবনের স্বাভাবিক প্রবাহ যখন ব্যাহত বা বাধাগ্রস্ত তখন রাজনীতির অবাধ প্রবাহ স্বাভাবিক থাকার কথা নয়। গত কয়েক বছর ধরেই রাজনীতির নিয়ন্ত্রণভার আওয়ামী লীগের হাতে। আওয়ামী লীগ ছাড়া দেশে আর কোনও সক্রিয় রাজনৈতিক দল আছে, এটাই মনে না হওয়ার অবস্থা তৈরি হয়েছে। এক সময় মনে হতো বিএনপির নানামুখী ষড়যন্ত্র এবং নানা ধরনের আওয়ামী লীগবিরোধী শক্তির ঐক্যবদ্ধ অপতৎপরতার কাছে আওয়ামী লীগ সরকার টিকতে পারবে না। আওয়ামী লীগকে ক্ষমতাচ্যুত করার জন্য সম্ভব-অসম্ভব সব উপায়ে অপচেষ্টা করে বিএনপির শক্তিক্ষয় ছাড়া আর কিছু হয়নি। বিএনপিকে পরাভূত করার জন্য আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ হাসিনা যেসব কৌশলের আশ্রয় নিয়েছেন, তার সব নীতি বা আদর্শিকভাবে দৃঢ় ছিল, সে দাবি করা যাবে না।

তবে ক্ষমতার রাজনীতিতে ক্ষমতায় টিকে থাকাই বড় কথা, অন্য কিছু নয়। শেখ হাসিনার সব কৌশলের সঙ্গে অনেকেরই একমত হওয়া কঠিন। তবে নীতিবানদের পরামর্শ শুনলে তার পক্ষে টানা তিনবারের মতো প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন হয়তো সম্ভব হতো না। একটি রাজনৈতিক দলের চূড়ান্ত লক্ষ্য তো ক্ষমতাই।

শেখ হাসিনার দৃঢ়তা, কৌশল এবং দূরদর্শিতার কাছে বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া বারবার হেরেছেন। খালেদা জিয়া সম্পর্কে তার সমর্থকরা যেসব ‘মিথ’ তৈরি করেছিলেন, তার জনপ্রিয়তার যে ফানুশ বানানো হয়েছিল, তার সবই একে একে ফুটো করে দিতে সক্ষম হয়েছেন শেখ হাসিনা। তিনি ঝুঁকি নিয়েছেন এবং জয়ী হয়েছেন। খালেদা জিয়াকে ক্যান্টনমেন্টের বাসা থেকে বের করলে হাসিনাকেও ক্ষমতা ছাড়তে হবে—এমন বিশ্বাস বিএনপি মহলে প্রবল ছিল। বিএনপি মনে করতো জিয়াউর রহমান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের চেয়েও জনপ্রিয়। জিয়ার স্মৃতিমাখা বাড়ি থেকে খালেদা জিয়াকে বের করলে বাংলাদেশের ঘরে ঘরে আগুন জ্বলবে। খালেদা জিয়াকে মইনুল হোসেন রোডের বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হলো আইনি ব্যবস্থার মাধ্যমে। তিনি কাঁদলেন। কিন্তু ঘরে ঘরে আগুন জ্বললো না। তার চোখের জল তার অসহায়ত্বই প্রকাশ করেছিল।

মানুষের ভোটের অধিকার সংকুচিত হলে, মানুষ পছন্দের প্রার্থীকে অবাধে ভোট দিতে না পারলে, বিএনপিসহ বিরোধী দলগুলো নির্বাচনে অংশ না নিলে শেখ হাসিনার পক্ষে দেশে নির্বাচন অনুষ্ঠান কিংবা ক্ষমতায় থাকা সম্ভব হবে না বলে ধরে নিয়ে আগুন-সন্ত্রাস শুরু করেছিল বিএনপি, জামায়াতে ইসলামীর সমর্থন নিয়ে। এই চ্যালেঞ্জেও জিতেছেন শেখ হাসিনা। তারপর বছর না ঘুরতেই শেখ হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত করতে খালেদার ভয়াবহ সহিংস আন্দোলন চলে তিন মাস ধরে। না, এবারও হারলেন খালেদা জিয়া।

শুরু হলো খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলার কার্যক্রম। তাকে শাস্তি দেওয়া হলে, কারাগারে নিলে দেশে আগুন জ্বলবে, শেখ হাসিনার ক্ষমতায় থাকা অসম্ভব করে তোলা হবে—এসব বাগাড়ম্বর বিএনপি নেতারা ক্রমাগত করেছেন। কিন্তু আদালত দীর্ঘ বিচারিক কার্যক্রম শেষে তাকে দোষী সাব্যস্ত করে কারাদণ্ড দিলে খালেদা জিয়াকে জেলে নেওয়া হলো। কিন্তু আগুন জ্বললো না। ভক্তকুল ঘরেই থাকলো। সরকার চাপে না পড়ে স্বস্তি বোধ করলো। বলা যায়, খালেদা জিয়ার জেলে যাওয়ার মধ্য দিয়ে বিএনপির রাজনীতিও পড়লো গাড্ডায়। এই গাড্ডা থেকে বিএনপির উঠে আসার সম্ভাবনা অতিক্ষীণ।

যারা সারাক্ষণ কষ্টকল্পনায় মশগুল থাকতেন যে, বিএনপি এই ক্ষমতায় এলো বলে, তারা এখন হতাশ। রাজনীতির সব কুতুব এক হয়েছেন, মঞ্চ গড়েছেন, ফ্রন্ট বানিয়েছেন কিন্তু শেখ হাসিনাকে, আওয়ামী লীগকে ঘায়েল করতে পারেননি। কেউ কেউ বলেন, শেখ হাসিনা তো ভোটের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসেননি। রাতের বেলায় ভোটের বাক্স ভর্তি করা হয়েছে। তিনি গণতন্ত্রকে হত্যা করেছেন। তিনি কর্তৃত্ববাদী একনায়কসুলভ শাসন কায়েম করেছেন। সব অভিযোগ অস্বীকার করা যাবে না। প্রশ্ন হলো, দেশের ব্যাপক জনগোষ্ঠী কি এতে খুব অসন্তুষ্ট? কিছু মানুষ অসন্তুষ্ট আছে, থাকবে। বেশি মানুষ মনে করে ভোট দিয়ে সরকার বদল করে কী লাভ হয়, তা তো দেখা আছে। ভোটের মাধ্যমে বিএনপি-জামায়াত দেশে যে সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদের গণতন্ত্র কায়েম করেছিল সেটা কি খুব ভালো ছিল? বিএনপির মন্দ গণতন্ত্র সহনীয় হলে আওয়ামী লীগের ‘নিয়ন্ত্রিত’ গণতন্ত্রে এত জ্বালা কেন? দরদ কি গণতন্ত্রের জন্য, নাকি জ্বলুনিটা আওয়ামী লীগ, শেখ হাসিনা ক্ষমতায় থাকার জন্য?

প্রায়ই বলা হয়, শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ দেশে ‘দুর্নীতি-লুটপাট-দুঃশাসন’ কায়েম করেছে এবং এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদী না হয়ে যারা নীরবতা পালন করে কার্যত সহযোগিতা করছেন তারা বুদ্ধিবৃত্তিক অপরাধ করছেন। যারা এই মত পোষণ করেন তাদের প্রতি শ্রদ্ধা রেখেও বলার কথা এটাই যে, বাংলাদেশের রাজনীতির দ্বন্দ্ব-সংঘাতগুলো অন্যদেশের মতো নয়। এখানে একাত্তরের, পঁচাত্তরের গভীর বিভাজন আছে। আমাদের রাজনীতির অভ্যন্তরীণ সমীকরণ, গণতন্ত্র চর্চার সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে সরল মন্তব্য করলে তাতে এক ধরনের ভ্রান্তি তৈরি হয়। যারা বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা করেন, রাজনীতিতে ভালো-মন্দের তফাত নির্ণয় করেন, তাদের কেউ কেউ যে ভাবের ঘরে চুরি করেন না, তাও হয়তো নয়।

বাংলাদেশের রাজনীতি, গণতন্ত্র বর্তমানে সত্যিকার অর্থেই একটি জটিল পথ অতিক্রম করছে। শেখ হাসিনা যা করছেন তার সব সঠিক বা নির্ভুল নয়। কিন্তু এর বিকল্প কী তা জোর দিয়ে কেউ বলতে পারছেন কি? ভোট দিয়ে মানুষ যাদের নির্বাচিত করবে, তারাই বিকল্প—এই সরলীকৃত ধারণা রাজনীতি এবং গণতন্ত্রের সংকট দূর না করে বাড়িয়ে তুলতে পারে।

রাজনীতিতে একটি ব্যাপক শুদ্ধি অভিযান লাগবে। সেই শুদ্ধি অভিযানে কে বা কারা নেতৃত্ব দেবেন সেটাই হলো এখন বিলিয়ন ডলারের প্রশ্ন। খালেদা জিয়া তার শারীরিক অসুস্থতার কারণে সেই নেতৃত্ব দিতে পারবেন না। তাছাড়া নেতৃত্ব-গুণে শেখ হাসিনার চেয়ে এগিয়ে, সেটাও তিনি প্রমাণে ব্যর্থ হয়েছেন। তার সম্পর্কে তৈরি সব ‘মিথ’ ভেঙে গেছে। তারেক রহমান সহসা দেশে ফিরে এসে বিএনপির মরা গাঙে বান ডাকাবেন, তারও কোনও লক্ষণ দেখা যায় না। বিএনপি সমর্থকদের এখন অপেক্ষা অলৌকিক কিছু ঘটার। কিন্তু রাজনীতির গতিপথ অলৌকিক ঘটনা দিয়ে নির্ধারিত হয় না।

এখন চলছে দুঃসহ করোনাকাল। এই অনিশ্চিত উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার সময়ে এমন একটি রাজনৈতিক আলোচনা উত্থাপনের জন্য প্ররোচিত হয়েছি আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক যোগাযোগ ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের একটি বক্তব্য পাঠ করে। ছয় দফা দিবস উপলক্ষে এক অনলাইন ব্রিফিংয়ে গত ৭ মার্চ তিনি ‘বিভেদের ভাইরাসে জাতিকে বিভ্রান্ত না করতে’ সবার প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘রাজনীতির সময় এটা নয়। রাজনীতি করার অনেক সময় আছে। করোনা প্রতিরোধে দলমত নির্বিশেষে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে সবার প্রতি আহ্বান জানান তিনি’।

আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদকের বক্তব্যে কোনও নতুন রাজনৈতিক চিন্তার প্রতিফলন ঘটেনি। এগুলো নিছক কথামালার রাজনীতি। করোনা প্রতিরোধে দলমত নির্বিশেষে সবাই মিলে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার বাস্তব অবস্থা দেশে নেই। আওয়ামী লীগ বা সরকার সেটা চায়ও না। এটা জাস্ট বলার জন্য বলা। সরকারের মধ্যে অন্যদের জন্য ছাড় দেওয়ার কোনও মানসিকতা নেই। তাছাড়া এটা রাজনীতি করার সময় নয় বলে তিনি যে বক্তব্য দিয়েছেন, সেটাও অরাজনৈতিক। রাজনীতির আবার সময়-অসময় কী? তারা সরকার চালাচ্ছেন রাজনৈতিক চিন্তার বাইরে? রাজনীতি শুধু সুসময়ের বিষয় নয়। মনে রাখতে হবে, সময় যেমন বহিয়া যায়, তেমনি দহিয়াও যায়। সময় এখন শেখ হাসিনার অনুকূলে। কিন্তু এটা কোনও চিরস্থায়ী ব্যবস্থা নয়। করোনা-পরবর্তী রাজনীতি গতানুগতিক ধারায়ই চলবে, তেমন ভবিষ্যদ্বাণী কি এখনই করা যাবে? করোনার অর্থনৈতিক দুর্যোগের অভিঘাত রাজনীতিতে লাগবে না তার গ্যারান্টি কে দিতে পারেন? তাই ভবিষ্যতের রাজনীতির প্রস্তুতি নেওয়ার সময় আসলে এখনই।

লেখক: জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক