জোনভিত্তিক লকডাউন আজ মধ্যরাত থেকে

নিউজ ডেস্ক:  করোনা মোকাবিলায় সংক্রমণের হার অনুযায়ী দেশকে রেড, ইয়েলো ও গ্রিন- এই তিন জোনে ভাগ করে প্রতিটি এলাকার জন্য পৃথক কর্মপরিকল্পনা সংক্রান্ত স্বাস্থ্য বিভাগের প্রস্তাবনায় সম্মতি দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এরপরই স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়সহ সংশ্নিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলো পরিকল্পনা বাস্তবায়নে কাজ শুরু করেছে। এরই অংশ হিসেবে প্রথম ধাপে রাজধানীর দুটি, নারায়ণগঞ্জ ও নরসিংদীর সংক্রমণপ্রবণ কয়েকটি এলাকায় আজ মঙ্গলবার মধ্যরাত থেকে পরীক্ষামূলকভাবে পাইলটিং কর্মসূচি গ্রহণ করা হবে।

রেড জোনের অন্তর্ভুক্ত রাজধানীর পূর্ব রাজাবাজার ও ওয়ারী এলাকায় লকডাউন দেওয়া হবে। এর বাইরে নরসিংদীর মাধবদী উপজেলা ও নারায়ণগঞ্জ জেলার কয়েকটি রেড জোন লকডাউন করা হবে। আজ মঙ্গলবার রাত ১২টা ১ মিনিট থেকে এসব এলাকায় লকডাউন কার্যকর করার কথা রয়েছে। এরপর ধাপে ধাপে গাজীপুর, কিশোরগঞ্জ, চট্টগ্রামসহ সারাদেশে এই কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হবে বলে স্বাস্থ্য বিভাগের একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে। তবে একসঙ্গে সব রেড, ইয়েলো ও গ্রিন জোনের নাম প্রকাশ করা হবে না। যেসব স্থানে জোনভিত্তিক কার্যক্রম শুরু হবে, কেবল ওই এলাকাগুলোর নাম প্রকাশ করা হবে।

করোনাভাইরাস সংক্রমণের মাত্রার ওপর ভিত্তি করে বিভিন্ন এলাকাকে রেড, ইয়েলো ও গ্রিন জোনে ভাগ করে লকডাউন ঘোষণার প্রস্তাবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অনুমোদন দিয়েছেন বলে সাংবাদিকদের জানিয়েছেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম। গতকাল সোমবার মন্ত্রিসভা বৈঠকের পর এক সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী এটি অ্যাপ্রিশিয়েট করেছেন। তবে ক্যাবিনেট মিটিংয়ে এটি নিয়ে আলোচনা হয়নি। স্বাস্থ্যমন্ত্রীর সঙ্গে তার আলোচনা হয়েছে। সংক্রামক ব্যাধি আইন অনুযায়ী বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তর অথরাইজড।

মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, আইনটি ব্যবহার করে যেভাবে জোনিং করার চিন্তাভাবনা হচ্ছে, এটা সারা পৃথিবীতে করা হচ্ছে। এটাতে সুবিধা আছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও অন্যান্য সংশ্নিষ্ট মন্ত্রণালয় এসব ঠিক করবে। কোনো এলাকায় যদি অধিক সংক্রমণ থাকে সেই এলাকাকে যদি স্পেশালি নিয়ন্ত্রণে নেওয়া যায়, সে বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী গত রোববারই সম্মতি দিয়েছেন।

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) মেয়র আতিকুল ইসলাম সমকালকে বলেন, আইইডিসিআরের তথ্য অনুযায়ী সংক্রমিত এলাকাগুলোকে চিহ্নিত করা হয়েছে। একইসঙ্গে জোনভিত্তিক কার্যক্রমের বিষয়ে একটি গাইডলাইন তৈরি করা হয়েছে। এসবের আলোকে রেড জোনের অন্তর্গত পূর্ব রাজাবাজারকে প্রথমধাপে লকডাউন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এরইমধ্যে এ বিষয়ে এলাকায় মাইকিং শুরু হয়েছে। মঙ্গলবার রাত ১২টার পর থেকে ওই এলাকায় লকডাউন কার্যকর করা হবে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আপাতত রাজধানীর পূর্ব রাজাবাজার, ওয়ারী, নারায়ণগঞ্জ জেলা ও নরসিংদীর মাধবদী উপজেলার কয়েকটি এলাকায় লকডাউন কার্যক্রম শুরুর নির্দেশনা দিয়েছেন। একইসঙ্গে পূর্ণ প্রস্তুতি গ্রহণ করে ধাপে ধাপে অন্যান্য এলাকায় এ কার্যক্রম গ্রহণের পরামর্শ দিয়েছেন। তবে তার আগে প্রতিটি এলাকায় প্রচার-প্রচারণা চালিয়ে জনসাধারণকে সচেতন করার পরামর্শও দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত ফোকাল পারসন ও অতিরিক্ত সচিব (প্রশাসন) হাবিবুর রহমান খান বলেন, জোনভিত্তিক কার্যক্রম শুরুর আগে সংশ্নিষ্ট প্রতিটি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের শীর্ষ কর্মকর্তারা ভার্চুয়াল বৈঠকে অংশ নেবেন। সবার মতামতের আলোকে পরবর্তী করণীয় নির্ধারণ করা হবে। জোনভিত্তিক কার্যক্রম দ্রুততম সময়ে শুরু হবে বলে জানান তিনি।

নারায়ণগঞ্জ, কক্সবাজারসহ দেশের কয়েকটি অঞ্চল লকডাউন করার কথা তুলে ধরে জানতে চাইলে হাবিবুর রহমান খান বলেন, স্থানীয় প্রশাসন স্থানীয়ভাবে সিদ্ধান্ত নিয়ে এটি করেছে। স্থানীয়ভাবে কেউ নিজের এলাকা ঝুঁকিমুক্ত রাখতে এ ধরনের নির্দেশনা দিতে পারেন।

ঢাকার ১০ এলাকা রেড জোন :স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সূত্র জানায়, প্রস্তাবনায় রাজধানীর ১০টি এলাকাকে রেড জোন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এলাকাগুলো হলো- গুলশান, কলাবাগান, গেন্ডারিয়া, পল্টন, সূত্রাপুর, রমনা, মতিঝিল, তেজগাঁও, শাহজাহানপুর এবং হাজারীবাগ। আজ মঙ্গলবার রাত ১২টা ১ মিনিট থেকে রাজধানীর পূর্ব রাজাবাজার ও ওয়ারী এলাকায় পাইলটিং লকডাউন কার্যক্রম শুরু হবে।

কী করা যাবে, কী করা যাবে না : করোনা সংক্রমণ বিবেচনা করে রেড, ইয়েলো ও গ্রিন জোনে কার্যক্রমের গাইডলাইন নির্ধারণ করা হয়েছে। রেড জোনে পুরোপুরি লকডাউন দেওয়া হবে। এই এলাকায় অফিস-আদালত ও অন্যান্য সব প্রতিষ্ঠান ও চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ থাকবে। তবে জরুরি সেবা অব্যাহত থাকবে এবং রাতে মালবাহী যান চলতে পারবে। ওই এলাকা বসবাসকারীদের জন্য নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের জন্য হোম ডেলিভারি ও নির্ধারিত ভ্যানে কাঁচাবাজারের ব্যবস্থা থাকবে। ওই এলাকার সব মানুষের নমুনা পরীক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যক নমুনা সংগ্রহ বুথ স্থাপন করা হবে। একই সঙ্গে জরুরি সেবার জন্য চিকিৎসক পুল প্রস্তুত থাকবে। রেড জোনের মতো ইয়েলো জোনেও শপিংমল বন্ধ থাকবে। তবে ইয়েলো ও গ্রিন জোনে মুদি দোকান খোলা থাকবে।

ইয়েলো জোনে অর্ধেক যাত্রী নিয়ে গণপরিবহন চলতে পারবে। একজন করে যাত্রী নিয়ে রিকশা ও অটোরিকশা চলতে পারবে। এই এলাকায় মালবাহী যানও চলবে। গ্রিন জোনে যানবাহন চলতে পারবে। রেড জোনে মসজিদে সাধারণের প্রবেশ নিষেধ থাকবে। ইয়েলো ও গ্রিন জোনে দূরত্ব বজায় রেখে মসজিদে নামাজ আদায় করা যাবে। ইয়েলো জোনে অফিস, কারখানা, কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প ৫০ শতাংশ কর্মী দিয়ে চালু রাখা যাবে। এর জন্য আগে থেকে স্থানীয় আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তা ও থানায় জানাতে হবে। তবে প্রত্যেকটি এলাকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকবে। রেড ও ইয়েলো জোনে জনসাধারণের অবাধ যাতায়াত বন্ধ করার জন্য ভৌগোলিক বাস্তবতা অনুসরণ করে সড়ক ও গলির মুখ বন্ধ করা হবে। পাড়া-মহল্লার ভেতরে আড্ডা পুরোপুরি বন্ধ থাকবে। রেড ও ইয়েলো জোনে কাঁচাবাজারের জন্য নির্ধারিত ভ্যান সার্ভিসের ব্যবস্থা করা হবে। আর লকডাউন এলাকার দরিদ্র ও ছিন্নমূল মানুষের জন্য খাদ্য সরবরাহ করা হবে।

মাঠে থাকবে ভ্রাম্যমাণ আদালত :রেড ও ইয়েলো জোনে করোনা আক্রান্ত ব্যক্তিদের হোম কোয়ারেন্টাইন নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কঠোর ভূমিকা পালন করবে। আইন অমান্যকারী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য রেড ও ইয়েলো জোনে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালিত হবে। প্রয়োজন হলে লকডাউন এলাকার করোনা আক্রান্তদের সরকার নির্ধারিত আইসোলেশন সেন্টারে নিয়ে যাওয়া হবে। আক্রান্তদের টেলিফোনের মাধ্যমেও চিকিৎসা সুবিধা নিশ্চিত করতে রেড ও ইয়েলো জোনে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর চিকিৎসক পুল প্রস্তুত রাখবে। লকডাউন এলাকার কোনো ব্যক্তিকে উন্নত চিকিৎসার জন্য বাইরে আসার প্রয়োজন হলে দায়িত্বপ্রাপ্ত পুলিশ সদস্যদের অনুমতি নিয়ে আসা যাবে। কোনো রোগীকে হাসপাতালে ভর্তির প্রয়োজন হলে রোগীর পরিবারের পক্ষ থেকে হটলাইন ১৬২৬৩ অথবা চিকিৎসক পুলের নম্বরে ফোন করলে কোন হাসপাতালে ভর্তি করা যেতে পারে, সে বিষয়ে সহযোগিতা করা হবে। লকডাউন এলাকায় কেউ মারা গেলে আল মারকাজুল ইসলাম, আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামসহ এই কাজে নিয়োজিত সংস্থার মাধ্যমে দাফন অথবা সৎকার করা হবে।

করোনা সংক্রমিত এলাকায় কেউ গেলে অথবা করোনা আক্রান্ত রোগীর কাছে গেলে মোবাইলে পুশ অ্যালার্ম স্বয়ংক্রিয়ভাবে চালু হবে। রেড ও ইয়েলো জোন সম্পর্কে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম, টেলিভিশন ও মসজিদের মাইক থেকেও সতর্কীকরণ বার্তা প্রচার করা হবে। রাজধানীর ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় একটি কমিটির অধীনে স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলের নেতৃত্বে পুলিশ, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও সিটি করপোরেশনের প্রতিনিধিসহ স্থানীয় জনসাধারণকে সম্পৃক্ত করে লকডাউনসহ অন্যান্য বিষয় বাস্তবায়িত হবে। মেয়রের সভাপতিত্বে কেন্দ্রীয় ব্যবস্থাপনা কমিটি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের চিহ্নিত এলাকা থেকে অগ্রাধিকার ও পারিপার্শ্বিক সক্ষমতা বিবেচনা করে এলাকা বা স্থান বাছাই করে নির্ধারিত রেড জোনে লকডাউন করবেন। একই সঙ্গে ইয়েলো ও গ্রিন জোনের সার্বিক ব্যবস্থাপনার বিষয়ে নির্দেশনা দেবেন। সংশ্নিষ্ট ওয়ার্ড কাউন্সিলরের নেতৃত্বে করা কমিটি এটি বাস্তবায়ন করবে।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক  বলেন, স্বাস্থ্য বিভাগ একা চাইলেই পুরো প্রক্রিয়াটি বাস্তবায়ন করতে পারবে না। অন্যান্য মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলো এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত রয়েছে। সুতরাং সম্মিলিতভাবে প্রস্তুতি নিয়েই কার্যক্রমটি বাস্তবায়ন করা হবে। সবার মতামতের আলোকে পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে। বর্তমান পরিস্থিতিতে জোনভিত্তিক কার্যক্রম গ্রহণ ছাড়া বিকল্প নেই বলে মনে করেন তিনি।