‘শেষ ঘণ্টা বাজার আগেই’—

‘এখন আমার কাছে এ শহর বড় বেশি ধূসর ধূসর বলে মনে হয়।’ লিখেছিলেন সৈয়দ শামসুল হক। ‘আমার শহর’ নামের অপূর্ব এক দীর্ঘ কবিতায়। কবিতাটা প্রথম ছাপা হয়েছিল দৈনিক সংবাদ–এ, আশির দশকের মাঝামাঝি, পড়া শেষ করে স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলাম, বহু ঘণ্টা আর স্বাভাবিক হতে পারিনি। এই শহরে একদিন প্রাণচাঞ্চল্য ছিল, রাজপথে, ফুটপাতে, রেস্তোরাঁয় মানুষের সপ্রাণ উপস্থিতি ছিল, সেই শহর পাষাণপুরির মতো নিস্তব্ধ হয়ে যাচ্ছে। সৈয়দ শামসুল হক লিখেছিলেন:

এখন/ আমার কাছে/ এ শহর/ বড় বেশি ধূসর ধূসর বলে মনে হয়।/ পুরোনো বাড়ির টানে লক্ষ্মীবাজারের/ নবাবপুরের পথে হেঁটে যেতে যেতে/ আবিষ্কার করি—/ জন্মাষ্টমীর মিছিলের পদচিহ্ন পড়ে না এখন/ এখানে/ অথবা/ হোসেনি দালান থেকে তাজিয়ার যাত্রা নেই আর;/ শুধু শুনি, মনে হয়, যেন শুনতে পাই/ কোথায় অশ্রুর স্বরে কারা করে মর্সিয়া এখন; /জানা নেই;/ ধূসর ধূসর সব।

তিনি লিখেছেন:
শাহজাদা সেলিম/ সাজে না আর/ নৃত্যনাট্যে গহর জামিল;/ পারভেজ চিত্রালী হাতে দাঁড়ায় না সিদ্দিকবাজারে;/ শহরের প্রতি পথে/ ধূসরতা আর মর্সিয়া।/ মর্সিয়া আর ধূসরতা।/ সুলতান ভাইয়ের ভাঙা সাইকেল রাখা নেই যেদিকে তাকাই,/ মুনীর চৌধুরী নেই ‘কবর’ রচনারত সেন্ট্রাল জেলে,/ শামসুল হক নেই,/ কবেই তো ইমাদুল্লা গেছে;/ এ শহরে শুনি না এখন/ শেখ মুজিবের পায়ে কাবুলি চপ্পল/ বাংলার বুকের গভীরে/ শব্দ তুলে হেঁটে যাচ্ছে/ আরমানীটোলা থেকে/ কারকুন বাড়ির গলিতে/ মৌলানা ভাসানীর বারান্দায়/ র‌্যাপার মাফলার মোড়া কর্মীদের দীর্ঘ প্রতীক্ষায়—কবে আসবে সব?

এখন বেঁচে থাকলে সৈয়দ শামসুল হক কী ভাবতেন? কী লিখতেন? আমরা একটা ঈদ পার করলাম, শোলাকিয়ায় বৃহত্তম ঈদের জামাতের মাঠ পড়ে ছিল ধু ধু পোড়োভূমির মতো, জাতীয় ঈদগাহ মাঠ খোলা হয়নি, বেশির ভাগ মানুষ বাড়িতেই নামাজ সেরেছে; কেউ কারও সঙ্গে মোলাকাত করেনি। একটা পয়লা বৈশাখ পার হলো, রমনার বটমূলে বসেনি ছায়ানটের বর্ষ আবাহনী সংগীতের আসর! এখন মা পারছেন না অসুস্থ সন্তানের কপালে হাত রাখতে, সন্তান প্রবেশাধিকার পাচ্ছে না মায়ের ঘরে ঢোকার। ডেন্টিস্ট বসছেন না চেম্বার খুলে, রোগীও যাচ্ছে না দাঁতের ব্যথায় কাতর হওয়া সত্ত্বেও, পরস্পর পরস্পরকে ভাবছে সম্ভাব্য করোনাবাহী, সম্ভাব্য ঘাতক। কেউ কারও কাছে যাচ্ছে না, কেউ কারও সামনাসামনি মুখ খুলে কথা বলতে পারছে না; মানুষ ভুলে যাচ্ছে স্পর্শ। মানুষ ভুলে যাচ্ছে কাছে যাওয়া।

মাত্র কদিনের মধ্যে এই শহর বিরান হয়ে গেল। জামিলুর রেজা চৌধুরী স্যার আর আসবেন না সেন্ট জোসেফ স্কুলের মাঠে, গণিত অলিম্পিয়াডের পতাকা তুলে বলবেন না, ‘আমার একটা স্বপ্ন আছে, ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশ থেকে কেউ একজন বিজ্ঞানের নোবেল পুরস্কার নিয়ে আসবে!’ নিলুফার মঞ্জুর নেই, দেখা হলে হেসে বলবেন না, মেয়ে কোথায় আছে, কী করছে? আনিসুজ্জামান স্যার চলে যাবেন এত তাড়াতাড়ি, কে ভাবতে পেরেছিল? মাত্র সেদিন, ২৬ মার্চ ২০২০, তিনি লিখলেন প্রথম আলোর প্রথম পৃষ্ঠায়! এপ্রিলের শুরুতে হাসপাতালে গেলেন, মে মাসের ১৪-তে কোভিড ১৯-এই তাঁর বিদায়! ঢোলা পায়জামা পরা আনিস স্যারের গায়ে উজ্জ্বল আড়ংয়ের পাঞ্জাবি, তিনি এসে আর বসবেন না প্রথম আলোর সাততলায়, আমার টেবিলের খুব কাছের সোফায়, এক কাপ কফিতে পকেট থেকে বের করা সুইটেনার মেশাতে মেশাতে বলবেন না, প্রুফটা দাও, দেখে দিই। ‘আমার অভিধানে’ লিখবেন না, ‘অনিরাপদ’ নয়, কথাটা হবে ‘বিপজ্জনক’। এনটিভিতে অনুষ্ঠান বিভাগের প্রধান মোস্তফা কামাল সৈয়দের মতো সুভাষী, স্মিত হাসি, সুরুচিসম্পন্ন মানুষকে আমরা হারালাম কোভিডের কারণে! ফেব্রুয়ারিতেই তিনি এসেছিলেন প্রথম আলোয়, সম্পাদক মতিউর রহমানের আমন্ত্রণে মধ্যাহ্নভোজনের আড্ডায়, তাঁর সঙ্গে ছিলেন নওয়াজীশ আলী খান, আবুল হায়াত, মামুনুর রশীদ, সৈয়দ আব্দুল হাদী।

ছয় মাস আগে, ডিসেম্বর ২০১৯-এ স্যার ফজলে হাসান আবেদ চলে গেছেন, রেখে গেছেন পৃথিবীর বৃহত্তম এনজিও; সেই শূন্যতা কীভাবে পূরণ হবে?

প্রতিটা দিন অন্তরটা হিম হয়ে থাকে। অনলাইনে খবরের আপডেট দেখতে ভয় পাই। কোন দুঃসংবাদ না জানি অপেক্ষা করছে! মাস চারেক আগে বন্ধুবান্ধব পরিচিত–অপরিচিত বাঙালিদের কোভিডে আক্রান্ত হয়ে জীবনাবসানের খবর আসত নিউইয়র্ক থেকে। এখন আসছে সারা বাংলাদেশ থেকে। শরতের সকালে যেমন করে শিউলি ঝরে পড়ে, তেমনি করে যেন মানুষ ঝরে ঝরে পড়ছে। মারা যাচ্ছেন দুদকের পরিচালক, মারা যাচ্ছেন সাবেক সচিব, কতজন যে ডাক্তার মারা গেলেন। মারা যাচ্ছেন পুলিশের তরুণ কর্মকর্তা। মারা যাচ্ছেন নিকটাত্মীয়। মারা যাচ্ছেন তরুণ সাংবাদিক। মারা যাচ্ছেন সহকর্মীর মা। মারা যাচ্ছেন বন কর্মকর্তা। মারা যাচ্ছেন কাস্টমস অফিসার। মারা যাচ্ছেন সরকারি প্রশাসনিক কর্মকর্তা। মারা যাচ্ছেন স্বামীর পর স্ত্রী, ছেলের পথ ধরে মারা যাচ্ছেন বাবা। সারা বাংলাদেশে কত নাম না জানা মানুষ যে চলে যাচ্ছে অকালে, সব খবর কি আমরা রাখি? ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিয়নের সামনে করোনার টেস্ট করাতে এসে সেখানেই মারা গেছেন সাংবাদিক। তেমনি পথেঘাটেও তো মারা যাচ্ছে মানুষ। শিশু মারা যাচ্ছে হাসপাতালে ভর্তি হতে না পেরে, ঠিক সময়ে চিকিৎসা শুরু না হওয়ায়, ঘড়ি ধরে ধরে তার সেই শেষযাত্রার বর্ণনা প্রথম আলোয় লিখছেন মিজানুর রহমান খান।

এ শহর আমার কাছে বড় বেশি ধূসর ধূসর বলে মনে হয়!

২. সাধারণ ছুটি উঠিয়ে নেওয়া হয়েছে, ট্রেন–বাস–লঞ্চ চলতে শুরু করেছে, সংক্রমণ দ্রুত বাড়বে। রোগীর সংখ্যা বাড়বে জ্যামিতিক হারে। আরও আরও মৃত্যুর খবর শুনতে হবে—নিজের মৃত্যুর কথা ভাবি না, মরে গেলে তো গেলামই—প্রিয় মানুষদের, প্রিয়জনদের মৃত্যুর খবর তো সহ্য করতে পারব না। আর চারদিকে আক্রান্ত হওয়ার খবর, বন্ধু, আত্মীয়, সহকর্মীর! আমি ভাবি, আচ্ছা কুড়িগ্রামে, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়, বান্দরবানে, রূপসায়, পাথুরিয়ায়, টেকনাফে, তেঁতুলিয়ার কারও করোনার লক্ষণ দেখা দিলে তিনি টেস্ট করাবেনই–বা কোথায়? আর যদি দরকার হয়, অক্সিজেনই–বা পাবেন কোথায়? এখন ঢাকাতেই কোনো হাসপাতালে একটা বেড পাওয়াও লটারিতে ফার্স্ট প্রাইজ পাওয়ার মতো কঠিন। প্রধানমন্ত্রী আদেশ দিয়েছেন সব জেলা হাসপাতালে আইসিইউ সুবিধা চালু করতে। সব উপজেলা হাসপাতালেও করোনা ইউনিট লাগবে। ভেন্টিলেটর না হোক, অন্তত অক্সিজেনের সুবিধাটা সব জায়গায় সুপ্রতুল থাকা উচিত!

৩. ভিকারুননিসা স্কুলের শিক্ষক তাজিন বিনতে রহমান মারা গেছেন পরশু। তাঁর প্রথম সন্তানের জন্ম দেওয়ার পর। তাঁর ছাত্রীরা ফেসবুকে অভিযোগ করছেন, তাজিন রহমানের করোনা ছিল না, কিন্তু হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার আগে তাঁকে প্রত্যাখ্যাত হতে হয়েছে তিনটা নামী হাসপাতালের দোরগোড়া থেকে! মা মারা গেছেন নবজাতক শিশুটিকে রেখে—কী হবে এখন?

এই শঙ্কাই ছিল প্রবল। করোনা নিদানকালে সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী হবেন গর্ভবতী মা, নবজাতক শিশু। কোভিড ছাড়াও তো কত রকমের অসুখ-বিসুখ, দুর্ঘটনায় চিকিৎসার দরকার হয়! চোখের অসুখ হলে চোখ দেখাব কোথায়? পেটে ব্যথা উঠলে কার কাছে যাব?

পেশাজীবীদের মধ্যে ডাক্তাররা মারা গেছেন সবচেয়ে বেশি! তাঁদের সুরক্ষা দিতে হবে। তাঁদের মানসিক প্রেরণা জোগাতে হবে। আবার সারা দেশের চিকিৎসাব্যবস্থায় শৃঙ্খলা আনতে হবে। বেশি করে করোনা পরীক্ষার আরও একটা সুবিধা আছে, তা হলো যাঁরা করোনা পজিটিভ থেকে নেগেটিভ হবেন, তাঁরা যেমন প্লাজমা দিতে পারবেন, তেমনি তাঁরা কাজে ফিরে আসতে পারবেন সাহসের সঙ্গে। বেশি বেশি পরীক্ষার সুবিধা তাই চাই-ই চাই।

আরেকটা সমস্যা আছে। হাসপাতাল বর্জ্য অপসারণ। বেশির ভাগ মাস্ক কিংবা পিপিই একবার ব্যবহার করে ফেলে দিতে হয়! এগুলোর নিরাপদ অপসারণের কোনো ব্যবস্থা তো আমাদের দেশে নেই!

সৈয়দ শামসুল হকের ‘আমার শহর’ কবিতার শেষ চরণগুলো এই রকম:

যেখানেই থাকো তুমি কবি চিত্রকর,

কিংবা তুমি হও যদি কিছু নয়—শুধুই দুর্জয়;

শেষ ঘণ্টা বাজার আগেই

তোমাদেরই জন্য আমি রেখে যাবো যাবতীয় বিষয়-আশয়;

জেনো, জয়নুলের ব্রহ্মপুত্র এভাবেই নীল থেকে গাঢ় নীল হয়;

শহর প্রকৃতপক্ষে মানুষের হয়॥

আনিসুল হক: প্রথম আলোর সহযোগী সম্পাদক ও সাহিত্যিক

জেড,আই/ঢাকানিউজ২৪ডটকম।