নিজ গ্রামে দাফনে বাধা চরম নিষ্ঠুরতা!

প্রফেসর ড. মো: ফখরুল ইসলাম,

‘জন্মিলে মরিতে হইবে’- এটাই পৃথিবীর নিয়ম। করোনা বা অন্য কোন রোগ-শোকে বা যে কোন কারণে সবাই যে কোনদিন মারা যাব। মারা যাবার পর সবার ইচ্ছে থাকে নিজ জন্মভূমি বা এলাকায় তার দাফন, সৎকার করা হোক। যাতে আপনজনরা তার কবর দেখে বিশেষ দিনগুলোতে তাকে স্মরণ করে, তার জন্য দোয়া করে। এজন্য অনেকে মৃত্যুর পূর্বে শেষ ইচ্ছে হিসেবে তার লাশ দাফনের স্থানের কথা জানিয়ে দেন।

করোনা বিপর্যয় শুরু হবার পর এই রোগে মৃতদের দাফন করা নিয়ে নানা ঘটনা জানা গেছে। রাজধানী ঢাকায় কোভিড-১৯ ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে যারা মারা যান তাদের কোন কবরস্থানে দাফন করা হবে সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে বেশ বেগ পেতে হয়েছে। অনেকে মারা যাবার পর গ্রামের বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হলে সেখানে এলাকাবাসী লাশ গাড়ি থেকে মাটিতে নামাতে দেয়নি। এজন্য ঝগড়া বিবাদ, রাজনীতি, কুসংস্কার, ভয়-ভীতি নানা বিষয়কে হাজির করে তালগোল পাকানো হয়েছে। সম্প্রতি লাশ দাফনে বাধা দেয়ার মত কিছু ঘটনা সংবাদের শিরোনাম হয়ে মানুষের বিশেষ দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে, যা অত্যন্ত অমানবিক ও মর্মান্তিক। করোনায় আক্রান্ত কি-না তা টেষ্ট করার আগে নিশ্চিত হবার উপায় করো নেই। শুধু লক্ষণ দেখে করোনা বুঝা যায় না। কারণ, দেখতে একদম অনেক সুস্থ্য মানুষ এর জীবাণু বহন করতে পারে। অনেকে করোনার লক্ষণ নিয়ে মারা গেছেন কিন্তু টেষ্ট করার পর তাদের করোনা ফলাফল নেতিবাচক এসেছে। এধরনের অন্তত: এক ডজন দু:খজনক ঘটনা সংবাদমাধ্যমে জানা গেছে। এখানে যে দু’টি বিশেষ ঘটনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে তাদেরও টেষ্ট করার পর ফলাফল নেতিবাচক পাওয়া গেছে।

মতলব দক্ষিণ উপজেলার নায়ের গাঁওয়ের নাউজান গ্রামের জনৈক পাটোয়ারী (৩২) শ্বাসকষ্ট ও জ্বর নিয়ে মারা গেছেন। নিছক সন্দেহের বশবর্তী হয়ে তার লাশ দাফনে বাধা দিয়েছে তার নিজ গ্রামের লোকজন। হায়রে নিয়তি! এটা কি ভয়? হীনমন্যতা, কুসংস্কার, হিংসা, নাকি ক্ষমতার দাপট? বেঁচে থাকা মানুষগুলো একদিন যার খেলার সাথী ছিল, আপনজন ছিল তারা আজ তাদের চিরচেনা বন্ধুর লাশকে যথাযথ মর্যাদা দিতে কার্পণ্য করছে। লাশের সাথে এ কেমন দুর্ব্যবহার করছে! যে মাটিতে তার জন্ম সেই মাটি তাকে কোলে নিতে পারছে না নিষ্ঠুর মানুষগুলোর জন্য।

আরেকটি মর্মন্তুদ ঘটনা ঘটেছে পাটগ্রাম থানার আমবাড়ি গ্রামে। যে গ্রামের এক মহিলা কর্মী টঙ্গীতে পোশাক কারখানায় কাজ করতো, ঈদের ছুটিতে ট্রাকে চড়ে বাড়িতে ফেরার সময় ভোররাতে রংপুর ক্যাডেট কলেজের কাছে তার মৃত্যু হয়। মৃত্যুর ষোল ঘন্টা পর অনেক লুকোচুরি শেষে তার বাবাকে খবর দেয়া হলে। এরপর পুলিশকে খবর দিলে নিয়মানুযায়ী মেডিকেল কলেজে নিয়ে লাশের পোস্টমর্টেম করা হয়। পুলিশের সিলমারা সাদা প্লাটিষ্ক কভারে ভরে তার বাবাকে বুঝিয়ে দিলে বাবা লাশ নিয়ে গ্রামে চলে যান। এর পরের ঘটনা অনেক করুণ, অনেক ঘৃণার। লাশ বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান গ্রামের মধ্যে লাশ দাফনে বাধা দেন। লাশ তাদের গ্রামে নিয়ে এলে লাশবাহী গাড়ি পুড়িয়ে দেয়া হবে বলে ভয় দেখিয়েছেন। মেয়ের বাবা নিরুপায় হয়ে আন্জুমানে মফিদুল ইসলামের নিকট দাফনের জন্য লাশটি দিয়ে দেন। এজন্য তিনি একটি লাশবাহী গাড়ির ড্রাইভারকে পাঁচ হাজার টাকা প্রদান করেন। কিন্তু উক্ত ড্রাইভার লাশটি আন্জুমানে মফিদুল ইসলামের নিকট হস্তান্তর না করে গভীর রাতে রংপুরের গঙ্গাচড়া থানার দ্বিতীয় তিস্তা সেতুর নিকট তিস্তা নদীতে ভাসিয়ে দেয়। একজন এম্বুলেন্সের ড্রাইভার কী করে পাঁচ হাজার টাকা আত্মসাৎ করে একটি পোষ্টমর্টেম করা লাশকে ঠিকানায় পৌছিয়ে না দিয়ে নদীর স্রোতে ভাসিয়ে দিল? এই কি তার বিবেক?

নদীর স্রোতের টানে সেই লাশ লালমনিরহাটের আদিতমারী থানার গোবর্ধন ইউনিয়নে ভেসে এলে সেখানকার মানুষ সাদা ব্যাগে বাংলাদেশ পুলিশ লেখা দেখে আদিতমারী থানায় খবর দেন। পুলিশ পুনরায় তার বাবাকে খবর দেয় এবং তিনি এসে মেয়ের লাশ শনাক্ত করেন। এরপর প্রশাসনিক হস্তক্ষেপে পুনরায় গলিত লাশ তার গ্রামের বাড়িতে নিয়ে দাফন করা হয়। পুরো বিষয়টি নিয়ে এক করুণ নাটকের সৃষ্টি করা হয়েছে। যা লেখার ভাষায় বর্ণনা করা কঠিন। তদন্ত কমিটির রিপোর্টে স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে লাশ দাফনে বাঁধা দেয়ার প্রমাণ পাওয়া আছে বলে জানা গেছে।

করোনার নিষ্ঠুরতায় মানুষের মধ্যে হতাশা বেড়েছে বহুগুণ। বিচলিত মানুষ যে কোন বিষয়ে সঠিক সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছে। বুদ্ধিবৃত্তিক মানুষকে বোকা ও অসচেতন করছে এই অদৃশ্য জীবানুর ভয়াবহতা। এর ফলে স্বার্থপরতা বেশী বেশী মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে। আতঙ্কগ্রস্ত মানুষ ক্রমান্বয়ে নানা কুসংস্কারে অন্ধ হয়ে উঠছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভুয়া নির্দেশনা ও বিনি পয়সার অবাধ জ্ঞান বিতরণ প্রক্রিয়া এই কুসংস্কারকে আরো বেশী উস্কে দিচ্ছে। করোনার ভয়ে মৃতদেহ দাফন বা সৎকারে আত্মীয়রা ভার্চ্যুয়াল জানাজা পড়ছেন, ঠিক আছে কিন্তু মৃতদেহ রেল স্টেশনে, হাসপাতালে ফেলে পালিয়ে যাচ্ছেন কেন? চলতি পথে গাড়িতে কোন যাত্রী মারা গেলে তাকে রাস্তার পাশে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে চলে যেতে হবে- এমন পৈশাচিক অবস্থা তৈরীর জন্য করোনাকে দায়ী করা হলেও দায়ী হচ্ছে সেইসকল মানুষ যারা স্বার্থপরতার চরম অবস্থানে চলে গিয়েছে। এমনকি মারা যায়নি অথচ করোনা হয়েছে ভেবে এক মাকেও সন্তান ও জামাই মিলে জঙ্গলে ফেলে আসার অমানবিক সংবাদ জানা গেছে।

বেহুশ মানুষ নিজে বাঁচার জন্য জীবন ও জীবিকাকে সমার্থক ভাবতে গিয়ে মানবিক মূল্যবোধ হারিয়ে বনের পশুর পর্যায়ে চলে গেছে। ভোগবাদী মানুষ শুধু দুনিয়ার খেয়াল নিয়ে মত্ত থাকার ফলে মৃত্যুর প্রস্তুতি কখনো নেয় না। ফলে মৃত্যুর সময় ঘনিয়ে এলে বাস্তবতা বুঝতে পেরে সবকিছুতে হুঁশ হারিয়ে ফেলে। ভোগবাদীরা জীবনটাকে ভোগ-বিলাসে মত্ত রাখায় সৃষ্টিকর্তা প্রদত্ত নির্দিষ্ট পথে অবস্থান করে না। ফলে শুধু দুনিয়ার খেয়াল তাদেরকে অন্ধ ও বেশী স্বার্থপর করে তোলে। ফলে মৃত্যুভয় তাদেরকে বেশী আতঙ্কগ্রস্থ করে তোলে। নিজে বাঁচার জন্য তারা বেশী তৎপর হয়ে যায়।

আমাদের দেশে করোনা সংক্রমণ এখনও শীর্ষবিন্দুতে পৌঁছায়নি। সামনে কঠিন দিন অপেক্ষা করছে বলে অনেকে অভিমত দিয়েছেন। সেই ভয়ংকর দিন না আসুক সেটাই আমরা কামনা করি। কিন্তু সেই দুর্দিন আসার আগেই আমরা করোনা সন্দেহে সাধারন লাশের সংগে চরম দুর্ব্যবহার শুরু করে দিয়েছি। একজন ইউপি চেয়ারম্যান বা যে কোন জনপ্রতিনিধি তার এলাকায় কোন করোনা রেগীর লাশ দাফনে বাধা দেয়া বা এ ধরনের নিষ্ঠুর নিষেধাজ্ঞা বা আদেশ দিতে পারেন না।

একটি লাশ যদি একজন করোনাক্রান্ত রোগীর হয়েই থাকে তাহলে তাকে কোন এলাকার মাটিতে দাফনে করতে বা সৎকার করতে বাধা দেয়ার যুক্তি কী? এজন্য স্বাস্থ্যঝুঁকি আছে কিনা তা আজও কেউ মুখ খুলে ব্যাখ্যা করছেন না। কেউ কেউ বলেছেন, মৃত ব্যক্তি থেকে করোনা সংক্রমণ ছড়ায় না। কবরে মাটি চাপা দিলে সেই লাশ থেকে জীবানু মাটি ফেটে বের হয়ে আসার কথা নিতান্তই একটা গুজব। এর পিছনে ধর্মীয় ও সামাজিক যুক্তি ও বিধিনিষেধ কী তা আজও মানুষের কাছে পরিষ্কার নয়। তাই মানুষ অন্ধের মত হীনমন্যতাবোধ থেকে সঠিক বৈজ্ঞানিক কারণ না জেনে বার বার লাশ দাফনে বাঁধা দিচ্ছে। শুধু সন্দেহ করে এমন নিষ্ঠুর আচরণ করতে দিলে মানুষের কষ্ট ও হতাশা আরো বেড়ে গিয়ে সামাজিক অস্থিরতা তৈরী হবার সম্ভাবনা বাড়ে। মানুষ শান্তিতে মরতে চায়। মৃতদের আত্মীয়রা শান্তিপূর্ণ পরিবেশে স্বজনের লাশ দাফন ও সৎকার করার নিশ্চয়তা চায়। এ ব্যাপারে সরকারী ঘোষণা পরিষ্কারভাবে থাকা দরকার।

করোনার ভয়াবহ সময়ে আমরা আরো সচেতন থাকি। মেডিকেল বর্জ্য ও ব্যবহৃত মাস্ক,
গ্লাভস্ ইত্যাদি যেখানে সেখানে ছুঁড়ে ফেলে না দিয়ে এ বিষয়ে স্বাস্থ্যসম্মতভাবে ব্যবস্থা গ্রহণ করি। বিশেষ করে দুর্ভাগ্যবশত যারা আমাদেরকে ছেড়ে আগে পরপারে চলে যাচ্ছেন তাদের মরদেহ দাফন করতে বাধা না দিয়ে বরং সাধ্য অনুযায়ী সম্মান দেখাতে কার্পণ্য না করি। সব মানুষই এই নশ্বর পৃথিবী থেকে চলে যাবে- কেউ আজ, কেউবা আগামীকাল। সুতরাং শুধু সন্দেহবশত: লাশ দাফন নিয়ে এত ভয় ও নিষ্ঠুরতা কেন?

*লেখক রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডীন, সমাজকর্ম বিভাগের প্রফেসর ও সাবেক চেয়ারম্যান।E-mail: fakrul@ru.ac.bd

জেড,আই/ঢাকানিউজ২৪ডটকম।