এইডস-ইবোলার মত কোভিড-১৯ কি থেকে যাচ্ছে?

প্রফেসর ড. মো: ফখরুল ইসলাম,

অভিজাত অতি-মহামারীর কার্যকরী প্রতিশেধক এখনো এলো না। সংক্রমণ ও মৃত্যু দুটোই বেড়েই চলেছে। জীবিকার তাগিদে মানুষ ঘরের বাইরে বের হয়ে পরেছে ইউরোপ সহ নানা দেশে। আমাদের দেশেও অফিস খুলে দেয়ার ঘোষণা হয়েছে, নিয়মানুযায়ী গণপরিবহন চলবে। ইতোমধ্যে যে যেভাবে পারে কর্মস্থলে ফিরছে গাদাগাদি করে ফেরীতে, পায়ে হেঁটে মিছিল করে। পাশাপাশি কোভিড-১৯ সংক্রমণের নতুন রেকর্ড প্রতিদিনই হচ্ছে। আমাদের দেশে গত ২৪ ঘন্টায় ২,৫২৩ জন সংক্রমিত হয়েছে। মৃত্যুসংখ্যা বেড়ে ৫৮২ জনে পৌঁছেছে।

শুধু আমাদের দেশে নয় সারা পৃথিবীতে মানুষের ধৈর্য্য আর ধরে রাখার ক্ষমতা বা উপায় কোনটিই কাজে আসছে না। যারা আতশবাজি পুড়িয়ে বলেছিলেন তাদের দেশ করোনামুক্ত হয়েছে, লকডাউন উঠিয়ে সবকিছু খুলে দেয়া হলো- পুনরায় নতুন সংক্রমণের খবরে তাদের মাথায় আবার বাজ পড়েছে। এরপরও তাদের মধ্যে এ বিষয়ে ক্ষান্ত দিয়ে ঘরে ফেরার লক্ষণ নেই।

টানা তিন দিন বন্ধ থাকার পর নিউজিল্যান্ডে আবার নতুন করে করোনা সংক্রমণ শুরু হয়েছে। নিউজিল্যান্ডের ঘুম উড়িয়ে দিয়ে অকল্যান্ডের ম্যারিস্ট কলেজের এক শিক্ষার্থীর দেহে করোনার জীবানু পাওয়া গেছে। এ পর্যন্ত ৮৫ জন রোগীর সাথে ঐ কলেজটির সম্পর্ক পাওয়া গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের জন হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্যসূত্র অনুযায়ী নিউজিল্যান্ডে করোনায় আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ১৪৯৮ জন, মারা গেছেন ২১ জন। এদিকে জিম, ক্যাফে, বার, স্কুল দোকান-পাট খুলে দিলেও আবার নতুন করে চিন্তায় পড়েছে দেশটির সরকার।

চীনের উত্তরাঞ্চলে জিলিন শহর পুরাপুরি লকড্ ডাউন করা হয়েছে। চার মিলিয়ন জনসংখ্যার ছিমছাম পর্যটন শহরটি বরফ ঘেরা জিলিন প্রদেশেরই অর্ন্তভুক্ত। হুবেই প্রদেশের উহান শহরের এগার মিলিয়ন নাগরিকের সবার করোনা টেষ্ট করা হচ্ছে। সেজন্য প্রতিদিন সাড়ে সাত লক্ষ মানুষের দেহে নমুনা সংগ্রহ ও যাচাই করা বিরাট এক কর্মযজ্ঞ্ তবুও নতুন সংক্রমণ ঠেকানার জন্য এ ছাড়া কোন বিকল্প দেখছেন না সিটি কর্তৃপক্ষ। কারণ পুরো একমাস সংক্রমণ বন্ধ থাকার পর সেখানে পুনরায় নতুন করে ছয়জন সংক্রমিত হয়েছে। তারা ভাবছেন- করোনার লক্ষণ নেই কিন্তু ভাইরাস ছড়িয়ে যাচ্ছেন এমন ব্যক্তিদেরকে খুঁজে পেতে হবে। তা না হলে নতুন সংক্রমণ হতেই থাকবে এবং করোনাকে উচ্ছেদ করা যাবে না।

করোনা সংক্রমণের শুরু থেকে ১৪৫ দিন পেরিয়ে বিশ্বে মোট মৃত্যু সংখ্যা তিন লাখ ষাট হাজার অতিক্রম করেছে। করোনার নতুন সংক্রমণ ও এত বেশী মৃত্যু সবাইকে খুব বেশী ভাবিয়ে তুলেছে। মানুষ তার প্রিয় জীবনের জন্য জীবিকার তাগিদে বাড়ির বাইরে বের হয়ে জীবনপাত নাকি ঘরে বসে না খেয়ে ধুকে ধুকে মৃত্যুবরণ করাটাকে প্রাধান্য দিবে তা নিয়ে সারা বিশ্বে তুমুল বিতর্কের সহসাই অবসান হচ্ছে না। করোনার টিকা আবিষ্কার এখনো সুদূর পরাহত। এ পর্যন্ত ব্যবহৃত ওষুধগুলোর কার্যকারীতা প্রশ্নবিদ্ধ। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণহীনভাবে যে যেমন করে পারছেন একেকটা ব্যাখ্যা দিয়ে নানা বিভ্রান্তি তৈরী করছেন। দেশে দেশে রাষ্ট্রনায়কগণ নিজেদের মধ্যে এ ব্যাপারে সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছেন। তাই এক অপরকে দোষারোপ করে আবোল-তাবোল বক্তব্য দিতে দেরী করছেন না। চিকিৎসা সেবা ব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়ায় মানুষ নিজের উপর ভরসা হারিয়ে আরো বেশী হতাশায় জর্জরিত হয়ে পড়ছে।

এভাবে গোটা পৃথিবী যেমন দুর্বল হয়ে যাচ্ছে, বেশী দুর্বল হচ্ছে এর বিচলিত মানুষগুলো। এইডস্, ইবোলার বিরুদ্ধে সংগ্রাম শেষ হবার আগেই করোনা-১৯ হানা দিয়েছে। এইডস্, ইবোলাকে পৃথিবী থেকে নির্মূল করা সম্ভব হয়নি। তবে তাদের আক্রমণের একটা নির্দিষ্ট ধরণ থাকায় সেগুলো জনমনে এতটা খারাপ প্রভাব ফেলেনি। করোনার আক্রমণের মাত্রা ও ভয়ংকর প্রভাব এক্ষেত্রে স্বাতন্ত্র্য নেতিবাচক বৈচিত্র বহন করে।

এইডস-ইবোলার মত করোনা কি থেকে যাচ্ছে? এখনও কেউই নিশ্চিত করে কোন সিদ্ধান্ত দিতে সক্ষমতা অর্জন করতে পারেননি। যেসব দেশ করোনকে উচ্ছেদ করে ফেলেছে বলে খুশীতে গদগদ হয়ে আতশবাজি ফুটিয়ে সংবাদ সম্মেলন করে নামযশ অর্জন করছিল তারা নতুন করে সংক্রমিত হওয়ায় সারা বিশ্বের আশা ভঙ্গ হতে চলেছে। এতে নতুন বিপদ দেখা দিয়েছে। কেউ বলছেন, করোনা বোনেদী অতিথি। এই বনেদী অতিথিকে অবহেলা করা হয়েছিল তারপর আদর করে বসতে দেয়া হয়েছে, খেতে দেয়া হয়েছে, তাই সে এখন শুতে চাচ্ছে। আরাম করে ঘুমিয়ে পড়লে তার সুখনিদ্রা ভাঙানো কঠিন হবে। আগামী দু’বছরে এর ঘুম ভাঙবে না।

এদিকে হযবরলভাবে বিভিন্ন ওষুধ ও টিকা ব্যবহারের কথা বলা হলেও সেগুলোর কার্যকারীতা পেতে আরো অনেক সময় লেগে যেতে পারে বলে বিশিষ্ট জীবানুবিজ্ঞানীগণ অভিমত দিয়েছেন। কারণ, টিকা তৈরীর কাজটি দ্রুত সম্পন্ন করা গেলেও সেগুলোর কার্যকারীতা নিরুপণের জন্য ট্রায়াল নিশ্চিত করা সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। এজন্য অধ্যবসায় ও চরম ধৈর্য্যরে পরীক্ষা দেয়াটা আরো কঠিন। দেশে দেশে এ কাজে নিয়োজিত অভিজ্ঞ চিকিৎসাবিজ্ঞানীগণ নিজেরাই ব্যাপকভাবে করোনায় আক্রান্ত হয়ে নিষ্ক্রিয়তায় চলে যাওয়ায় বিপদ আরো বেশী ঘণীভুত হয়েছে।

অন্যদিকে করোনায় ব্যাপক প্রাণহানি শুরু হয়ে যাওয়ায় মানুষের ধৈর্য্যরে বাধ টিকতে চাচ্ছে ন। এর সাথে সংযুক্ত হয়েছে জীবিকার নিরাপত্তাহীনতা, বেকারত্ব, অপরাধ, হতাশা, ইত্যাদি। মানুষ একটি বড় সমস্যার সমাধান করতে অপারগ হলে তখন তার ছোট সমস্যাগুলোও পর্বতসম মনে হয়। পৃথিবীর মানুষগুলো এখন সেই জটিলতার মধ্যে নিপতিত হয়ে পড়েছে।

তাই প্রতিশেধক নিয়ে আপাতত: যত সুখের সংবাদ আসুক না কেন মানুষকে মুখোশ পরে কতদিন, কতকাল কাটাতে হবে তার ভবিষ্যদ্বাণী করা দুরূহ। কারণ, সারা বিশ্বে ঝুঁকি বাড়াচ্ছে অগণিত উপসর্গহীন রোগী। যে রোগের লক্ষণ নেই, বৈশিষ্ট্য নিয়ে লুকোচুরি, তাকে ঝেঁটিয়ে বিদায় করাটা তো সহজ কাজ নয়। এইডস-ইবোলার মত করোনাকে নিয়ে চিন্তিত মানুষের ঘরকান্না কি চিরসাথী হয়ে থেকে যাবে-এটা এখন বড় সংশয়ের প্রশ্ন হয়ে দেখা দিয়েছে।

*লেখক রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডীন, সমাজকর্ম বিভাগের প্রফেসর ও সাবেক চেয়ারম্যান।E-mail: fakrul@ru.ac.bd

জেড,আই/ঢাকানিউজ২৪ডটকম।