সেই ঈদ, সেই ঈদগাছ আর সেই শিশুরা

রাশেদ রাফি,

আমাদের পাশের গ্রাম সাতবাড়িয়ায় বিশাল ঈদগাহ। চার গ্রামের মানুষ এ ঈদগাহে নামাজ পড়েন। একসময় চারদিক থেকে পুরো ঈদগাহকে ছাতার মতো বেষ্টন করে রাখত বিশাল এক গাছ। বটবৃক্ষের মতো বিশাল গাছটির নামের সঙ্গে এর আকৃতির মিল নেই। কিন্তু এর স্বভাবের সঙ্গে মিল আছে। লোকেরা একে বলত শিশুগাছ। আমি বলতাম ঈদগাছ। বৃষ্টি এলে ঈদগাছ তার ছোট ছোট ঘন পাতা দিয়ে পানি ধরে রাখত অনেকক্ষণ। এরপর যখন না পারত তখন ছেড়ে দিত; আমরা ভিজে যেতাম। ভিজে গেলে মনে হতো না ভিজে গেছি, মনে হতো ঈদগাছের পানি গায়ে লেগেছে।

আমাদের ঈদ শুরু হতো ঈদের আগের দিন রাত থেকে। রোজার ঈদে আকাশ মেঘলা থাকলে চাঁদ দেখা নিয়ে মাঝেমধ্যে সমস্যা হতো। পরে রেডিওর খবর শুনে বড়রা জানাতেন ঈদ হবে কি না। হবে শুনলেও মনে সন্দেহ থেকে যেত, কারণ চাঁদ তো দেখতে পারিনি। ভোর থেকেই আব্বা ডাকাডাকি শুরু করতেন গোসল করে তৈরি হওয়ার জন্য। আমি দেখতাম আমার পিঠাপিঠি ভাইটি উঠেছে কি না। ও না উঠলে আমিও উঠতাম না। এরপর হাশেম মাওলানা এসে ঈদগাহ থেকে সুর তুলে চার গ্রাম জাগিয়ে দিলে আমরা নিশ্চিত হতাম, আজই ঈদ। গোসল, পায়জামা, পাঞ্জাবি, খুশবু, সুরমা—এসবের পর মা সেমাই নিয়ে এসে হাজির হতেন, আমি মুখ গোমড়া করে রাখতাম। কারণ মিষ্টি পছন্দ করি না। মা বলতেন, এটা না খেয়ে ঈদগাহে গেলে ঈদ হবে না। ঈদ হবে না, বলে কী! এত অপেক্ষার ঈদ না হলে উপায় আছে? অগত্যা কয়েক চামচ খেয়ে নিতাম।

ঈদগাহে যেতাম বাড়ির সবাই দল বেঁধে। এরপর বড়রা আমাদের ছেড়ে মাঠে গিয়ে বসতেন। আমরা ছোটরা বেলুন কিনে ফুলিয়ে মাঠের চারদিকে ঘুরতাম। মাঝেমধ্যে বেলুন ফুটে ঠাস করে শব্দ হতো। এরপর আবার নতুন বেলুন ফুলাতাম। মাঠের একপাশে বিক্রি হতো বরইয়ের আচার, চানাচুর, চকলেট। মাঝেমধ্যে চানাচুর ও বরইয়ের আচার খেতাম। এসব করতে করতে সময় কেটে যেত। নামাজ শেষে বড়রা আমাদের খুঁজে বের করে নিয়ে যেতেন। আব্বা ও বড় ভাই আমাদের হাতে টাকা দিতেন রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা দরিদ্রদের হাতে তুলে দেওয়ার জন্য।

আমরা ওঁদের টাকা দিয়ে খুব আনন্দ পেতাম। আসার সময় অনেক করে বেলুন কিনে নিয়ে আসতাম। সারা দিন ওই সব বেলুন ফুলাতাম। ফুটে শেষ না হওয়া পর্যন্ত ঈদের দুই-তিন দিন চলত বেলুন ফুলানো আর ধাক্কা দিয়ে উড়িয়ে দেওয়ার খেলা। এটা ছিল অতি শৈশবের ঈদ। কৈশোর এলে কিছুটা পরিবর্তন আসে। যেমন বড়দের পাশাপাশি আমরাও নামাজে দাঁড়াতাম। খেলার সামগ্রীতেও আসে পরিবর্তন। বেলুনের বদলে হাতে আসে বারুদ ফোটানো খেলনা পিস্তল। আর আসে টিনের তৈরি লঞ্চ। এর ভেতরে থাকত একটা ছোট্ট তেলের ইঞ্জিন। ওটাতে আগুন ধরিয়ে পুকুরে ছেড়ে দিলে লঞ্চটা নিজে নিজে চলতে শুরু করত। এ জিনিস এখনো আছে। তবে খুবই বিরল।

শৈশবের সেই সব স্মৃতির কারণেই ঈদ এত দামি, এত গুরুত্বপূর্ণ একটা উৎসব। দেশের যেখানে যে অবস্থায় থাকি না কেন, বছর ঘুরে ঈদ এলে গ্রামে সেই ঈদগাছের নিচে নামাজ পড়তে হবেই। নয়তো ঈদকে ঈদ বলে মনে হবে না। তাই ঈদ এলেই গ্রামে চলে যেতাম আমরা সবাই।

আমাদের ঈদগাহে এখন সেই ঈদগাছটা নেই। অন্যদের মতো আমাদেরও একটা পাকা মিম্বর চাই, আর তা করতে হলে গাছটা কাটতে হবে। অন্যকে অনুকরণের নেশা যে কীভাবে নিজেকে হত্যা করে, তা বুঝল না কমিটি, বুঝল না গ্রামবাসী। এটা ভাবলেই একটা দীর্ঘশ্বাস আসে আমার! শিশুগাছ নেই, হাশেম মাওলানা নেই, আব্বা নেই, মা নেই, ক্রিমরোল নেই, সেই ঈদও নেই। কিন্তু আমার মনে এঁরা সবাই আছেন।

আমি যখন ইউরোপে ছিলাম, তখন ঈদ এসেছে শুনলেই আমার মনে ভাসত আমার শৈশবের একটা নির্মল চলচ্চিত্র; যার প্রথম ভাগের দৃশ্যপটে একে একে আসত: ভোরবেলায় ঘুম থেকে ওঠার জন্য আব্বার হাঁকডাক ও হাশেম মাওলানার সুরেলা আওয়াজ। তাড়াহুড়ো করে গোসল, এরপর পায়জামা-পাঞ্জাবি খুশবু, সুরমা; অতঃপর জোর করে ধরিয়ে দেওয়া মায়ের হাতের সেমাই-পায়েস। ওই চলচ্চিত্রের দ্বিতীয় ভাগের দৃশ্যপটে আসত সেই স্বর্গীয় শিশুগাছ, ঈদগাহের চারপাশজুড়ে বাচ্চা ছেলেমেয়েদের হই-হুল্লোড়, বরইয়ের আচার, চানাচুর বানানোর ঢপ ঢপ শব্দ, টাকায় ১০টা বেলুন ও হাতের ধাক্কায় মুক্ত বাতাসে সেই বেলুন ওড়ার দৃশ্য।

চলমান করোনা মহামারির কারণে এবারের ঈদ উদযাপনে এসেছে বেশ পরিবর্তন। পরিবর্তনটা এতই বেশি যে বাংলাদেশের গত কয়েক শ বছরের ইতিহাসে ঈদকে এমন জাকজমকহীন ও জৌলুশহীন হতে দেখা যায়নি। লন্ডনে যে ঈদ হয় তাকে আমি বলতাম বিলেতি ঈদ। করোনার কারণে এবার মনে হয় দেশের সব মানুষের কাছেই ঈদটা আমার দেখা সেই বিলেতি ঈদের মতো। তবে এ কথা তো ঠিক যে আমাদের সবারই মননে ও মগজে এখনো জ্বলজ্বল করছে আমাদের শৈশবের সেই প্রাকৃতিক ঈদের নির্মল চিত্রাবলি, যা আমাদের দিতে পারে সমরূপ আনন্দ।

এই লেখার মাধ্যমে করোনায় সংক্রমিত পৃথিবীর সব দেশের সব ধর্মের, সব বর্ণের সব মানুষকে শিশুগাছ সমেত বাংলাদেশি ঈদগাহ ও প্রাকৃতিক ঈদের অকৃত্রিম শুভেচ্ছা জানাচ্ছি।
রাশেদ রাফি, জনস্বাস্থ্য ও সামাজিক বিজ্ঞানবিষয়ক গবেষক।

জেড,আই/ঢাকানিউজ২৪ডটকম।