সকল হাসপাতাল ও ক্লিনিকে কোভিড-১৯ রোগীদের চিকিৎসা

মো. নজরুর ইসলাম: স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় দেশের সকল সরকারি-বেসরকারি একই হাসপাতাল, ক্লিনিক ডায়াগনস্টিক সেন্টারসমূহে কোভিড-১৯ ও নন-কোভিড রোগীদের চিকিৎসা প্রদান করার নির্দেশ দিয়েছেন। গত ২৪শে মে অতিরিক্ত সচিব সিরাজুল ইসলাম স্বাক্ষরিত এক প্রজ্ঞাপনে তিনি জানান, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞগণ দেশের কোভিড-১৯ চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা পর্যালোচনা করে একই হাসপাতালে কোভিড-১৯ ও নন-কোভিড রোগীদের স্বাস্থ্য সেবা প্রদান নিশ্চিত করার জন্য পরামর্শ প্রদান করেছেন। এরই আলোকে একই হাসপাতালে কোভিড-১৯ এবং নন-কোভিড রোগীদের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ক্রমিক নম্বর (১) ও (২) ধারাবাহিকতায় ৫০শয্যা তার অনূর্ধ্ব শয্যা বিশিষ্ট দেশের সকল সরকারি-বেসরকারি হাসপাতারে বিভিন্ন রোগের চিকিৎসার ব্যবস্থা চালুর জন্য নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে। ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে কোভিড-১৯ ও নন কোভিড হাসপাতাল দ্বন্দ্বের অবসান হবে বলে নাগরিকরা আশা করছেন। যদি কেউ এর বিরোধীতা করেন তাহলে তা সরকারি সিদ্ধান্তের অমান্য বলে গণ্য হবে।

স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদ (স্বাচিপ) এর কেন্দ্রীয় কমিটির মহাসচিব অধ্যাপক ডাঃ এম এ আজিজ বলেন এটি একটি সঠিক সিদ্ধান্ত। এই সিদ্ধান্তের ফলে কোভিড ও ননকোভিড উভয় ধরনের রোগীরা যে হয়রানির শিকার হতেন তা বন্ধ হবে এবং সকল ধরনের রোগীদের চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত হবে। বিএমএ, বিপিএমপিএ ও বিপিসিওডি ময়মনসিংহ জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক ডাঃ এইচ এ গোলন্দাজ তারা সরকারের এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে বলেন এতে রোগীদের সুচিকিৎসার পথ সুগম হবে। উল্লেখ্য গত একমাস ধরে ময়মনসিংহে কোভিড-১৯ ও নন কোভিড রোগীদের জন্য হাসপাতাল ঘোষণা নিয়ে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের (মচিমহা) বিএমএ সহ ডাক্তার সমাজ ও প্রশাসন পক্ষে বিপক্ষে দাবী জানিয়ে আসছিল। এই মুহুর্তে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এই প্রজ্ঞাপনটি জারি করলেন।

ডাঃ তারা গোলন্দাজ বলেন, বিএমএ সহ ময়মনসিংহের ডাক্তার সমাজ নতুন ভবনে কোভিড-১৯ ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নতুন ভবনকে কোভিড হাসপাতাল করার দাবী জানিয়ে আসছিলাম। ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নতুন ভবনকে কোভিড হাসপাতাল হিসাবে গত ১৯মে এক পরিপত্র জারি করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।

ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ  প্রফেসর ডাঃ চিত্তরঞ্জন দেবনাথ জানান এটি সরকারের একটি ভালো উদ্যোগ। বিশ্বের কোথাও কোভিড ও নন কোভিড হাসপাতাল নেই। একই হাসপাতালে সব রোগীদের চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে।  ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ননকোভিড হাসপাতাল বাস্তবায়নের  গত ২০মে পরিপত্রের মাধ্যমে আদেশ দেয়া হয় এবং তা বাস্তবায়নে ২টি সভাও করা হয়েছিল।

স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ থেকে জারি করা নির্দেশনায় বলা হয়, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বিভিন্ন দেশের কভিড-১৯ রোগীদের চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা পর্যালোচনা করে একই হাসপাতালে কভিড ও নন-কভিড রোগীদের পৃথক অংশে রেখে স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার পরামর্শ দিয়েছেন। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রস্তাব অনুযায়ী, কভিড ও নন-কভিড রোগীদের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ৫০ শয্যা এবং এর বেশি শয্যাবিশিষ্ট সব সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে কভিড এবং নন-কভিড রোগীদের চিকিৎসার জন্য পৃথক ব্যবস্থা চালুর নির্দেশ প্রদান করা হয়।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ফোকাল পারসন ও অতিরিক্ত সচিব (প্রশাসন) হাবিবুর রহমান খান গণমাধ্যমকে বলেন, বর্তমানে করোনা সংক্রমণের পিকটাইম চলছে। সর্বোচ্চ সংক্রমণের এই সময়ে প্রতিদিন আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বাড়বে। আক্রান্ত মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার বিষয়টি এখানে সর্বোচ্চ গুরুত্ব পাবে। এটি বিবেচনা করে ৫০ শয্যা ও তার ওপরের শয্যাবিশিষ্ট দেশের সব সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে। এর মাধ্যমে সব মানুষকে চিকিৎসার আওতায় আনা সম্ভব হবে।

  • ৫০ থেকে শুরু করে তার বেশি শয্যার সব হাসপাতাল কভিড ও নন-কভিড জোনে ভাগ হবে
  • সাধারণ রোগীর পাশাপাশি করোনা রোগীরাও সেবা পাবেন
  • প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে নিয়োগ হচ্ছে আরও ৩ হাজার জনবল

হাবিবুর রহমান খান আরও বলেন, করোনা সংক্রমণের পর হাসপাতালে বেশকিছু চিকিৎসক-নার্স আক্রান্ত হয়েছেন। কিছু প্রতিষ্ঠান ও ইউনিটে কার্যক্রম বন্ধ রাখতে হয়েছিল। অনেক হাসপাতালে করোনা নেগেটিভ সনদ ছাড়া হাসপাতালে রোগী ভর্তি করতে চাইছিল না বলে অভিযোগ পাওয়া যায়। এতে অন্য রোগে আক্রান্ত রোগীদের সেবা পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। এর পরিপ্রেক্ষিতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে একটি আদেশ জারি করে সাধারণ রোগীদের সেবা নিশ্চিত করার নির্দেশনা দেওয়া হয়। কিন্তু বর্তমানে আক্রান্তের সংখ্যা প্রতিদিনই বাড়তে থাকায় নতুন করে সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে। এই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ৫০ শয্যা ও তার ওপরে শয্যা সংখ্যার প্রত্যেকটি সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে কভিড ও নন-কভিড জোনে ভাগ করা হবে। এতে করে সব ধরনের রোগী সেবা পাবেন।

করোনা আক্রান্ত রোগীর সেবায় চিকিৎসক ও নার্স নিয়োগের প্রসঙ্গ তুলে ধরে হাবিবুর রহমান খান বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনায় করোনা পরিস্থিতি মোকাবেলায় স্বাস্থ্যবিভাগ কাজ করে যাচ্ছে। করোনা আক্রান্ত ব্যক্তিদের চিকিৎসার বিষয়টি নিশ্চিত করতে তিনি জরুরি ভিত্তিতে চিকিৎসক ও নার্স নিয়োগের নির্দেশ দেন। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশের পর মাত্র ১০ দিনের মধ্যে দুই হাজার চিকিৎসক ও পাঁচ হাজার ৫৪ জন নার্স নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু স্বাভাবিক নিয়মে এই নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে গেলে এক থেকে দুই বছর সময় লেগে যেত। চিকিৎসা ব্যবস্থাপনাকে আরও শক্তিশালী করতে তিনি নতুন করে আরও ১ হাজার ২০০ মেডিকেল টেকনোলজিস্ট, ১ হাজার ৬৫০ জন মেডিকেল টেকনিশিয়ান এবং ১৫০ জন কার্ডিওগ্রাফার নিয়োগের নির্দেশনা দিয়েছেন। এই ৩ হাজার জনবল নিয়োগের বিষয়ে অর্থ ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় অনুমোদন প্রদান করেছে। দ্রুততম সময়ের মধ্যে এই নিয়োগ প্রক্রিয়াও সম্পন্ন হবে।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের এই ফোকাল পারসন আরও বলেন, বর্তমানে করোনা পরিস্থিতি সামাল দিতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে হিমসিম খাচ্ছে। উন্নত দেশগুলোও আক্রান্ত রোগীর চিকিৎসা দিতে হিমসিম খাচ্ছে। বাংলাদেশও এর বাইরে নয়। উন্নয়নশীল একটি দেশ হিসেবে আমরা যথেষ্ট চেষ্টা করে যাচ্ছি। অনেকাংশে আমরা সফলও হয়েছি। কিছুক্ষেত্রে মানুষ হয়ত সমালোচনা করছে এবং সেটি করতেই পারে। তাদের সমালোচনা ও পরামর্শকে আমরা গ্রহণ করেই স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছি।

করোনা রোগ নিয়ে গবেষণা ও চিকিৎসার বিষয়ে হাবিবুর রহমান বলেন, শুধু হাসপাতালের চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা নিয়েই কিন্তু আমরা বসে নেই। বেশকিছু সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান করোনা ভাইরাসের জিনোম সিক্যুয়েন্স (জীবন রহস্য) উন্মোচন করেছে। প্লাজমা থেরাপি নিয়েও কাজ চলছে। এর বাইরে রেমডিসিভিরসহ আরও বেশকিছু ওষুধ নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে বলে জানান তিনি।