কান্নাভেজা কোলাকুলিহীন রেকর্ডসংখ্যক ঈদজামাত

প্রফেসর ড. মো: ফখরুল ইসলাম,

কোলাকুলি ছাড়া এবারের ঈদটি ইতিহাসের পাতায় স্থান করে নিল। কোলাকুলি করবে কীভাবে? কেউ হাঁটু পানিতে দাঁড়িয়ে ঈদের নামাজ আদায় করেছেন। কেউ মসজিদে নির্দিষ্ট ব্যক্তি দৈহিক দূরত্ব মেনে, কেউবা বাসায় একাই। কেউই ঈদগাহে নামায পড়েননি।
পবিত্র ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয়েছে দেশের সব এলাকার সকল মসজিদে। ২০১৫ সালের এক পরিসংখ্যানে বলা হয়েছে বাংলাদেশে মসজিদের মোট সংখ্যা আড়াই লক্ষ। আবার ২০১৯ সালে এক হিসেব মতে শুধু ঢাকা শহরে ছয় হাজার মসজিদ সহ বাংলাদেশে তিনলক্ষ মসজিদে জুম্মার নামাজ অনুষ্ঠিত হয় বলে জানা গেছে। সেই হিসেবে দেশে মসজিদের মোট সংখ্যা তিনলক্ষ।

এসকল মসজিদে এবারের ঈদে যদি গড়ে ৩টি ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয়ে থকে তাহলে শুধু মসজিদেই মোট ঈদের নামাজের জামাত অনুষ্ঠিত হয়েছে ৯ লক্ষ। আর চার-পাঁচটি করে জামাত অনুষ্ঠিত হয়ে থাকলে মসজিদগুলোতে সেই সংখ্যা ১০ থেকে ১১ লক্ষ হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

এ ছাড়া এবারের পবিত্র ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয়েছে নিজ নিজ বাসা-বাড়ির ভেতরে, কক্ষে, বারান্দায়, ছাদে, উঠানে, বৈঠকখানায়, লনে, কার পার্কিং লটে এবং নানা সুবিধাজনক প্রশস্ত জায়গায়। ঈদের নামাজে বাচ্চারা বেশী পরিমাণে অংশ গ্রহণ করে ও আনন্দ-উৎসব করে থাকে। বাচ্চাদের ছাড়া অভিভাবকরা শুণ্যতায় ভোগেন। এবারের ঈদে বাচ্চাদের নিয়ে ঈদের নামাজ পড়তে মসজিদে যেতে অনেক অভিভাবক ভয়ে ছিলেন। বাচ্চারা বহুদিন পর বাসার বাইরে গিয়ে এলাকার খেলার সাখী, বন্ধু-বান্ধবদের দেখে ওরা হয়তো উল্লাসে মেতে উঠতে চাইবে। আবার বাধা দিলে মন খরাপ করে ঈদের আনন্দকে মাটি করে ফেলবে। ফলে অনেকে কৌশলে বাচ্চাদেরকে নিয়ে নিজ বাসাতেই ঈদের জামাতের আয়োজন করেছেন। ঈদগাহ মাঠের চেয়ে মসজিদগুলো অনেক ছোট। সেখানে এলাকার সব মানুষের স্বাস্থ্যবিধি মেনে একত্রে একবারে ঈদজামাতের আয়োজন করা যায়নি। এটা মোটেও সম্ভব ছিল না। সেজন্য প্রতিটি মসজিদে ৪-৫ বার নতুন জামাতের আয়োজন করতে হয়েছে। সে হিসেবে একই ফ্লোরে পর পর ৪-৫ বার নামাজ আদায় করা স্বাস্থ্য সম্মত হয়নি। সব মুসুল্লি ব্যক্তিগত জায়নামাজ সংগে আনতে পারেননি। প্রতিটি জামাতের পূর্বে ফ্লোর জীবানুমুক্ত করার সময় ও উপায় কোনটাই ছিল না। ফলে অনেকেই বলেছেন- একই মসজিদে পর পর অনেক জামাতের আয়োজন না করে খোলা ঈদগাহে একবারের জন্য একটি বড় জামাতের আয়োজন করলেই স্বাস্থ্যগত দিক দিয়ে যুক্তিযুক্ত ছিল।

এই ঈদের নামাজে জামাতের সংখ্যা হিসেব করা দুরূহ কাজ। তবে ঈদের নামাজের পর ফেসবুকে প্রাপ্ত এক প্রাক্কলণে জানা গেছে যাদের পরিবারে ছোট ছোট ছেলে বাচ্চা ও অসুস্থ রোগী ছিল তাদের শততরা ৩০ ভাগ মসজিদে না গিয়ে বাসাতেই পবিত্র ঈদের নামাজ আদায় করেছেন। ঢাকা শহরে ঈদে ঘরে ঈদের নামাজ আদায় করার এই হার ৪০ ভাগ।

এক পরিসংখ্যানে জানা যায় বাংলাদেশে মোট খানার সংখ্যা ৩৩.২ মিলিয়ন। এর ১৩ ভাগ পরিবার যদি বাসায় নামাজ আদায় করে থাকেন তাহলে সেই সংখ্যা প্রায় ৬ মিলিয়ন। ফ্লাটবাড়ির বাসিন্দাদের হিসেব মাথায় রেখে এক মিলিয়ন বাদ দিলেও দেশে এবারের ঈদুল ফেতেরের নামাজে জামাতের সংখ্যা মসজিদে ১০ লক্ষ ও বাসা-বাড়িতে ঈদের নামাজ আদায়ে ছোট ছোট পারিবারিক জামাতের সংখ্যা কমবেশী অর্ধকোটি। তবে ঘরের মধ্যে কোথাও দু’জন. কোথাও তিনজন ও কোথাও লকডাউনে আটকে পরা আত্মীয়, কর্মচারীসহ একশ’জনেরও বেশী সংখ্যক মুসুল্লি একত্রে পবিত্র ঈদের জামাত তৈরী করে নামাজ আদায় করেছেন। ঘরে ঘরে ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হওয়ায় এর সঠিক সংখ্যা হয়তো কোন বড় খানা জরিপের মাধ্যমে জানা যাবে। তবে উপরের প্রাক্কলন অনুযায়ী এবারের ঈদে বাংলাদেশে ৬০ লক্ষেরও বেশী ঈদের নামাজের জামাত অনুষ্ঠিত হয়েছে বললে মোটেও অত্যুক্তি হবে না। এই ঈদের নামাজের জামাতের সংখ্যা দেশে সর্বকালের সর্বাধিক সংখ্যক জামাতে নামাজে আদায় করার সংখ্যার রেকর্ড ভঙ্গ করেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

এতে যেসব লাভ হয়েছে সেগুলো হলো- যিনি কোনদিন নামাজে ইমামতি করেননি তিনি এবার ঈদের নামাজে ইমামতি করেছেন, খুৎবা পাঠ করেছেন। বাসার মেয়েরা সাধারণত: আমাদের দেশে ঈদের নামাজ আদায় করার সুযোগ পান না। এবার অনেক মা-মেয়ে বাসায় থেকেই জামাতে নামাজ আদায় করেছেন। ঈদের নামাজ পড়া হবে এই উপলক্ষ্যে ঘর-বাড়ি, পার্কিং, ছাদ, লন পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করা হয়েছে। যে সকল জায়গায় কখনো সিজদাহ্ পড়েনি সেখানে মানুষ কপাল ঠেকিয়ে মহান আল্লাহ্ রাব্বুল আ’লামীনকে স্মরণ করার সুযোগ পেয়েছে। বাড়ির রুগ্ন সদস্যটিও জামাতে ঈদের নামাজ আদায় করতে পেরেছে।

যা হয়নি এবং যা ছিল দৃষ্টিকটু তা হলো- অন্যান্যবার গাড়িওয়ালারা ঈদের দিনে ঈদগাহে যাবার সময় প্রতিবেশীদের খোঁজ করতো, এবার করেনি। রাস্তায় সাঁই সাঁই করে গাড়ি চালিয়ে পাশ দিয়ে চলে গেলেও কেউ কারো জন্যে থেমে বলেনি আমার ফাঁকা গাড়িতে উঠুন। অথবা, থেমে কেউ গাড়িতে উঠার আহব্বান করলেও যদি কেউ উঠতে না চান, তার ভয়ও ছিল।

সবার মুখে মাস্ক থাকায় কারো হাসিমাখা মুখ বুঝা যায়নি। মুসুল্লিরা একটি কাতার ফাঁকা রেখে পরেরটিতে নিজ নিজ জায়নামাজ বিছিয়ে ৩-৬ ফুট দূরে অবস্থান নেয়ায় দেরীতে আসা কেউই সামনে যেতে পারেননি। কেউ কাউকে চাপাচাপি করে জায়গা করে দেয়নি, দিতেও চায়নি। ফলে নামাজ আদায় করার জায়গা নিয়ে স্বার্থপরতা মনে হয়েছে। একমিনিট দেরীতে আসা লোকজন কেউ রাগ করে অসহায়ের মত ১ ঘন্টা পিছনে দাঁড়িয়ে থেকেছে পররবতী জামাতের জন্য। এই বিষয়টি আমার কাছে খুব অমানবিক ও দৃষ্টিকটু লেগেছে। কিন্তু কারো জন্যে করার কিছুই ছিল না। নামাজ শেষ হতেই কোলাকুলি ও কুশল বিনিময় করার নিষেধাজ্ঞা থাকায় যে যার মত গোমড়া মুখে হন হন করে বাড়ির দিকে চলে গেছে। এতে ঈদের ঐতিহ্য অনেকটাই ম্লান হয়ে গেছে।

এদিকে কেউ কারো বাড়িতে বেড়াতে যায়নি। কেউ সকালে কলিংবেল টিপে সেমাই, মিষ্টি বা উপহারের থালি হাতে এসে ঈদমোবারক জানায়নি। বাড়িতে তৈরী সেমাই, পায়েস, ফিরনী, কাবাব, ফালুদা টেবিলে সারাদিন পড়ে থাকলেও শেষ হয়নি। কারো বাড়িতে ঈদের খাবার পাঠানো হয়নি বা দিতে যাওয়া যায়নি। সারাদিন ফকির-মিসকিন তেমন কেউ আসেনি। শুধু এসেছে কিছু ফোন কল, ভিডিও বার্তা, কিছু মেসেজ ও ভার্চ্যুয়্যাল ঈদ কার্ড ও শুভেচ্ছা। তা দেখে চোখ ভরলেও মন কি ভরে? বাচ্চারা সেজেগুজে মনটা ভার করে ড্রইংরুমে একা একা বসে টিভি দেখছে, মোবাইলে টিপাটিপি করে সময় কাটিয়েছে। সবার মধ্যে একটা অজানা বিরক্তি ও চাপা ক্ষোভ- যেটা ওপেন সিক্রেট। এভাবে কি ঈদ জমে?

বাংলাদেশসহ করোনার ভয়াবহতায় বিশ্বআজ উন্মাতাল। এর মাঝে খুশীর উৎসব ঈদুল ফিতর এসেছিল আনন্দের বারতা নিয়ে। এই বারতার ঝিলিকে শত দু:খ-কষ্টের মধ্যে মানুষ নতুন কিছু শিখেছে, নতুন করে পরস্পরকে উপলব্ধি করার সুযোগ পেয়েছে। মানুষ বেঁচে থাকলে তার জীবনে বার বার ঈদ আসবে। আমরা সবাই প্রার্থনা করি, পৃথিবী থেকে দূর হোক রোগ-শোক, বালা মুছিবত, সব ভেদাভেদ। অচিরেই একটি কার্যকরী টিকা বা প্রতিষেধক তৈরী হোক, অতি মহামারী থেকে বিশ্বমানবতার মুক্তি ঘটুক, স্বস্তি ফিরে আসুক সবার মাঝে।

*লেখক রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডীন, সমাজকর্ম বিভাগের প্রফেসর ও সাবেক চেয়ারম্যান।E-mail: fakrul@ru.ac.bd

জেড,আই/ঢাকানিউজ২৪ডটকম।