বর্তমান বাস্তবতায় বেঁচে থাকাই ঈদ

প্রফেসর ড. মো: ফখরুল ইসলাম,

এবারের মত এত করুণ সময়ে আর কারো জীবনে কখনও ঈদ আসেনি বলে মনে হচ্ছে। সারা দুনিয়ায় এই দু:খ কষ্ট ছড়িয়ে গিয়ে একটা সামাল সামাল রব চলছে। একদিকে হু হু করে করোনা সংক্রমণের হার ও মৃত্যুহার বেড়েই চলেছে অন্যদিকে আম্পানের আস্ফালন দেখে মনে হয়েছিল বর্তমান বাস্তবতায় শুধু বেঁচে থাকাটাই ঈদ। জীবন রক্ষা করাটাই এবারের ঈদের চেয়ে বড় আনন্দের বিষয়।

শুধু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেই করোনা একলক্ষের অধিক প্রাণ কেড়ে নিয়েছে। মৃত্যূপুরী আমেরিকা এখন স্বপ্নের দেশ নয়। নিউয়র্ক টাইমস্ করোনায় মৃতদের নামের তালিকা দিয়ে কোন প্রকার রং ও ছবি ছাড়া সাদাকালো সংখ্যা প্রকাশ করেছে। মৃতদের জন্য সংখ্যাটি উৎসর্গ করে বলেছে- ‘তোমরাই আমেরিকা’। আসলে এত বৈভবের মাঝে এত নির্দয় কষ্ট বুকের ভেতর চেপে রাখা দায়। ফুটবলের দেশ ব্রাজিলে মৃতদের স্বজনদের কান্না থামছে না। ইউরোপের মানুষ নাজেহাল হয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছে। ভারত ও আমাদের দেশে মৃত্যুহার উর্দ্ধমুখী। এখনো নাকি ভয়াবহ মৃত্যুর পিক সময়ঘন্টা বাজেনি। মার্কিনীদের মত উইপোকার ন্যায় বেসামাাল হয়ে যাবার ভয় প্রতিনিয়ত তাড়া করছে। উইপোকার মুখ ও দাঁত খুব শক্ত কিন্তু পেট ও শরীর খুব নরম। কোনকিছুর আঘাতে পেটের নাড়িভুরি বের হয়ে গেলেও মুখ দিয়ে কাঠ ফুটো করে নিজের ক্ষমতা জাহির করে। মহান আল্লাহ আমাদেরকে তেমন মুছিবত থেকে হেফাজত করুন।

করোনা সংকটে মধ্যে ঈদ এসেছে। বাজার-হাট খুলেছে। মানুষ ধুমসে কেনাকাটা করছে। গণপরিবহণ বন্ধ থাকলেও ব্যক্তিগত গাড়িতে শহর ছেড়ে গ্রামের বাড়ির দিকে রওয়ানা করেছে। ব্যক্তিগত গাড়িতে চড়ে স্বাস্থ্য-নির্দেশনা মেনে বাড়ি যাবার অনুমতি দেয়া হলেও মানুষ অবাধ্য হয়েছে। তারা অতি ভাড়ায় মাইক্রোবাস, পিকআপ, জীপ, ট্রাক, ইত্যাদি দলবদ্ধভাবে ভাড়া করে গাদাগাদি করে চেপে গ্রামের বাড়িতে রওয়ানা দিয়েছে। এতে করোনার হটস্পট ঢাকা, নারায়নগঞ্জ, গাজীপুর থেকে আক্রান্ত মানুষ সারা দেশে সংক্রমণ ছিটিয়ে দিয়ে গ্রামে গিয়ে ঢুকছে।

ধৈর্য্যহীন বেসমাল ঘরমুখী মানুষকে কে আটকাতে পারে? এমন একটি আশঙ্কা করা হয়েছিল বাংলাদেশের করোনার ভবিষ্যৎ নিয়ে বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার প্রাথমিক প্রতিবেদনে। সেখানে বলা হয়েছিল- বাংলাদেশের মত দরিদ্র দেশগুলোতে যেখানে স্বাস্থ্য অবকাঠামো দুর্বল সেখানে প্রথমেই আক্রান্ত হবে স্বাস্থ্যকর্মী ও তাদের সাহায্যদানকারী সেবা সংস্থাসমূহ। আমাদের দেশে তাই হয়েছে। এখানে হাজার হাজার ডাক্তার, নার্স, পুলিশ, বিজিবি, আনসার সদস্যগণ আক্রান্ত হয়ে পড়েছেন। অনেকে ইতোমধ্যে মৃত্যুবরণ করেছেন। নতুন চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ দান করা হলেও সেটা নিতান্তই অপ্রতুল। দেশের মোট মানুষের অনুপাতে মাত্র ৩০ ভাগের চিকিৎসা দেয়ার মত অবস্থা রয়েছে। সেটাও শুধু রাজধানী ও বড় বড় শহরগুলোতে। গ্রামে বলা চলে করোনা চিকিৎসার জন্য তেমন কিছুই নেই।

ঈদে শহরের আক্রান্ত মানুষগুলো গ্রামে সংক্রমণ ছড়িয়ে দেবার জন্য ইতোমধ্যে বাড়ি পৌছে গেছে। এটা খুব্ই ভয়ংকর বিষয়। গ্রামের মানুষগুলো তো আর শহরের মানুষের মত ততটা সচেতন নন অথবা পাষাণ নন যে- ঢাকা থেকে গেলে তাদেরকে গ্রামে ঢুকতে দিবে না। অমর্যাদা বা গোনাহ্ হতে পারে এই ভয়ে তারা অবুঝের মত আন্তরিক হয়ে যেতে পারেন। হয়তো সেই সুবাদে মসজিদে বা মাঠে ঈদের নামাজের পর কোলাকুলি হয়ে যাবে, কদমবুছি হয়ে যাবে। গ্রামে করোনার গণ-সংক্রমণের ভয় এখানে। তাই বাংলাদেশের করোনার ভবিষ্যৎ নিয়ে বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার প্রাথমিক প্রতিবেদনে শহরের তুলনায় গ্রামের সংক্রমণ দেরীতে হবার কথা বলা হয়েছিল। এভাবে ঈদ, পুজা ইত্যাদির মাধ্যমে সেটা গোটা দেশের গ্রামে-গঞ্জে ছাড়িয়ে গেলে মহা বিপর্যয় ঠেকানোর মত কোন প্রস্তুতি আমাদের নেই।তাই ঈদ আমাদের জন্য খুশীর বারতা নিয়ে এলেও আমাদের ভুল সিদ্ধান্ত ও সামাজিক নিয়ন্ত্রণহীনতা গণ-মানুষের জীবনের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

তাই এবারের ঈদ অবাধ্য ঈদ। এবারের ঈদ বেপরোয়া ভাবনার ঈদ। সামাজিক নিয়ন্ত্রণহীনতার মধ্যে বিচলিত মানুষের মধ্যে করোনার ভয়ংকর সংক্রণের বিষয়ে বিবেক জাগানো আপাতত: এই ঈদে সম্ভব নয় বলে কর্তৃপক্ষ হাল ছেড়ে দিয়েছেন। এটাকে হার্ড ইমিউনিটির কৌশল বলে অনেকে স্বস্থির নি:শ্বাস ফেলতে চেষ্টা করলেও তারা বোকার স্বর্গে বাস করছেন। যেখানে মানুষের জীবন বিনাশ হয়ে সবকিছু নি:শেষ হবার সম্ভাবনা প্রবল, সেখানে গরু-ভেড়ার পালের মত গণ-মানুষের দলীয় রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা (হার্ড-ইমিউনিটি) নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার সময় এটা নয়। তাই আমাদের দেশে সামনের দিনগুলোতে করোন সংক্রমণ খুবই ভয়ংকর বার্তা নিয়ে হাজির হলে অবাক হবার মত কিছু নেই। আমাদের মারাত্মক ভুল হচ্ছে।

এদিকে এখনো বাজারে কোন কার্যকরী টিকা আসেনি। কোম্পানীগুলো শুধু আশা শোনাচ্ছে। কার্যকরী টিকা পেতে আরো দু’এক বছর লেগে যাবে বলে কেউ কেউ সতর্ক বার্তা দিয়েছেন।

আমাদের উপর আম্পানের আস্ফালণ বয়ে গেল, আম গেল, চিংড়িসহ সকল অনেক আবাদ নষ্ট হয়ে গেল। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ। অনলাইন পড়াশুনার কথা বলা হলেও সারা দেশে সবার অংশগ্রহণের সেই সুযোগ নেই। বিদেশী ক্রেতারা অর্ডার বাতিল করায় একজন গার্মেন্টস্ মালিককে অঝোরে কাঁদতে দেথা গেল। তাঁর দশ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের পন্য কিনবে না ওরা। শ্রমিকরা তার কারখানার প্রাণ, কিন্তু তিনি তাদের ঈদ বোনাস দিতে না পেরে হতাশ হয়ে কাঁদছেন। এটা বড়ই করুণ দৃশ্য। বিদেশী একটি পত্রিকার পাতায় তার ছবিও ছাপা হয়েছে। সবদিক থেকে সামনে অনেক ঝুঁকি। এজন্য সারা বিশ্বভয়াবহ দুর্ভিক্ষের আশঙ্কা করা হচ্ছে।

মানবতার এই দু:সময়ে অনেক দু:খ-কষ্ট বুকে চেপে পথ চলছি আমরা সবাই। জীবন বাঁচানোর তাগিদে জীবিকার জন্য ছুটছি। ছুটে চলেছি কিছু পাবার আশায়-শান্তির অন্বেষণে। বিচলিত মানুষগুলো ঈদে নিজ নিজ ঘরে ফিরে শান্ত হোক, বিনিময় করুক সৌহার্দ্য, প্রেম-প্রীতি ভালবাসার। গ্রাম থেকে ঈদফেরত মানুষগুলো শহরে আসার পর তাদের করোনা স্বাস্থ্য পরিস্থিতি গভীর পর্যবেক্ষণে রাখার একটা সুবন্দোবস্ত থাকলে ভাল হবে।

করোনার ভয়াবহতায় বিশ্ব আজ উন্মাতাল। এর মাঝে খুশীর উৎসব ঈদুল ফিতর এসেছে আনন্দের বারতা নিয়ে। এই বারতার ঝিলিকে শত দু:খ-কষ্টের মধ্যে পৃথিবী থেকে দূর হোক রোগ-শোক, বালা মুছিবত। মানুষ বেঁচে থাকলে তার জীবনে বার বার ঈদ আসবে। এই ঈদে আমরা সবাই প্রার্থনা করি, অতি মহামারী থেকে বিশ্বমানবতার মুক্তি ঘটুক, স্বস্থি ফিরে আসুক অচিরেই।

*লেখক রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডীন, সমাজকর্ম বিভাগের প্রফেসর ও সাবেক চেয়ারম্যান।E-mail: fakrul@ru.ac.bd

জেড,আই/ঢাকানিউজ২৪ডটকম।