আম্পান কেড়ে নিয়েছে তাদের ঈদ আনন্দ

নিউজ ডেস্ক:   ঘূর্ণিঝড় আম্পান সাতক্ষীরা উপকূলীয় এলাকার লাখো মানুষের এবারের ঈদ আনন্দ কেড়ে নিয়েছে। দিনে অন্তত একবার খাবারের চিন্তায় ব্যাকুল পরিবারগুলোর কাছে তাই নেই ঈদের আনন্দ। আম্পান ও নাদী ভাঙনে মাথা গোঁজার ঠাঁইটুকু কেড়ে নেওয়ায় আনন্দের লেশ মাত্র নেই তাদের মাঝে। ঈদে সেমাই, পায়েস খাওয়ার চেয়ে তাদের কাছে মুখ্য হয়ে উঠেছে ভাঙন কবলিত উপকূল বাঁধ রক্ষা।

সরেজমিনে বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, শ্যামনগরের বুড়িগোয়ালিনী, গাবুরা, পদ্মপুকুর, কাশিমাড়ি ও আশাশুনি উপজেলার শ্রীউলা প্রতাপনগর এলাকায় এখনও পর্যন্ত জোয়ার ভাটা হচ্ছে। অধিকাংশ মানুষ এখন আশ্রয়কেন্দ্রে অনেকে বসবার করছেন বাঁধের ওপরে। এতে করে ঈদের উৎসব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে উপকূলের লাখো মানুষ। ঈদের আনন্দ উৎসব থেকে নিজের সব পরিবার ও সন্তানদের নিয়ে অনাহারে পানিবন্দি অবস্থায় দিন কাটাতে হচ্ছে।

শ্যামনগরের গাবুরার নেবুবুনিয়া, জেলেখালী, গোলাখালী, বুড়িগোয়ালীনি, দর্গাবটি আর দাতিনাখালী এলাকা ঘুরে ও দুর্গতদের সঙ্গে কথা বলে এমন চিত্রের দেখা মিলেছে।

প্লাবিত এলাকা : বুড়িগোয়ালিনী এলাকার শিশু আবু নাইম বলে, ‘খাওয়া হচ্ছে না ঠিকমতো। আমাদের আবার ঈদ। অনেকে ত্রাণ দিয়ে গেছে। কেউ তো ঈদের পোশাক দিয়ে যায়নি। আমরা কীভাবে ঈদের নামাজ পড়বো? মসজিদের মাঠ সবই তো ডুবে গেছে।’

দাতিনাখালীর ছালমা বিবি বলেন, ‘তিনবেলা খাবার জুটতেছে না, তাই ঈদ কোনও চিন্তা ভাবনা নেই। ঘরে যা ছিল সব জোয়ারে নিয়ে চলে গেছে। অনেক কষ্টে কিছু সম্পদ করি। কিছুদিন পরপর আমাদের ঝড় এসে সব কেড়ে নিয়ে চলে যায়। উপকূলের মানুষের দুঃখের কথা কেউ শোনেন না বলে কেদে ফেললেন।’

গাবুরা এলাকার তানভির আহমেদ বলেন, ‘জোয়ার আসলে ঘরের মধ্যে বুক সমান পানি উঠছে। মাছের ঘের আর কাঁকড়ার প্রজেক্ট পানিতে তলিয়ে গেছে। এমন দুরাবস্থার ভেতর নামাজ আদায়ের মধ্যে ঈদ সীমাবদ্ধ। আর সেমাই লাচ্ছা খাওয়ার খুশির চেয়ে ভাঙন কবলিত বাঁধে কাজ করা জরুরি হয়ে গেছে। তাই ঈদ এর নামাজ শেষে অন্যদের সঙ্গে মিলে বাঁধের কাজে যাবেন।’

আম্পানের ক্ষতিগ্রস্ত বাড়ি: গাবুরা ইউপি চেয়ারম্যান মাসুদুল আলম বলেন, ‘আম্পানের সময় প্রবল জোয়ারের চাপে আমাদের এলাকার অধিকাংশ ভাঙে গেছে। এখানকার মানুষ তিন বেলা তিন মুটো খেতে পারছে না। ঈদ করবে কীভাবে। গাবুরা ৪৩ হাজার মানুষ ঈদ আনন্দ থেকে বঞ্চিত। ঘূর্ণিঝড় আম্পানের কারণে পুরো এলাকা প্লাবিত হওয়ায় প্রথমবারের মতো ঈদ আনন্দ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে ইউনিয়নের মানুষ।’

পদ্মপুকুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আতাউর রহমান জানান, ইউনিয়নের ৩৭ হাজার মানুষ বসবাস করে। ঘূর্ণিঝড় আম্পানে বাঁধ ভেঙে ও করোনার কারণে এবার ঈদ আনন্দ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে পদ্মপুকুরের মানুষ।

বুড়িগোয়ালিনী ইউনিয়নপরিষদের চেয়ারম্যান ভবতোষ কুমার জানান, ঘূর্ণিঝড় আম্পানের আঘাতে সৃষ্ট জলোচ্ছ্বাসে বাঁধ ভেঙে ৯টি গ্রাম প্লাবিত হওয়ায় ২৫ হাজার মানুষ এবার ঈদ আনন্দ হতে বঞ্চিত হচ্ছে।

ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধ: প্রতাপনগর ইউপি চেয়ারম্যান জাকির হোসেন বলেন, ‘ঘূর্ণিঝড় আম্পানে আমার ইউনিয়ন সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আমার ইউনিয়নের ৫০ কিলোমিটার বাঁধে মধ্যে অধিকাংশ ভেঙে বিলীন হয়ে এখন লোকালয়ে জোয়ার ভাটা হচ্ছে। সবাই এখন পানিবন্দি এবারের ঈদ আমাদের জন্য না।’

উপজেলা নির্বাহী অফিসার আ ন ম আবুজর গিফারী বলেন, ঈদ উপলক্ষে পৃথক কোনও বরাদ্দ না আসায় করোনা ও আম্পানের জন্য পাওযা বরাদ্দগুলো জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্তদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে।

ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য ত্রাণ: জেলা প্রশাসক এসএম মোস্তফা কামাল জানান, আম্পানে ক্ষতিগ্রস্ত শ্যামনগর উপজেলার বুড়িগোয়ালীনি, গাবুরা, পদ্মপুকুর, আশাশুনি উপজেলার প্রতাপনগর ও শ্রীউলা ইউনিয়নের আশ্রয়কেন্দ্রে থাকা মানুষের সঙ্গে ঈদ ভাগাভাগি করে নিতে তাদের মাঝে মাংস, চাউল, ডিম ও সেমাইসহ খাদ্য সামগ্রী পৌঁছে দেওয়া হয়।