মৃত্যুর দূতের এখন গ্রাম বাংলায় যাত্রা!

আবদুল মান্নান:   দেশে এবং সারা বিশ্বের ২১২টি দেশে এক ভয়াবহ দুর্যোগ নেমে এসেছে যার নাম কোভিড-১৯ বা করোনা। শুরুটা হয়েছিল ডিসেম্বর মাসের শেষের দিকে। এই পর্যন্ত সারা বিশ্বে ৫১ লক্ষের বেশি মানুষ আক্রান্ত হয়েছে, মৃত্যু হয়েছে তিন লক্ষেরও বেশি মানুষের। বাংলাদেশে আক্রান্ত হয়েছে ২৬ হাজর ৭৩৩ জনের বেশি (শুক্রবার পর্যন্ত) । এই রোগের কোনও বাছ বিচার নেই। ধনী দরিদ্র, প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রী, সংসদ সদস্য, সেনাপ্রধান হতে শুরু করে পাশের বাড়ির মানুষ সকলে আক্রান্ত হচ্ছেন। মুত্যুও কখন কাকে আলিঙ্গন করবে তাও আগাম বলা যাচ্ছে না। এই রোগের কোনও চিকিৎসা এখনও আবিষ্কার হয়নি। বাংলাদেশ সহ অনেকে চেষ্টা করছে। এখনও সফলতা এসেছে বলা যাবে না। এই সময় ভয়াবহ সংক্রামক রোগের একমাত্র ওষুধ হচ্ছে সামাজিক দূরুত্ব বজায় রাখা, খুব গুরুত্বপূর্ণ কাজ না থাকলে ঘর হতে বের না হওয়া। এটি যাতে সকলে মেনে চলেন তার জন্য প্রত্যেক দেশ নিজ নিজ দেশের মানুষকে সতর্ক করছেন। পশ্চিম আফ্রিকার নাইজেরিয়া একটি মুসলমান প্রধান দেশ, মানুষকে ঘরে রাখতে সেই দেশে কারফিউ জারি করে মানুষকে তারা ঘরে রেখেছে, ঘোষণা করেছে বের হলে গুলি করা হবে। ফিলিপিন্সেও একই নির্দেশ দেওয়া হয়। এরকম ব্যবস্থা আরও কয়েকটি দেশে নেওয়া হয়েছে। জেল জরিমানার ব্যবস্থাও আছে। চালু হয়েছে বেত্রাঘাত।

বাংলাদেশে কারফিউ, জেল জরিমানা বা বেত্রাঘাত ছাড়া সকল প্রকারের ব্যবস্থার চেষ্টা করা হয়েছে, কোনোটাই সফল হয়নি। প্রথম দিকে মানুষ একটু সচেতন থাকলেও তৈরি পোশাক শিল্পের মালিকরা তাদের কারখানা খোলা ঘোষণার পর সব কিছু তছনছ হওয়া শুরু হলো। তারপর মাঝখানে এসে পড়লো ধর্মের নানা রকমের অপব্যাখ্যা যদিও পবিত্র হাদিসে রসুলউল্লাহার পরিষ্কার নির্দেশ আছে মহমারির সময় কী করতে হবে বা হবে না। সরকার ঘোষণা করলেন জুমার নামাজ মসজিদে না পড়ে সকলে বাড়িতে জোহর পড়বেন, একই সাথে ওয়াক্তের নামাজ বা জুমার নামাজ জামাতে পড়তে পারবেন মসজিদের ইমাম মোয়াজ্জেম সহ পাঁচ। তারও আগে পবিত্র কাবা শরিফ ও মসজিদে নববীতে একই হুকুম করে জামাত নিষিদ্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। সম্প্রতি পবিত্র মক্কা নগরী সহ সৌদি আরবে ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে ঈদের সময় পাঁচ দিনের কারফিউ জারি করা হয়েছে এবং পবিত্র মক্কা নগরী সহ সকল স্থানে কোনও ঈদের নামাজও জামাতে হবে না। শুধু মসজিদের ভেতরের অবস্থানরত স্টাফ জামায়াতে ঈদেও নামাজ আদায় করতে পড়বেন। ঈদের নামাজ বাড়িতে পড়তে বলা হয়েয়েছে। বাড়িতে ঈদেও নামাজ কীভাবে পড়া যায় তার ব্যাখ্যা অনেক আলেম ও ইসলামি চিন্তাবিদরা দিয়েছেন। বাড়িতে ঈদেও নামাজ মসজিদের মতোই শুধু খুতবা হবে না। রবিবার বা সোমবার ঈদ হবে।

সরকার ঘোষণা করলো রমজান মাসে সকলে তারাবির নামাজ বাড়িতে পড়বেন, মসজিদে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। আমাদের বেশিরভাগ মানুষের ধারণা তারাবির নামাজ মসজিদে পড়া বাধ্যতামূলক। কিছু কিছু মানুষ মনে করে তারাবিহ না পড়লে রোজা হবে না। বাস্তবতা হচ্ছে ইসলাম ধর্মে পাঁচটি স্তম্ভ আছে। এগুলো হচ্ছে ঈমান, রোজা, নামাজ, জাকাত (যাদের সামর্থ থাকে), হজ (যাদের সামর্থ আছে) । এর বাইরে আছে সুন্নত, ওয়াজিব, নফল এবং মুস্তাহাব। এগুলো কী অবস্থায় কখন পালন করতে হয় তা পরিষ্কারভাবে বলা আছে যা আমাদের অনেক ইসলামিক চিন্তাবিদ বা ঈমামরা বলেন না বা লেখাপড়ার অভাবে জানেন না। যেহেতু এটি রমজান মাস একটু তারাবির নামাজের কথা বলি।

তারাবির নামাজটা মসজিদে না গিয়েও বাড়িতে পড়তে পারেন, এটা ফরজ নয়। প্রথমবার যখন হযরত মুহাম্মাদ (সা.) মসজিদে তারাবির নামাজ পড়ছিলেন তখন তাঁর সঙ্গে কয়েকজন মুসল্লি যোগ দেন। তারপর তিনি দেখেন মসজিদে প্রতিদিন নামাজির সংখ্যা বাড়ছে। তিনি বুঝতে পারলেন এমনটি চলতে থাকলে মানুষ তারাবির নামাজ ফরজ বা বাধ্যতামূলক মনে করবেন। এরপর তিনি মসজিদে এই নামাজ পড়া বন্ধ করে দিলেন। হযরত ওমরের খেলাফতের সময় তা আবার মসজিদে জামাতে পড়ার রেওয়াজ চালু করে দিলেন। তবে তা মসজিদে পড়তে হবে তা কখনও বাধ্যতামূলক ছিল না। কেউ চাইলে বাড়িতেও পড়তে পারতেন এবং এখনও পারেন। আর তারাবির নামাজের রাকাতের সংখ্যা কয়েকরকম পড়ার উদাহরণও আছে। হযরত মুহাম্মদ (সা.) চল্লিশ রাকাতও পড়েছেন। যেই না ইসলামিক ফাউন্ডেশন বলল তারাবির নামাজ পড়তে মসজিদে আসবেন না তখন মনে হলো সকলের মাথার ওপর আসমান ভেঙে পড়লো। অনেক জায়গায় খুন খারাবি হওয়া শুরু হলো। কোন পাঁচজন বা দশজন মসজিদে ঢুকবে তা নিয়ে হাঙ্গামা রক্তারক্তি।

রমজানের পর আসে ঈদ। এটা একটি আনন্দের দিন। আত্মীয়-স্বজনদের সঙ্গে মোলাকাত করা, তাদের খোঁজ-খবর নেওয়া। সৌদি আরবে ও মধ্যপ্রাচ্যেও আরব দেশে মানুষ আত্মীয়স্বজনদের খবর রাখেন না । ঈদে মানুষ সমুদ্র সৈকতে অথবা কোনও পার্কে বেড়াতে যান। অবস্থা অনুকূলে না থাকলে যেমন যুদ্ধে অথবা কোনও মহামারি বা দুর্ভিক্ষ ইত্যাদি হলে তখন ঈদের আনুষ্ঠানিকতা বাদ দেওয়া হয়। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় একটা ঈদ এসেছিল যা তেমন একটা পালিত হয়নি। এতসব কথা লিখতে হলো তার কারণ হচ্ছে সব জায়গায় দেখা যাচ্ছে করোনাকে তুচ্ছ করে সকলে দলবল নিয়ে হাজারে হাজারে শহর ছাড়ছেন। সকলে সকাল হতে বাজারে গিয়ে বসে থাকেন কখন দোকান খুলবে। পুলিশ তখন নীরব দর্শক। তাদের কিছু করার থাকে না। এই মানুষগুলোর কাছে জানতে চাইলে ‘আপনারা এই করোনা নামক মহামারির সকল সাবধানতা উপেক্ষা করে কেন আপনারা বের হচ্ছেন’? সকলের উত্তর ‘ত্রিশদিন রোজা রাখলাম, একদিন ঈদ করবো না’ ।

তারা কি বুঝতে পারেন না যে যাদের নিয়ে তারা ঈদের আনন্দ করতে চাচ্ছেন আগামী ঈদে তাদের অনেকেই আর ঈদ করতে আসবেন না বা যাদের সাথে ঈদ করতে কষ্ট করে অনেকে পরিবার নিয়ে বাড়ি গলেন তাদেরও কেউ কেউ সামনের ঈদে থাকবেন না। এটি হবে একমাত্র নিজের ভুলের কারণে। এর মধ্য সরকার বৃহষ্পতিবার ঘোষণা দিল নিজের ব্যক্তিগত গাড়ি বা মাইক্রোবাস নিয়ে মানুষ শহর ছাড়তে পারবেন। অনেকর মতে এই ঘোষণা আত্মঘাতির সামিল। শহরে এখন রেন্ট এ কার ও মাইক্রোবাস সবগুলোই ব্যক্তিগত হয়ে গেছে। বাসের সামনে গার্মেন্টস শ্রমিকের ব্যানার লাগিয়ে বাসে সাধারণ যাত্রী বোঝাই করে অন্য জেলার দিকে শুক্রবার ভোর হতে অনেক পরিবহন যাত্রা করেছে। অনেকের মতে পুরো ব্যাপারটা তামাশায় পরিণত হয়েছে। শহরে কেউ অসুস্থ হলে তবুও কিছু চিকিৎসা পাওয়া যায়। গ্রামে কি তা পাওয়া যাবে? দেশ এক ভয়াবহ পরিস্থিতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে বলে অনেকের ধারণা। রোজা ফরজ, এটা করা আবশ্যক। ঈদ সকলে মিলে একত্রিত হয়ে এই বছর না করলে কোনও অসুবিধা হবে না। আমরা সকলে পরিস্থিতির শিকার। মেনে নিতে হবে। ঈদের দিন সকলে নিজ নিজ বাড়িতে থাকি। বেঁচে থাকলে সামনের বছর আল্লাহ্’র রহমতে পরিস্থিতি ভালো হতে পারে। আল্লাহ্ আমাদের সহায়ক হোন।

লেখক: বিশ্লষক ও গবেষক