দেশের আইটি খাত ও জামিলুর রেজা চৌধুরী

এম শামসুল আলম:   জামিলুর রেজা চৌধুরী। তাঁর শিক্ষকরা তাঁকে জামিল নামে ডাকতেন। কখনো তাঁদের মুখে জেআরসিও শুনেছি। তাঁর সহকর্মী বা বন্ধুরা জেআরসি বলতেন। আমরা ছাত্ররা বা তাঁর ছাত্র সমতুল্য ব্যক্তিরা তাঁকে ‘জেআরসি স্যার’ বলি। এই নামেই তিনি অধিক পরিচিত। তিনি ব্যক্তির সীমানায় সীমাবদ্ধ ছিলেন না। প্রতিষ্ঠানে পরিণত হন। তাঁর কাছে আমরা নানাভাবে আশ্রয়-প্রশ্রয় পেয়েছি। বেঁচে থাকতে তাঁর গুরুত্ব এভাবে বুঝিনি। এখন বুঝি! কষ্টকর এক অনুভূতির আগুনে পুড়ি।

আমি তাঁর ক্লাসরুম ছাত্র ছিলাম না। তবে নানাভাবে তাঁর সাহচর্যে আসার আমার সৌভাগ্য হয়েছিল। আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁর কাছে আমার শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ ছিল না। তবে আমার কর্মজগতে নানা পরিসরে আমি তাঁর কাছ থেকে যেসব শিক্ষা অর্জন করেছি, তার কোনো তুলনা নেই। সেই অভিজ্ঞতা ও উপলব্ধি নিয়েই জেআরসি স্যারকে স্মরণ করতে বসেছি। তিনি কত বড় মাপের মেধাবী ছিলেন, গুণী ও জ্ঞানী ছিলেন, তা নিয়ে অনেকেই অনেকভাবে বলেছেন। আরো বলবেন। তাঁর মান মাপ নিয়ে বলার যোগ্যতা আমার নেই। সে চেষ্টাও করা হবে আমার জন্য ধৃষ্টতা। তাই সেদিকে যাব না।

সিস্টেম ডাইনামিক পদ্ধতি অবলম্বনে আশির দশকে বুয়েটে ‘রুরাল এনার্জি সিস্টেম মডেলিং’ শীর্ষক গবেষণার কাজ করি। আমার কাজ ছিল বাংলাদেশের গ্রামীণ শক্তি ব্যবস্থার একটি গাণিতিক মডেল তৈরি করে তা সিমুলেশনের মাধ্যমে গ্রাম এলাকায় মধ্যম ও দীর্ঘমেয়াদি শক্তিপ্রবাহের প্রক্ষেপণ করা এবং তার গতি-প্রকৃতি বিশ্লেষণ করা। গ্রাম উন্নয়নে শক্তিপ্রবাহে বজায়যোগ্য শক্তির বিন্যাস ও প্রবৃদ্ধি নির্ণয় করার লক্ষ্যে সম্ভাব্য গ্রহণযোগ্য নানা বিকল্প পলিসি ওই মডেলের সাহায়্যে সিমুলেট করে পর্যালোচনা করা।

সমস্যায় পড়লাম। সিমুলেশন সফটওয়্যার নেই। ইন্ডাস্ট্রিয়াল প্রোডাকশন সিস্টেম মডেলিংয়ে তখন সিস্টেম ডাইনামিক পদ্ধতি ব্যবহার হতো। এআইটি ও এমআইটিতে তখন এ পদ্ধতিতে বেশকিছু মডেলিংয়ের কাজ হয়। কিন্তু সেসব মডেল সিমুলেশন হতো মেনফ্রেম কম্পিউটারে। বুয়েটে মেনফ্রেম কম্পিউটার ছিল। ওই সফটওয়্যার ছিল না। ফলে সিমুলেশনের জন্য আমাকে এআইটিতে যেতে হবে। কিন্তু যাওয়া সহজ ব্যাপার ছিল না। ফলে পিসিতে মডেল সিমুলেশনের জন্য পিসির উপযোগী সফটওয়্যার কেনার প্রস্তাব করি। প্রস্তাবটি কম্পিউটার সেন্টারের মতামতের জন্য পাঠানো হয়। অনিশ্চয়তায় পড়ি। কম্পিউটার সেন্টারের তখনকার পরিচালক ছিলেন জেআরসি স্যার। তাঁর সঙ্গে দেখা করি। সেই প্রথম দেখা। তিনি অনেক সময় ধরে অতি আগ্রহভরে আমার কাজ নিয়ে আমার সঙ্গে আলাপ করেন। অনেক উৎসাহ দেন। সাহস জোগান। গবেষণার জগতে বিভ্রান্ত অপরিচিত আমার মতো এক ছাত্রকে সেদিন অনেক বেশি গুরুত্ব দেন এবং সমাদর করেন। ফলে আমি অভিভূত হই। সে ঘটনা মনে পড়লে এখনো আবেগতাড়িত হই। তিনি কী করে বুঝেছিলেন তাঁর ওই সহানুভূতিটুকু আমার সেদিন বড় বেশি প্রয়োজন ছিল! আমিও আজ একজন শিক্ষক। দুর্দশাগ্রস্ত এমন কোনো শিক্ষার্থী কি আমার কাছে এমন সহানুভূতি পায়? কোনো মানুষ বিচার-বিবেচনায় কোন মাত্রায় অবস্থান করলে এমন সহানুভূতিশীল হন? তাঁকে কি আমাদের মতো সাধারণ ভাবা যায়!

তিনি ১৯৯৬ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা হিসেবে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান। সে সময়ে অতি উৎসাহী হয়ে তার সঙ্গে দেখা করি এবং অভিনন্দন জানিয়ে কথা প্রসঙ্গে বলি, স্যার! আমাদের প্রত্যাশা তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত উন্নয়ন পলিসির রূপরেখা পরবর্তী নির্বাচিত সরকারের জন্য যেন রেখে যায়। আমার কথায় সাড়া দেন এবং বলেন, তিনি বিশেষজ্ঞদের কারো কারো সঙ্গে এরই মধ্যে কথা বলেছেন। তিনি কিন্তু ভাবেননি, তিন মাস মেয়াদের সরকারের রুটিন কাজের বাইরে কোনো কিছু করার সুযোগ নেই। তিনি আমাদের শিখিয়ে গেছেন কাজ করার জন্য সুযোগ থাকে না। সুযোগ করে নিতে হয়। সুযোগ দিতে হয়।

১৯৯৭ সালে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় জেআরসি স্যারের নেতৃত্বে সফটওয়্যার রফতানির সমস্যা ও সম্ভাবনা অনুশীলনের জন্য একটি কমিটি গঠন করে। এ কমিটিকে ‘জেআরসি কমিটি’ বলা হয়। সে কমিটি সফটওয়্যার রফতানিতে জাতীয় সক্ষমতা উন্নয়নের লক্ষ্যে আর্থিক সংস্কার, জনসম্পদ ও আইসিটি অবকাঠামো উন্নয়ন এবং সফটওয়্যার রফতানি বাজার উন্নয়ন ও সম্প্রসারণকল্পে ৪৫টি সুপারিশ করে। এ সুপারিশগুলো বাস্তবায়নের মাধ্যমে তখনকার সরকার তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি খাত উন্নয়নে মনোযোগ দেয়।

১৯৯৮ সালের শেষের দিকে আমাকে বিআইটি চট্টগ্রাম (বর্তমান চুয়েট) থেকে এনে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় প্রেষণে বাংলদেশ কম্পিউটার কাউন্সিলে (বিসিসি) পদায়ন করে। বেশকিছু সুপারিশ বাস্তবায়নে বিসিসি ছিল ফোকাল পয়েন্ট। আমি সেসব সুপারিশ বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় একজন কর্মী হিসেবে অংশগ্রহণ করি। বাস্তবায়ন কার্যক্রম তদারকির জন্য ‘রপ্তানী উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি)’-তে জেআরসি স্যারের সভাপতিত্বে একটি মনিটরিং কমিটি ছিল। ইপিবির চেয়ারম্যান কমিটির সদস্য সচিব ছিলেন। সে কমিটির সভায় বিসিসির প্রতিনিধি হিসেবে আমি হরহামেশায় উপস্থিত হতাম। তাছাড়া ফাইলপত্র সই, চিঠিপত্র আদান-প্রদান ও যুক্তি-পরামর্শের জন্য বিসিসি, আবার কখনো কখনো মন্ত্রণালয়ও আমাকে জেআরসি স্যারের কাছে পাঠাতো। এভাবেই স্যারের সঙ্গে আমি সংশ্লিষ্ট হই। ১৯৯৯ সালে তাঁর নেতৃত্বে জাতীয় তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি নীতিমালা প্রণয়ন কমিটি হয়। নীতিমালার খসড়া বিসিসিতে তৈরি হয়। এ সূত্রেও তাঁর সঙ্গে আমার সংশ্লিষ্টতা বাড়ে। তখনকার শিক্ষানীতিতে তথ্যপ্রযুক্তি শিক্ষা শিরোনামে একটি অধ্যায় সরকার সংযোজন করে। সে অধ্যায়ের খসড়া জেআরসি কমিটির সুপারিশের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বিসিসি তৈরি করে।

জেআরসি কমিটির সুপারিশমালায় সফটওয়্যার নির্মাতা তৈরির লক্ষ্যে জরুরি ভিত্তিতে এক হাজার প্রশিক্ষক তৈরির সুপারিশ ছিল। ফলে আমার দায়িত্বে প্রাইভেট-পাবলিক পার্টনারশিপে ১০ মাসব্যাপী ১ হাজার ৫০ ঘণ্টা প্রশিক্ষণের ভিত্তিতে পোস্ট গ্র্যাজুয়েট ডিপ্লোমা প্রোগ্রামের আওতায় সরকারি খরচে প্রশিক্ষক তৈরির কাজ শুরু হয়। প্রশিক্ষণ কারিকুলাম ও কনটেন্ট বিসিসি তৈরি করে। সমুদয় কার্যক্রম চালানোর জন্য প্রাইভেট আইটি প্রশিক্ষণ ফার্মের সঙ্গে বিসিসি চুক্তিবদ্ধ হয়। শর্ত থাকে যে বিসিসির অনুমোদনক্রমে প্রশিক্ষণের স্থান ও রিসোর্স পার্সনের ব্যবস্থা ওই ফার্ম করবে। বিসিসি কর্তৃক গঠিত মনিটরিং কমিটি প্রশিক্ষণ কার্যক্রম তদারক করবে এবং মাসান্তে অগ্রগতির প্রতিবেদন দেবে। অতঃপর জাতীয় পত্রিকায় উন্মুক্ত বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে প্রশিক্ষণে আগ্রহী নির্ধারিত যোগ্যতাসম্পন্ন ব্যক্তিদের কাছ থেকে দরখাস্ত আহ্বান করা হয়। দরখাস্তকারীদের লিখিত পরীক্ষা নেয়া হয়। সে পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে তৈরি মেধা তালিকা থেকে মেধাক্রম অনুয়ায়ী প্রশিক্ষণার্থী বাছাই করা হয়। বিভাগীয় সদরের স্ট্যান্ডার্ড আইসিটি ট্রেনিং সেন্টারগুলোয় সদ্য নিয়োগপ্রাপ্ত জনবলের সঙ্গে এসব প্রশিক্ষণার্থীর প্রশিক্ষণ কার্যক্রমে ভর্তি চূড়ান্ত করা হয়। উদ্বোধনীর অপেক্ষায় প্রশিক্ষণ শুরু করা যায়নি। ছুটি শেষে আমি আমার কর্মস্থলে ফিরে আসি। এরই মধ্যে সরকার পরিবর্তন হয়। ফলে শুধু এ কার্যক্রমই নয়, কোনো কার্যক্রম নিয়েই বিসিসি আর এগোতে পারেনি। জেআরসি স্যারেরও কোনো কিছুর সঙ্গে আর সংশ্লিষ্টতা ছিলেন না। পরে বিসিসির ওইসব কর্মকর্তা প্রশিক্ষণ ছাড়াই কাজে যোগ দেন। তাঁদের কেউ কি আজ সফটওয়্যার নির্মাতা বা রক্ষণাবেক্ষণ প্রকৌশলী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত?

নিয়মিত সফটওয়্যার নির্মাতা ও রক্ষণাবেক্ষণ প্রকৌশলী তৈরির লক্ষ্যে প্রশিক্ষিত জনবল তৈরি ছিল জেআরসি কমিটি কর্তৃক প্রণীত সুপারিশমালার মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য। সে লক্ষ্যে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইনফরমেশন অ্যান্ড কমিউনিকেশন টেকনোলজি (বিআইআইসিটি) স্থাপনের উদ্যোগ নেয়া হয়। এ কাজে সহযোগিতা করা ছিল আমার অন্যতম কাজ। ডিমড ইউনিভার্সিটির মর্যাদায় স্বশাসিত প্রতিষ্ঠান হিসেবে এ প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট স্থাপন করার জন্য একটি প্রকল্প প্রস্তাব পেশ করা হয়। প্রকল্পটি প্রি-একনেকে অনুমোদন পায়। পরিশেষে কোনো এক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট হিসেবে বিআইআইসিটি স্থাপন করার ব্যাপারে পরিকল্পনা কমিশনের প্রস্তাবে মতভেদ দেখা দেয়। ফলে পরিকল্পনা কমিশন প্রকল্প প্রস্তাবটি খারিজ করে। তাই বিআইআইসিটি স্থাপন করা যায়নি।

তখনকার পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী ড. মহিউদ্দীন খান আলমগীরের মতে, নতুন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়সহ সব বিশ্ববিদ্যালয়ে কম্পিউটার বিজ্ঞান ও কৌশল বিভাগ খোলা হয়েছে। ফলে পৃথকভাবে বিআইআইসিটি স্থাপনের কোনো প্রয়োজন নেই। শিখন ও প্রশিক্ষণের মধ্যে কী প্রভেদ, তা তাঁর কাছে গুরুত্বপূর্ণ ছিল না। এখানেই তিনি ও জেআরসি স্যার অভিন্ন নন। জেআরসি স্যারের মতে, সফটওয়্যার নির্মাতা ও আইসিটি অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণ প্রকৌশলী তৈরির জন্য প্রশিক্ষিত জনবল প্রয়োজন। তাই সে প্রশিক্ষণের জন্য কম্পিউটার বিজ্ঞান ও কৌশলে মেধাবী ডিগ্রিধারীদের দরকার। বিশ্ববিদ্যালয় ডিগ্রিধারী শিক্ষিত জনবল তৈরি করে, প্রশিক্ষিত জনবল নয়।

আইসিটি প্রশিক্ষণ প্রদানে সক্ষমতা উন্নয়নের জন্য ছয়টি বিশ্ববিদ্যালয়কে সরকার আর্থিক অনুদান দেয়। জেআরসি কমিটির সুপারিশের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বিসিসি এ অর্থায়নে একটি প্রকল্প প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ে পাঠায়। এ প্রস্তাব উপেক্ষা করে মন্ত্রণালয় অর্থ ছাড় করে এবং ব্যয়ের রূপরেখা ছাড়াই সে অর্থ বিশ্ববিদ্যলয়গুলোকে থোক আকারে বরাদ্দ দেয়। ফলে এ অর্থ জেআরসি কমিটির সুপারিশ বাস্তবায়নে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারেনি। সফটওয়্যার নির্মাতা বা রক্ষণাবেক্ষণ প্রকৌশলী তৈরি গুরুত্ব পায়নি।

আইসিটি প্রশিক্ষণ দেয় ও সফটওয়্যার নির্মাতা তৈরি করে বা করতে পারে, এমনসব ব্যক্তি খাত প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা উন্নয়নে সরকার অনুদান দেয়ার প্রস্তাব গ্রহণ করে। এই অনুদান প্রাপ্তির যোগ্যতা নির্ধারণ মানদণ্ড ত্রুটিপূর্ণ ছিল। ফলে অনুদানের জন্য বাছাইকৃত প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে অনেক প্রতিষ্ঠানই বিতর্কের শিকার হয়। ওই অনুদানে সেসব প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা কতটা উন্নয়ন হবে, তা নিয়ে সংশয় দেখা দেয়। তাছাড়া সে সক্ষমতা উন্নয়ন কী মাত্রায় এবং কীভাবে হবে, এর কোনো গাইডলাইন ছিল না। সুতরাং এ উদ্যোগে ভাটা পড়ে। জেআরসি স্যারের বিবেচনায় সফটওয়্যার রফতানিতে উদ্যোক্তা হবে ব্যক্তি খাত। তাই পুরো প্রক্রিয়ায় ব্যক্তি খাতের অংশগ্রহণ ও ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করা না হলে সফটওয়্যার নির্মাতা তৈরি এবং সফটওয়্যার রফতানি বাজার সম্প্রসারণ ও উন্নয়ন সহজ হবে না।

খসড়া আইসিটি নীতিমালার ওপর জেআরসি স্যারের সভাপতিত্বে বেশকিছু কনসালটেশন মিটিং বিসিসি আয়োজন করে। সেসব মিটিংয়ে ব্যক্তি খাত থেকে আসা অংশীজন প্রতিনিধিরা গুরুত্বপূর্ণ অভিমত দেন। সেসব অভিমতের ভিত্তিতে খসড়াটিতে আমূল পরিবর্তন আনা হয় এবং পরবর্তী মিটিংয়ে তা নিশ্চিতও করা হয়। এভাবে নীতিতে উদ্যোক্তার স্বার্থ ও জনস্বার্থ সুরক্ষায় ভারসাম্য আসে। এই পুরো কাজটি জেআরসি স্যার নিজ তদারকিতে রেখে করান। এ কাজে ব্যক্তি খাত উদ্যোক্তাদের অংশগ্রহণ ও ক্ষমতায়ন নিখুঁতভাবে নিশ্চিত করেন। ওই কার্যক্রমে তাঁর সুনিপুণ দক্ষতা ও সক্ষমতা দেখে আমি অভিভূত হই।

সম্ভবত ২০০২ সাল। আইসিটি খাত উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের কোনো আলামত নজরে পড়ে না। বাংলাদেশ একাডেমি অব সায়েন্সের বার্ষিক সম্মেলন। পরমাণু শক্তি কমিশনে আয়োজিত এক অধিবেশনে সভাপতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থ বিজ্ঞানের প্রফেসর এএম হারুন অর রশিদ। মূল বক্তা জেআরসি স্যার আইসিটিতে এবং এনার্জিতে আমি। যথারীতি স্যার তাঁর প্রবন্ধ উপস্থাপন করলেন। আমি কষ্ট পেলাম। বিগত সময়ে এ খাত উন্নয়নে স্যার যেসব অবদান রেখেছেন, সেসবের অনেক কিছুই সেখানে ছিল না। অর্থাৎ স্যারের কাছে তা গুরুত্ব পায়নি। স্যারের প্রবন্ধের ওপর কিছু বলার জন্য দাঁড়ালাম এবং আহত স্বরে বললাম, ‘স্যার! আপনি আমাদের নিয়ে এতদিন ধরে এত কিছু করলেন, তার অনেক কিছুই আপনি এখানে বলেননি।’ সঙ্গে একটি তালিকাও পেশ করি। স্যার বললেন, ওগুলো দিয়ে তিনি পেপারটি সংশোধন করবেন। মনে হয়েছিল, আমার কথাগুলো তাঁর অপ্রত্যাশিত ছিল না। তবে তখন এসব কথা কে শুনতে চায়!

গত শতাব্দীর শেষ দশক। ভাড়াবাড়িতে বার্ষিক ৭২ লাখ টাকায় বিসিসি চলত। এখান থেকেই জেআরসি স্যারের নেতৃত্বে সরকারের আইসিটি খাত উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পরিচালিত হতো। আমার পরম সৌভাগ্য, এমন কর্মকাণ্ডে তাঁর নেতৃত্বে আমি কাজ করার সুযোগ পাই। সেখানে আমরা ছোট ঘরে কাজ করেছি বড় মন নিয়ে। আজ বিশাল বিসিসি ভবন। ডিজিটাল বাংলাদেশ। আইসিটি খাতে হাজার হাজার সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী। চারদিকে ল্যাবটপ, ডেস্কটপ, স্মার্টফোন এসবের ছড়াছড়ি। বিভিন্ন পর্য়ায়ের নিরাপত্তা সুরক্ষায় তথ্যপ্রযুক্তির ব্যাপক ব্যবহার। অটোমেশনে উৎপাদন ও প্রশাসন। সব মিলিয়ে বিশাল আইসিটি কর্মযজ্ঞ। বছরে হাজার হাজার কোটি টাকা খরচ। প্রায় দেড়শটি বিশ্ববিদ্যালয় ও দুইশরও অধিক কলেজ থেকে প্রতি বছর হাজার হাজার শিক্ষিত আইসিটি জনবল বের হয়। এ এক অনন্য অর্জন!

এক দশক ধরে পিএসসির বাছাই কমিটিতে আইসিটি প্রফেশনাল বাছাই পর্বে যা দেখে আসছি, তাতে মনে হয় সফটওয়্যার নির্মাতা ও আইসিটি অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণ প্রকৌশলী তৈরিতে আমরা অমনোযোগী। বেশির ভাগ চাকরিপ্রার্থী এ ব্যাপারে ন্যূনতম সক্ষমতা অর্জন করেন না। পিএসসির বাছাই কমিটিতে আইসিটি অধিদপ্তরের ডিজি এবং মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি থাকেন। তাঁদের সঙ্গে কথা বলে আমার মনে হয়েছে, বিষয়টি রাষ্ট্রের জন্য তাঁরা অত বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন না। অবশ্য বাস্তবে তারই প্রতিফলন দেখি। বিশ্বমানের সফটওয়্যার নির্মাতা ও আইসিটি অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণ প্রকৌশলী আমরা তৈরি করি না। সফটওয়্যার ও আইসিটি জনবল রফতানির বাজার সম্প্রসারণ ও উন্নয়ন করিনি। দেশের জন্য জেআরসি স্যার এ কাজগুলোই করতে চেয়েছিলেন। হয়নি। বরং ডিজিটাল বাংলাদেশ এখন অন্য সব দেশের সফটওয়্যার, হার্ডওয়্যার ও দক্ষ জনবল রফতানির বাজার। সেই বাজারই দিন দিন সম্প্রসারণ ও উন্নয়ন হচ্ছে।

এম শামসুল আলম: জ্বালানি বিশেষজ্ঞ