প্রাণ ও পড়ালেখা বাঁচানোর যুক্তিযুক্ত পরিকল্পনা জরুরী

প্রফেসর ড. মো: ফখরুল ইসলাম,

করোনাকালে প্রাণ ও পড়ালেখা উভয়কেই বাঁচানো জরুরী মনে করা হচ্ছে। দেশে পাঁচ কোটি শিক্ষার্থীকে নিয়ে আমরা অনেকটা বিপাকে পড়েছি। করোনা সংক্রমণ ও মৃত্যুহারের উর্দ্ধগতি এই মুহুর্তে সবাইকে বেশী চিন্তায় ফেলে দিয়েছে। বাবা-মা, অভিভাবকদের মুখে চিন্তার বলিরেখা শিক্ষার্থীদেরকেও দুর্ভাবনায় ঠেলে দিয়েছে। ফলে ভয়, হতাশা, শিক্ষার্থীদের ইচ্ছা ও প্রাণচাঞ্চল্যকে ম্রিয়মান করে দিয়েছে।

এ অবস্থায় শিক্ষার্থীদেরকে শুধু টিভি, ফেসবুকে আজে বাজে কাজে ব্যস্ত না রেখে কিভাবে লেখাপড়ায় মনোযোগী করা যেতে পারে সেজন্য শিক্ষাবিদদের চিন্তার শেষ নেই। এজন্য ঘরে ঘরে অনলাইন পাঠদান করার নানা পরামর্শ ও নির্দেশনা জানানো হচ্ছে। কিন্তু সে প্রচেষ্টাগুলো এখনো ব্যক্তিগত, বিক্ষিপ্ত, অগোছালো এবং প্রাথমিক পর্যায়ে রয়ে গেছে। বুয়েটের কিছু শিক্ষক, কিছু সরকারী কলেজের শিক্ষক এবং কয়েকটি প্রাইভেট উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান এ ব্যাপারে আগ্রহ দেখিয়ে কিছু কর্মসূচি হাতে নিলেও অনেক পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে অনলাইন পাঠদানের অবকাঠামো না থাকায় এখনও এ ব্যাপারে কোন কার্যকরী সিদ্ধান্ত নেয়া সম্ভব হয়ে ওঠেনি। শুধু ইউজিসি কর্তৃক গত ১০ মে একটি অনলাইন জরিপ করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এরপর সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ডীন ও বিভাগীয় সভাপতিগণের নিকট থেকে অনলাইন পাঠদান শুরু করার জন্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জামাদির তালিকা চাওয়া হয়েছে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীর সংখ্যা অনেক। তারা এখন নিজ নিজ বাড়িতে কেউ কেউ প্রত্যন্ত এলাকায় অবস্থান করছেন। তাদেরকে অনলাইন ক্লাসে অর্ন্তভূক্ত করার জন্য কোন কৌশল নিয়ে এগুতে হবে তার কোন নির্দেশনা এখনো পাওয়া যায়নি।

করোনা নিষেধাজ্ঞার কারণে শিক্ষকগণ নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানে যেতে না পারায় সরকারী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অনলাইন পাঠদানের ক্ষেত্রে এখনও প্রাতিষ্ঠানিক নীতিমালা ও কাঠামো তৈরী করা সম্ভব হয়নি। শুধু ঢাকা বা বড় শহরের শিক্ষার্থীকে নিয়ে ভাবলে চলবে না। করোনার লম্বা ছুটিতে সারা দেশের শিক্ষার্থীরা নিজ নিজ গ্রামের বাড়িতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। তাদের অনেকে বাড়িতে বিদ্যুৎ নেই। অনেকের কম্পিউটার ও ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সুবিধা নেই। গ্রামে-গঞ্জে ওয়াইফাই সুবিধা তেমন গড়ে উঠেনি। অনেকের স্মার্টফোন ও নেটওয়ার্ক থাকলেও সেখানে প্রয়োজনীয় স্পিড নেই। অনেক গরীব শিক্ষার্থীর ফোন ও বেশী মেগাবাইট ডাটা কেনার অর্থ বা সুবিধা কিছুই নেই।

তদুপরি দেশে মোবাইল ফোন ব্যবহারকারীর মোট সংখ্যার অনুপাতে ধরে নেয়া যায়- সারা দেশে ৫০-৬০ ভাগ শিক্ষার্থীর কম্পিউটার বা হাতে স্মার্টফোন আছে এবং তাদের ইন্টারনেট সুবিধা রয়েছে। আধুনিক প্রযুক্তির সুবিধাবঞ্চিত অর্ধেক শিক্ষার্থীকে বিয়োগ করে বা বাদ রেখে সুবিধাপ্রাপ্ত বাকী অর্ধেক শিক্ষার্থীর জন্য আমরা অনলাইনে পাঠদান. পরীক্ষা নেয়ার কথা ভাবছি। কেউ কেউ আবেগাপ্লুত হয়ে অনলাইনে শিক্ষা বিপ্লবের কথা বলে ফেলেছেন। তবে তা যদি শধু ধনী, সুবিধাপ্রাপ্ত অর্ধেক শিক্ষার্থীর জন্য ভাবা হয়ে থাকে তাহলে বলার কিছু নেই। কারণ, আমাদের চিন্তাধারার মধ্যে অসহায়দেরকে বেশী করে বঞ্চিত করার অনেক উদাহরণ প্রতিদিন লক্ষ্য করা যায়। বিশেষ করে করোনাকালের এই বিপদের সময়ে দরিদ্র পিতামাতা ও অভিভাবকগণের নিকট থেকে অনলাইন ক্লাসে যোগদানের প্রস্তুতির জন্য যেসব শিক্ষার্থীদের আব্দ্র পুরণ করতে না পেরে একদিকে যেমন শিক্ষার্থীরা হতাশ হবে, অন্যদিনে অভিভাবকগণ নিজেদেরকে অক্ষম-অপাংক্তেয় মনে করে মানসিক পীড়ায় ভুগতে থাকবে। তাই, গরীব শিক্ষার্থীদের অনলাইন ক্লাসে যোগদানের প্রস্তুতির সামর্থ্য আছে কি না সেদিকটি বেশী খেয়াল রাখা দরকার। যাদের স্মার্টফোন আছে তাদের ক্লাস করার কথা ভাবা হচ্ছে। মোবাইলের পাঁচ ইঞ্চি পর্দায় তারা অনলাইনে ক্লাসে অংশগ্রহণ করবে। এর অসুবিধাগুলো হলো- এ পর্যন্ত একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় তাদের অফিসয়াল ফেসবুক পেজের মাধ্যমে ১২২৬ জন শিক্ষার্থীর ওপর জরিপ চালিয়ে দেখেছেন, ৯০ ভাগ শিক্ষার্থী অনলাইনে পাঠদান চান না। আশিভাগ শিক্ষার্থী অনলাইন ক্লাসের সুবিধায় আসতে পারলেও ২০ ভাগ শিক্ষার্থী বাদ থেকে যাবে।

অসুবিধাগুলোর মধ্যে প্রধান হলো- সারা দেশে ইন্টারনেট পরিষেবা না থাকা এবং যেখানে যাদের রয়েছে সেখানকার সব শিক্ষার্থী সেই সেবা ক্রয় করতে আর্থিকভাবে সক্ষম নন। এছাড়া রাজধানীর একটি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় যেখানে শিক্ষকগণ গত কয়েকমাস যাবত অনলাইনে ক্লাস নিচ্ছেন তাদের সাম্প্রতিক এক জরিপের ফলাফল থেকে জনা গেছে-বিশ্ববিদ্যালয়টি রাজধানীতে অবস্থিত হলেও তাদের ৭০ ভাগ শিক্ষার্থী গ্রাম থেকে এসেছে। করোনার বন্ধে তারা নিজ নিজ গ্রামের বাড়িতে চলে গেছে। অনলাইন ক্লাস চালু হলেও তাদের শতকরা ত্রিশভাগ শিক্ষার্থী কখোনই অনলাইন ক্লাসে যুক্ত হয় না। অর্থাৎ, তারা অনুপুস্থিত থাকছে। বাকীদের মধ্যে অনলাইন ক্লাস চালু হলে তারা বাড়িতে কোন ভাল নিরিবিলি প্লেসে বসার সুযোগ পায় না। পুকুর পাড়ে, বাজার, নদীরঘাট, স্কুলে মাঠে থেকে সংযোগ নিয়ে ক্লাসে অংশ নিয়েছে। ইন্টারনেটে ঘন ঘন বাফারিং হওয়ায় খুব স্বল্প সময়ে তারা সংযোগে থাকতে পারে। এছাড়া দীর্ঘ সময়ব্যাপী সকল শিক্ষকের লেকচার ফলো করার মত প্রয়োজনীয় ডাটা বা মেগাবাইট কেনার মত আর্থিক সামর্থ্য নেই।এছাড়া ঐ বিশ্ববিদ্যালয়ে যারা অনলাইনে ক্লাস করেছে তারা অনলাইনে পরীক্ষা দিতে রাজী নয়। এ দাবী মানা না হলে তারা ধর্মঘট করে ভবিষ্যতে অনলাইনের ক্লাস বর্জন করার হুমকি দিয়েছে।

আরো অন্যান্য যেসব সমস্যা জানা গেছে সেগুলো হলোঃ-

(১) ধীরগতির ইন্টারনেট -নেটওয়ার্ক এত স্লো যা বিরক্তিকর। মনে হয় গরুরগাড়ি করে তথ্য আসে। তাই কোন কাজ করতে ইচ্ছা করে না। করোনাকালে বিছানায় শুয়ে শুয়ে পিঠে ব্যথা হয়ে গেছে, ঘুমাতে পারি না -বললেন একজন শিক্ষার্থী খুবই বিরক্তি প্রকাশ করে।

(২) বাফারিং ও বার বার নেটওয়ার্ক সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ায় ধারাবাহিকভাবে লেকচার ফলো করতে না পারা বড় অসুবিধা।

(৩) শিক্ষক-শিক্ষার্থীূদের মধ্যে পারস্পরিক সমঝোতা বা ইন্টার‌্যাকশান ঠিকমত না হওয়ায় লেকচার বুঝতে কষ্ট হয়। বুঝতে না পারা অংশগুলো আর কারো কাছে সেভাবে পুন: বুঝিয়ে নেবার উপায় থাকে না।

(৪) পাঠদানকারী শিক্ষককে তাৎক্ষণিকভাবে প্রশ্ন করারা সুযোগ না পাওয়ায় শিক্ষার্থীর মনে ক্ষেদ থেকে হতাশা তৈরী হয়।

(৫) বেঁধেদেয়া নির্দিষ্ট সময়ে শিক্ষকগণ শ্রেণিকক্ষের মত বেশী বেশী উদাহরণ বা গল্প দিয়ে পড়া বুঝিয়ে দিতে পারেন না। এছাড়া লেকচারটি রেকর্ড হয়ে যাবার ভয়ে শিক্ষক অতি সতর্ক, কৃত্রিম ও ফর্মাল ব্যবহার করেন। এতে ছাত্র-শিক্ষকের মধ্যে আন্তরিকতার ঘাটতি দেখা দিয়ে শিক্ষাশুণ্যতা তৈরী হয়। এছাড়া সহপাঠিরা পাশে না থাকায়
বিষয়টি হতাশা তৈরী করে।

(৬) অনেক সময় ক্লাসের সময় ফোন কল আসা ও ধরা, মেসেজ আসা ইত্যাদিও মনোযোগের ব্যত্যয় ঘটাতে পারে।

(৭) স্বাস্থ্য ঝুঁকি: এত ছোট অক্ষর দেখতে না পারা, চোখ ঝাপসা হয়ে যাওয়া, চোখের ওপর অতিরিক্ত চাপ, হেডফোনের শব্দের মাধ্যমে কানের ক্ষতি, ব্রেণের ক্ষতি, মাথা ভোঁ ভোঁ করা, অবসাদগ্রস্থ হওয়া ইত্যাদি তো আছেই।

(৮) অনলাইন ক্লাসে কৌতুহল থাকে না, নিজস্ব চিন্তাভাবনা করার ফুরসৎ থাকে না। যেখানে চিন্তা নেই সেখানে নতুন যুক্তি নেই, নতুন জ্ঞান তৈরী হয় না। এভাবে চিন্তার পরিধি ও উদারতা কমে গিয়ে পাঁচ ইঞ্চি পর্দায় নিজেদের ভাবনাগুলো আড়ষ্ট হয়ে পড়ে।

প্রাথমিক ও নিম্নমাধ্যমিক শিক্ষার্থীদের ৮০ ভাগই গ্রামে বাস করে। তাদের এই ধরনের প্রযুক্তিগত সুবিধা নেই বললেই চলে। সেজন্য গরীব শিক্ষার্থীদের অনলাইন ক্লাসে যোগদানের প্রস্তুতি গ্রহণের সামর্থ্য আছে কি না সেদিকটি বেশী খেয়াল রেখে তাদেরকে প্রযুক্তি উপকরণ সরবরাহ অথবা আর্থিক সহায়তা প্রদান করা দরকার। কারণ, করোনার বিপর্যয় বেশীদিন দীর্ঘায়িত হবার আভাষ দিয়েছেন অনেক বিজ্ঞানী। আগামী বছরের আগে করোনার কার্যকরী টিকা আসার সম্ভাবনা ক্ষীণ। এ ছাড়া, উহান ও নিউজিল্যান্ডে করোনা রোগীরা ভাল হয়ে বাড়ি ফেরার পর নতুন করে সংক্রমণের খবর জানা গেছে। বাংলাদেশে মে ১৮ তারিখে সর্বোচ্চ সংক্রমণ (১৬০২ জন) ও সর্বোচ্চ মৃত্যু (২১ জন) বলা হলেও এখনও সংক্রমণ ও মৃত্যুর পিক সময় সামনে রয়েছে বলে অনেকে ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন। তাই হেলাফেলা না করে এ ব্যাপারে এখনই আমাদের উ্পযোগী দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা নিয়ে ভাবা দরকার।

কেউ কেউ বলেছেন- এটা সাময়িক, ঠেকা সারানো কাজ। পাঁচ ইঞ্চি পর্দায় সত্যিকারের স্কুল কলেজের স্বাদ খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা করা বৃথা। এটা কোন রকমে শিক্ষার্থীদেরকে ব্যস্ত রাখার একই উপায় মাত্র। কিন্তু করোনা বিপর্যয়ের দিনগুলো অতি বেশী দীর্ঘায়িত হলে আমাদের এসব কথার খেসারত দেবার উপায় খুঁজে পাওয়া যাবে না। করোনা দূর হয়ে যাবার পরও করোনা দরিদ্র্য ও করোনা রিফুজিরা সামাজিক সমস্যায় পড়ে বেকায়দা পরিস্থিতি তৈরী করতে পারে। তাদেরকে খাদ্য সরবরাহের পাশাপাশি শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সব ধরনের সামজিক নিরাপত্তার ব্যবস্থা করতে হতে পারে। শিক্ষা মানুষের মৌলিক অধিকার। এর ধারাবাহিকতা ধরে না রাখলে ভবিষ্যৎ অন্ধকার হয়ে যাবে। তাই সাময়িক ও যেনতেনভাবে না ভেবে অনলাইন পাঠদানের যুক্তিযুক্ত ও দীর্ঘমেয়াদী টেকসই কাঠমো তৈরীর পরিকল্পনা নিয়ে ভাবা উচিত।

*লেখক রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডীন, সমাজকর্ম বিভাগের প্রফেসর ও সাবেক চেয়ারম্যান।E-mail: fakrul@ru.ac.bd

জেড,আই/ঢাকানিউজ২৪ডটকম।