শ্রদ্ধাঞ্জলি: নির্মোহ বড়মাপের একজন মানুষ

যতীন সরকার:  জাতীয় অধ্যাপক আনিসুজ্জামান আজ আমাদের পাশে নেই, এ কথা ভাবতেই যেন নিথর হয়ে পড়ি। সংবাদটি আমার কাছে বজ্রাঘাতের মতো। আমি ব্যক্তিগতভাবে এই জ্ঞানতাপসকে শুধু শ্রদ্ধার চোখেই দেখতাম না, তাকে তার মননশীল-সৃষ্টিশীলতার কারণেই নমস্ব মনে করতাম। তার মতো একজন বড় মাপের মানুষের মূল্যায়ন করা, তাকে নিয়ে পর্যালোচনা করা আমার পক্ষে সহজ নয়। আমার মতো নগণ্যজনকেও তিনি যেভাবে প্রীতির চোখে দেখতেন, তা আমার জন্য গর্বের অধ্যায় হয়ে আছে। বয়সে তিনি আমার প্রায় এক বছরের ছোট হলেও অন্যসব দিকেই অনেক বড়। তার কর্ম ও খ্যাতির বিস্তৃত সীমানায় তিনি আমাদের সামনে শারীরিক অনুপস্থিতি সত্ত্বেও জ্বলজ্বল করবেন।

তার রচনা ভান্ডার কতটা সমৃদ্ধ তা নতুন করে বিশ্নেষণ করা নিষ্প্রয়োজন। তার অনেক রচনার মধ্যে কোনটি বিশিষ্ট তা নির্ণয় করাও সহজ নয়। আমি তার রচিত বিপুল ভান্ডার থেকে একটি মাত্র দৃষ্টান্ত তুলে ধরতে চাই। ‘মুসলিম মানস ও বাংলা সাহিত্য’ তার একটি অসাধারণ বই। এটি তার পিএইচডি থিসিসের পুস্তকায়িত রূপ। এই অমূল্য রচনায় তিনি মুসলিম সমাজের যে চিত্র তুলে ধরেছেন, তার ব্যাখ্যা-বিশ্নেষণ সহজ নয়। এর আগে মৌলিকভাবে আর কেউ এভাবে বিশ্নেষণ করেছেন বলে আমার স্মরণে নেই। বিরাট মহত্ত্বের অধিকারী অধ্যাপক আনিসুজ্জামান স্মৃতিতে থাকবেন অম্লান, সৃষ্টিতে থাকবেন অমর। তার সমৃদ্ধ রচনাভান্ডার আমাদের অমূল্য সম্পদ। আর এ জন্যই তিনি আমাদের বাতিঘর হিসেবে আখ্যায়িত এবং মূল্যায়িত। তিনি প্রজন্মের কাছে ধ্রুবতারার মতো এবং আমাদের কাছেও অনন্য একজন আলোকিত মানুষ হিসেবে মূল্যায়িত।

১৪ মে অপরাহেপ্ত তিনি আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন। খুব আশান্বিত ছিলাম তিনি দ্রুত সুস্থ হয়ে আমাদের মাঝে ফিরে আসবেন। কারণ তার প্রয়াণের দুই দিন আগে হাসপাতাল ও চিকিৎসকদের বরাত দিয়ে তার শারীরিক অবস্থার উন্নতির কথা জানানো হয়েছিল। কিন্তু সব সম্ভাবনা-আশার যবনিকাপাত ঘটল জাতির বিবেকসম মানুষটির শেষ পর্যন্ত চির প্রস্থানের মধ্য দিয়ে। আজ তিনি আমাদের মাঝে নেই এটিই চূড়ান্ত সত্য। তার শারীরিক অনুপস্থিতি সত্যই মেনে নেওয়া কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবুও জীবনচক্রের এই অমোঘ বিধান মেনে নিতে হচ্ছে। তার মতো বড় মাপের মানুষেরা নিশ্চয় ক্ষণজন্মা বলতে হবে। তার সঙ্গে যতবার কথা বলেছি, ততবারই এই শাশ্বত সত্যটি আমার সামনে ভেসে উঠেছে।

যা কিছু সুন্দর, এর সবকিছুতেই তার সম্পৃক্ততা ছিল। আমি মুক্তকণ্ঠে, উচ্চকণ্ঠে বলতে পারি- এমন নমস্য, বরেণ্যজনের সম্পৃক্ততা ছাড়া সুন্দরও যেন ব্যাপকভাবে বিকশিত হতে পারে না। এই কথাটির ব্যাখ্যা-বিশ্নেষণও নিষ্প্রয়োজন। কথাগুলো শুধু তার সঙ্গে আমার প্রীতির বন্ধনের কারণেই উচ্চারিত হচ্ছে না, বাস্তবতা কিংবা প্রয়োজনের নিরিখেই এর সত্যাসত্য নির্ণিত। সত্য-জ্ঞান-নীতি-প্রজ্ঞার সাধক মানুষ অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের শূন্যতা পূরণ হওয়ার নয়। কারণ এমনজন তো শয়ে শয়ে জন্মান না। তার প্রজ্ঞার দৃষ্টি এমনভাবে ছড়িয়ে তাকে আমাদের সমাজে বিশিষ্ট করে তোলে, যার বর্ণনা তুলনারহিত। তিনি তুলনাহীন। বাঙালি সংস্কৃতির পরিচর্যাকারী আনিসুজ্জামানকে নানাভাগে ভাগ করে বিশ্নেষণ করা যেতে পারে।

জাতীয় অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজে জড়িত থাকলেও প্রত্যক্ষ দলীয় রাজনীতির সঙ্গে স্বাধীন বাংলাদেশে তাকে জড়াতে দেখিনি। তবে ৫০ ও ৬০-এর দশকে প্রগতিশীল রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে তিনি যুক্ত থেকে তাদের সমর্থন দান করেছেন। আধুনিকতম এই নিকটজনের জন্য আমার শ্রদ্ধার ডালি কীভাবে সাজাব তাও এই মুহূর্তে বুঝে উঠতে পারছি না। কারণ অসংখ্যজনের মতো আমিও অত্যন্ত শোকাতর, বেদনাহত। আমরা আমাদের এই শোক কাটাব তাকে মূল্যায়ন করে, তার সব কর্মের মধ্যে তাকে খুঁজে নিয়ে। একক কোনো পরিচয়ের গণ্ডিতে আনিসুজ্জামানকে আবদ্ধ করার অবকাশ নেই। তবে সবকিছুর ঊর্ধ্বেও তিনি ছিলেন নির্মোহ বড়মাপের একজন মানুষ।

আধুনিক, প্রজ্ঞাধারী, আমাদের কালের গুরুত্বপূর্ণজন সফল শিক্ষাবিদ, কীর্তিমান গবেষক, সৃজনশীল লেখক যিনি বাংলাদেশের প্রাতিষ্ঠানিক ও রাষ্ট্রীয় প্রায় সব ধরনের স্বীকৃতি ও পুরস্কার অর্জন করে গেছেন, তার শূন্যতা তো আমাদের কাছে অসীমই। সবচেয়ে বড় কথা হলো তার এত অর্জনের ভার তিনি বয়েছেন স্বটান থেকে। অহমিকা, দম্ভ, নেতিবাচক কোনো কিছুই তাকে স্পর্শ করতে পারেনি। জাতির গণতান্ত্রিক-সাংস্কৃতিক আন্দোলন সংগ্রামে তার অগ্রগণ্য ভূমিকা আমাদের জন্য অনুস্মরণীয় হয়ে থাকবে। নমস্য এই অনুজের মুক্তিযুদ্ধ পর্বে ভূমিকাও ছিল অনন্য। শিক্ষা কমিশনে যুক্ত থেকে শিক্ষার জন্যও তিনি রেখে গেছেন বলিষ্ঠ ভূমিকা। অর্থাৎ সব ক্ষেত্রে তিনি আমাদের জন্য হয়ে উঠেছিলেন অপরিহার্য।

বহু অভিধায়ই তাকে অভিহিত করা যায়। বহু বিশেষণেই তাকে করা যায় বিশেষায়িত। আঁধারের যাত্রীদের সঙ্গে নিয়েই তিনি চলেছেন মশাল হাতে। তার সামনে যতবার পড়েছি কিংবা টেলিফোনে কথা বলেছি, ততবারই হয়েছি প্রীতিস্নাত। পাণ্ডিত্য ও মননশীলতার জন্য তিনি শুধু এপার বাংলায় নয়, ওপার বাংলায়ও ভূষিত হয়েছেন নানা পুরস্কার ও স্বীকৃতির মাল্যে। এ জন্য তার স্থান পূরণের মতো মানুষ আমরা সহজে পাব না। তার কাছে আমরা তার জন্যই হয়ে থাকব চিরঋণী। অধ্যাপক আনিসুজ্জামান বড়ই ইতিবাচক মানুষ ছিলেন।

সব রকমের ক্ষুদ্রতা থেকে নিজেকে মুক্ত রেখে তিনি তার আলোর দ্যুতি ছড়িয়ে গেছেন। আদর্শচ্যুত হননি কখনোই। এতই নীতিনিষ্ঠ ছিলেন যে, এও তুলনারহিত। বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির উজ্জ্বল নক্ষত্র আনিসুজ্জামান আমাদের সামনে অনেক দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন। তার অসমাপ্ত কাজ প্রজন্মের প্রতিনিধিরা নিষ্ঠার সঙ্গে এগিয়ে নিয়ে যাবেন- এই প্রত্যাশা সঙ্গতই করি। তিনি আমাদের যে আলোয় ভরিয়ে দিয়েছিলেন, সেই আলোই আমাদের পথ দেখাবে। তিনি কেন অনন্য- এ প্রশ্নের উত্তর তো তিনি নিজেই। তার আত্মজীবনী ভবিষ্যতে আমাদের ইতিহাসের উপাদান জোগাবে- এই বক্তব্যের সঙ্গেও মোটেই দ্বিমত পোষণ করি না। ইতিহাসের রাজপথের বাঁকে বাঁকে তার উপস্থিতি বিশাল অধ্যায়ের অনুষঙ্গ।

তার চলে যাওয়া নানা কারণে আমাদের চরম বেদনাহত করেছে। এই বেদনার ভার বয়ে চলা সহজ নয়। তবুও চলতে হবে- এই তো বিধির বিধান। সমগ্র বিশ্ব করোনা দুর্যোগে এক ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। আমরাও এর বাইরে নই। কঠিন এক সময় পার করছি আমরা। এমন সময়ে মিলিতভাবে শোক প্রকাশের অবকাশও নেই। কষ্টটা এ জন্য আরও বেশি বোধ করছি। একজন আদর্শ শিক্ষক হিসেবে আনিসুজ্জামানের খ্যাতি শুধুই যে এই গণ্ডিবদ্ধ ছিল না, তা-ই আমি বলতে চেয়েছি। উদারনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির মানুষ আনিসুজ্জামান আমার কাছে তো বটেই অসংখ্যজনের কাছে তিনি উদারনীতির একজন উজ্জ্বল প্রতিনিধি।

আমাদের মহান সংবিধান রচনায়ও তার সম্পৃক্ততা ছিল। সামাজিক-রাজনৈতিক মুক্তির আন্দোলনে তাকে আমরা পেয়েছি সম্মুখ সারিতে। জাতির ক্রান্তিলগ্নে তার দৃঢ় দীপ্তকণ্ঠ আমরা শুনেছি। শহীদ জননী জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে গঠিত ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির আন্দোলনেও ছিলেন অগ্রভাগে। স্কুলে পড়াকালীনই যুক্ত হন আমাদের ভাষা আন্দোলনে। মনে পড়ে সেই ১৯৬০-এর দশকের কথা। পাকিস্তান সরকারের প্রবল রবীন্দ্রবিরোধিতার কালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মশতবর্ষ উদযাপনে তার অনন্য ভূমিকাও স্মরণযোগ্য।

অর্থাৎ শুধু বিদ্যাচর্চার গণ্ডিবদ্ধই তিনি ছিলেন না। কর্মে ছিলেন তিনি ব্যাপৃত। আগেই লিখেছি তার রচনাভান্ডার অত্যন্ত সমৃদ্ধ যা আমাদের কাছে অমূল্য সম্পদ। বাঙালির মননের প্রতীক কীর্তিমান মানুষ আনিসুজ্জামানের প্রয়োজন আমাদের কাছে ফুরিয়ে যাওয়ার নয়। শ্রদ্ধাবনত চিত্তে স্মরণ করি অনুজকে। অসংখ্যজনের মতো আমি তার একজন অনুরাগী, গুণগ্রাহী হিসেবে নিজেকে ভেবে খুব প্রীত হই। তার আত্মা শান্তি পাক। তিনি ছিলেন আমাদের চেতনা মননের বাতিঘর। ওপারে ভালো থাকুন আনিসুজ্জামান।

শিক্ষাবিদ ও প্রাবন্ধিক