রোজা রেখে কিছুই খাই না, সুদ-ঘুষ খাই কেন?

প্রফেসর ড. মো: ফখরুল ইসলাম:   এক কোরীয় ভদ্রলোক ভেবেছিলেন মুসলিমগণ হয়তো রোজায় পানি বা পানীয় খেয়ে রোজা রাখেন। কারণ, তিনি জানেন, পৃথিবীর নানা দেশে রোজা বা ফাস্টিং করা একটি ধর্মীয় ব্যাপার এবং একেক দেশে একেক নিয়মে তা পালন করা হয়ে থাকে। যেমন, কোন দেশে খাবার খাওয়া নিষেধ, যতবার খুশি পানি পান করা যায়। সারাদিনে শুধু একবার পানি খাওয়া যায়। কোন কোন উপজাতীয়দের মধ্যে রোজা রেখে চুরুট, হুক্কা ইত্যাদি খাওয়া বারণ নয়।

আমরা সারাদিন কোনকিছু না খেয়ে রোজা রাখি। কিন্তু কোন পানি বা পানীয় গ্রহণ করি না তাতে কোরীয় ভদ্রলোক অনেকটা অবাক হয়েছিলেন। মুসলিমগণ মহান আল্লাহর নির্দেশমত তার ভয়ে সব ধরনের খাদ্য, পানীয় ও ভোগ-বিলাস থেকে বিরত থেখে রোজা পালন করে থাকেন-এটা তাঁর কাছে খুবই ইন্টারেষ্টিং বিষয় বলে মনে হয়েছিল। তিনি ভেবেছিলেন, রোজা থাকাকালীন সময়ে আমরা পানি খেলে আল্লাহ্ দেখবেন এই ভয়ে তা খাই না। সেই মোতাবেক তাঁর ধারণা হয়েছিল, বাংলাদেশের মুসলিমগণ আল্লাহ্র ভয়ে কোন খারাপ কাজ করেন না। তাই বাংলাদেশে কোন অপরাধ নেই, দুর্নীতি নেই। দেশটি নিশ্চয়ই ঘুষ-দুর্নীতি মুক্ত, পাপ-পঙ্কিলতা মুক্ত একটি ন্যায়ানূগ দেশ!

এটাই সেই কোরীয় ভদ্রলোকের স্বাভাবিক ধারণা ছিল। কিন্তু ইন্টারনেট ঘেঁটে বাংলাদেশের দুর্নীতির আসল তথ্য জানতে পরে তার তো চোখ ছানাবড়া। আসলে আমরা একদিকে বিশ্বাসী এক জাতি। অন্যদিকে, নিয়ম-শৃংখলা ও ঐশী নির্দেশনা না-মানার ক্ষেত্রেও আমরা অগ্রগামী।রোজা রেখে সুযোগ থাকা সত্তে ও গোপনে পানিও খাই না- মহান আল্লাহ্ দেখছেন বলে। কারণ. আমরা বিশ্বাস করি মহান আল্লাহ্তা’য়ালা চিরঞ্জীব। তিনি সদাজাগ্রত, সর্বদ্রষ্টা। সাগরের তলা থেকে আসমানের প্রান্তে কী ঘটছে সমবসময় তিনি সবকিছুই দেখছেন।

তাই মানুষের ভাল কাজের সাথে সব ধরনের মন্দকাজ- অন্যায়, অবিচার, সুদ-ঘুষ, দুর্নীতি, পাপ সবকিছুই আল্লাহ্ দেখতে পান। তাহলে সেগুলো করার সময় আমরা কেন আল্লাহকে ভুলে যাই? আমাদের মধ্যে এত স্ববিরোধীতা কেন? কেন এত বৈপরীত্য বিরাজ করে? মহান আল্লাহ্তা’য়ালার দেয়া বিধি-বিধান সুস্পষ্ট। সেগুলো অমান্য করে আমরা প্রতিনিয়ত অন্যায় কাজ করে চলেছি। অবৈধভাবে উপার্জিত অর্থ দ্বারা ক্রয়কৃত নিষিদ্ধ দ্রব্য ভক্ষণ করছি। পাপ কাজ করছি, মদ-নেশা করছি। সুদ-ঘুষ ইত্যাদির ব্যবসা করছি নির্দ্ধিধায়। এগুলোকে ঘৃণাও করছি না। তবে কি আমার রোজা হচ্ছে? মহান আল্লাহর নির্দেশমত তার ভয়ে রোজা রেখে পানি খাই না, তবে সুদ-ঘুষ খেতে ভয় পাই না কেন? নির্ভয়ে সেগুলো গ্রহণ করি কেন?

আমাদের দেশে এত মসজিদ, এত মন্দির, এত উপাসনালয়- সেগুলো প্রতিনিয়ত আমাদের কী শেখায়? নিশ্চয়ই সেগুলোতে বহু ভাল মানুষ যাতায়াত করেন, সদুপোদেশ আদান-প্রদান করেন। আমরা সেগুলো শুনে থাকি। মেনে চলি না কেন?এক গবেষণায় বলা হয়েছিল-বাঙ্গালী সংকর জাতি। মিশ্র হবার ফলে কি তাহলে করোনা ভাইরাসের মত আমাদের চরিত্র বার বার বদল করে ফেলি? তাহলে আমাদের উপায় কী হবে?
আমরা কোন গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে দ্বিধা-দ্বন্দে ভুগতে থাকি ও ভুল সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি। যেমনটা হয়েছে করোনায় লকডাউন নিয়ে।

আমরা একদিকে জনগণকে বলছি-ঘরে থাকুন নিরাপদে থাকুন। অন্যদিকে ডাকছি-ঢাকায় আসুন কারখানায় কাজ করুন। এই ধরনের স্ববিরোধিতা ও বৈপরীত্য চালাকি করে বলা হলেও অদৃশ্য করোনা তো কাউকে ক্ষমা করবে না। কারণ, আমরা জানি- পাপ কারো বাপকেও ছাড়ে না। অর্থ্যাৎ, নিজেদের দেশের নিরাপত্তার জন্য ভাল-মন্দ সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রেও আমরা বুদ্ধিবৃত্তিক দেউলিয়াপনা প্রদর্শণ করে চলেছি। তার কারণ হলো আমাদের বিশ্বাসের মধ্যে নড়বড়ে অবস্থা, আমাদের চিন্তা-ধারণাগুলো কোথা থেকে শক্তিশালী হবার প্রেরণা খুঁজে পাবে? তাই আমাদের মানবিক গুণগুলোকে জাগিয়ে তুলতে হলে মানসিক ও নৈতিক চিন্তাকে শাণিত করতে হবে। এজন্য ন্যায়ানুগ ব্যক্তি ও সমাজব্যবস্থার ভিত্তি আশু দরকার।

এজন্য সকল অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে হবে। সবকাজে মহান আল্লহ্তা’য়ালাকে ভয় করতে হবে। রোজা পালনের জন্য যেমন সুযোগ থাকা সত্তে¡ও গোপনে পানি বা কোন কিছু না খেয়ে সারাদিন কষ্ট করে কাটিয়ে দিতে কার্পণ্য করছি না- ঠিক তেমনি প্রতিটি কাজে মহান আল্লাহ তা’য়ালাকে স্মরণ করে যদি চলতে পারি তাহলে আমাদের দেশের অতিলোভী মানুষগুলোর মনের অভাব দূর হবে। লোভী মজুতদার, ব্যবসায়ী, ত্রাণচোর, বাটপার, শিক্ষিত দুর্নীতিবাজ, ঘুষখোর, চাটুকার, তেলবাজ, অবিবিশ্বাসী মানুষেরা সবার কথা ভেবে নিজ নিজ দায়িত্ব ঠিকভাবে পালন করতে উদ্বুদ্ধ হবে।

আর এভাবেই একটি টেকসই উন্নয়নের ধারা ও ধরা তৈরী হবে। মানুষ ক্রমান্বয়ে নিজেদের ভুল ও সীমাবদ্ধতাগুলো বুঝতে শিখবে এবং এক সময় রোজা রেখে শুধু খাদ্য ও পানীয় পরিহার নয় বরং সুদ-ঘুষ ও যাবতীয় অন্যায় কাজ পরিহার করাকে দায়িত্ব ও কর্তব্য মনে করে ইহলৌকিক ও পারলৌকিক কল্যাণ অর্জনে ব্রতী হবে।

*লেখক রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডীন, সমাজকর্ম বিভাগের প্রফেসর ও সাবেক চেয়ারম্যান।E-mail: fakrul@ru.ac.bd

জেড,আই/ঢাকানিউজ২৪ডটকম।