যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালে ড.আনিসুজ্জামানকে যেমন দেখলাম

সুমন দত্ত
ড.আনিসুজ্জামানের সঙ্গে আমার পরিচয় স্কুল জীবনে। বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামকে নিয়ে একটি রচনা লেখেন তিনি। পরীক্ষায় কমন পড়ার আশায় সেই রচনা পড়ি। আশির দশকে পুরো সমাজ ব্যবস্থাটা ছিল সাম্প্রদায়িক। সেই সময় আমার সরকারি স্কুলের শিক্ষকরা কবি নজরুলকে ইসলামিক কবি। আর রবীন্দ্রনাথকে হিন্দু কবি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করত। ওই সময় আনিসুজ্জামান বিদ্রোহী কবির বর্ণনার শুরুতেই বলেন, ইসলাম মননের কবি নন কাজী নজরুল। সেদিন জানতাম না সাংবাদিকতা করতে গিয়ে ড. আনিসুজ্জামান স্যারের সঙ্গে দেখা হয়ে যাবে।

৭১ এ মানবতা বিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত যুদ্ধাপরাধী সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী ওরফে সাকার বিচারে সাক্ষ্য দিতে আসেন ড. আনিসুজ্জামান। ট্রাইব্যুনাল-১ চলে সাকার বিচার। চট্টগ্রামের কুন্ডেশ্বরীর প্রতিষ্ঠাতা নতুন চন্দ্র সিংহ কীভাবে সাকার হাতে নিহত হোন তার বর্ণনা দেন তিনি। তবে তিনি হত্যাকাণ্ডের প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন না। সেই সময় তিনি এই ঘটনা একাধিক লোকের মুখে শুনেছেন। এমনটাই আদালতে বলেছেন।

এবার জেরার সময় সাকার আইনজীবীরা ঘটনার প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন না করে ড. আনিসুজ্জামান কিভাবে বাংলাদেশে এলেন, তার পিএইচডি কিসের ওপর ছিল, ভারত সরকার তাকে কি কি পুরস্কার দিয়েছে এসব প্রশ্ন করতে থাকেন। সাকার আইনজীবীদের এমন প্রশ্ন শুনে আমরা যারা ট্রাইব্যুনালে বসে আছি, তাদের কাছে মনে হচ্ছে ড. আনিসুজ্জামান মঙ্গলগ্রহ থেকে সরাসরি এজলাসে এসেছেন। ঘাগু এসব আইনজীবী ড. আনিসুজ্জামানকে চেনেন না। তিনি কি বিষয়ের শিক্ষক সেটা তারা জানেন না। অথচ সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমানের সঙ্গে ড. আনিসুজ্জামান বাংলায় আইনি অভিধান লিখেছেন। যা সুপ্রিমকোর্টের প্রত্যেক আইনজীবীর সংগ্রহে রয়েছে। মনে মনে ভাবি, এমন একজন মেধাবী লোককে তারা কি সব বেহুদা প্রশ্ন করছে।

সাকার আইনজীবীরা ভেবেছিল তিনি বাংলার অধ্যাপক ইংরেজি হয়ত বলতে পারেন না। তাই তারা বাংলায় জেরা করে পরে আবার ইংরেজিতে প্রশ্ন করেন। ড. আনিসুজ্জামান দ্রুত ইংরেজিতে সেই সব প্রশ্নের উত্তর দেন। সাকার আইনজীবীরা যত দ্রুত প্রশ্ন করেন ড. আনিসুজ্জামান তত দ্রুত উত্তর দেন। জেরাতে সুবিধা করতে পারেনি সাকার আইনজীবীরা। কোন প্রশ্ন করেই তাকে আটকাতে পারেনি। তাই ক্ষিপ্ত হয়ে আনিসুজ্জামানকে রিফিউজি বলে গালাগালি করে সাকা। যা পরে বিভিন্ন মিডিয়ায় প্রকাশিত হয়েছে।

এক সময় সাকার আইনজীবীরা ড. আনিসুজ্জামানকে মাদক সেবনকারী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করে। এতে তারা ব্যর্থ হয়। ষাটের দশকে নতুন চন্দ্র সিংহের কুন্ডেশ্বরীতে মৃত সঞ্জবনী নামে একটি এনার্জি ড্রিংক তৈরি করত। সেটা পান করতে ড.আনিসুজ্জামান ও তার দলবল সেখানে যেত এমনটা বলার চেষ্টা করে। ড. আনিসুজ্জামান এসব মিথ্যা বলেন। নতুন চন্দ্র সিংহের পরিবারের সঙ্গে তার কীভাবে পরিচয় হয়েছে তার পুরো ইতিহাস তিনি বলেন। এতসব জেনে সাকার আইনজীবীদের মুখ কালো হয়ে যায়।

ড. আনিসুজ্জামান একজন রিয়েল ফাইটার। সাকার মত কুখ্যাত ব্যক্তির বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিতে বুকের পাটা লাগে। তার সেই অসীম সাহস আমরা এজলাশে দেখেছি। অনেকে আদালতে এসে ঘাবড়ে যান। তার মধ্যে এসব দেখিনি।

আজ তিনি চলে গেলেন। কিন্তু রেখে গেলেন স্মৃতি। তাকে স্যালুট জানাই। অসাম্প্রদায়িকতার প্রতীক হয়ে তিনি আজীবন আমাদের মাঝে বেঁচে থাকবেন।

লেখক : সাংবাদিক