এই দুর্দিনে ভালোবাসার মুখগুলো

বিশ্বজিৎ চৌধুরী:  ঘরে থাকাই এখন সবচেয়ে ভালো নাগরিক বোধের পরিচয়। এ কথা মেনেও ৮-১০ দিনে একবার তো বেরোতেই হয় ক্ষুন্নিবৃত্তির প্রয়োজনে। শুনেছিলাম চট্টগ্রাম রেলওয়ে স্টেশনের গাড়ি পার্কিং এলাকায় একটি নিরাপদ কাঁচাবাজার বসানো হয়েছে। নাম দেওয়া হয়েছে করোনা মডেল কাঁচাবাজার। সেখানে নির্দিষ্ট দূরত্ব রেখে বড় এলাকাজুড়ে বসানো হয়েছে শাকসবজি, তরিতরকারি ও মাছ-মাংসের বাজার। ক্রেতাদের জন্য চিহ্নিত করা আছে দাঁড়ানোর জায়গা। মাস্ক ও গ্লাভস পরেছেন বিক্রেতারা। এসব ছাড়া ক্রেতাসহ কারোরই প্রবেশাধিকার নেই। মাইকে নিয়মাবলি স্মরণ করিয়ে দেওয়া হচ্ছে পুলিশের পক্ষ থেকে।

এ রকম সৃজনশীল উদ্যোগের জন্য পুলিশকে ধন্যবাদ না দেওয়া অন্যায় হবে। খবর নিয়ে জানলাম, বাজারটির কোথায় বসালে ক্রেতা-বিক্রেতাদের সুবিধা হবে তা বুঝতে একজন শিল্পী ও চারুকলা কলেজের কয়েকজন ছাত্রকে দিয়ে পরিকল্পনা ও নকশা তৈরি করে নিয়েছিলেন কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ মহসিন।

পুলিশের ভূমিকা দেখে বিস্মিত হয়েছি, কৃতজ্ঞতা বোধ করেছি। শুধু চট্টগ্রাম শহরেই ৫০ হাজার মানুষকে নানাভাবে ত্রাণসহায়তা দিয়েছে পুলিশ। বাড়ি বাড়ি গিয়ে খাবার পৌঁছে দিয়েছে। জরুরি প্রয়োজনে ফোন করতে হটলাইন নম্বর জানিয়ে দেওয়া হয়েছে পত্রপত্রিকা ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। সেই নম্বরে যোগাযোগ করে বিফল হয়নি বিপদগ্রস্ত মানুষ। কক্সবাজার থেকে খবর পেলাম, পর্যটন মৌসুমে যাঁরা নানা পেশায় নিয়োজিত থেকে জীবনধারণ করতেন, তঁদের পাশে দাঁড়িয়েছে সেখানকার পুলিশ। গত ২৮ দিনে দুর্গম ও উপকূলীয় এলাকায় ১ হাজার ২৮০ পরিবারে ত্রাণসহায়তা এবং ৫ হাজার ৮৮০ পরিবারকে রান্না করা খাবার সরবরাহ করেছে তারা।

হাওর অঞ্চলের চাষিরা বন্যার আশঙ্কায় ভুগছেন। সেখানে চট্টগ্রাম থেকে দেড় হাজার শ্রমিক পাঠানোর উদ্যোগ নিয়েছে পুলিশ। প্রতিটি বাসে ২০ জন করে শ্রমিককে সেখানে পাঠানোর জন্য এক শীর্ষস্থানীয় শিল্পগোষ্ঠীর সহায়তা নিয়েছে তারা। পুলিশ বললে বন্দুক আর লাঠি হাতে ছুটে আসা যে বিশেষ পেশার সদস্যদের কথা মনে পড়ে, এখন তাদের সেবাপরায়ণতা, মানুষের প্রতি মমত্ববোধ ও সর্বোপরি সৃজনশীল উদ্যোগ দেখে সত্যি বিস্ময় জাগে। জানি, এই পেশায় দুর্নীতিবাজ, অসৎ লোকের অভাব নেই, রাতারাতি তারা ভালোও হয়ে যাবে না। কিন্তু কিছু ভালো কাজ, কিছু সৃজনশীল উদ্যোগ মানুষকে আশাবাদী করবে, এই বিভাগের সদস্যদের ভাবমূর্তিও বদলাবে। এই দুর্দিনে তাদের আচরণ হয়তো ‘পুলিশ আপনার বন্ধু’ কথাটাকে যাচাই করার সুযোগ এনে দেবে।

চিকিৎসক ও চিকিৎসাব্যবস্থা নিয়ে ক্ষোভ-অভিযোগ-অভিমানের শেষ নেই। কিন্তু করোনা-আতঙ্কের দিনগুলোতে নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যেও তাঁরা নিজেদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দাঁড়িয়েছেন মানুষের পাশে। তাঁরা কর্মক্ষেত্রে রোগী শনাক্ত করছেন বা চিকিৎসা দিচ্ছেন; আর দুশ্চিন্তায় অনিদ্র রাত কাটাচ্ছেন তাঁদের স্ত্রী-সন্তান বা মা-বাবারা। শুরুর দিকে তো সুরক্ষা সরঞ্জামের প্রকট অভাব ছিল। উল্লেখযোগ্য সংখ্যক চিকিৎসক ও চিকিৎসাকর্মী করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন; কিন্তু অন্যরা সে জন্য মাঠ ছাড়েননি। সীমিত সামর্থ্যে তাঁরাও সৃজনক্ষমতার পরিচয় দিচ্ছেন। গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের উদ্ভাবিত টেস্টিং কিট ‘জিআর কোভিড-১৯ ডট ব্রট’ প্রস্তুত বলে ঘোষণা দিয়েছে তারা। ভেন্টিলেটর সংকটে বিকল্প ভেন্টিলেটর বা নন-কনভেনশনাল ভেন্টিলেটর তৈরির কথা জানিয়েছে বাংলাদেশ মেশিন টুলস ফ্যাক্টরি (বিএমটিএফ)। সিএমএইচে এই ভেন্টিলেটরের কার্যকারিতা পরীক্ষা করা হয়েছে বলেও জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।

ব্যক্তিপর্যায়ের উদ্যোগও থেমে নেই। করোনার চিকিৎসার জন্য চট্টগ্রামে ফিল্ড হাসপাতালের কার্যক্রম শুরু হয়েছে। চিকিৎসক বিদ্যুৎ বড়ুয়া ১০ জন চিকিৎসক ও ৬০ জন চিকিৎসাকর্মী নিয়ে এই হাসপাতাল চালু করেন। এতে সহায়তা দিচ্ছে নাভানা গ্রুপ। ৪০টি শয্যা ও ভেন্টিলেটর সুবিধার এই হাসপাতালে চট্টগ্রাম নগর ছাড়াও সীতাকুণ্ড, মিরসরাই ও ফেনীর রোগীরা চিকিৎসা সুবিধা পাবেন।

পুলিশ, চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা যখন মানুষের সেবায় ক্লান্তিহীন, তখন তাঁদের ভালোবাসার প্রতিদান দেওয়ার জন্যও যেন উদ্‌গ্রীব সাধারণ মানুষ। গত শুক্রবার দিবাগত রাতে বিভিন্ন হাসপাতালের চিকিৎসক, নার্স, স্বাস্থ্যকর্মী এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অন্তত দুই হাজার সদস্যের মধ্যে সাহ্‌রির খাবার বিতরণ করেছেন একদল তরুণ। ‘রাউজানবাসী’র ব্যানারে এ কার্যক্রম চালান তঁারা।

সমাজের নানা স্তরের মানুষের মধ্যে যে শুভ ও কল্যাণবোধের সৃষ্টি হয়েছে, এই দুর্দিনে তা যেন এক বড় আশা ও আশ্বাসের বিষয়। ত্রাণের চাল, ডাল, তেল চুরির ঘটনা প্রকাশিত হয়েছে পত্রপত্রিকায়। সেই চোরদের প্রতি ঘৃণা জানানোর ভাষা নেই। কিন্তু গ্রাম-গঞ্জে সমাজকর্মী, রাজনৈতিক কর্মী বা জনপ্রতিনিধিদের অনেকেই সরকারি হিসাবের বাইরে নিজেরাও যে মানুষকে নানাভাবে সহায়তা করছেন, তারও তো অনেক খবর পাই।

নারায়ণগঞ্জে গায়ত্রী দেবী নামের এক বৃদ্ধার মৃত্যুর পর যখন আত্মীয়স্বজন কাউকে পাওয়া যাচ্ছিল না লাশ সৎকারের জন্য, তখন নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের ১৩ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর খোরশেদ আলম লোকজন নিয়ে শ্মশানে মৃতদেহের সৎকার করেছেন। এই সংবাদ জেনে মানুষ হিসেবেই যেন এই গৌরবের অংশীদার হয়ে পড়ি আমরা, ‘মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান।’ এর আরেক রকম চিত্রও দেখি। মিরসরাই গজারিয়া সর্বজনীন মাতৃমন্দিরের ত্রাণ বিতরণের সময় হিন্দু ও মুসলমানের মধ্যে কোনো ভেদাভেদ করা হয়নি।

সিলেটের হাওর অঞ্চলসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় ধান কাটার শ্রমিকসংকট দেখা দিয়েছে। আগাম বন্যার আশঙ্কায় চোখে ঘুম নেই কৃষকের। এ সময় তাঁদের পাশে দাঁড়িয়েছেন ছাত্র-শিক্ষক–ব্যবসায়ীসহ নানা পেশার মানুষ। বিনা মজুরিতে ধান কেটে মাড়াই করে তাঁরা পৌঁছে দিচ্ছেন কৃষকের বাড়িতে। এই দৃশ্য কে কবে দেখেছে আগে। এই দুর্দিন আমাদের ভালোবাসার কত রূপ যে দেখাল, এই কথা কি কোনো দিন ভুলতে পারব আমরা?

ফেসবুকের মাধ্যমে নানা সংগঠন গড়ে উঠেছে। এই মুহূর্তে আয়-উপার্জনহীনদের পাশে নানাভাবে দাঁড়াচ্ছে তারা। গরিবদের তো বটেই, যেসব মধ্যবিত্ত মুখ ফুটে বলতে পারছে না অভাবের কথা, তাদের স্বল্পমূল্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী পৌঁছে দিচ্ছে, যাতে কোনোভাবেই তাদের আত্মসম্মানে আঘাত না লাগে। চিরকাল দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির সুযোগ নেওয়া অসাধু ব্যবসায়ীদের দেখে এসেছি আমরা, কিন্তু আমাদের চারপাশে এত ভালো মানুষও যে আছে, তা কী করে জানতাম করোনাভাইরাস না এলে? পথের অভুক্ত কুকুর-বিড়ালের জন্যও মানুষের ভালোবাসার অভাব নেই—এ কথা কী করে জানতাম এই মহামারি না এলে?

বিশ্বজিৎ চৌধুরী প্রথম আলোর যুগ্ম সম্পাদক, কবি ও সাহিত্যিক

bishwabd@yahoo.com